24/04/2022
গত ১২|০৪|২২ আবাপ তে মাননীয় অভিরূপ সরকারের 'কোন খাতে টাকা খরচ হচ্ছে ' শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে ডিএ প্রসঙ্গে তিনি যে বক্তব্য পরিবেশন করেছেন সেই প্রেক্ষিতে বলি, সরকারের 'নুন খেয়ে গুণ গাওয়া৷ প্রথমত বর্তমান সরকারের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ব্যাখায় তাঁর অভিমত, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণের সঙ্গে নিজস্ব ঋণ এই দুই মিলেই বর্তমান সরকারের ঋণের সংখ্যটা যথেষ্ঠ হওয়ার কারন হিসাবে উল্লেখ করেছেন৷ বর্তমান সরকারের ঋণ বৃদ্ধির ব্যাখায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি পরিষেবার খরচ বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছেন৷ কিন্তু তিনি যেটা বলেন নি তা'হল, জনসংখ্যা এবং পরিষেবা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাদের দ্বারা সরকারি পরিষেবা (সরকারি কর্মী) তুলে ধরা হয়, তাদের সংখ্যা জনসংখ্যার নিরিখে কতটা কম বা বেশি থাকা উচিত তার কোনও উল্লেখ নেই৷ উল্টো তিনি চুক্তিতে নিয়োগকে সমর্থন করেছেন৷
তাঁর মতে ২০১১ সাল পরবর্তী বর্তমান সরকারের আমলে রাজস্ব আদায় 'কিছুটা' বেড়েছে৷ এই কিছুটা বলতে কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে? তার পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি৷ কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বামেদের শেষ বাজেট ২০১০—২০১১ সালে নিজস্ব কর থেকে আয় হয়েছিল ২১,১২৮.৭৪ কোটি টাকা৷ এই ১০-১১ র, তুলনায় বর্তমানে রাজস্ব আদায়ে যথেষ্ঠ উন্নতি হয়েছে৷ যেমন ২০১৮ - ১৯ নিজস্ব কর আদায় ধরা হয়েছিল, ৫৫,২০০ কোটি৷ আদায় হয়েছে ৬০,৭৩২.২৮ কোটি৷ আসলে জিএসটি লাগু হওয়াতে রাজস্ব খাতে যে আয় অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে তা আজ রাজ্যবাসীরও অজানা নয়৷
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারি কর্মচারিদের নিদিষ্ট নিয়ম মতো ডিএ না দেওয়ার প্রবনতায় সরকারি কর্মচারিদের মনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে তা তিনি উপলব্ধি করে এক আজব যুক্তি তুলে ধরেছেন৷ তার ব্যাখা ৫ম বেতন কমিশনে এক কিস্তি ডিএ দিতে ২৫ কোটি টাকা খরচ হতো৷ ষষ্ঠ বেতন কমিশনে ২.৫৭ গুণ বেতন বৃদ্ধিতে তা গিয়ে দাড়িয়েছে ৬৪.২৫ কোটি টাকা৷ বছরে মোট ৭৭১ কোটি টাকা৷ এই ধরনের খেলো যুক্তির মাধ্যমে আপনি সরকারের কাছে কোন বার্তা পৌছে দিতে চাইছেন? ১০০ টাঃ ৫% বৃদ্ধিতে ৫ টাকা হলে, ২৫৭ টাকায় ৫% = ১২.৮৫ টা বাড়ে তার জন্য অর্থনীতিবিদ হতে হয় না৷
অভিরূপ বাবু, আপনাকে স্মরণ করিয়ে দি আপনি ২০১৫ সালে নভেম্বর মাসে ৬ষ্ঠ বেতন কমিশনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করে, ৬ মাসের বেতন কমিশন তার মেয়াদ বারংবার বৃদ্ধি পরবর্তী চার বছর পর ২০১৯ সেপ্টেম্বরে 'কথিত' ষষ্ঠ বেতন কমিশনের রিপোর্ট পেশ করেন৷ এই কথিত বলার কারন, কর্মী সংগঠন গুলিকে কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার পে-কমিশনের রিপোর্ট তুলে দেয়নি৷ বলাবাহুল্য, আরটিআই করেও তা পাওয়া যায়নি৷ তাই আমাদের সন্দেহ হয়, আপনি আদৌ রিপোর্টে পেশ করেছেন কিনা৷ করলেও তাতে ডিএ'র কথা উল্লেখ আছে কিনা?
