24/11/2025
বড় বাবুর পনেরো মাস বয়সে ছোট বাবুর জন্ম। এর পনেরো মাস পর মেয়ের জন্ম। একেবারে পিঠোপিঠি ছোট্ট ছোট্ট তিনটি বাচ্চা সামলাতে গিয়ে আমি আমি যেন দিনে রাতে কয়েকবার করে যমদূতের সাক্ষাৎ পাচ্ছিলাম! কিছুতেই হিসেব মিলছিল না- কিভাবে আমার মতো খুব সচেতন, সতর্ক থাকা মানুষের এভাবে সারে চার বছরে তিনজন সন্তানের জন্ম হয়!
এমনিতেই শাশুড়ীর চোখের বিষ আমি তার মধ্যে বাচ্চারা হয়ে উঠছে আরেক ইস্যু! সারাদিন হাজার রকমের কথাবার্তা চলতো তার- বছর বছর আমি বাচ্চা পয়দা করছি, কত কারেন্ট হতে পারে, জগতেও কেউ হয়না আমার মতো মুর্খ! সারাক্ষণ বাচ্চাদের ট্যানট্যানানিতে উনার মাথায় অসুস্থতা বেধে যাচ্ছে! ঘুমোতে পারেননা চিল্লাপাল্লার জন্যে! যেখানে সেখানে বাচ্চাদের হাগুমুতুর দুর্গন্ধ, নোংরা ইত্যাদি ইত্যাদি!
এদিকে বাচ্চাদের বাবার আয় সীমিত! বাচ্চাদের ডায়াপার, ফর্মুলা, যত্নআত্তির উপকরণ আরও সব প্রয়োজনীয় নানা কিছু আনা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। সংসারে তার টাকাপয়সা দেওয়ার অবস্থা অনেকটা টানাটানির মধ্যে পড়ে যায়। এটা শাশুড়ীকে আরও মারমুখী করে দেয়!
ভাগ্যিস আমার ছোট্ট একটা ইনকাম সোর্স ছিল। অনলাইনে দেশের বাইরের বাঙালি বাচ্চাকাচ্চাদের কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিতাম। এতে আমার মাস শেষে কিছু বৈদেশিক মূদ্রা হাতে জমা হতো। বাচ্চাদের নিয়ে শত কষ্ট, সময় সঙ্কট, অসুস্থতা, অস্থির পরিস্থিতিতেও এই টিউশনি করা ছাড়িনি আর।
রক্ষে ছিল, অধিকাংশ স্টুডেন্টই ছিল ইউরোপ ও ইউএসের বাসিন্দা সেক্ষেত্রে আমার রাতে ও ফজর নামাজ পরবর্তী ক্লাস শিডিউল থাকতো বেশি। আর আমার বাচ্চারা মোটামুটি সে সময়গুলোতে কমবেশি ঘুমোতো।
বুঝছিলাম আমার উপর মারাত্মক চাপ হয়ে যাচ্ছিল, আমি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিলাম ভেতর থেকে একরকম। কিন্তু ঐ ক'টা টাকাপয়সা হাতে না থাকলে আমি আরও মরতাম! যেহেতু ফিড করতো বাচ্চা সেক্ষেত্রে প্রায়ই ক্ষুধার্ত থাকতাম। প্রেসার লো থাকতো। চোখ অন্ধকার হয়ে মাথা চক্কর দিতো। কিন্তু কখনও আমার জন্যে বাড়তি খাবার হতোনা ঘরে। তিনবেলা সবার সাথে ঐ একটু ভাত খাওয়া হতো এতটুকুই।
পরপর বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে শরীরের অবস্থা নাজেহাল হয়ে পড়েছিলো। সিজারে এনেস্থিসিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কোমড় ব্যাথা হতো প্রচুর। পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন, নিয়মিত রাতজাগা, চব্বিশ ঘণ্টা বাচ্চাদের নিয়ে দৌড়ের উপর থাকা, ক্ষুধা তৃষ্ণায় দুর্বলতা, আবার রাতজেগে- সময়ে অসময়ে বিদেশের টাইম মেইনটেইন করে পড়ানোতে আমি অনেকটাই পাগলের মতো হয়ে থাকতাম! তার উপরে যখন শুনতে হতো- শাশুড়ীর নানা অপমান, তীর্যক ব্যাবহার, গালমন্দ- আমি ভেতর থেকে ভেঙেচুরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়তাম যেন। আমার অসুস্থতা এসবে ক্রমেই যেন বেড়ে যাচ্ছিল।
আমার মা আসতেন মাঝেমধ্যে। দুই এক দিন থেকে আবার চলে যেতেন। বাড়িতে আমার বাবা সম্পূর্ণ একা, আম্মু ছাড়া কষ্ট হয়ে যেতো তাঁর খাওয়া দাওয়া নিয়ে।
বাপের বাড়ি গিয়েও যে থাকব ক'দিন- সে অবস্থা ছিলনা! খুব গ্রামীণ পরিবেশ, তাছাড়া আমার পিত্রালয়ের আর্থিক পরিস্থিতি দুর্বল ছিল! বাচ্চাদের বাবা আমি সেখানে থাকলে খরচ দিতে চাইত না! সবমিলিয়ে এক বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে হতো আমাকে সেখানে!
