16/10/2026
কান্তজিউ/কান্ত নগর/কান্তজির মন্দির।
কাহারোল,দিনাজপুর।
টেরাকোটা শিল্প যেখানে রুপ ছড়ায়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দিনাজপুরের ঢেপা নদীর তীরে গড়ে উঠেছিলো ঐতিহাসিক এক মন্দির।রত্ন শিল্পরীতিতে তৈরি হয়েছিলো এই মন্দির।রত্ন স্থাপত্যশৈলীর ৭ টি ভাগ আছে মানে রত্ন স্থাপত্য শৈলী ৭ প্রকার। এরমধ্যে দিনাজপুরের ঢেপা নদীর তীরে গড়ে উঠা মন্দিরটি ছিলো নবরত্ন।প্রায় ১৫০০০ হাজার টেরাকোটা টালি বা মাটির ফলকের ছোয়া পেয়েছে এই মন্দির।যেখানে মহাভারত ,রামায়ণ সহ বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো।মন্দিরে উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে তৎকালীন দিনাজপুর রাজবাড়ির মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৭২২ সালে প্রাণনাথ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে মন্দিরের নির্মাণ শেষ করেন। ব্রিটিশ আমলে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এই মন্দিরটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। নবরত্ন বা ‘নয় শিখর’ যুক্ত কান্তজিউ মন্দিরের চুড়া হতে আদি নয়টি শিখর ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।যখন এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিলো তখন এর উচ্চতা ছিলো ৭০ ফুট কিন্তু ভূমিকম্পের পর তা ৫০ ফুটে দাঁড়ায়।
হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির এটি, যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। ধারণা করা হয়, মহারাজা সুমিত ধর শান্ত এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
কান্তজীর মন্দির শ্রীকৃষ্ণের জন্য নিবেদিত। কালিয়াকান্ত জীউ অর্থাৎ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপনের জন্যই মন্দিরের নামকরণ হয়েছে কান্তজীউ, কান্তজী বা কান্তজীর। মন্দিরটির সুবাদে এলাকাটি কান্তনগর নামে পরিচিতি পায়। সেজন্য পরবর্তী সময়ে এর আরেক নাম হয়ে যায় কান্তনগরের মন্দির।
জনশ্রুতি রয়েছে, মন্দিরের নির্মাণ সামগ্রী সুদূর আসামের পর্বত ও হিমালয় থেকে আনা হয়েছিল। এর নির্মাণকাজের জন্য বেশিরভাগ কর্মী পারস্য থেকে এসেছিলেন। ইতিহাস ও গঠনশৈলীর জন্য এটি দেশের বিখ্যাত মন্দির।
প্রথম পর্যায়ের অলঙ্করণে, কৃষ্ণের নানা কাহিনী, সমকালীন সমাজ জীবনের বিভিন্ন ছবি এবং জমিদার ও অভিজাতদের বিনোদন চিত্র আছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের অলংকরণে, বনের মধ্যে শিকার দৃশ্য, হাতি, ঘোড়া ও উট সহ রাজকীয় শোভাযাত্রা, যা সুন্দরভাবে সজ্জিত আছে। এছাড়াও পালকিতে বসে থাকা হুকা হাতে জমিদার, নদীর দৃশ্য, লোকজনে ঠাসা নৌকায় সকলে আনন্দ-উৎসবে মগ্ন এমন দৃশ্যপটও বিদ্যমান। তৃতীয় ধাপের অলংকারে রয়েছে, দানব রাজা কংস কিশোর কৃষ্ণকে বধ করতে উদ্যত, সারস গলার দানব বাকাসুর হত্যা, স্বর্ণ দানব কলিকায়ে দমন, লম্বা সরু নৌকায় কৃষ্ণের আনন্দ ভ্রমণ ইত্যাদি বিষয়।
কান্তজির মন্দিরের দক্ষিণ মুখে রামায়ণের বিভিন্ন কাহিনীচিত্র, পঞ্চবটীর বনে রামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষণের বনবাসের চিত্র রুপায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও রাবণ কর্তৃক সীতা অপহরণ, অশোকের বনে সীতার বন্দিজীবন ইত্যাদি পোড়ামাটির ফলকগুলোতে ফুটে উঠেছে।