03/07/2026
রহস্যময় ফ্লোর //.
নিউইয়র্কে আসার প্রথম বছরের ঘটনা। বহু বছরের পুরনো এক বন্ধুর খবর পেয়ে তার বাসায় গিয়েছিলাম- ম্যানহাটনে, হাডসন নদীর পাড়ে। সে একা থাকে। অনেকদিন পর দেখা, রাতভর আড্ডা দেওয়ার কথা।
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে হঠাৎ তার জরুরি ফোন এলো। মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, খুব দরকারি কাজ, এখনই বেরোতে হবে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার আমার দিকে তাকাল- চোখে যেন অদ্ভুত তাড়া। তারপর বলল, তুই থাক, আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরব।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর অ্যাপার্টমেন্টটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগছিল। পুরোনো বিল্ডিং, উঁচু সিলিং, লম্বা করিডর। জানালার বাইরে শহরের আলো, ভেতরে চাপা নীরবতা। আমি সোফায় বসে টিভি চালালাম, আবার বন্ধ করলাম। বাতি আধো। হঠাৎ মনে হলো, ঘরের ভেতর আরেকটা নিঃশ্বাস আছে।
প্রথমে ভাবলাম ভুল শুনছি- ফ্রিজের শব্দ, পাইপের আওয়াজ। কিন্তু না। ধীরে ধীরে কাছে এলো, কারও হাঁটার মতো। কার্পেটের ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে। বুক ঠান্ডা হয়ে গেল। ঘড়ি রাত দুইটা দেখাচ্ছে। করিডরের শেষ প্রান্তে ছায়াটা দেখলাম। লম্বা, স্থির। সেখানে তো কেউ থাকার কথা নয়।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। পা দুটো যেন নিজের ইচ্ছেতে এগোল। করিডরে ঢুকতেই বাতি নিভে গেল। চারদিক অন্ধকার। আমি একা নই।
কানের কাছে কেউ আস্তে বলল, ফিরে যা। কণ্ঠ নারী না পুরুষ বোঝা গেল না। বরফ ঠান্ডা বাতাস গালে লাগল। আমি ঘুরে দেখি, লিভিং রুমের আলো নিজে থেকে জ্বলে উঠেছে। সুইচ আমি ছুঁইনি। সোফার ওপর কেউ বসে আছে ভেজা কাপড়ে। মাথা নিচু। ভেজা চুল ঝুলছে। মেঝেতে টুপটাপ জল পড়ছে। বাইরে তো বৃষ্টি হয়নি।
আমি এক পা এগোতেই সে মুখ তুলল। মুখ নেই। শুধু ফাঁকা অন্ধকার, যেন গভীর জল। সোফায় বসে থাকা অবয়ব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মেঝেতে জল জমে ছোট দাগের মতো ছড়িয়ে গেল। আমার পায়ের আঙুল ছুঁয়ে ঠান্ডা হয়ে গেল। সে এগিয়ে আসছে। আমি পিছোচ্ছি। দেয়ালে ঠেকে গেল পিঠ।
ঠিক তখনই মোবাইলের রিংটোন। বন্ধুর কল। আলো স্বাভাবিক। আমি চোখ বন্ধ করেছিলাম এক মুহূর্ত। খুলে দেখি, ঘর ফাঁকা। সোফা শুকনো। করিডর নিস্তব্ধ। ফোনে বন্ধু বলল, আর একটু দেরি হবে। আমি কিছু বলিনি। শুধু কার্পেটের এক কোণা এখনো ভেজা। বাতাসে কাঁচা পানির গন্ধ।
আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াইনি। লিফটে নেমে বাইরে চলে এলাম। ঠান্ডা রাতের বাতাসে শ্বাস নিলাম। সোজা বাসায় ফিরলাম।
দুদিন পর বন্ধু ফোন করল। বলল, সেদিন তো তোর আসার কথা ছিল। আমি রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। দুই দিন হয়ে গেল, ফোনও করলি না। কী হলো? আমি সব বললাম। বন্ধু কিছুক্ষণ চুপ। তারপর ধীরে বলল, তুই তো আসিসইনি। আমি বাসাতেই ছিলাম।
পরদিন ঐ বিল্ডিংয়ে গেলাম। রিসেপশনে গেস্ট রেজিস্টারে আমার সিগনেচার দেখে চোখ বড় হয়ে গেল। কোন ফ্লোরে গিয়েছিলাম, কার বাসায় গিয়েছিলাম, বুঝতে পারিনি। মেয়েটা বলল, অনেক ফ্লোরে রেনোভেশন চলছে। অনেক অ্যাপার্টমেন্ট ফাঁকা। বন্ধুর বাসায় যাওয়ার আর সাহস হয়নি। সেই রাতে যেমন বাসা দেখেছি, আর এখন গিয়ে কি দেখব- ভেজা কার্পেট, সোফা, করিডর কেমন হবে, সেই ভয়ে আর যাওয়া হয়নি।
কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। রাত দুইটা বাজলেই ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়, কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। দরজা আস্তে ঘুরছে। চোখ খুলতে ভয় লাগে। সোফায় কেউ বসে আছে। মাথা নিচু। ভেজা চুল ঝুলছে। মেঝেতে অদৃশ্য জল। আর সে চুপচাপ অপেক্ষা করছে, যেন আমি আবার ফিরব।
একটা অস্বস্তি কাজ করছিল খুব। কোন কাজে মন বসছিল না। ভূতপ্রেত আমি বিশ্বাস করি না। তবু মনে হচ্ছিল এর একটা কুলকিনারা করা দরকার।
পরদিন বিল্ডিংয়ে আবার গেলাম। রিসেপশনের গেস্ট রেজিস্টারে আমার সিগনেচার দেখেছিলাম। পাতাটি উল্টালাম- তারিখ মিলল, সময় মিলল। কিন্তু আমার সিগনেচার নেই। লাইনটা ফাঁকা।
নিজে নিজে ব্যাখ্যা সাজাতে লাগলাম। সবই ক্লান্তির ফল। নতুন শহর, পুরোনো বিল্ডিং, পাইপের শব্দ, আলো ছায়ার খেলা। নিজেকে বোঝালাম, ফিসফিসটা ছিল বাতাসের শব্দ। ফিরে যা আমি নিজেই শুনেছি। মস্তিষ্ক বিপদের সময় নিজেকেই সাবধান করে। আবার ভাবলাম, হয়তো সেই অবয়ব আমাকে তাড়িয়ে দেয়নি, বাঁচিয়েছিল। হয়তো ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছিলাম। রেনোভেশনের ফাঁকা ফ্লোর, আধো আলো, ক্লান্ত চোখে ছায়া মানুষ হয়ে উঠেছিল। তবু প্রশ্নটা রয়ে গেল। তাহলে আমার সিগনেচার কোথায় গেল?
কয়েকদিন পর ম্যানহাটনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। লেখা ছিল Paranormal Psychologist। কৌতূহল বশে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ভদ্রলোক মন দিয়ে পুরো ঘটনাটা শুনলেন। তারপর তিনটি সম্ভাবনার ব্যাখ্যা দিলেন।
প্রথম সম্ভাবনা, আমি আসলে সেখানে যাইনি। পুরো ঘটনাটা মনস্তাত্ত্বিক। ভয়, ক্লান্তি আর অচেনা পরিবেশ থেকে আমার মস্তিষ্ক নিজেরই একটা দৃশ্য তৈরি করেছে। ঘটনা বাস্তবে ঘটেনি, তবে অনুভূতিটা বাস্তব ছিল।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, আমি গিয়েছিলাম, তবে অন্য ফ্লোরে। সেখানে হয়তো অদ্ভুত আলো ছায়া, নীরবতা আর মানসিক চাপ মিলে একটা অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল। বাস্তব আর মানসিক অভিজ্ঞতার মাঝামাঝি কিছু।
তৃতীয় সম্ভাবনা সবচেয়ে অদ্ভুত। আমি ভুল ফ্লোরে যাইনি, ভুল সময়ে গিয়েছিলাম। কিছু জায়গায় বাস্তবতার স্তর খুব পাতলা হয়ে যায়। সেখানে অন্য সময়ের কোনো ছায়া এসে পড়ে। আমি হয়তো সামান্য সময়ের জন্য সেই স্তরে ঢুকে পড়েছিলাম। আমার সিগনেচার ছিল, কিন্তু অন্য কোনো সময়ে।
ভদ্রলোক আরও বললেন- “আপনার অভিজ্ঞতার বেশির ভাগ অংশেরই যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু দুটি বিষয় আমার যুক্তির বাইরে- আপনি যে কার্পেট ভেজা দেখেছেন এবং রিসেপশনের রেজিস্টারে নিজের সিগনেচার। যদি এই দুইটি সত্য হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা আমার কাছেও নেই।”
আমি চুপচাপ তার অফিস থেকে বের হয়ে এলাম। হঠাৎ মনে হলো বন্ধুকে আবার ফোন দিই। মোবাইল বের করে নাম্বারটা ডায়াল করলাম। কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর ফোনের ওপাশে যান্ত্রিক একটা নারী কণ্ঠ ভেসে এলো- “The number you have dialed is not in service.” আমি আবার ডায়াল করলাম। একই উত্তর। ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলাম।
বাইরে তখন ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তা, আলো আর মানুষের ভিড়। সবকিছু স্বাভাবিক। তবু সেই রাতের স্মৃতি পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। আজও মাঝে মাঝে মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। ঘড়ির দিকে তাকাই না। কারণ আমার অদ্ভুতভাবে মনে হয়, তখন ঠিক রাত দুইটা বাজে। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর খুব কাছে কোথাও থেকে যেন ভেজা কারও নিঃশ্বাস ভেসে আসে।.
মনজু
নিউ জার্সি
৭ মার্চ ২০২৬