15/05/2026
যখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যাবতীয় বিষয় পরিত্যাগ করিয়া, ইহমুত্রার্থ ফলভোগে বিরাগ জন্মিয়া একমাত্র ভগবানকে আশ্রয় ও অবলম্বন করিবে, তখন ভগবানের প্রতি যে অনুরাগ বা আসক্তির সঞ্চার হয়, তাহাই জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি। প্রকৃত ভক্তির ইহাই প্রথম স্তর। এই ভক্তিতে স্তব-স্তুতি থাকে, প্রার্থনা-মিনতি থাকে; আরাধনা উপাসনা সকলই থাকে। কাজেই ইহার নাম সাধন-ভক্তি। তৎপরে ক্রমশঃ সাধকের চিত্ত ভগবানে একাগ্র হয়—ভক্তির কোলে আত্মসমর্পণ করিয়া তাঁহার স্নিগ্ধতনুস্পর্শে সংসার-কোলাহল ভুলিয়া, যখন সমগ্র হৃদয়বৃত্তির সহিত সাধক তাহাতে মজে, তখন জ্ঞানের বন্ধন খুলিয়া যায়। জ্ঞানশূন্য হইলে ভক্তি তদগতা—স্বার্থ চিন্তা থাকেনা, বিচার থাকেনা, উদ্দেশ্য থাকেনা—ষোল আনাই তুমি। জ্ঞানশূন্যা বিশুদ্ধ ভক্তির সাধনায় ক্রমশঃ ভগবানের মহিমজ্ঞান দূরে যায়, অর্থাৎ ভগবান্ সর্ব্বশক্তিমান্, পাপ-পুণ্যের দণ্ডদাতা, সৃষ্টিস্থিতি প্রলয়কর্তা প্রভৃতি ঐশ্বর্য্যজ্ঞান দূরীভূত হইয়া প্রেমের সঞ্চার হয়। তখন সে আমার প্রাণ, আমার প্রাণের প্রাণ, মাত্র এইজ্ঞানে পুত্রের ন্যায়, ভৃত্যের ন্যায়, প্রেমপূর্ণ হৃদয়ে ভগবানের সেবা করিতে বাসনা জন্মে। এইখানে রাগানুগাভক্তি প্রকৃত পক্ষে ভাবভক্তিতে পর্য্যবসিত হইল। ভাবের মোহে বিভোর হইতে পারিলে ভগবান্ আপনার হয়েন, নিকটে আসেন।
সাধনায় দাস্য ভাব পুষ্ট হইয়া দাস্যের সঙ্কোচ দূরে যায়, তখন ভগবানে প্রাণের প্রেম-সখীত্ব 'অর্পিত হয়। সখ্যপ্রেমের ক্ষীরধারায় ভগবান্ পরিতৃপ্তিলাভ করিয়া আনন্দিত ও প্রীত হয়েন। সখ্যভাবে ভক্ত ও ভগবান্ এক হইয়া যান। তখন ব্রজের রাখালবালকগণের ন্যায় অসঙ্কোচে ভগবানের সহিত খেলা, কাঁধে চড়া চড়ি, একত্র শয়ন-ভোজন, নবপল্লবে ব্যজন, বন-ফুল মালায় বিভূষণ প্রভৃতি করিয়া ভক্ত বিভোর হইয়া যান। তাঁহার অভাবে চারিদিক শূন্য দেখেন।
এই সখ্য-ভাব পরিপুষ্ট হইলে বাৎসল্য ভাবের সঞ্চার হয়। তখন সাধক, ভগবানকে নিজ অপেক্ষাও ক্ষুদ্র বোধ করিয়া থাকেন ভক্ত নিজে পিতা মাতা হইয়া, ভগবানকে শিশু পুত্রের ন্যায় আদর যত্ন করিয়া থাকেন। নিজের স্বার্থ ভুলিয়া-বাসনা-কামনা বিসর্জন দিয়া একমাত্র পুত্রের সেবাই জনক-জননীর ধ্যান-জ্ঞান। পুত্রের নিকট পিতা মাতা কিছুই চাহেন না; আপনা ভুলিয়া, সর্ব্বস্ব দিয়া পুত্রের সুখ-স্বাস্থ্যের জন্য ব্যস্ত। এইরূপ ভাব ভগবানে জন্মিলে, তাহাকে বাৎসল্য ভাব বলে। নন্দ-যশোদার বাৎসল্যভক্তিতে ভগবান্ বালক সাজিয়া যশোদার স্তন্যপান, নন্দের বাধা মাথায় বহন করিয়া ছিলেন।
বাৎসল্য ভাবের পরিপাক দশায় যখন ভক্ত আত্মহারা হইয়া যান, তাহার সমস্ত দেহ-মন-বুদ্ধি ভগবানে সমর্পিত হইয়া যায়, তখনই কান্তাভাব বলা যায়। স্ত্রী যেমন স্বামীকে ভালবাসে, সেইরূপ প্রাণ দিয়া, যৌবন-জীবন দেহভার সমর্পণ করিয়া ভগবানকে ভালবাসিলে, তখন তাঁহাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইহাই সাধ্যের শেষ অবস্থা—ভাবভক্তির ইহাই উৎকৃষ্ট অবস্থা।
—শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব
(প্রেমিকগুরু)
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর