07/05/2026
Writers' Building শুধু একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের এক জীবন্ত সাক্ষী। Kolkata শহরের প্রাণকেন্দ্র বি.বি.ডি বাগ এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক ভবন বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। লাল রঙের বিশাল এই অট্টালিকা আজও কলকাতার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরুণ কেরানি বা “রাইটার”দের কাজের জন্য এই ভবনের নির্মাণ শুরু হয়। সেই সময় ইংল্যান্ড থেকে বহু যুবক ভারতে আসতেন কোম্পানির প্রশাসনিক কাজ করার জন্য। তাদের থাকার ও কাজের জায়গা হিসেবেই তৈরি করা হয় Writers’ Building। ভবনটির নকশা তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত স্থপতি থমাস লায়ন। প্রথমদিকে এটি ছিল তুলনামূলক সাধারণ একটি ভবন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর আকার ও গুরুত্ব দুটোই বৃদ্ধি পায়। পরে ভবনটিকে নতুনভাবে সম্প্রসারণ ও অলংকরণ করা হয়, যার ফলে এটি ইউরোপীয় ধাঁচের এক বিশাল প্রশাসনিক ভবনে পরিণত হয়।
উনিশ ও বিশ শতকে Writers’ Building হয়ে ওঠে ব্রিটিশ বাংলার প্রশাসনের মূল কেন্দ্র। এখান থেকেই বাংলার শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হতো। ব্রিটিশ অফিসারদের কঠোর প্রশাসন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম এই ভবন থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে Writers’ Building ছিল একদিকে ক্ষমতার প্রতীক, অন্যদিকে ব্রিটিশ অত্যাচারেরও প্রতিচ্ছবি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে Writers’ Building-এর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিন তরুণ বিপ্লবী — বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত — ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী অভিযান চালান। তারা ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা কর্নেল এন.এস. সিম্পসনকে লক্ষ্য করে Writers’ Building-এ প্রবেশ করেন। এই আক্রমণ ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং সারা বাংলার যুবসমাজকে স্বাধীনতার আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরে এই তিন বিপ্লবীর স্মৃতিতে ডালহৌসি স্কোয়ারের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বি.বি.ডি বাগ — অর্থাৎ বিনয়, বাদল ও দীনেশ বাগ।
স্বাধীনতার পর Writers’ Building পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান সচিবালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বহু মুখ্যমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এখান থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব পরিচালনা করেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই ভবন ছিল বাংলার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী এখানে কাজ করতেন এবং অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখান থেকেই নেওয়া হতো।
স্থাপত্যের দিক থেকেও Writers’ Building অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর দীর্ঘ বারান্দা, উঁচু স্তম্ভ, বিশাল জানালা এবং গ্রিক-রোমান ধাঁচের নকশা ভবনটিকে এক অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছে। ভবনের সামনে থাকা মূর্তি ও অলংকরণ ব্রিটিশ যুগের শিল্পরীতির পরিচয় বহন করে। রাতের আলোয় আলোকিত Writers’ Building কলকাতার অন্যতম আকর্ষণীয় দৃশ্য হিসেবে ধরা হয়।
আজও Writers’ Building শুধু একটি পুরোনো সরকারি ভবন নয়, এটি বাংলার গৌরব, সংগ্রাম ও ইতিহাসের প্রতীক। এই ভবনের প্রতিটি ইট যেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ, ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস এবং বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প বহন করে চলেছে।