02/07/2026
'জুলাই গণহত্যায় আওয়ামীলীগ দলীয়ভাবে দায়ী'- অনেকেই এমন মত দিয়েছেন যার পক্ষে শক্তিশালী তথ্য প্রমাণ রয়েছে।
১। জুলাই ২০২৪ সালে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের কোনো একক নগরে বা রাজধানীতে নয় বরং সারাদেশেই ছাত্র-জনতার উপর গুলি চালিয়ে অকাতরে ছাত্রজনতাকে আহত ও নিহত করেছে। বিবিসি বাংলা'র ডেটা জার্নালিজমের মাধ্যমে 'আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন এন্ড ইভেন্ট ডেটা' ACLED থেকে ১৩৮৪ জন নিহত ছাত্র জনতার লোকেশন প্লট মতে সারাদেশে একযোগে হত্যাযজ্ঞ চালনো হয়েছে। জাতিসংঘও একই তথ্য দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঢাকার দলীয় কাউন্সিলর ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছিলেন- “আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের প্রতি হামলা এসেছে, হুমকি এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা আমাদের করতেই হবে। কাজেই আপনারা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রস্তুত হয়ে যান। সারা দেশে সতর্ক হয়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে এ অশুভ অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ১৪০০ খুন এবং ১৫ হাজার আহত এককভাবে বাংলাদেশ পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলাবাহিনী গুলোর হামলায় হয়নি, ব্যক্তিগতভাবে কোনো নেতার নির্দেশ শুধু নয় বরং দল হিসেবে আওয়ামীলীগ এবং তার সকল অঙ্গ সংগঠন যেমন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ শ্রমিকলীগ, স্বেচ্চাসেবকলীগ সবাই এই দমন পীড়নে সরাসরি দলীয়ভাবে সংযুক্ত ছিল এবং সারাদেশে। এর পক্ষে শক্ত তথ্য প্রমাণ আছে। ফলে দেশব্যাপী সংগঠিত খুন, গণহত্যা ও হামলার দায় আওয়ামীলীগকে দলীয়ভাবেই বহন করতে হবে।
সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৯ জুলাই ২০২৪ থেকে প্রায় প্রতি রাতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ধানমন্ডির বাসভবনে একটি “কোর কমিটি” বৈঠক হতো, যেখানে আন্দোলন দমনসহ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হতো। এই কমিটির এক বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকের সিদ্ধান্ত হয়। সূত্র: প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২০২৫।
২। ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের 'দেখামাত্র গুলির নির্দেশ' দিয়েছেন। এটা উনি দিয়েছেন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে আওয়ামীলীগ এর দলীয় মিটিং এবং ১৪ দলীয় জোটের মিটিং এর পরে।
“এটা অবশ্যই কারফিউ। এটা নিয়ম অনুযায়ীই হবে এবং সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।”
২০ জুলাই ২০২৪, প্রথম আলো: কাদের বলেছিলেন কারফিউ "শুট অ্যাট সাইট" হবে এটা ১৯ জুলাই গণভবনে হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকের পরের বক্তব্য।
এছাড়া মানবজমিনে (২০২৬) পাওয়া গেছে যে ICT-তে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ঠিক এই "শুট অ্যাট সাইট" সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার। ফলে দলীয়ভাবে শুধুমাত্র আওয়ামীলীগ নয় বরং ১৪ দলীয় জোটও দায়ী। এর মাধ্যমে ঐক্যমত্ত কমিশনে ১৪ দলীয় জোটকে বাইরে রাখার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
অর্থাৎ আওয়ামীলীগ যে দলীয়ভাবে জুলাই গণহত্যার জন্য দায়ী তার পক্ষে বেশ শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ (ICT-র রায়/পরোয়ানা, জাতিসংঘের প্রতিবেদন, সাবেক আইজিপির জবানবন্দি) আছে। পাশাপাশি জুলাই ২০২৪ সালের সংবাদ আর্কাইভে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় প্রায় সব নেতার হত্যার ও নির্যাতন এবং সহিংস আন্দোলন দমনের বক্তব্য ও নির্দেশ আছে।
৩। আন্দোলন দমনে সরকারকে উৎসাহিত করেছিলেন আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও ব্যবসায়ীরা। আওয়ামী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে জানা যায়, ২৭ জুলাই ২০২৪ ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে হাসিনা-সমর্থিত সাংবাদিক নেতাদের একাংশ এক সমাবেশে সরকারের দমন-পীড়নের প্রতি সমর্থন জানান। আওয়ামী সম্পাদকরা গণভবনে গিয়ে হাসিনার সহিংস দমনকে সমর্থন করেছিল, দালাল সম্পাদকদের সেই ছবি ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী কিছু শিল্পীর সরাসরি বক্তব্য আছে নির্যাতনে পক্ষে।
আওয়ামীপন্থী শিক্ষারাও ৩ আগস্ট হাসিনার সাথে গণভবনে দেখা করে জুলাই গণহত্যা ও দমনপীরনের বিরুদ্ধে সমর্হতন দিয়েছে। শনিবার, ৩ আগস্ট ২০২৪ বাংলা ট্রিবিউন ও বাংলানিউজ২৪ এর রিপোর্ট মতে গণভবনে শেখ হাসিনা পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ এবং পৃথকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-শিক্ষক-অধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং আওয়ামী শিক্ষকদের নীল দল ছাত্রজনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে মিছিল করেছে। শাহবাগে এধরণের অবস্থান কর্মসূচী করেছে আওয়ামী শিল্পীরাও।
অতি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আওয়ামী ব্যবসায়ীদের মিটিং হাসিনার উপস্থিতিতে তারা কার্ফিউ এবং দমনের পরামর্শ দিয়েছে।
****************
৪। হামলার পক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কিছু বক্তব্য-
১৫ জুলাই, সোমবার,
মহিবুল হাসান চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী:
“এ যুগের রাজাকারদের পরিণতি ওই যুগের রাজাকারদের মতোই হবে! ঘৃণা, ধিক্কার আর ক্রোধ এদের প্রতি! রাজাকারের দল তোরা, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ছাড়!”
