29/08/2017
"নিমতলার নীলকুঠি" (বিখ্যাত "নীলদর্পণের" ঐতিহাসিক নীলকুঠি)
চৌবেড়িয়া,বনগাঁ
চৌবেড়িয়া গ্রামের উৎপত্তির ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় তার নামের মধ্যে , যে যমুনা নদীর তীরে চৌবেড়িয়া সে নদীকে দেখলে আজ বিশ্বাস হতে চাইবে না যে এই সেই যমুনা যার তীরে আগ্রা তীরে মথুরা,বৃন্দাবন যার তীরেই ব্রজের রাখাল শ্রীকৃষ্ণের বাঁশী বাজত । যা প্রয়াগ তীর্থে গঙ্গা আর সরস্বতী নদীর সাথে মিশে ত্রিবেণী সঙ্গম এর সৃষ্টি করে বহুজনের আকাঙ্খিত তীর্থক্ষেত্র পরিণত হয়েছে । সেই যমুনা বাংলার মুক্তবেণী হুগলী জেলার ত্রিবেণীতে গঙ্গা ও সরস্বতী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবেশ করেছে নদীয়ার সীমারেখা দিয়ে অধুনা ২৪ পরগনা জেলার মধ্যে । প্রশস্ত স্রোতস্বতী যমুনা একদিন চৌবেড়িয়া গ্রামের চারিদিকে বেষ্টন করে কুলু কুলু নাদে বয়ে যেত । পাঠান আমলের শেষের দিকে কাশীনাথ রায় নামে এক কায়স্ত রাজা ঐখানে দুর্গ নির্মাণ করেন আর তার নাম করন করেন *চতুবেষ্টিত দুর্গ । যমুনা যার চারিদিকে পরিখার কাজ করত, কাশিনাথের এই সুদৃঢ় সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করাও খুব শক্ত ছিল।
বাংলাদেশে মোঘল আধিপত্য বিস্তারের জন্য আকবরের প্রধান সেনাপতি মানসিংহ পাঠানদের সাথে যুদ্ধ করতে বাংলায় আসেন সে সময় কাশীনাথ মোঘলদের যথেষ্ট সাহায্য করে ছিল, মোঘল-পাঠান যুদ্ধে মোঘলদেরই জয় হয়, কাশীনাথের সাহস,বীরত্ব ও যুদ্ধকৌশলে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আকবর কাশীনাথ কে *সমর সিংহ* উপাধি দেন । কাশীনাথ আধিক দিন আর বাঁচতে পারেননি তিনি গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হন ।
কাশীনাথের স্ত্রী সে ঘাতক কে চিনেছিলেন, একজন ক্ষমতালোভী মোঘল অনুগ্রহপুষ্ট কর্মচারী । রানী তার বিরুদ্ধে নালিশ জানান আকবরের কাছে, আকবরের রাজসচিব টোডরমল্ল,সেনাপতি মানসিংহ আরও ছোটবড় কর্মচারী এলেন চতুবেষ্টিত দুর্গে, সেখানে দরবার বসল , টোডরমল্ল সেই বিশ্বাসঘাতক কর্মচারীকে উপযুক্ত শাস্তি দিলেন । এই চতুবেষ্টিত দুর্গেই বাংলাদেশে মোঘলদের প্রথম দরবার । এই দুর্গ থেকেই সর্বপ্রথম আকবরের বঙ্গবিজয় ঘোষণা করা হয় । রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় এই চতুবেষ্টিত দুর্গের পটভুমিকায় বনগ্রামের মহকুমা শাসকের বাংলোর বকুলতলায় বসে তাঁর *বঙ্গবিজেতা উপন্যাসটি রচনা করেন । ঐ ঐতিহ্যবাহী দুর্গের কোন চিহ্ন অবশিষ্ট নেই । সমস্তই যমুনা গ্রাস করেছে । পূর্বের ঐ চতুবেষ্টিত দুর্গের সংলগ্ন স্থান বর্তমানে চৌবেড়িয়া ।
**বঙ্গবিজয় ঘোষণার কিছুকাল পরেই ঐ চতুবেষ্টিত দুর্গ সকল গৌরব ব্যথা বেদনা বুকে নিয়ে চিরতরে আত্মগোপন করেছে যমুনার গর্ভে । নতুন তিনখানি গ্রাম কত উত্থান পতন, দুঃখ কষ্ট লাঞ্ছনার স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও বেঁচে আছে ।
ব্রিটিশ আমলে নীলকুঠি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলার বিভিন্ন স্থানে , ইচ্ছামতীর তীরে মোল্লাহাটি (বনগাঁ) ছিল তাঁর প্রধান কাযক্ষেত্র । যমুনা নদীর তীরে চৌবেড়িয়ার অপর পারে *নিমতলার কুঠির ধবংসাবশেষ আজও বর্তমান । নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র এই নিমতলার কুঠির কে কেন্দ্র করেই তাঁর বিখ্যাত * নীলদর্পণ উপন্যাস টি রচনা করেছিলেন