আপনি স্বীকার করেছেন, ষষ্ঠ বেতন কমিশনে এই রাজ্যের কর্মীরা ৩১% মহার্ঘ ভাতা কম পাচ্ছেন৷ এর জন্য ধন্যবাদ৷ কিন্তু আপনি যে সময় বেতন কমিশনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেছিলেন তখন কর্মীরা কত শতাংশ মহার্ঘ ভাতা কম পেতেন? তার হিসেব কি আপনার জানা নেই? আরও বলি, সেসময় এই সরকারের আর্থিক পরিস্থিতি বা কেমন ছিল? এই তথ্য কিন্তু আপনার জানা৷ কিন্তু আপনি তা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন৷
প্রথমে মহার্ঘ ভাতার কথা বলি৷
————————————————
০১|০৪|০৮ থেকে ০১|১২|১০ এই সময়ের মধ্যে বাম সরকার ৮ কিস্তি বা ৩৫% মহার্ঘ ভাতা প্রদান করেছে৷ অপরদিকে ২০১১ সালের মে মাসে নয়া সরকার ক্ষমতায় আসার পর
০১|০১|১২ থেকে ০১|০১|১৬ (৫ম বেতন কমিশন শেষ) পর্যন্ত ৫ কিস্তি বা ৪০% মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হয়েছে৷ ৩৫%+৪০% = মোট ৭৫%
সেসময় (০১|০১|১৬) কেন্দ্র এবং অনান্য অধিকাংশ রাজ্য সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা ছিল ১২৫%৷ ফলস্বরূপ ব্যবধান ১২৫%-৭৫% = ৫০%
এবার ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরের হাল হকিকৎটা জেনে নি৷ তবে এক্ষেত্রে ২০১০-১১ বাম আমলের আর্থিক হাল কেমন ছিল তা জেনে নিতে হবে৷
২০১০-১১ আর্থিক বছরে রাজ্যের মোট প্রকৃত আয় হয়েছিল যথক্রমে :
১) নিজস্ব কর আদায়: ২১,১২৮.৭৪ কোটি
২)কর বর্হিভূত আয়: ২,৩৮০.৫০ কোটি
৩)কেন্দ্রীয় করের রাজ্যের ভাগ:
১৫,৯৫৪.৯৫ কোটি
৪)কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত অনুদান ৭,৮০০.০১ কোটি
---------------------------------------------------------------
১০-১১ আর্থিক বছরে সর্বমোট প্রকৃত আয় ৪৭,২৬৪.২০ কোটি টাকা৷
অপর দিকে ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে রাজ্যের মোট প্রকৃত আয় হয়েছিল যথক্রমে :
১) নিজস্ব কর আদায়: ৪২,৪৯২.০৮ কোটি
(১০-১১ থেকে ১৫-১৬ তে রাজস্ব আদায় ১০৩% বেশি)
২)কর বর্হিভূত আয়: ১,৮৬১.৭৯ কোটি
৩)কেন্দ্রীয় করের রাজ্যের ভাগ:
৩৭,১৬৩.৯৩ কোটি
(১০-১১ থেকে ১৫-১৬ তে কেন্দ্রীয় করের শেয়ার ১৩৩% বেশি)
৪)কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত অনুদান:
২৮,২১৪.৪১ কোটি
(১০-১১ থেকে ১৫-১৬ তে কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত অনুদান ৩৬২% বেশি)
---------------------------------------------------------------
২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে সর্বমোট প্রকৃত আয় ১,০৯,৭৩২.২১ কোটি টাকা৷
অভিরূপ বাবু আরও লক্ষ্য করুন, সরকার কি ভাবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন-পেনশন খাতের টাকা সম্পূর্ণ খরচ না করে তা অন্য খাতে খরচ করেছে৷
২০১২-১৩ আর্থিক বছর থেকে ২০১৬-১৭ এই পাঁচ বছরে বেতন পেনশন খাতে মোট বরাদ্দ হয়েছিল ২,২৯,৩৪৪.৯৭ কোটি টাকা৷ কিন্তু সরকার খরচ করেছে, ২,১৬,৯৯০.৩৫ কোটি টাকা৷ সাশ্রয় ১২,৩৫৪.৬২ কোটি টাকা৷ এবার প্রশ্নটা আপনাকে, সে সময় তো ১ কিস্তি মহার্ঘ ভাতা দিতে ২৫ কোটি x ১২ মাস = ৩০০ কোটি টাকা খরচ হতো৷ সেক্ষেত্রে মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হয়নি কেন? উত্তর আছে? থাকলে দিতে পারবেন না৷৷
মলয় মুখোপাধ্যায়
সাঃ সম্পাদক
কনফেডারেশন অব স্টেট গভঃ এমপ্লয়িজ