26/03/2026
দেশত্যাগী এক মহাবীরের গল্প
তিনি বিশ্বের একমাত্র পাইলট যিনি এক মিনিটের কম সময়ে (২৩ সেকেন্ডে) ৫টি শত্রু বিমান ভূপাতিত করেছেন। এটি এখন পর্যন্ত বিশ্বরেকর্ড। পুরো যুদ্ধে তিনি মোট ৯টি শত্রু বিমান ভূপাতিত করেন এবং অপর দুটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত করেন।
বলছিলাম মুহাম্মদ মাহমুদ আলম এর কথা। তিনি ১৯৩৫ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মুহাম্মদ মাসুদ আলম। তিনি পাকিস্তান আন্দোলন এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সমর্থন করতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানী বিমান তাদের বাড়িতে বোমাবর্ষণ করে। ঐ সময় ব্রিটিশ পাইলট মরিস প্রিং ৩টি জাপানী বিমান ভূপাতিত করেন। কলকাতায় লোকেরা তার সম্মানে র্যালি করেছিল। তিনি তখন থেকে যুদ্ধ পাইলট হতে সংকল্প করেন।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তার পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় ১১ বছর বয়সে তিনি আত্মরক্ষার্থে একজনকে হত্যা করেছিলেন। তিনি ঢাকার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তার মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
মাধ্যমিক শিক্ষাকালে তিনি পোলিশ পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুচোস্কির অধীনে শাহীন এয়ার ট্রেনিং কর্পস (SATC)-এর সদস্য হন এবং কোয়েটায় স্নাতক কুচকাওয়াজের সময় তার কাঙ্ক্ষিত গ্লাইডার উইংস অর্জন করেন।
তিনি কোয়েটায় ছয় মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তারপর ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেবে ১৯৫২ সালে আরপিএএফ কলেজে যোগদান করেন। তিনি ১৫তম জিডি(পি) কোর্সের অংশ হিসেবে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান এয়ার ফোর্সে কমিশন লাভ করেন।
তিনি পিএএফ স্টেশন মৌরিপুরে ফাইটার কনভার্সন কোর্স সম্পন্ন করেন। দ্রুতই তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় ফাইটার পাইলট হিসেবে আবির্ভূত হন এবং আকাশ থেকে আকাশে গোলাবর্ষণ প্রতিযোগিতায় পিএএফ-এর সর্বোচ্চ স্কোরার হন।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ৬ সেপ্টেম্বর ৩টি এফ-৮৬ সাব্রি ফর্মেশনে ফ্লাই করে স্কোয়াড্রন লিডার আলম হালওয়ারা বিমান ঘাঁটির উপর হারতীয় বায়ুসেনার একটি হকার হান্টার বিমান ভূপাতিত করেন, যেটি চালাচ্ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার একে রাওলি।
পরের দিন, ৭ সেপ্টেম্বর তিনি সারগোদার উপর একটি কমব্যাট এয়ার পেট্রোল মিশনে ফ্লাই করেন। এ সময় তিনি বায়ুসেনার একে এক পাঁচটি হকার হান্টারের মুখোমুখি হন এবং পাঁচটি বিমানকেই গুলি করে ভূপাতিত করেছেন।
বায়ুসেনার ঐ সকল বিমানের পাইলট ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার ওঙ্কার নাথ কাকার ও এ বি দেবাইয়া, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট গুহা ও ফ্লাইং অফিসার ব্রার এবং স্কোয়াড্রন লিডার ভাগবত। অবশ্য, হারত এই রেকর্ডে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিল।
১৬ সেপ্টেম্বর স্কোয়াড্রন লিডার ও ফ্লাইং অফিসার মোহাম্মদ শওকতুল ইসলাম হারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশ করেন। বায়ুসেনার ফ্লাইং অফিসার প্রকাশ সদাশিব রাও পিঙ্গলে ও ফারুক দারা বুনশা দ্রুত তাদেরকে ধাওয়া করে।
