03/13/2026
২০১২ সাল থেকে কানাডার টরন্টো শহরে আমার জীবন এক দীর্ঘ শীতের সাথে সহাবস্থান।
এখানে শীত কখনও নির্মম, কখনও সুন্দর। বছরের শীতের কয়েকটা মাস জুড়ে এই জীবনের সাথে আমাদের চোখগুলোর যে সম্পর্ক এবং আমাদের হিমায়িত হৃদয়ে যে স্মৃতিগুলো জমাট বাঁধতে থাকে সেখানে এক ভিন্ন নান্দনিকতার ফুল ফোটে। যেটা কিনা বৈচিত্র্যতার ভিন্ন এক রুপ। যার প্রভাব হেমন্ত আর বসন্ততেও বিস্তারিত হতে পারে।
জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারির গভীর রাতে তাপমাত্রা প্রায়ই নেমে যায় মাইনাস ৩০ থেকে মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত (উইন্ডচিল ধরলে আরও নিচে)। তুষারপাতও কম নয়—গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১১০ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার বরফ শহরটাকে ঢেকে ফেলে সাদা লেপ-তোষক-বালিশে।
এই কঠিন শীতের মধ্যেই আমার টরন্টোকে দেখার, চিনে নেওয়ার এবং ক্যামেরায় ধরে রাখার শুরু। সেই অভিজ্ঞতার ফসলই আমার প্রথম ফটোগ্রাফি বই— “টরন্টো”। মনে আছে, ২০১৪ সালের সেই ভয়াবহ শীতের কয়েকটা মাস আমার প্রায়ই অন্ধকার সকালে জুবুথুবু হয়ে বেরিয়ে পড়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। প্রায় হাঁটুসমান জমাট তুষারের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে যাওয়া, কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ, হাতে ট্রাইপড—এমন একটা সেলুলয়েডের শট মনে গেঁথে আছে নিজেকে নিয়ে। বরফে ঢাকা রাস্তা, নিঃশব্দ পার্ক, আর ধোঁয়া ওঠা নিঃশ্বাস—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে অগুনিত ছবিতে রূপ নিয়ে চলেছিল যা একটা এলবাম হয়ে আছে মনের বুকসেল্ফে।
মাঝে মাঝে সেই দীর্ঘ শীতযাত্রার ছোট্ট আশ্রয় ছিল টিম হর্টনের এক কাপ গরম ব্ল্যাক কফি, হাতে ধরা ক্ষনিকের উষ্ণতা।
তখন আমি “ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিজিটাল ফটোগ্রাফি” পড়ি। ক্লাস শুরু হতো সকাল আটটায়। কিন্তু শীতের শহরে সকাল আটটা মানে তখনও প্রায় রাতের অন্ধকার। তাই বাসা থেকে বেরোতে হতো সাড়ে ছয়টায়—ঘুটঘুটে অন্ধকারে, বরফঢাকা ফুটপাত ধরে। বাস আর ট্রেনে চড়ে কলেজে পৌঁছে ক্লাসরুমে ঢোকার আগে দাঁড়াতাম কফির লাইনে। সেখানে কখনও ক্লাসের দু-একজন সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত গরম কফির বাষ্পের মধ্যে।
আজ সকালে ঘুম ভেঙে জানালার কাছে এসে যখন দেখি বাইরে তুষার ঝরছে নিঃশব্দ, অবিরাম, তখন সেইসব দিনের কথা হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে। মনে হয়, এই শহরের শীত শুধু ঠান্ডা নয়; এর ভেতরে জমে আছে অনেক পথ হাঁটার স্মৃতি, ক্যামেরায় ধরা সাদা নিস্তব্ধতা, আর এক কাপ গরম কফির ধোঁয়া ওঠা উষ্ণতা।
*নীচের ছবিটি সাসকাচিওয়ানের সাসকাটুনে তোলা। ডিসেম্বর ২০২৫।