09/06/2026
এই বাংলা মা ভগবতীর বিশেষ প্রিয় তাই তাঁর কৃপাতে ধন্য এই বঙ্গভূমি দেবী মহামায়া চণ্ডিকার বহু প্রাচীন মন্দির আছে তার অন্যতম এক মন্দির আজ আলোচ্য।
দক্ষিন চব্বিশ পরগনার,ডায়মন্ড হারবারের লালবাটি গ্রামের অতি প্রাচীন ও জাগ্রত পীঠ স্থান দেবী চণ্ডীতলা ।এই মন্দির কে ঘিরে রয়েছে অনেক অলৌকিক কাহিনী।
দেবী চণ্ডী এখানে কোনো মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত নন বরং তাঁর নিবাস বটবৃক্ষের ছায়ায়।দেবী এখানে কোনো মন্দিরে আবদ্ধ থাকতে পছন্দ করেন না বলে লোকবিশ্বাস। মা চণ্ডীর জন্য মন্দির নির্মানের চেষ্টা গ্রামবাসীরা করলেও সেই ভব্য মন্দির নির্মাণ কে দেবী বিফল করে দেন। তাই দেবী চণ্ডিকা এখানে বট বৃক্ষের নীচেই বসবাস করেন তাই গ্রামবাসীরা মায়ের জন্যে বেদী নির্মান করে দিয়েছেন আর সেই বেদীর ওপরেই মা চণ্ডীর অধিষ্ঠান । লোককাহিনী অনুসারে দেবী চণ্ডী দূর্ধর্ষ হিন্দু বিদ্বেষী দস্যু কালাপাহাড় কে যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। কালাপাহাড় মধ্যযুগের সেই সময় সারা ভারতবর্ষের বহু হিন্দু মন্দির ও দেব দেবীদের বিগ্রহ ধ্বংস লীলায় মেতে ছিলেন এবং তার নজর পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার লালবাতির দেবী চণ্ডীর এই বিগ্রহের ওপরে তাই এই বিগ্রহ ধ্বংস করতে এখানে এলে স্বয়ং দেবী চণ্ডিকা প্রকট হয়ে দস্যু কালাপাহাড়ের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণা হন এবং কালাপাহাড় কে দেবী পরাস্ত করেন।দস্যু কালাপাহাড়ের সাথে এই প্রবল যুদ্ধ শেষে মা চণ্ডী রনক্লান্ত হয়ে এই স্থানে বটবৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই আজও কিংবদন্তী হয়ে লালবাটি গ্রামের লোকেদের মুখে মুখে ফেরে। এই দেবীর বিগ্রহটি কালো কষ্টিপাথরে নির্মিত । অনুমান করা হয় এই প্রাচীন মূর্তিটি পাল সেন যুগের সমসাময়িক । দেবী এখানে অষ্টভূজা, মহিষাসুরমর্দিনী ও আট টি হাতে আট টি আয়ুধ ধারন করেছেন , মহিষের পৃষ্ঠে দক্ষিণ পদ দ্বারা মুণ্ড বিচ্ছিন্ন করছেন এবং মহিষের বিচ্ছিন্ন শরীর থেকে উদ্গত পুরুষ রূপী মহিষাসুরকে দেবী ত্রিশূল দ্বারা বিদ্ধ করেছেন দেবীর অপর পদটি পদ্মের উপরে শোভিত । একটি বিশালাকার পদ্ম ফুলের ওপরে দেবীর বিগ্রহ টি শোভিত এবং দেবী মূর্তি তে খোদিত মা চণ্ডী ঋষিমুনিভি দ্বারা পূজিতা।দেবীর বিগ্রহটি প্রায় ধ্বংস প্রাপ্ত এবং তাই মূর্তির অলঙ্করণ প্রায় অবলুপ্তির পথে, তবুও জাগ্রত দেবী রূপেই গ্রামবাসীদের কাছে দেবী চণ্ডী পূজিতা হয়ে আসছেন।পাল যুগের স্থাপত্য শৈলী এই মূর্তিতে সুস্পষ্ট ও হাজার বছরের প্রাচীন । দেবীর এই বিগ্রহের দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই গ্রামে আবির্ভাবের এক অলৌকিক কাহিনী রয়েছে । ডায়মন্ড হারবারের এই লালবাটি গ্রামে দীর্ঘ দিন ধরেই ছিল চৌধুরী বংশের বসবাস।শোনা যায় চৌধুরী বংশের পূর্বপুরুষকে দেবী চণ্ডী স্বপ্নাদেশ দেন তিনি মাটির তলায় বহুকাল চাপা পড়ে রয়েছে দেবীর সুপ্রাচীন বিগ্রহ । এরপরে ওই স্থানে চৌধুরী পরিবার পুকুর কাটার সময়ে দেবীর বিগ্রহ উদ্ধার করা হয় এবং পূজার বন্দোব্যস্ত করা হয়। স্থানীর চৌধুরী পরিবার মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুকুর কাটার সময় মা চণ্ডীর কোষ্ঠীপাথরের মাতৃ বিগ্রহটি উদ্ধার করার সময় শোনা যায় মায়ের বিগ্রহের মুখমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কেউ কেউ বলেন স্থানীর পুকুর কঙ্কন দিঘী থেকেই মা উঠেছিলেন। দেবীর স্বপ্নদৃষ্ট পুকুর তিনটি পুকুরের সম্বনয়ে সৃষ্ট ও এই পুস্করিনীর নাম ছিলো কঙ্কন দীঘি। বলা হয় এটি মা চণ্ডীর পুকুর ।
মায়ের অধিষ্ঠানের জন্য ডায়মন্ড হারবারের লালবাটির গ্রামবাসীরা দেবী মন্দির নির্মাণ করতে চেষ্টা করা হলেও মা চণ্ডী সেই মন্দির নিজেই বিনষ্ট করে দিতেন। জনশ্রুতি অনুসারে এরপরে এক রাত্রে মা চণ্ডী চৌধুরী পরিবারের সদস্যকে স্বপ্নাদেশে দেন, দস্যু কালাপাহাড়ের সাথে সংগ্রামের সময় দেবীর অঙ্গে অনেক থানায় আঘাত লেগেছে তাই আর তিনি মন্দিরে আবদ্ধ থাকতে চান না তাই এই বটবৃক্ষের নীচেই তিনি বিশ্রাম নেবেন । মায়ের সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর মন্দির নির্মাণের চেষ্টা চিরতরে বন্ধ করা দেন চৌধুরী পরিবার ও সেই থেকে বটবৃক্ষের তলায় বেদী নির্মান করে দেবী চণ্ডীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয় । সেই থেকে এই বেদীতেই হয় দেবী চণ্ডিকার নিত্যপুজো। মায়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ফাল্গুনী পূর্ণিমার অর্থাৎ দোল পূর্ণিমার আগের দিন চাঁচরের দিনে তাই প্রতিবছর ওই দিনে সময় সাড়ম্বরে পালিত হয় মায়ের বাৎসরিক পূজা। বাৎসরিক পূজার দুই দিন আগে শুরু হয় হরিনাম সংকীর্তন। চণ্ডীতলা সুসজ্জিত হয় খুব সুন্দর করে ফুলের সাজে সাথে দেবীর বিগ্রহ বেনারসী শাড়ী গয়না এবং ফুলের মালায় সেজে ওঠেন।সারাবছর দেবী বিগ্রহে কোনো শাড়ী পরানো থাকে না । বাৎসরিক পূজা সারা রাত ধরে চলে । অসংখ্য ভক্ত দেবীর কাছে মায়ের পুকুরের জলে স্নান করে দণ্ডী খাটেন ও সাথে মহিলা ভক্তরা মা চণ্ডীর কাছে সংসারের মঙ্গল কামনায় ধুনো পোড়ানো হয় । নিত্য পূজার সাথে প্রতি শনি মঙ্গলবারে অনেক ভক্ত আসেন মায়ের পুজো দিতে, চলে সাড়ম্বরে পূজা ।