09/02/2022
*সুর সম্রাজ্ঞী 'নাইটিঙ্গেল' লতা মঙ্গেশকরের জীবনাবসান।*
*রাজীব কুমার নন্দী।*
শায়াদ ফির ইস জনম মে...মুলাকাত হো না হো...'। গানের স্নিগ্ধ সৌরভ ছড়িয়ে চলে গেলেন সুর সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেসকর। না সত্যিই আর 'মুলাকাত' হবে না তাঁর সঙ্গে। জীবনাবসান হল গানের'নাইটিঙ্গেল' এর। সঙ্গীতজগৎ হারাল তাঁর উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে। ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত সুর সম্রাজ্ঞী। তিনি রবিবার সকালে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
।দুঃসংবাদটি প্রথম জানান লতা মঙ্গেশকরের বোন ঊষা মঙ্গেশকর।কিংবদনন্তী শিল্পীর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী ।
করোনায় আক্রান্ত হন বর্ষীয়ান এই সঙ্গীতশিল্পী। শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকায় তাঁকে ICU-তে ভর্তি করা হয়। । তাঁর আরোগ্য কামনায় প্রার্থনা করছিল গোটা দেশের অনুরাগীরা। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত অনুরাগীদের প্রার্থনা এবং চিকিৎসকদের সব চেষ্টা বিফলে গেল। সরস্বতী পুজোর পরদিনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন সুর সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেসকর। একটি যুগের অবসান।
এ যেন এক আশ্চর্য সমাপতন। সরস্বতী পুজোর পরদিনই প্রয়াত 'সরস্বতীর বরকন্যা' লতা মঙ্গেশকর।
লতা মঙ্গেসকরের গানের বর্ণময় অধ্যায়ের মতোই জীবন ছিল বর্ণময়।
মধ্যবিত্ত পরিবারে সব ভাই বোনদের মধ্যে লতাই ছিলেন বড়। জন্মপত্রে লতার নাম ছিল হেমা। পরবর্তীতে বাবার এক নাটকের চরিত্র লতিকার নামানুসারে বদলে যায় হেমার নাম। আত্মপ্রকাশ ঘটে লতা মঙ্গেশকরের। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গানের কেরিয়ার শুরু। সাল, ১৯৪২। লতা যখন স্টুডিয়োতে গান গেয়েছেন, সেই বছরেই জন্ম হচ্ছে অমিতাভ বচ্চনের।
প্রথমে গানের সূচনা ভালো না হলেও পরবর্তীকালে ভারতের গানের জগতে ধ্রুবতারা হয়ে উঠেছেন তিনি। প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায় তাঁর শহীদ ছবিতে গান গাওয়ার ইচ্ছে বাতিল করে দিয়েছিলেন নিমেষেই। লতার গলা পাতলা, মন্তব্য ছিল তাঁর। সঙ্গীত পরিচালক গুলাম হায়দার অবশ্য সেদিন বেশ কটি কথা শুনিয়ে এসেছিলেন শশধরকে। জোর গলায় বলেছিলেন, “প্রযোজকরা এর পর লতার পা ধরে তাঁদের ছবিতে গাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাবে।” এক বাঙালি খারিজ করেছিলেন লতার গান আর পরবর্তীতে বাঙালিদের হাত ধরেই লতা ‘ব্র্যান্ডের’ ঘটেছিল আত্মপ্রকাশ। বাংলা জানতেন, বলতেও পারতেন। তাঁর ‘রঙ্গিলা বাঁশি’র সুরেলা গলা একটা গোটা প্রজন্মকে প্রেমে পরতে শিখিয়েছিল।
কয়েক যুগ ধরে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ধারা পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন। চলচ্চিত্র এবং গানের জগৎ ছাড়াও ভারতের উন্নতির জন্যও সর্বদা ভাবনাচিন্তা ছিল তাঁর। মজবুত এবং উন্নততর দেশ দেখতে চেয়েছেন তিনি। লতার প্রয়ানে দু দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ভারতীয় সরকার।' সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্ধনমিত রাখা হবে জাতীয় পতাকা।
উনিশশো চল্লিশের দশকে চলচ্চিত্রে তত বেশি গানের সুযোগ না থাকায় তরুণী লতা আয়-রোজগারের জন্য অভিনয় করতে শুরু করেন।
তিনি প্রায় আটটি মারাঠি আর হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৪৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র 'গজাবাউ'-তে তিনি 'কিছু কথা, কিছু শব্দ' শিরোনামের একটি গান গেয়েছেন, যা ছিল চলচ্চিত্রে তার গাওয়া প্রথম গান।
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
''মেকআপ, লাইট এগুলো কখনোই আমার ভাল লাগেনি। মানুষজন আপনাকে আদেশ দিচ্ছে, এই কথা বলো, ওই কথা বলো, আমার খুব অস্বস্তি লাগতো।'' চলচ্চিত্রে তাঁর সময় নিয়ে নাসরীন মুন্নী কবিরকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন।
যখন একজন পরিচালক তাকে বলেছিলেন যে, তার ভুরু ছাঁটতে হবে, কারণ এগুলো বেশি ছড়ানো, তখন তিনি খুবই আহত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেটা মেনে নিয়েছিলেন।
১৯৪৯ সালে মহল চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার পর থেকে তিনি সবার নজরে চলে আসেন।
নাইটিঙ্গেল অব ইন্ডিয়া' বলে আখ্যা পাওয়া লতা মঙ্গেশকর অর্ধশত বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ভারতের ৩৬টি ভাষায় প্রায় ৩০ হাজার গান গেয়েছেন।
দশকের পর দশকজুড়ে তিনি ছিলেন ভারতের সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন সঙ্গীত শিল্পী। বলিউডের প্রত্যেক শীর্ষ অভিনেত্রী চাইতেন, চলচ্চিত্রে তাদের গানটি যেন তাকে দিয়ে গাওয়ানো হয়।
অত্যন্ত প্রশংসিত'
একটি সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকর বলেছিলেন যে, তার পরিবার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা করতো এবং চলচ্চিত্রের গান বাড়িতে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হত না।
তিনি কখনোই প্রথাগত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। একজন গৃহকর্মী তাকে মারাঠি বর্ণপরিচয় শিখিয়েছেন এবং স্থানীয় একজন পুরোহিত তাকে সংস্কৃত শেখান। আত্মীয়স্বজন এবং শিক্ষকরা তাদের বাড়িতে এসে তাকে অন্যান্য বিষয় শেখাতেন।
মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলিতে তাদের পারিবারিক বাসস্থানটি নিলাম হয়ে গেলে পরিবারটি পশ্চিমের শহর পুনায় (এখন পুনে) চলে আসতে বাধ্য হয়। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারটি বোম্বাই (এখনকার নাম মুম্বাই) শহরে চলে আসে।
তিনি সিনেমা দেখতেও পছন্দ করতেন। তার পছন্দের হলিউডি চলচ্চিত্র ছিল 'দি কিং এন্ড আই', যা তিনি অন্তত ১৫ বার দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। আরেকটি পছন্দের চলচ্চিত্র হচ্ছে 'সিঙ্গিং ইন দ্যা রেইন'।
তিনি গাড়ি ভালোবাসতেন। জীবনের নানা পর্যায়ে তিনি ধূসর রঙের হিলম্যান এবং নীল শেভ্রোলেটের মালিক হয়েছেন, ক্রাইসেলার এবং মার্সিডিজও ছিল। বাড়িতে তার নয়টি কুকুর রয়েছে।
অন্যদিকে মঙ্গেশকর ক্রিকেটের একজন গোঁড়া সমর্থক। অনেক সময় রেকর্ডিংয়ে বিরতি দিয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলা দেখতে গিয়েছেন। ডন ব্রাডম্যানের স্বাক্ষর করা একটি ছবি তার গর্বের একটি জিনিস।
মাঝে মাঝে রান্না করা এবং রোলেইফ্লেক্স ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা তার শখের অন্যতম।
যুক্তরাষ্ট্রে ছুটি কাটানোর সময় তিনি লাস ভেগাসে সারারাত ধরে স্লট মেশিনে খেলতে ভালোবাসতেন।
তার কালজয়ী সঙ্গীত অবশ্যই ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আনন্দ বয়ে এনেছে এবং নাসরীন মুন্নী কবির যেভাবে বলেছেন, তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এসব সঙ্গীত।
আজ লতা মঙ্গেশকর নেই ,তবু তিনি আছেন আমাদের ভালোবাসায় অন্তরে।গানের সুরে সুরে।