সাদ্দাম হোসেন, কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ:
“কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাঁরা “আমি রাজাকার” স্লোগান দিচ্ছেন, তাঁদের শেষ দেখিয়ে ছাড়ব।”
ওবায়দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ:
“কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের “রাজাকার” স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে। আত্মস্বীকৃত রাজাকার যারা নিজেদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, তার জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট।”
(সূত্র: প্রথম আলো, “কোটা আন্দোলন: আলোচিত-সমালোচিত যত কথাবার্তা”,
১৭ জুলাই, বুধবার
শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রী:
“আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় আন্দোলনে নেমে দুষ্কৃতকারীদের সংঘাতের সুযোগ করে দেবেন না।”
সূত্র: গণভবন থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ
ওবায়দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ:
“আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের প্রতি হামলা এসেছে, হুমকি এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা আমাদের করতেই হবে। কাজেই আপনারা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রস্তুত হয়ে যান। সারা দেশে সতর্ক হয়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে এ অশুভ অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।”
সূত্র: প্রথম আলো; ঢাকার দলীয় কাউন্সিলর ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য
আ ক ম মোজাম্মেল হক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী:
“কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন স্বাধীনতার বিরোধীদের হাতে চলে গেছে। কাজেই আর বসে থাকার সময় নেই।”
প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন
১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার
ওবায়দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ:
“রাজপথ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।” ধানমন্ডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন
শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রী (ফাঁস হওয়া, বিবিসি-যাচাইকৃত অডিও):
“[নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে] প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে, তারা যেখানেই তাদের পাবে, গুলি করবে।”
সূত্র: বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশন, “The Battle for Bangladesh: Fall of Sheikh Hasina” (৯ জুলাই ২০২৫ প্রকাশিত অনুসন্ধান); বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি কণ্ঠস্বর যাচাই করেছে; ফোনালাপ রেকর্ড করেছিল এনটিএমসি। ফোনকলের তারিখ ১৮ জুলাই ২০২৪, গণভবন থেকে।
২০ জুলাই, শনিবার
ওবায়দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ:
“এটা অবশ্যই কারফিউ। এটা নিয়ম অনুযায়ীই হবে এবং সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।”
সূত্র: প্রথম আলো, “কোটা আন্দোলন: আলোচিত-সমালোচিত যত কথাবার্তা”, ১ আগস্ট ২০২৪; গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকের পর কারফিউ ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে বক্তব্য
২৬ জুলাই, শুক্রবার
ওবায়দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ:
“নিরীহ মানুষ হত্যার দায় বিএনপি ও জামায়াতের।” ধানমন্ডিতে সংবাদ সম্মেলন
২৭ জুলাই, শনিবার
সরকার-সমর্থিত সাংবাদিক নেতাদের একাংশ:
“(সংগঠিত সমাবেশে) শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের দমন-পীড়নের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন।”
সূত্র: উইকিপিডিয়া, “ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান”; জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত সমাবেশ
৪ আগস্ট, রোববার, গণভবনে নিরাপত্তা সমন্বয় বৈঠক
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক আইজিপি (ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি):
“সেদিন সকাল ও রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত দু’টি নিরাপত্তা সমন্বয় বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, এসবি-ডিজিএফআই-এনএসআই প্রধানসহ ২৭ জন উপস্থিত ছিলেন; রাতের বৈঠকে শেখ রেহানাও ছিলেন। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।”
সূত্র: প্রথম আলো, “শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের নির্দেশে জুলাই গণহত্যা”, সেপ্টেম্বর ২০২৫; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক আইজিপির জবানবন্দি
**************
ফলে ব্যক্তি শেখ হাসিনা, দলীয় সাধারণ সম্পাদক সহ আওয়ামীলীগের পুরো দলীয় কাঠামো জুলাই খুনের পক্ষে কাজ করেছে। এসব তথ্য প্রমাণে প্রতীয়মান হয় যে, আওয়ামীলীগ দলীয়ভাবে জুলাই গণহত্যার জন্য দায়ী। বর্তমানে বিচারচলাকালীন সময়ে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের দিকে তাকিয়ে আছি।
জুলাই গণহত্যার (ম্যাসাকার ও কার্নেজ) দায়, দায়ী ব্যক্তি ও সংগঠনকে নিতেই হবে।
ম্যাপ কৃতজ্ঞতা- বিবিসি বাংলা জুলাই আর্কাইভ 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিন'