19/11/2025
#মেঘালয়ে_কালো_ছায়া ভ্রমণ কাহিনী (পর্ব - ৯)
আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। আজ অনেকটাই বড় পরিকল্পনা বানিয়ে রেখেছি। বিপ্লবদা আর ওর বান্ধবী ঠিক করেছে, আজ ওরা শিলিগুড়িতে নাইট স্টে করবে। কিন্তু আমার ইচ্ছা গুয়াহাটি থেকে এক টানে কলকাতা ফিরে যাওয়ার।
যদিও এই কয়েকদিন প্রচুর পরিমাণে রাইড করে শরীর যথেষ্ট ক্লান্ত আছে। এর উপর একটানা ২৪ ঘন্টা বাইক চালানো, যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। যদি সেরকম কোন সমস্যা হয়, তাহলে রিক্স নেব না।
আজ আমার শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা শুধুমাত্র হবে না। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যেরও যথেষ্ট পরীক্ষা হয়ে যাবে।
বিপ্লবদারা রোজ দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। এই কারণে আমি ফোন করে ওদের উঠে পড়তে বললাম।
স্নান করে, ব্যাগ গুছিয়ে, ব্রেকফাস্ট করে আমি আটটার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। কিন্তু এখনো ওদের দেরি হবে।
যার কারনে আমি বসে গেলাম ইউটিউবের ভিডিও এডিটিং-এ। Arindam NBD নামেই আমার একটা ছোট্ট ইউটিউব চ্যানেল। আমার বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি এখানে আমি শেয়ার করি।
আমাদের হোটেল থেকে বের হতে সকাল নটা বেজে গেল। বাইরে যথেষ্ট রোদ উঠে গেছে। মেঘালয়ে ঠান্ডা থাকলেও, গুয়াহাটিতে যথেষ্ট গরম।
অফিস টাইম হয়ে যাওয়ায় গুয়াহাটি শহরে যথেষ্ট ভিড় রয়েছে। জাতীয় সড়কেও যানবাহনের মেলা। বাধ্য হয়েই ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম।
গুয়াহাটি শহরটা একটা উপত্যকা শহর। এই শহরকে চতুর্দিকে পাহাড়ে ঘিরে রেখেছে। আর গুয়াহাটি শহরের পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী। এই ব্রহ্মপুত্র নদীর ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়া মানেই, গুয়াহাটি শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়া।
ব্রহ্মপুত্র নদী পার হতেই যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে গেল। এবার যথেষ্ট ফাঁকা রাস্তা। তুলনামূলক স্পিড বেড়ে গেল আমাদের বাইকের।
রাস্তা যথেষ্ট ভালো হওয়ায় এবং পরিকল্পনা অনেক বড় হওয়ায় মাঝে কোথাও দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু দেখতে দেখতে পাঁচ ঘন্টা অতিক্রম হয়ে গেছে। এবার একটু রেস্ট দরকার। সঙ্গে খিদেও পেয়ে গেছে। কারণ এখন দুপুর দুটো বাজে।
রাস্তা ভালো হলেও, ভালো খাবারের জায়গার বড়ই অভাব। প্রায় আধঘন্টা খোঁজার পর একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ধাবা দেখতে পেলাম। এখানেই ভাত ডাল সবজি ডিমের ওমলেট সহযোগে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম।
খাওয়ার পরে বিপ্লবদার এখন ঘুম পাচ্ছে। এরই মধ্যে আমি বিপ্লবদাকে একটানা কলকাতা যাওয়ার প্রস্তাব দিলাম। আমার প্রস্তাব শুনে চোখগুলো আমড়ার মত গোল গোল করে, ঘাড় নাড়া বুড়োর মতো জোরে জোরে মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল তার পক্ষে অসম্ভব।
