12/05/2019
মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ'ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক'রে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।
সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে,
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।
ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,
কোনোখানে জনমানব নাই,
তুমি যেন আপন-মনে তাই
ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’
আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো,
ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে-
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,
‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’
এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’
ওই - যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে,
বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে
আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,
‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’
তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’
আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’
ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।।
এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক'রে,
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে
বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’
কী দুর্দশাই হত তা না হলে!’
সত্যিই মা কথাটি অনেক মধুর এবং ভালোবাসার এক বিশাল আকাশ, অথৈ সাগর এবং সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত প্রেমময়ী এক নাম।
” মা হল পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ, কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময়ে নেই বিনা সুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা।”
আপনি যত বড়ই হন না কেন, মায়ের কাছে আপনি সেই ছোট শিশুর মতোই। আপনার বাড়ি ফিরতে দেড়ি হলে কিংবা ফোন বন্ধ থাকলে মায়ের চেয়ে বেশি কষ্ট আর কেউ পায় না। যখন আপনি দরজায় এসে দাঁড়ালে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে বলবে খোকা এসেছিস, কত টেনশনে ছিলাম। মায়ের হাতের রান্না করা খাবার সব খাবারের ঊর্ধ্বে। মায়ের আর বাবার দুজনেরই সমান অবদানের কথা বলা হলেও বাবা খানিকটা আড়ালেই থাকেন মায়ের অপরিসীম আর অনবদ্য ভূমিকার কারণে। মা হলো একাধারে অভিভাবক, বন্ধু বা কাছের একজন, যাঁর সঙ্গে অভিমান কার যায়, আবার নিজের ভেতরের সবকিছু উগড়ে দেওয়া যায়।
পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্ট হবে যে মাকে ভালোবাসে না। ব্যতিক্রমের বিষয়টা বাদ দিয়ে এটাই আমাদের সাধারণ জীবনের অসাধারণ এক সমীকরণ। যে বৃত্তে বন্দি প্রায় প্রতিটি প্রাণী; শুধু মানুষ বললেই ভুল হবে, প্রায় প্রতিটি জীবই মাতৃত্বের এই গোলক ধাঁধার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে। একবার চিন্তা করে দেখুন তো, মাতৃত্বের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যদি ব্যাহত হতো। তাহলে অবস্থাটা কী হতো? আর যাই হোক, যে এক জীবনে মাকে পেল, সে মাকে হারাতে চাইবে না কোনো দিন। এই পৃথিবীতে মা ছাড়া কেউ তাঁর সন্তানকে স্বার্থহীন ভাবে ভালোবাসে না। মায়ের ভালোবাসার মধ্যে আছে প্রকৃত সুখ।
মায়ের ভালোবাসাকে স্বরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর পালন করা হয় Mother’s Day মা দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে “মা দিবস” হিসাবে উদযাপনের ঘোষণা দেয়া হয় ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেসে। আর তখন থেকেই এই দিনে সারা বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে এই দিবস। বিশ্বের প্রায় ৪৬টি দেশে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। কথিত আছে, ব্রিটেনেই প্রথম শুরু হয় মা দিবস পালনের রেওয়াজ, কেননা সেখানে প্রতি বছর মে মাসের চতুর্থ রবিবারকে মাদারিং সানডে হিসাবে পালন করা হতো।
মা-ই পারে নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে রোগগ্রস্ত সন্তানকে সেবা প্রদান করে সুস্থ করে তুলতে। এই মা-ইতো প্রথমে অ আ অক্ষর এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ দেন। তারপর ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেন স্কুলে পাঠাতে। প্রাথমিক থেকে সর্বশেষ শিক্ষা সমাপনে মায়ের যে ভূমিকা তা কোন সু-সন্তানকে নিশ্চয়ই নূতন করে মনে করিয়ে দেবার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়না। তবে কু-সন্তানেরা এই মমতাময়ী মাকে দুধের ঋণ শোধ দূরে থাক, কুলাঙ্গার সন্তান সেই মাকে কতইনা কষ্ট দিয়ে চলে। মায়ের আদর, মমতা, শাসন সর্বোপরি দায়িত্ববোধ আর কারও সাথে তুলনা চলেনা। সেই মায়েরা যখন সন্তানদের কাছ থেকে কষ্ট পায়, আঘাত পায় এবং অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করে তখন ঐ মা যে কিভাবে নিজেকে শীতল রাখেন তা ভাবা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। মা তো মা, সে তবুও সন্তানকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে প্রাণান্ত চেষ্টায় নিবিষ্ট থাকে, কখনো সফল হয় কখনো ব্যর্থ হয়। মা ভীষণ কষ্ট পায় যখন নিজের গর্বের সন্তান তার বৌয়ের অসহযোগিতার কারণে মাকে নিজের সাথে না রেখে বৃদ্ধ বয়সে আলাদা করে দেয়। এই কষ্ট কোন ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। সন্তান যখন ভরন পোষণের দায়িত্ব নেয়না, এমনকি দেখা সাক্ষাতও করেনা, একটু গভীর ভাবে ভাবুনতো কি অব্যক্ত ব্যথা জাগবে মায়ের মনে! ভাববেন, তা হলে বাবার দায়িত্ব কি?
মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রি ভুবনে নাই।