এছাড়া জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবারে হয় জয়মঙ্গলবারের ব্রত ও আষাঢ়ে বিপত্তারিনী পূজা খুব ধূমধাম করে হয় ওই দিনে মা চণ্ডীকে নতুন শাড়ী , গহনা ও সুন্দর ফুলের মালাতে সাজানো হয় বহু ভক্তরা আসেন মা চণ্ডীর পূজা দিতে সাথে অনেক ভক্ত মায়ের কাছে দণ্ডী খাটেন । তা ছাড়া শারদীয়া দুর্গা পূজার সময় প্রতিদিন ষষ্ঠী থেকে নবমী চার দিন মা কে নতুন শাড়ী , গহনা ও ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয় কিন্তু কোনো ঘট বসানো ও নবপত্রিকা আসেনা প্রতিদিন বিশেষ পূজা ও পুষ্পাঞ্জলী চলে মায়ের কাছে । পাশেই দূর্গা দালানে শারদীয়া দূর্গা পূজা হয় মা চণ্ডীর পুকুরে নবপত্রিকা স্নান করিয়ে মা চণ্ডীর কাছে পূজা করিয়ে শুরু হয় গ্রামের দূর্গা পূজা । প্রতিদিন সকালে দুপুর ১২ টা নাগাদ ফল মিষ্টি দিয়ে মায়ের নিত্য পূজা হয় । বাৎসরিক পূজাতেই কেবল বিশেষ ভোগরাগ হয় । মায়ের মূর্তির পাশেই আছে মা ষষ্ঠীর শিলা মূর্তি । বিভিন্ন ষষ্ঠীর দিনে দেবী ষষ্ঠীর পূজা দিতে ভক্তরা আসেন এখানে ।
মায়ের বেদীটি লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা ও বাঁধানো । সামনেই রয়েছে দোচালা নাটমন্দির। দেবীর এই অধিষ্ঠানের জায়গা কে বলা হয় মা চণ্ডীর থান । প্রতিদিন মায়ের বেদী ধুয়ে পরিষ্কার করে তারপর নিত্যপুজা শুরু হয়।স্থানীয় ব্রাহ্মন গাঙ্গুলী পরিবারের সদস্যরা মা চণ্ডীর নিত্য সেবা করেন । দেবীর পুকুর থেকে জল ঘটি করে তুলে এনে তাতেই মা চণ্ডী স্নান করেন। এরপরে গাছের ফুল , ফল ও মিষ্টি দিয়েই হয় মায়ের নিত্যপূজা। মায়ের খানের পাশেই আছে একটি বেদীতে ছাউনি দেওয়া বাবা পঞ্চানন , মা শীতলা , মা মনসা ও জ্বরাসুরের আসন । চৈত্র সংক্রান্তির দিনে হয় বাবা পঞ্চাননের গাজন ও ঝাঁপ উৎসব , চৈত্রে হয় দেবী শীতলা ও জ্বরাসুরের পূজা , শ্রাবণ , ভাদ্র সংক্রান্তিতে ও দশহরাতে হয় দেবী মনসার পূজা । অপূর্ব গ্রাম্য পরিবেশে মা চণ্ডীর এই স্থানে এক অদ্ভুত শান্তি ও দেবীর কৃপা অনুভূত হয় ।
মায়ের এই মন্দিরে আসতে হলে শিয়ালদহ থেকে ডায়মন্ড হারবার লোকাল ট্রেনে আসতে হবে ডায়মন্ড হারবার স্টেশন, সেখান থেকে বেরিয়ে বাজারের দক্ষিণ দিক থেকে টোটো ধরে খুব সহজেই মায়ের মন্দিরে পৌঁছানো যায় ।
🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
শুভ জয় মঙ্গলবার ১৪৩৩
ডায়মন্ড হারবারের লালবাটি গ্রামের শ্রী শ্রী চণ্ডী মাতার মহাপুন্য দর্শন ১৪৩৩
স্থান : শ্রী শ্রী চণ্ডী মাতার মন্দির ( ডায়মন্ড হারবার , লালবাটি গ্রাম ) ১৪৩৩
©Koushick Banerjee
Do not post these picture without prior permission