11/06/2026
মানবশিশুরই তো কান্না! সহ্য করা যায়?
মহান কবি নাজিম হিকমত তার বিখ্যাত কবিতায় লিখেছিলেন— বিংশ শতাব্দীতে, মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। এখন একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই আয়ু বোধহয় আর অবশিষ্ট নেই।
নাগরিকত্বের টানাপোড়েনের মধ্যে, দুই দেশের সীমানার কাঁটাতারের মাঝে দাঁড়িয়ে এক বাচ্চা মেয়ের আকুতি—
“খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, গা-ধোয়া নেই, কিচ্ছু নেই। সারাদিন এইভাবে পথে-ঘাটে বসে আছি। আর কতদিন থাকতে হবে জানি না। আমার আব্বু, মা, ভাই, দিদি—সবাই আছে। আমরা এমডিএইচ স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়তাম। এখন শুধু চাই, আমাদের দেশের বাড়ি আমাদেরকে ফিরিয়ে দিক।”
প্রখর রোদের নিচে বসে কথাগুলো বলছিল একটি স্কুলপড়ুয়া মেয়ে। তার কণ্ঠে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, কোনো মতাদর্শের ভাষাও ছিল না। সে রাষ্ট্র বোঝে না, সীমান্ত বোঝে না, কূটনীতি বোঝে না। সে শুধু জানে, তার খিদে পেয়েছে। সে জানে, তার একটি বাড়ি ছিল, একটি স্কুল ছিল, কিছু বন্ধু ছিল। আর সে সেখানে ফিরে যেতে চায়।
যে বয়সে একটি শিশুর চিন্তা করার কথা স্কুল, খেলা, বন্ধু আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে, সেই বয়সে তাকে বলতে হচ্ছে– “তিন দিন কিছু খাইনি”, "খোল আকাশের নিচে পড়ে আছি", আর পারছি না, “বাড়ি ফিরতে চাই”।
নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে একবার যদি এই কথাগুলো অনুভব করা যায়, তাহলে বোঝা যায়—মানবিকতার গল্প বলা এই সমাজ আসলে কতটা নিষ্ঠুর।
এই ঘটনাটি কেবল এক "অবৈধ অভিবাসী" শিশুর সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকার করুণ আকুতি নয়; এটি আমাদের বর্তমান সভ্যতারই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। কারণ, প্রশ্নটা শুধু তার পরিচয়ের নয়। প্রশ্নটা আরও বিস্তৃত—এই কষ্ট কি কেবল “অবৈধ” তকমা পাওয়া কোনো আলাদা শ্রেণির?
একই সমাজের অন্য প্রান্তে থাকা বৈধ নাগরিকের শিশুটিও কি খুব আলাদা জীবন পায়? তারও কি শৈশব নিশ্চিত? তারও কি সকাল মানে স্কুল, দুপুর মানে খেলাধুলা, আর রাত মানে নিরাপদ ঘুম?
বস্তির সংকীর্ণ ঘরে, নির্মাণকাজের ধুলো-ধোঁয়ার পাশে, কিংবা ফুটপাতে বড় হওয়া বহু শিশু প্রতিদিন একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। কাগজে-কলমে তাদের পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা অভিন্ন—ক্ষুধা, অভাব আর একমুঠো অন্নের তীব্র অনিশ্চয়তা।
অথচ, একই সমাজের ঠিক অন্য প্রান্তে শৈশব যেন এক সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবী। যেখানে অভাব নেই, অনিশ্চয়তা নেই, পেট ভরে খাওয়ার জন্য কোনো অপেক্ষা নেই। সেখানে জীবন অনেকটাই প্রস্তুত, অনেকটাই সুরক্ষিত।
এই ব্যবধান শুধু নাগরিকতার নয়—এটা জীবনের মৌলিক অধিকার বণ্টনের চরম বৈষম্য। তাই প্রশ্নটা আর “অবৈধ” বা “বৈধ” পরিচয়ের বেড়াজালে আটকে থাকে না।
প্রশ্নটা আরও সরল, কিন্তু আরও তীক্ষ্ণ—
একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কারও শৈশব কেন প্রতিদিন ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই, আর কারও শৈশব কেন নিশ্চিন্ত পরিপূর্ণতা?
—via Nizam Nizam