পিঙ্গলে তখন শওকতের বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করেন। আর বুনশা এদিকে আলমকে ধাওয়া করেন। ডগফাইটে সুদক্ষ আলম কৌশলে বুনশাকে পেছনে ফেলে দেন এবং তার হান্টার বিমানটি গুলি করে ফেলে দেন। বুনশা যুদ্ধে নিহত হন।
একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো আলমের সকল উইংম্যান অকার্যকর চছিলেন। তাদের বিমান শট ডাউন হতো এবং তারা নিহত হতেন; অতচ একইসাথে থাকা আলমের একই বিমান দ্রুততার সাথে ১০টি হান্টারকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়।
যুদ্ধের পর, সরকার তাঁকে সিতারা-ই-জুরাত পুরস্কারে ভূষিত করে। পুরস্কার বিতরণকালে তার সাথে পরিচিত হওয়ার সময় আইয়ুব খানের চোখে জল এসে গিয়েছিল। তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন তাঁকে একটি বাসভবন উপহার দেয় (তিনি গ্রহণ করেননি)।
১৯৭০ সালে সিরীয় পাইলটদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে সিরিয়া সরকারের অনুরোধে তাঁকে সিরিয়ায় ডেপুটেশনে পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলে তিনি অত্যন্ত হতাশ হন এবং কয়েক মাস কাজে যোগ দেননি।
কর্মে অনুপস্থিতির ঐ সকল মাসে তিনি তার বেতন নিতে অস্বীকার করেন। বরং পাকিস্তানের অপর কিছু পাইলট সিরীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত দাবি করেছিলেন, তখন আলম তাদেরকে কোর্ট-মার্শালে শাস্তির মুখোমুখি করিয়েছিলেন।
১৯৭৩ সালের আরব-জ্রায়েল যুদ্ধে তিনি ১৬ জন পিএএফ পাইলটের একটি দলের নেতৃত্ব দেন এবং জ্রায়েলি বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেন এবং তারপরে মিগ-২১ বিমানের একটি সিরীয় স্কোয়াড্রনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৭৮ সালে আলম এয়ার কমোডর হন এবং তার অবদানের জন্য তাকে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ ভূষিত করা হয়। ১৯৮০ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল কলেজ অব ডিফেন্স স্টাডিজ তাকে ফিল্ড মার্শাল উইলিয়াম স্লিম এর সাথে তুলনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
পাকিস্তানে ফিরে আসার পর তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন যে, তাকে একটি অপারেশনাল এয়ার বেসের কমান্ড দেওয়া হবে কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। মার্চ ১৯৮১-এ, তাকে সহকারী বিমান প্রধান (পরিকল্পনা) হিসেবে মনোনীত করা হয়।
পাক বিমান বাহিনীর বর্তমান উন্নয়নে তার এক অনস্বীকার্য অবদান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিমান ক্রয়ের চুক্তি নিয়ে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউল হক ও এয়ার চিফ মার্শাল আনোয়ার শামিম আলোচনা করছিলেন। সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আলোচনায় ক্ষুব্ধ হন এবং প্রোটোকল ভেঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে মার্শাল শামিমকে নিম্নমানের বিমান ক্রয় বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি উষ্মার সাথে বলেন- "Sir, we should go for nothing less than F-16s which would serve our needs for the next 20-30 years."
তার এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জে জিয়া অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। অনুষ্ঠান শেষ করার পূর্বে জিয়া
জিয়া তার ফোল্ডারটি টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে বলেন, "Gentlemen, I don't think you have done your homework properly".
