23/01/2024
রক্তে নেতাজী
এভাবেও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হয়। হ্যাঁ ঠিক এভাবেই বিগত ৩৫ বছর ধরে নিঃশব্দে নেতাজীর জন্মদিন তাঁর মত করে পালন করে চলেছেন পেশায় নাপিত গোবিন্দ মান্না। কিন্তু কীভাবে? তবে একটু খোলসা করেই বলা যাক। এনার বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সিদ্ধা গ্রামে। ইনি বিগত ৩৫ বছর ধরে ২৩ জানুয়ারী দিনটি সকলের বিনামূল্যে চুল দাঁড়ি কেটে দেন। এই দিনে তাঁর দোকানে আগত কোন খদ্দেরর কাছ থেকে কোন পয়সা নেন না। কিন্তু কেন? আসলে ইনি খুব ছোট থেকেই ভীষণ রকমের নেতাজী ভক্ত। নেতাজী তাঁর অনুপ্রেরনা, তাঁর গুরু। নিজের দোকানের নামও দিয়েছেন "নেতাজী সেলুন"। ক্লাস ফোর পাশ এই মানুষটিকে বিগত ২২ বছর ধরে চিনি চুল, দাঁড়ি কাটার সুবাদে।তাই আজকের দিনে তাঁর সঙ্গে দেখা না করলেই নয়। তাই বেরিয়ে পড়লাম। দোকানে গিয়ে দেখি যথারীতি ভীষণ ভীড়। আমাকে দেখেই গোবিন্দ দা বলে উঠলো 'আরে সাঁতরা যে আয় বোস'। আমিও গিয়ে বসলাম। তারপর কথোপকথন শুরু হলো-
আমি - আচ্ছা গোবিন্দ দা কত বছর ধরে তুমি এই ভাবে নেতাজীর জন্মদিন পালন করছো?
গোবিন্দ দা - ১৯৮৯ সালে আমি নিজের দোকান করি, তবে থেকেই শুরু।
আমি - নেতাজীর প্রতি তোমার এই প্রবল আকর্ষণ কবে থেকে শুরু হলো?
গোবিন্দ দা - ১৯৮৫ সালে আমি যখন এই কাজ শেখার জন্য কলকাতায় এক দোকানে থাকতাম সেই দোকানে মাস্টার দা সূর্য সেনের পত্রবাহক আসতেন।আমার বয়স তখন ১০। ওনার কাছে নেতাজীর কথা শুনতাম।নেতাজীকে নিয়ে অনেক গল্প বলতেন, আর আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।সেই থেকে নেতাজীর প্রতি প্রবল এক আকর্ষণ অনুভব করি।তারপর থেকেই দোকানে যে খবরের কাগজ আসতো সেখানে নেতাজী সম্পর্কে কোন লেখা বেরোলে আমি সেগুলো সংগ্রহ করে রেখে দিতাম, আর সময় বুঝে খুব মন দিয়ে পড়তাম।এই ভাবে আমি নেতাজী সম্পর্কে জানতে শুরু করি। ১৯১২ সালের পর থেকে নেতাজীর জীবনে যা যা ঘটেছিলো তার প্রায় সবটাই মোটামুটি জানি।
এই সময় পাশের দোকান থেকে একজন এসে গোবিন্দ দাকে কিছু খাওয়াতে চাইলেন।কিন্তু গোবিন্দ দা সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করলেন।বললেন আজকের দিনে আমি কারোর কাছে কিছু খাবো না। সেই ব্যক্তি সম্ভবত চুল কেটেছেন আর পয়সা তো গোবিন্দ দা নেয়নি তাই ঘুর পথে কিছু দেওয়ার চেষ্টা।আর গোবিন্দদাও সেই লোক, ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা, বললে হবে। একজন বলে উঠলেন কেউ যদি তোমার এই কাজকে সম্মান জানিয়ে কিছু দিতে চায় তুমি নেবে না।গোবিন্দ দা বলে উঠলো আজ সকালে আমার ছেলে বউ আমাকে যে সম্মান দিয়েছে সেটাই যথেষ্ট।আমি দোকানে আসার সময় তারা বলে দিয়েছে আজ আমি যেন সকলের খুব ভালো করে চুল, দাঁড়ি কেটে দেই। ফ্রী বলে যেন দায়সারা কাজ না করি।
আবার একজন বলে উঠলো - আজকে একটা মালা এনে তো নেতাজীর ছবিতে পরাতে পারতে, কেমন যেন খালি খালি লাগছে। গোবিন্দ দার উত্তর - নেতাজী জীবিত না মৃত তা এখনো সরকার ঘোষণা করেনি, তাই পরাই নি।
আমি - আচ্ছা তুমি যে এইভাবে নেতাজীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দাও আশেপাশের লোক ছাড়া দূরের কেউ জানে?
গোবিন্দ দা - এর আগে কয়েকবার কয়েকটি সংবাদপত্র থেকে এসেছিলো। ২০১৮ সালে দাদাগিরি অনুষ্ঠানের লোক এসেছিলো।আমাকে বললো সারা রাজ্যে আমাদের মতো যারা নীচু কাস্ট এর কিছু লোককে নিয়ে একটা এপিসোড করবে যারা বিভিন্ন মনীষীদের অনুসরণ করে।আমার ph no নিয়ে তারা চলে গেলো।আমিও ভীষণ খুশী।তার মাস তিনেক পর তারা আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো আর আক্ষেপের সুরে বললো আমার মতো আর কাউকে তারা পাইনি তাই তারা করতে পারছে না।একবার তো উত্তরপ্রদেশ থেকে নিমন্ত্রণ এসেছিলো ২৩ শে জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য।আমি তাদের বলি ২৩ শে জানুয়ারি আমি দোকান বন্ধ রাখতে পারবো না অন্য কোনদিন হলে বলবেন অবশ্যই যাবো।
এইভাবে গল্প করতে করতে আমার পালা এলো প্রয়োজন না থাকলেও দাঁড়িটা কেটেই নিলাম, সঙ্গে চললো নেতাজীকে নিয়ে আলোচনা।নেতাজীকে নিয়ে গোবিন্দ দার জ্ঞান আমাকেও অবাক করে দেয়।
এভাবেই নেতাজী বাঙালির রক্তে, মজ্জায় ঢুকে গেছে। আমরা সকলেই নেতাজীকে সম্মান করি কিন্তু কত জন তাঁকে নিয়ে চর্চা করি, তাঁকে নিয়ে পড়াশুনা করি।গোবিন্দ দার মতো লোকেদের মাধ্যমেই নেতাজী অমর হয়ে থাকবেন।বেরিয়ে আসার সময় গোবিন্দ দা আমাকে একটা প্রশ্ন করলো- আচ্ছা সাঁতরা আমি কি এটা ভুল করছি না ঠিক করছি।আমি বললাম তোমার কি মনে হয়, তুমি ভুল করছো না ঠিক করছ। গোবিন্দ দা বললো- বেশীর ভাগ মানুষই তো ভালো বলে, দুই এজন সমালোচনা করে।আর নেতাজীর মতো মানুষের যদি শত্রু থাকতে পারে আমি তো কোন নাপিত। কথাটা শুনে আর কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না, শ্রদ্ধায় মাথাটা ঝুঁকে গেলো।
✍️সুশোভন সাঁতরা
Collection