বাধ্য হয়ে, ওদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই রওনা হলাম। এখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ম্যাপের সময় অনুযায়ী আমার কলকাতায় পৌঁছাতে আটটা বাজবে।
ওদিকে বেলা যত বাড়বে, তত বেশি ঘুম পাবে। সেই কারণে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে কলকাতা ঢুকতে হবে। অন্যথা আমার এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার কিছু কিলোমিটার পূর্বে পেট্রোল পাম্প থেকে বাইকে ফুল ট্যাংকি তেল ভরে দিলাম। কারণ এখানে পেট্রোলের দাম পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় ৭ টাকা কম। আসামের সীমানাবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ গাড়ি আসাম থেকেই তেল ভরে। কিন্তু আমরা এই সুযোগ রোজ পাই না। যার কারনে আমাদের বেশি টাকা দিয়েই তেল ভরতে হয়।
পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে বেশ কিছুটা এগোতেই রাস্তা সরু হয়ে গেল। এখন দু দিক থেকেই গাড়ি যাতায়াত করছে। এইরকম জাতীয় সড়কে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
রাস্তার বেশ কিছু জায়গায় কাজ চলছে। আর জমাট ধুলোয় অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
ভারতের সবথেকে বেশি চা উৎপাদন হয় আসামে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা আসামে কোন চা বাগান দেখতে পাইনি। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে কিছু কিলোমিটার এগোতেই রাস্তার দুদিকে সুন্দর সুন্দর চা বাগান।
রাস্তার দু'পাশে বড় বড় গাছ আছে। আর রাস্তা শুরু হওয়ার কারণে, রাস্তায় যথেষ্ট ছায়া আছে। বিকালের সময় এই রাস্তায় বাইক চালাতে সত্যিই অপূর্ব লাগছে।
জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছিল এখানে একদিন থেকে যাই। কিন্তু একদিন অতিরিক্ত থাকার সময় আমার হাতে নেই। আগামীকাল পর্যন্তই ছুটি। আগামীকাল যাতে সারাদিন রেস্ট নিতে পারি, সেই উদ্দেশ্যেই একটানা বাইক চালিয়ে কলকাতায় যাবো।
অনলাইন ম্যাপ সময় দিয়েছিল সন্ধ্যা সাতটায় আমি শিলিগুড়ি পৌঁছাব। কিন্তু আমি এক ঘন্টা পূর্বেই শিলিগুড়ি ঢুকে গেলাম। শিলিগুড়িতে একটা ছোট্ট চা বিরতি নিয়ে পুনরায় রওনা হলাম।
অন্ধকারের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। শরীরে এখনো ভরপুর উদ্যম রয়েছে। কিন্তু এই প্রথমবার আমি একা একা বাইক নিয়ে এই রাস্তায় সারারাত রাইড করবো। কোনরকম যান্ত্রিক গোলযোগ না হলে, অন্য কোন সমস্যা এই রাস্তায় হওয়ার কথা নয়। তবুও একা থাকায় একটু ভয় থেকেই যায়।
অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় রাস্তার দু'পাশের চা বাগান গুলো দেখা যাচ্ছে না। শিলিগুড়ি থেকে ডালখোলা পর্যন্ত রাস্তা যথেষ্ট খারাপ। এই রাস্তাটা একটু সাবধানে চালাতে হবে।
ডালখোলা পর্যন্ত বাইকের গতি অনেকটাই কমিয়ে নিলাম। একা থাকায় সাবধানতা একটু বেশিই অবলম্বন করা ভালো। ডালখোলা পৌঁছাতেই প্রায় নটা বেজে গেল।
সারাদিন বাইক চালানোর কারণে খিদে একদমই পাচ্ছেনা। পুনরায় একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। এখান থেকে দুটো কেক আর গরম দুকাপ চা খেয়ে নিলাম। ঘুম কাটানোর সবথেকে ভালো ওষুধ হচ্ছে চা। যদিও এখনো আমার বিন্দুমাত্র ঘুম পায়নি।
