04/11/2023
শাশুড়ির হাতের পাঁচটে আঙুলের ছাপ বসে গেছে আমার গালে। অগ্নিচোখে তাকিয়ে আছেন তিনি আমার দিকে। আমার অপরাধ হলো, তরকারীতে লবন বেশি দিয়ে ফেলেছি। খাবার মুখে দিতে দেরি; চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার গালে চড় বসাতে দেরি করেননি তিনি। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এ বাড়িতে আমার মার খাওয়াটা অস্বাভাবিক না বরং মার না খাওয়াটাই অস্বাভাবিক!
আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় বছর খানেক হলো। বিয়ের প্রথম থেকেই শাশুড়ি আমাকে পছন্দ করতেন না। সব সময় ঝাঁঝ নিয়ে কথা বলতেন আমার সাথে। পান থেকে চুন খসলেই মুখ দিয়ে গালাগালির তুবড়ি ছুটাতেন। শাশুড়ির এহেন আচরণের হেতু প্রথমদিকে আমার বোধগম্য না হলেও পরে অবশ্য জানতে পেরেছি এর কারণ। শাশুড়ি তার বাল্যকালের বান্ধবীর সুন্দরী মেয়ে জ্যোতির বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার ছেলে অর্থাৎ আমার স্বামী রায়ানের সাথে। এতে বাধ সাধলেন আমার শ্বশুর। জ্যোতি ছেলেবাজ মেয়ে। চরিত্র ভালো না। তাই আমার শ্বশুর জ্যোতির সাথে রায়ানের বিয়ে না দিয়ে পুত্রবধূ হিসেবে পছন্দ করলেন আমাকে।
আমার মা বাবা নেই। বড়ো এক ভাই আছে। আমার জন্মের পর মা মারা যান। তার কয়েক বছর পর বাবাও। এতিম করে পৃথিবীতে রেখে গেছেন আমাদের দুই ভাই বোনকে। ভাইয়া আমার চেয়ে সাত বছরের বড়ো। মা বাবা মারা যাবার পর পিতৃতুল্য ভাইটা আমাকে লালন পালন করেছে, বড়ো করেছে। আমার সমস্ত আবদার অনায়াসে মিটিয়েছে।
রায়ান দেখতে হ্যাণ্ডসাম, সরকারি চাকরি করে। বিয়ের বাজারে তাকে যোগ্য পাত্রই বলা যায়। তাই আমার শ্বশুর যখন ভাইয়ার কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন তখন ভাইয়া আপত্তি করেনি রায়ানের সাথে আমার বিয়ে দিতে।
শ্বশুরের স্নেহ আর রায়ানের ভালোবাসা পেয়ে শাশুড়ির কটু কথাকে থোড়াই কেয়ার করে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছিলাম আমি। শাশুড়ি অবশ্য বেশিকিছু বলতে পারতেন না। শ্বশুরের চোখ রাঙানিতে চুপ মেরে যেতেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই আমার জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ!
বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় আমার শ্বশুর স্ট্রোক করে মারা যান। সেই সাথে আমার মাথার উপর থেকে ছায়াটাও সরে যায়। উঠতে বসতে শাশুড়ির খোঁটা শুনতে হতো। আমাকে বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হতো প্রতিনিয়ত। আমিও যে মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে থাকতাম, তেমনটি না। মাঝে মাঝে তার মুখের উপর দু চার কথা শুনিয়ে দিতাম। কারণ, তখনও রায়ানের সাপোর্ট ছিল আমার সাথে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটুকুও উবে গেল।
এক রাতে রায়ান আমার সাথে ঘনিষ্ট হতে চাইল। আমার সেদিন শরীরটা ভালো ছিল না। তাই রায়ানের আহ্বানে সাড়া দেইনি। কিন্তু রায়ান নাছোড়বান্দা। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেই রায়ানকে। রায়ান সেদিন রেগে গিয়েছিল খুব। এরপর থেকে সে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে লাগল। কিছুদিন পর জানতে পারলাম রায়ান পরকীয়া করছে, তাও আবার শাশুড়ির বান্ধবীর মেয়ে সেই জ্যোতির সাথে। রায়ানকে জ্যোতির পেছনে আরো বেশি লেলিয়ে দিয়েছেন আমার শাশুড়ি। আমি সেটা টের পাই। অনেক চেষ্টা করেছি রায়ানকে সঠিক পথে ফেরানোর জন্য কিন্তু পারিনি। পরনারীতে যে ছেলে মজে গেছে, তাকে ফেরানো কি অতো সোজা?
