21/06/2023
বই রিভিউ,,,
বইঃ আদম ধর্ম (প্রারম্ভ)
লেখকঃ কাজী ম্যাক
প্রকাশনীঃ কুহক কমিক্স এন্ড পাবলিকেশন
প্রচ্ছদঃ আদনান আহমেদ রিজন
ধরণঃ স্পিরিচুয়াল থ্রিলার
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২০৭
মুদ্রিত মূল্যঃ ৪৫০/-
ফ্ল্যাপ থেকেঃ
আমরা এখন প্রচুর স্যাটানিক কাল্টের নাম জানি। শুধু নাম-ই নয় এসব কাল্টের ইতিহাসও আমরা কমবেশি জানি। তবে সবথেকে দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা এক স্যাটানিক কাল্ট যা "আদম ধর্ম" নামে আত্মপ্রকাশ করেছিলো, সে সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না ।
এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সুপরিচিত ছিলেন "আনোয়ার দরবেশ" নামে। প্রথমে তিনি পীর দরবেশ হিসেবেই - এলাকায় খ্যাতি অর্জন করেন। বেশ কিছু লোক তার মুরিদও হন। কিন্তু, হঠাৎ-ই আনোয়ার দরবেশের চিন্তা- চেতনা এবং আচার আচরণে আমূল পরিবর্তন আসা শুরু করে। তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্মের বিরোধীতা শুরু করেন। তিনি ইসলামের সর্বশেষ নবীকে শয়তানের প্রতিনিধি হিসেবে আখ্যা দেন। জানা যায় তার চারপাশের মানুষজন তার এরকম অদ্ভুত বিশ্বাসের কারণে তাকে একঘরে করে দেয়। কিন্তু আসলে তিনি নিজেই স্বেচ্ছায় প্রতিবেশীদের "বয়কট" করেছিলেন।
ধীরে ধীরে তিনি তার এই নতুন ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ রুপ দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি স্বতন্ত্র ইবাদতের পদ্ধতি, সূরা, নানা রকম নিয়ম-নীতি তৈরি করতে থাকেন। নিজ পরিবারের সকল সদস্যদের তিনি তার ধর্মে দীক্ষিত করেন। প্রথম অবস্থায় পীর হওয়ার কারণে তার মুরিদদের মধ্যেও অনেকে এই ধর্মে দীক্ষিত হন। চলতে থাকে তাদের গোপন ধর্মচর্চা।
তাদের এই চর্চার মূল বিষয় ছিলো "কুফরি কালাম"। আনোয়ার দরবেশ মারা যাবার পর তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তার আত্মাকে হাজির করার চেষ্টা করে। আনোয়ার দরবেশের আত্মা হাজির হয় এবং তাদের প্রতি নির্দেশনা আসে "একসাথে আত্মহত্যা করার"। এতে তাদের আত্মা সংঘবদ্ধভাবে মুহাম্মদ সাঃ-র আত্মাকে আক্রমণ করতে পারবে। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত মনে
হলেও এটাই ছিলো তাদের জন্য সত্য। ১১ জুলাই, ২০০৭ সাল। জামালপুরের জগন্নাথগঞ্জ স্টেশন থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করে জিএম এক্সপ্রেস ২৫৪ ডাউন নামক লোকাল ট্রেনটি। আজ ট্রেন চালাচ্ছেন ড্রাইভার (লোকো মাস্টার) আব্দুল মতিন এবং মোঃ এনায়েত খান। ময়মনসিংহ পৌরসভার কাশর এলাকার ইটখোলায় যখন ট্রেনটি আসে, তখন ঘড়িতে সময় বেলা ৩টা ১০ মিনিট। হঠাৎ ড্রাইভাররা দেখেন, রেলপথের বাঁ পাশ থেকে বেশ কয়েকজন নারী- পুরুষ একে অন্যকে ধরাধরি করে রেল লাইনের দিকে আসছে।
মোট ৯ জন। পুরুষ, নারী, শিশু সবাই একই পরিবারের সদস্য। রেললাইন ধরে চুপচাপ বসে পড়ে তারা। প্রথমে ড্রাইভাররা কিছুই বুঝতে পারেননি। পরে খেয়াল করলেন, তারা আসলে রেললাইন পার হচ্ছে না, রেললাইনের উপরেই বসে আছে। ড্রাইভার হুইসেল দিলেন। তারা লাইন থেকে সরল না। ড্রাইভাররা বুঝতে পারলেন এরা সবাই আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। ট্রেন ইমার্জেন্সি ব্রেক করলো। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চোখের সামনে ৯ জন মানুষকে চাপা দিয়ে ট্রেনটা
বেশ খানিকটা সামনে এগিয়ে গিয়ে থামল। পরবর্তীতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে তার বাড়ির ভেতর কিছু নথি আবিষ্কার করেছিলেন। সেসব নথি তে নানা রকম তথ্য লিপিবদ্ধ ছিলো।
একটি ডায়েরির ভেতর ইংরেজিতে লেখা ছিল-"আমরা পৃথিবীর একমাত্র পরিবার যারা স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল। মোহাম্মদের আইনের বাইরে এবং সব ধর্মের সব কার্যকলাপের বাইরে। তাহলে আমরা কে? আমরা হলাম আদম। ” এ ছাড়া লেখা ছিলো "সবার উপরে আদম সত্য, জুলুমের বিচারের ব্যবস্থা করিব।” আনোয়ার দরবেশ মারা যাওয়ার আগে অছিয়ত করে গিয়েছিলেন। অছিয়তনামার একটি অংশ নিম্নে দেয়া হলোঃ
"আমার মৃত্যুর পরে কেউ আমার জানাজা পড়বে না। আমাকে গোসল দিবে না এবং আমাকে যেনো কাফনের কাপড় না পরানো হয়। আমি যে পোশাক পরে মারা যাবো সে পোশাক সহ-ই ঘরের ভেতর আমাকে মাটি চাপা দেয়া হবে। যখন তোমরা আমাকে কবরে শোয়াবে, তখন আমার মাথাটি পূর্ব দিকে, পা পশ্চিম দিকে, এবং আমার মুখ দক্ষিণের দিকে করে দিবে। যদি এই নির্দেশ লঙ্ঘন করা হয় তবে আমি প্রতিশোধ নেব।"
ভাগ্যক্রমে এই ধর্মের এক অনুসারীর কাছ থেকে কিছু টাকার বিনিময়ে একটি পান্ডুলিপি আমি গোপনে সংগ্রহ করি। সেই সাথে পাই কিছু ভয়ানক তথ্য। এই বইটিতে আমি চেষ্টা করবো সেসব তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরার
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগে বলে নেই যে আমরা যারা Netflix এর ডকুমেন্টারি সিরিজ House of Secrets দেখেছি তারা অনেকটাই এই বইয়ের কাহিনির সাথে সামঞ্জস্য পেতে পারেন। মূলত দুটো ঘটনাই বাস্তব। তবে বাংলাদেশের 'আদম ধর্ম' কেইসটা অনেক ক্রিটিকাল এবং ভয়ানক।
সত্যি বলতে বইটা যতটা এক্সপেকটেশন নিয়ে শুরু করেছিলাম তার বিন্দুমাত্রও পূরণ করতে পারেনি। অনেকটাই আশাহত হয়েছি। মূল কাহিনির অস্তিত্ব ছিলো সামান্য মাত্র, তাও একেবারে শেষের দিকে।
তবে বইটা থেকে অনেকখানি ডার্ক সাইকোলজি ও কিছু জায়গায় রয়েছে আদিম লাভক্রাফটিয়ানের ছোয়া পাওয়া যাবে। বইটিতে ধর্ম, দর্শন, সাইকোলজি এবং হররের অদ্ভুত সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। বইটিতে অনেক রহস্যই অমীমাংসিত রাখা হয়েছে যার কারণে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুজে পাওয়া যায় নি। হয়তো বইয়ের দ্বিতীয় পর্বে এই রহস্যের সমাধান পাবো।
এই পাঠপ্রতিক্রিয়াটিতে আমি পজিটিভ ও নেগেটিভ দিকে তুলে ধরবো।
শুরুতে বইয়ের কিছু পজিটিভ দিকগুলো দেখা যাক৷
লেখকের লিখনশৈলী বেশ ভালো হয়েছে, খুবই সাবলীল ভাষায় তিনি বইটা সাজিয়েছেন।
যুক্তির প্রয়োগের বর্ণনাগুলো অসাধারণভাবে ব্যাবহার করেছেন।
বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থ্রিলিং ভাইব কিন্ত বজায় রেখেছেন লেখক যা বেশ ভালোই লেগেছে।
আনোয়ার দরবেশের প্রাথমিক চরিত্রটা বেশ ভালো লেগেছে, যদিও শেষের দিকে এসে সে পথভ্রষ্ট হয়ে যায় যা মূলত মানসিক সমস্যা থাকে।
এবার আসি বইটির কিছু নেগেটিভ দিকে।
বইয়ে প্রচন্ড পরিমাণ বানান ভুল ছিল যা এর আকার অনুসারে একদমই খাপছাড়া। রীতিমতো বিরক্ত হয়েছি। হতাশ হলাম বইয়ের তৃতীয় মুদ্রণে এসেও এতো বানান ভুল থাকবে বলে আশা করিনি। কিছু কিছু জায়গায় বাক্যে প্রতিষ্ঠা একেবারেই অর্থহীন (যেমন কোরআনের মোট সূরা ১৪৪! )। এটা অবশ্যই প্রোডাকশন এর ভুল যা গ্রহণযোগ্য নয়।
লেখক কিছু বিষয়কে অতিরঞ্জিত ভাবে উপস্থাপন করেছেন। তবে যদি তা যদি ঘটনা প্রবাহে দরকার হয় তাহলে এটি অভিযোগ করার মত না।
অতিরিক্ত বর্ণনা, স্লো বার্ণ এবং মূল বিষয়ের উপর ফোকাস পুরোপুরিই কম, সম্ভবত বইয়ের সিকুয়েলের জন্য এমনটা করা হয়েছে। যদি না করা হয়ে থাকে তাহলে সত্যিই হতাশ হয়েছি।
ঘটনাপ্রবাহের শেষের দিকে এসে একটু বেশিই তাড়াহুড়োর মাঝে শেষ করেছেন।
বইটির পিছনের ফ্ল্যাপের কথাগুলো অসুম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এছাড়া বইয়ের পেইজ কাটিং এ আরো সতর্ক হওয়া দরকার ছিল, প্রায় মার্জিন এ চলে গেছে। শেষ প্রান্ত আরো মসৃণ হতে পারত।
আশা করি যে জায়গাগুলোতে সম্পাদনার ঘাটতি রয়ে গেছে, সেই জায়গাগুলো ঠিকঠাক করে নেয়া হবে পরবর্তী সংস্করণে এবং পেইজ কাটিং এর দিকে যত্নবান হবে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ২.৫/৫