এই রাতে কোন দোকানে দাঁড়ালে একটাই সমস্যা, মানুষ জন জিজ্ঞাসা করে “কোথায় যাচ্ছি”। কিন্তু বর্তমান সময়ে সঠিক উত্তর দেওয়া বিপদজনক হতে পারে।
বিপ্লবদারা নিশ্চয়ই এর মধ্যে শিলিগুড়ি পৌঁছে গেছে। ওদের একটা ফোন করলাম। ফোনে জানতে পারলাম মাঝ রাস্তায় ওদের একটা ছোট এক্সিডেন্ট হয়েছে। একটা বাইক বেপরোয়া ভাবে ওদের সামনে চলে আসে। আর সেই বাইকের সাথেই ধাক্কা লেগে ওরা পড়ে যায়। বাইকের অল্প বিস্তার ক্ষতির সঙ্গে, ওদের হাত পা কেটে গেছে।
ওদের এই অবস্থা শুনে আমি পুনরায় শিলিগুড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বললাম। কিন্তু ওরা আমাকে বারণ করলো। ভয় পাওয়ার মত কিছু হয়নি আশ্বস্ত করে, আমাকে সাবধানে কলকাতা যেতে বলল।
আমি পুনরায় বাইক ছুটিয়ে দিলাম কলকাতার উদ্দেশ্যে। মালদা পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু মালদার পরে অল্প অল্প কোমরে ব্যথা হতে শুরু করলো। এতক্ষণ হেলমেট পড়ে থাকায় ঘাড়েও ব্যথা করছে।
এবার ঠিক করলাম প্রত্যেক টোল গেটে কিছুক্ষণ সময় বিশ্রাম নিয়ে যাত্রা করব। বাকি রাস্তাটুকু যে সুখকর হবে না, তা ভালোমতোই বুঝতে পারছি।
কৃষ্ণনগর পৌঁছাতে ভোর চারটে বেজে গেল। শরীর এবার যথেষ্ট ক্লান্ত লাগছে। বাইক চালাতে আর একদমই ইচ্ছা করছে না। একটু একটু ঘুম পাচ্ছে।
আর মাত্র ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা বাকি। এখন মন ও মস্তিষ্ক দুটোকেই যথেষ্ট সংযত রাখতে হবে। এই রাস্তাটুকুই হবে এই রাইডের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
বহু কষ্টে রানাঘাট পর্যন্ত এলাম। বাইকের সিটে আর বসে থাকা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন গরম তাওয়ার উপর বসে আছি।
ভালোমতোই বুঝতে পারছি আর একটানা বেশিক্ষণ বাইক চালানো যাবে না। এবার পরিকল্পনা করলাম প্রত্যেক কুড়ি কিলোমিটার অন্তর 10 মিনিট বিশ্রাম নেব। এর ফলে একটু দেরি হলেও, কষ্ট কম হবে।
এই ভাবেই ধীরে ধীরে বারাসাত পর্যন্ত আসলাম। কিন্তু অবাক কান্ড। বারাসাত আসতেই শরীরের ক্লান্তি অনেকটাই কমে গেল। আর সামান্য কিছুটা রাস্তা অতিক্রম করলেই বাড়ি পৌঁছে যাব। আর সেই আনন্দে সমস্ত ক্লান্তি ডানা মেলে উড়ে গেছে।
এবার বারাসাত থেকে একটানা বাইক চালিয়ে সকাল আটটায় বাড়ি চলে আসলাম।
শরীরে এখন বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই এখন আমার মূল উদ্দেশ্য।
বিপ্লবদা কে একটা ফোন করলাম। জানতে পারলাম, ওরা সুস্থ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিলিগুড়ি থেকে রওনা হবে।
সবাইকে আমার এই ভ্রমণের গল্প শোনানো সম্পন্ন হল। এবার আমি চললাম ঘুমাতে। খুব তাড়াতাড়ি সব পাঠকদের সঙ্গে নিয়ে পুনরায় বেরিয়ে পড়বো নতুন কোন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সবাই ভাল থাকবেন।
** আমার সমস্ত ভ্রমণ কাহিনী ভিডিও ফর্মে পেতে "Arindam NBD" ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করুন।
** এই ভ্রমণ সিরিজের প্রত্যেকটা পার্ট সহজে পেতে #মেঘালয়ে_কালো_ছায়া বা লিখে সার্চ করুন।
** আপনাদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
#মেঘালয়_ভ্রমণ_কাহিনী #মেঘালয়_ভ্রমণ #ভ্রমণকাহিনী