শেষ তিনটা মাস আমার জীবনটা চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে আমার শাশুড়ি আর রায়ান। আগে শাশুড়ি বকাঝকা করত। এখন মুখের আগে তার হাত চলে। কিছু থেকে কিছু হলেই গায়ে হাত তোলে। এই যে আজ দুপুরে, নিজের ভাগ্যবঞ্চিত জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে বেখেয়ালে তরকারিতে লবণ বেশি দিয়ে ফেলেছি। সে কারণে তিনি আমার গায়ে হাত তুলতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি৷ তার ছেলেও কম যায় না। রায়ানের দেয়া অসংখ্য মারের দাগ আছে আমার শরীরে।
ইদানীং খুব দেরী করে বাসায় ফেরে রায়ান। কখনো ওর শার্টে মেয়েলী পারফিউমের সুবাস পাই, কখনোবা শার্টে লিপস্টিকের দাগ দেখতে পাই। বাসায় ফেরার আগে যে জ্যোতির সাথে সময় কাটিয়ে এসেছে সেটা বুঝতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয় না আমার। এ নিয়ে কিছু বলতে গেলেই গায়ে হাত তোলে। একবার তো গলা টিপে ধরেছিল আমার। শেষ মুহূর্তে গলা ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, আমি যেন ওর ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক না গলাই।
এতকিছুর পরেও আমি এ বাড়ির মাটি কামড়ে পড়ে আছি এখানে। কারণ আমার পায়ের তলায় শক্ত মাটি নেই। মা বাবা তো নেই-ই। একটা ভাই আছে, এক সময় যার চোখের মণি ছিলাম আমি। কিন্তু এখন সেই ভাইয়ের চোখের মণি থেকে চোখের বালি হয়ে গেছি। আমি যখন ভাইয়ার চোখের দিকে তাকাই, তখন তার চোখে আমার জন্য তীব্র বিতৃষ্ণা দেখতে পাই। ভাইয়া মুখে আমাকে কিছু বলেনি কখনো। কিন্তু সে যে আমাকে কতটা ঘৃণা করে তা তার চোখের দিকে তাকালেই আমি বুঝতে পারি।
শ্বশুরবাড়িতে আমার দুর্দশার কথা ভাইয়াকে কয়েকবার বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। বলবই বা কি করে! ভাইয়া তো আমার সাথে কথাই বলে না। ভালো করে তাকায়ও না তার এই বোনটার মুখের দিকে।
রায়ান বাসায় এলো রাত সাড়ে এগারোটায়। আমার গালে স্পষ্ট আঙুলের ছাপ তার চোখে পড়লেও এ নিয়ে কথা বলল না একটাও। ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ বসল। চুপচাপ খেয়েদেয়ে উঠে চলে গেল ঘরে। একটাবার জিজ্ঞেসও করল না আমি খেয়েছি কি না! ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে একটা প্লেটে ভাত-তরকারি নিয়ে আমি খেতে বসলাম। টানা এক সপ্তাহ না খেয়ে থাকলেও এ বাড়ির কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে না আমি খাইনি কেন! সুতরাং, নিজেকে অভুক্ত রেখে কোনো লাভ নেই।
ভাত খেয়ে টেবিল গুছিয়ে ডায়নিং রুমের লাইট অফ করে ঘরে এলাম আমি। দরজা আটকে বিছানার কাছাকাছি যেতেই হাত টান মেরে আমাকে বিছানায় ফেলে দিল রায়ান। লেগে পড়ল নিজের শরীরের চাহিদা মেটানোর কাজে। আমি বাধা দিলাম না কিংবা বাধা দিতে পারলাম না।
আমাদের সম্পর্কটা এখন কেবল এই শারীরিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্য সময় রায়ান আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকায়ও না অবধি! বুক ফেঁটে আর্তনাদ বের হতে চাইছে আমার।
আজকাল শারীরিক সম্পর্কগুলো খুব তিক্ত লাগে আমার কাছে। কষ্ট হয় খুব। রায়ান আমাকে স্পর্শ তো করে কিন্তু সে স্পর্শে ভালবাসা নেই ছিটেফোঁটাও; আছে কামনা। ঘৃণায় চোখ ফেটে জল বেরোচ্ছে আমার। রায়ানের সেদিকে খেয়াল নেই। সে তার কাজে ব্যস্ত।
রাত তখন তিনটা। রায়ান বিছানা থেকে উঠে সিগারেট, লাইটার আর মোবাইল নিয়ে বারান্দায় গেল। লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে কয়েকটা সুখটান দিল। এরপর ফোন করল জ্যোতিকে। দুজন মিলে সিডাকটিভ কথাবার্তা শুরু করল। ঘেন্নায় শরীর রি রি করে উঠল আমার। এতক্ষণ আমার সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়ে এখন জ্যোতির সাথে কিসব কথা বলছে! নাহ, আর সহ্য হচ্ছে না। এতদিন অনেক সহ্য করেছি। আজ এর একটা বিহিত করতেই হবে।
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। রায়ান আমাকে খেয়াল করেনি। সে কথা বলায় ব্যস্ত। আমি ঝট করে রায়ানের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলাম। তারপর রেলিং এর ওপর দিয়ে বাইরে ফেলে দিলাম মোবাইলটা।
রায়ান হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেণ্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই ওর মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। হতভম্ব চেহারায় এসে ভর করল ক্রোধ। আচমকা এক হাতে শক্ত করে আমার চুলের মুঠি চেপে ধরল। আমি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম।
”শালী! তোর সাহস হয় কী করে আমার মোবাইল ফেলে দেওয়ার? খুব তেজ বাড়ছে তাই না? তোর তেজ কমাইতেছি।”
রায়ান চুল ছেড়ে সপাটে চড় মারল আমার গালে। দুপুরে শাশুড়ি যে গালে চড় মেরেছে, রায়ান সে গালেই মেরেছে। চড় খেয়ে দু চোখে অন্ধকার দেখছিলাম আমি। এক্ষুনি যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাব। দেয়াল ধরে কোনো রকমভাবে পতন ঠেকালাম। তাকালাম রায়ানের দিকে। এই মানুষটা আমার স্বামী, সেটা ভেবে ঘেন্না হচ্ছিল আমার। একদলা থুথু ছুঁড়ে মারলাম রায়ানের মুখে। এতে রায়ান আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। চুলের মুঠি ধরে সজোরে ধাক্কা দিল আমাকে। আমার কপালটা প্রচণ্ড জোরে বারি খেল দেয়ালের সাথে। ভারসাম্য হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলাম আমি। টের পেলাম, আমার কপাল বেয়ে রক্তের ফোয়ারা নামছে। এরপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করলাম। একই সাথে আবিষ্কার করলাম, কেউ পরম যত্নে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কপালটা ব্যথা করছে বড্ড। অজান্তেই হাত চলে গেল কপালে। বুঝতে পারলাম সেখানে ব্যন্ডেজ করা। কপালে হাত রেখেই ধীরে ধীরে চোখ খুললাম। চোখ মেলে তাকিয়ে প্রথমেই ভাবীর চিন্তিত চেহারা টা আমার নজরে পড়ল। আমি তাকাতেই ভাবীর চিন্তিতভাবটা উবে গেল যেন। ভাবী তার হাতটা আমার মাথা থেকে নামিয়ে গালের উপর আলতো করে রাখল। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, ”এখন কেমন লাগছে, প্রিয়ন্তী?”
”ভালো।” অস্ফুট স্বরে বললাম আমি।
আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। ভাবী বাধা দিয়ে বলল, ”উঁহু, উঠো না। হাতে ক্যানোলা পরানো। স্যালাইন চলছে।”
আমি আর ওঠার চেষ্টা করলাম না।
কেবিনে ভাবীকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ”ভাইয়া কোথায়?”
”তোমার ভাইয়া নিচে ফার্মেসীতে গেছে। ডাক্তার কিছু ঔষধ আর ইনজেকশন দিয়েছে। সেগুলো আনতে গেছে।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। কিছুক্ষণ পর ভাবী বলল, ”ওরা তোমার উপর এত অত্যাচার করেছে অথচ তুমি আমাদের কিচ্ছু জানাওনি! কেন বলোনি আমাদের?”
আমি জবাব দিলাম না। কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না।
ঘর লাগোয়া ঝুল বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে আছি। তাকিয়ে আছি উন্মুক্ত আকাশপানে। গতকাল বিকেলেই হসপিটাল থেকে ভাইয়া-ভাবীর সাথে বাসায় চলে এসেছি। কিভাবে আমার মন ভালো রাখা যায়, কি করলে আমি একটু খুশী থাকব- সেসব নিয়ে ভাবি তটস্থ থাকে সারাক্ষণ। ভাবী আমাকে যতটা আদর আর স্নেহ করে, দুনিয়ায় আর কোনো ভাবী তার ননদকে এতটা আদর করে বলে আমার মনে হয় না। অথচ আমি কী করলাম? সেই ভাবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ কেড়ে নিলাম তার কাছ থেকে। তার পেটের সন্তান কেড়ে নিলাম। একই সাথে কেড়ে নিলাম তার মা হওয়ার সক্ষমতাটুকু! এই আমার জন্য সে কখনো মাতৃত্বের স্বাদ নিতে পারবে না!
(চলবে)
#প্রকৃতির_প্রতিশোধ
লেখ-আরব মালিক
পর্ব ১
পরের পর্বে সমাপ্তি