পরে জেনারেল জিয়া বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং পাকিস্তান বিমান বাহিনী শেষ পর্যন্ত অবশেষে F-16 বিমানগুলো কিনেছিল। ওদিকে, মার্শাল শামিমের বিষয়ে জানা যায় যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ৫ লাখ ডলারের একটি খামারবাড়ি কিনেছিলেন।
নির্ভীক-দুঃসাহসী আলম সরাসরি শামিমের মুখোমুখি হন এবং ঐ বিষয়ে তদন্ত পরিচালনার সুপারিশ করেন। তার পরিবর্তে, শামিম বছরের শেষে আলমকে নেতিবাচক এসিআর দেন এবং তার চরিত্র এবং যুদ্ধের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আলম তখন শামিমের দুর্নীতির বিষয়টি জেনারেল জিয়ার নজরে আনেন। জিয়া উত্তর দেন, আপনি কি মনে করেন যে, আমি জানি না- আপনি আমাকে কী বলছেন।" আলম উত্তর দেন, "আমি পাকিস্তানের জন্য খুব উদ্বিগ্ন এবং আমি আর চাকরি করতে অস্বীকার করছি।"
তাকে নির্ধারিত সময়ের আগে অবসর দেওয়া হয়। ইনকামের অপর কোনো উৎস না থাকা সত্ত্বেও তিনি পেনশন নিতে অস্বীকার করেন। জেনারেল জিয়া তাকে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত ও ইসলামাবাদে ইনস্টিটিউট অফ স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের চেয়ারম্যান পদের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং যাযাবর জীবন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। মূলত তিনি সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে তিনি বাগরাম বিমান ঘাঁটিতে মুজাহিদিন-আক্রমণে অংশ নেন।
তিনি পায়ে হেঁটে ও ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ের উপর দিয়ে দীর্ঘ যাত্রা করেন। ল্যান্ড মাইন এড়িয়ে গোলাগুলির মধ্যে দিয়ে লোগার প্রদেশের আজরো উচ্চভূমি অতিক্রম করে এবং বাগরামে পৌঁছানোর জন্য আরও তিনটি প্রদেশ পার হতে হয়েছিল।
সেখানে উচ্চভূমির মাঝপথে আলম বরফযুক্ত পাথরে পিছলে যান। তার বাম হাত ভেঙে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর, তিনি সঠিক চিকিৎসার জন্য পেশোয়ারে ফিরে আসেন। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার তাঁকে একটি পিস্তল উপহার দিয়েছিলেন।
আফগানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের শেষের দিকে, আলম পাঞ্জশির উপত্যকায় আসেন এবং গেরিলা কমান্ডার আহমদ শাহ মাসুদের অতিথি হন। তাদের নিয়মিত হতো এবং আলমকে তিনি "জেনারেল" বলে সম্বোধন করতেন।
সোভিয়েত বিদায়ের মাস খানেক পর শীর্ণ ও ক্লান্ত দেহে লম্বা দঁড়িবিশিষ্ট আলম গভীর রাতে এয়ার মার্শাল আয়াজ আহমেদ খানের কাছে আসেন। তিনি দুই দিন ধরে অভুক্ত ছিলেন। খাওয়ার পর, তিনি তিন দিন ঘুমিয়ে কাটান। এরপর আয়াজ খানের সাথে তার আর কখনও যোগাযোগ হয়নি।
তিনি নিঃস্ব হয়ে যান। অতিরিক্ত ধূমপানের (দিনে দুই প্যাকেট) ফলে তাঁর গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। ২০০২ সালে এয়ার চিফ মুশাফ আলী তার জন্য একটি দুই বেডরুমের গেস্টহাউস তৈরি করান এবং তাকে পেনশন গ্রহণে রাজি করান।
তিনি ২০০৫-২০০৬ সাল পর্যন্ত ঐ গেস্টহাউসে বসবাস করেন। সেখান থেকে তাকে কিছু সময়ের জন্য করাচির ফয়সালে ঘাঁটিতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি করাচিতে স্থায়ী হন এবং তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার র্নির্মাণ করেন।
২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাঁকে পিএনএস শিফা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর অসুস্থতার বিষয়ে মিডিয়ায় কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি। ২০১৩ সালে ১৮ মার্চ সকালে ৭৭ বছর বয়সে ধূমপান-জনিত জটিলতায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে তার সম্মানে এমএম আলম একাদশ নামে একটি ক্রিকেট দল গঠন করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে লাহোরের মেইন মার্কেট থেকে গুলবার্গ পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তাটি এমএম আলম রোড নামকরণ করা হয়।
২০১৪ সালে তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে মিয়ানওয়ালী ঘাঁটির নাম পরিবর্তন করে পিএএফ বেস এম.এম. আলম রাখা হয়। তাঁর সম্মানে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। তার ব্যবহৃত সাব্রি জেটটি করাচির পিএএফ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
আলম অবিবাহিত ছিলেন, কারণ তার বাবার মৃত্যুর পর ছোট ভাইবোনদের লালন-পালনের দায়িত্ব তাকে বিয়ে করার খুব কম সুযোগ দিয়েছিল। একজন আগ্রহী পাঠক হিসেবে, তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ৩,০০০ এর বেশি বই ছিল।
আল্লাহ্ তাঁকে ক্ষমা করে জান্নাতে দাখিল করুন।
Mohammad Salimullah