ছোট বাবুর অস্তিত্ব যখন টের পাই নিজের মাঝে, আমার মা'ও আমাকে অনেক বকাঝকা করলেন। আমি প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পরছিলাম তখন। সব সময় অক্সিজেন নিয়ে থাকতে হতো। কষ্ট করে মা ছিলেন আমার পাশে ডেলিভারি পর্যন্ত। এতে তাঁকেও চূড়ান্ত অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত! জামাই বাড়ি এতদিন কিভাবে থাকেন শাশুড়ী! যেখানে শশুর বাড়ি থেকে জামাইকে দিতে হয়, সেখানে শাশুড়ী এসে আরও জামাইয়ের খায় ইত্যাদি কথাবার্তা!
কিন্তু মা পাশে না থাকলে সুস্থ্য স্বাভাবিক বাচ্চা জন্ম দেওয়া সম্ভব হতনা আমার পক্ষে।
বাবুর জন্মের কিছু দিন পর- মা চলে যেতে চাইলে আমি মা'কে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলাম। মা'ও পুরো পথ কাঁদতে কাঁদতে নাকি দেশে ফিরেছিলেন সেদিন।
দেশে গিয়েও মা ফোন করতেন ঘন্টায় ঘন্টায়! চিন্তায় অস্থির থাকতেন আমাকে নিয়ে। আমি শুধু মা'র ফোন ধরে অনবরত কাঁদতে থাকতাম। কিছুদিন পর বাচ্চাদের দেখভালের জন্যে গ্রাম থেকে মধ্যবয়সী একজন মহিলাকে এনে দিলেন মা। আমি উনাকে চাচি ডাকতাম। উনি আসায় কিছুটা হালকা হলাম। চাচি বাচ্চাদের খুব সুন্দর ভাবে দেখাশোনা আদরযত্ন, করতে পারতেন।
কিন্তু আরেক দিকে জ্বালা বাড়লো! উনি থাকবেন কোথায়? দিনে তো কোনো ভাবে চলে যায়। কিন্তু রাতে! ছোট্ট দু'রুমের বাসার এক রুমে হাসবেন্ড আমি বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমোই। আরেক রুমে শশুর শাশুড়ী। মাঝে এক চিলতে ড্রয়িং ডাইনিং স্পেসের একপাশে খাট রাখা- সেখানে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা আমার দেবর নেশা করে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। আরেক পাশে খাওয়াদাওয়া করা হয়। আমি খাওয়াদাওয়ার জায়গায় বিছানা করে দেই চাচিকে ঘুমোতে। কিন্তু চাচি অস্বস্তি বোধ করতেন। কারণ পাশেই এক গাঁজাখোর!
শাশুড়ীর বকবকানি আরও বেড়ে যায়! কারণ চাচির শোয়ার জায়গাটা দিয়ে হেঁটে বাথরুমে যেতে হয়। রাতে বাথরুমে যেতে তাদের অসুবিধা। নিত্য নতুন কথাবার্তার আমদানি শুরু হতে থাকে প্রতিনিয়ত! চাচি একজন মানুষের জন্যে অনেক খাবার লাগে! উনি ভাত খান বেশি! এত যোগান আছে কি যে সংসারে লোক রাখতে গেছি ইত্যাদি!
শাশুড়ির অত্যাচার, অপমান বেড়ে চলা বৈ কমছিল না! একদিক থেকে না হয় অন্য দিক থেকে! খাওয়া, পরা, থাকা সব কিছুতে খোঁটা দিয়ে দিয়ে আমার জীবনটা পুরোপুরি বিষিয়ে তুলছিল। আমি বাচ্চাদের নিয়ে রুমে দরজা লক করে বসে কাঁদতাম দিনরাত। মনে হতো আর বাঁচবোনা! স্বামী সংসার সবকিছু মূল্যহীন ঠেকতো!
বাসা থেকে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিলাম একসময়।
কাছেই এক আপুকে জানতাম যিনি হোমমেইড খাবার সরবরাহ করতেন। উনাকে প্রতিদিন আমার ও চাচির জন্যে সব খাবার, নাস্তা সরবরাহ করতে বললাম। তিন বেলা খাবারের সাদামাটা মেন্যু ঠিক করে দিলাম বাচ্চাকাচ্চা সহ আমি ও চাচির জন্যে। আপুটা আমাকে সব খাবার নিয়ম করে দেওয়া শুরু করলেন। বাচ্চাদের জন্যে খিচুড়ি, স্যুপ ও পুডিং তৈরি করে দিতেন প্রতিদিন। আমি চব্বিশ ঘণ্টা রুম বন্ধ করে বসে থাকতাম। শুধু খাবারের ফোন পেলে গিয়ে খাবার নিয়ে আসতাম। বাচ্চাদের জন্যে বেশি করে ড্রাই ফ্রুটস আনিয়ে রাখতাম, সাথে টক দই, ডিম সেদ্ধ, শরবত, সেরেলাক, ওটস খাওয়াতাম বেশিরভাগ সময়। তাছাড়া আমাদের খাবারের সাথে তাদের স্যুপ, পুডিং, খিচুড়ি তো আসতোই রেগুলার।
কিন্তু যন্ত্রণা পিছু ছাড়েনা! বাচ্চাদের বাবা এটা মেনে নিতে পারছিল না। আমার সাথে তার যত রাগ অভিমান শুরু হয়ে যায়! আমার এসবে নাকি বাসায় সে লজ্জা পাচ্ছে! আমি নাকি ডলার পাউন্ডের গরম দেখাচ্ছি। তার মা'কে অপমান করছি হ্যানত্যান! সব কিছুতে কমিউনিকেশন কমিয়ে দিতে লাগলো আমার সাথে!
সে বাসায় আসলেই শাশুড়ী গলা চড়াতো! কান্নাকাটির ভং ধরে আমাকে নিয়ে নানা অভিযোগের বিষ ঢালতো তার কাছে। আর সে আমার কাছে এসে নিজেকে নিজে আঘাত করতো। মাথা ঠুকতো। নিরুদ্দেশ হওয়ার ভয় দেখাতো আমাকে! এইসব পরিস্থিতি, পরিবেশে আমার চিন্তা ভাবনা লোপ পেয়ে যাচ্ছিল মারাত্মক ভাবে। শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরতো অনবরত, এই সব স্বামী সংসার দুরে ফেলে বাচ্চাদের নিয়ে আমার বেঁচে থাকাটাই জরুরী এখন।
বাচ্চাদের বাবা আমার একটু এদিক সেদিক মানবেনা কোনও ভাবে! কিন্তু তার মা যে আমার উপর চূড়ান্ত ভাবে মানসিক অত্যাচার চালাতো সেটা তার নিকট অতি স্বাভাবিক ছিলো। আমার সাথে তার সামনেই এত কিছু যে হতো- সে সব দেখেও নিশ্চুপ-নির্বিকার থাকতো। তার মা'কে একটু বোঝানোর চেষ্টা করেনি কখনও। তার মায়ের সব অন্যায়ের ক্ষেত্রে শুধু আমাকে ধৈর্য ধারণের উপদেশটুকুই দিতে পারতো।
আমার স্টুডেন্টরা সব ছোটছোট বাচ্চা, আর দেশের বাইরেই তাদের বেড়ে উঠা। আমাকে অনেকটা বিদেশের নিয়মে খুব ঠান্ডা মাথায় খুব আদর, যত্ন দিয়ে অসম্ভব কোমল ভাবে তাদেরকে টিচিং করতে হতো।
সব সময় আমার মনে হতো, টাকার জন্যে পরের বাচ্চাদের নানান ঝামেলা সহ্য করে সাবলীল ভাবে সব কিছুই যখন হ্যান্ডল করছি, আমার বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই আমি কখনও যেন এতটুকু অধৈর্য না হই। তারপরও মেজাজ হারিয়ে যেতো প্রায়ই। প্রচন্ড অপরাধবোধে ভুগতাম নিজ বাচ্চাদের নিয়ে। চিন্তা থাকতো সব সময় সহনশীলতার মধ্যে নিজেকে ধরে রাখতে।
এটাও মনে হতো, সব যখন সহ্য করার মিশনে আছি- তো শাশুড়ির ব্যাবহারটাও যেন ইগ্নোর করি। কিন্তু পারতাম না। তার দেওয়া কষ্ট, কথা, তাচ্ছিল্য এফোঁড়ওফোঁড় করে ঝাঁঝরা করে দিতো আমাকে। শ্বাস কষ্ট লাগতো আমার।
তারপরও চেষ্টা করতাম অনেক সময়। কিন্তু সবকিছু নিজের উপর দাবিয়ে দিতে গিয়ে মশা মাছির মতো পিষ্ট হতে থাকতাম মানসিক চাপে! হাসবেন্ড আমার এই অবস্থা গুলো একটুও বুঝতে চাইতো না! তার অবুঝ কথাবার্তা, সান্ত্বনা আমাকে আরও হতাশায় ডুবিয়ে দিতো।
দু'জন টুইন স্টুডেন্ট ছিল আমার। খুব ছোট্ট, চার কি পাঁচ বছর বয়স। দেখতে বেশ সুন্দর অনেকটা বিদেশীদের মতো ফর্সা ফুটফুটে তারা। কথাবার্তা খুব কম বলতো সে বাচ্চারা! ওদের মা'ও বিদেশিদের মতো দেখতে ছিল! সপ্তাহে এক কি দু'টো ক্লাস করতো সে বাচ্চারা। তাও ইরেগুলার! ওদের পড়ার সময় একটু শব্দ হওয়া যেত না। আমার ছোট্ট রুমটায় আমার বাচ্চারা একটু শব্দ করতেই ওদের মা এসে খুব কড়া কথা শোনাতো আমাকে! এই ভদ্রমহিলাকে যতবারই দেখতাম খুব রাগী ও অসুস্থ মনে হতো! আর এত ধর্মভীরু লাগতো যেন সব সময় হিজাব নিক্বাবে থাকে এমন।
তারা ইউরোপে। বাংলাদেশের রাত ১০/১১ টার দিকে পড়তে আসতো টুইনেরা। আমি চেষ্টা করতাম আমার সব বাচ্চাদের তখন ঘুম পাড়িয়ে দিতে। কিন্তু মাঝেমধ্যে ব্যাতিক্রম হতো। একদিন আমার ছোট্ট বাচ্চাটা কিছুটা অসুস্থ, চাচির কাছেও থাকছিলনা। একটু কান্না করছিল ক্লাস টাইমে। এতে টুইনদের মা এসে আমাকে আবারও নানা কথা বলতে শুরু করল! আমি আর সামলাতে পারলামনা সেদিন। কেঁদে উঠি ডুকরে। হাতজোড় করে সে মহিলাকে বোঝানোর চেষ্টা করি কতটা নিরুপায় ও অসহায় আমি! শুধু টাকার প্রয়োজনীয়তায় আজ আমাকে বাচ্চাদের নিয়ে এতো কিছু সহ্য করতে হচ্ছে। মহিলা সেদিনও খুব অসুস্থ! আমার কান্না দেখে হকচকিয়ে যায়! নরম হয়ে আমার ব্যাপারে জানতে চায়। আমিও মন খুলে তাকে আমার স্ট্রাগল, কষ্টের সব কথাই বলি। উনি অবাক হয়ে পড়েন। বলে তুমি চলে যাও এখান থেকে। বলি একা তিনজন ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে বসবাস করা কত কঠিন আমাদের দেশে, কতটা সাহসের দরকার সর্বপরি কতটা এ্যাফোর্ট লাগে তা অকল্পনীয়। উনি খুব আগ্রহী হচ্ছিলেন আমার সাথে কথা বলতে!
ঐ রাতে সারারাত সে আপার সাথে কথা বলতেই যায়। হাসবেন্ড আমার ঢাকার বাইরে ছিলেন সেদিন। হঠাৎ প্রাণ খুলে কথা বলার কাউকে পেয়ে আমিও যেন সেদিন জমাট বাঁধিয়ে রাখা সব কষ্ট কথার ঝাঁপি খুলে দেই।
উনিও আমার সাথে সাথে উনার নিজের জীবনকাহিনী বলতে শুরু করেন। উনি কিডনি জটিলতা সহ নানা শারীরিক মানসিক অসুস্থতার মধ্যে ছিলেন। উনার বাবা বাংলাদেশি কিন্তু মা পোল্যান্ডের। সেদিনে বুঝছিলাম উনার ভালো বাংলা বলতে না পারা ও ফরেনারদের মতো চেহারা হওয়ার ব্যাপারটা।
টিনএজ বয়সেই মারা যান তার মা। বাবা বিয়ে থা আর করেননি। দুই বছর হয় বাবা একটা অ্যাক্সিডেন্টে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসা! উনি বিয়ে করেছিলেন এক স্প্যানিশকে। টুইনদের জন্ম সে ঘরেই হয়। কিন্তু সে সম্পর্ক স্থায়িত্ব পায়নি।
উনি কথার মাঝে- আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন, বাচ্চাদের নিয়ে থাকার মতো একটা জায়গা পেলে আমি কি নিজের ইনকামে ওদেরকে নিয়ে একা চলতে পারব?
আমি কিছু না ভেবে তৎক্ষনাৎ বলি অবশ্যই পারা যাবে। উনি জানান, বাংলাদেশ আসবেন উনি, আমার সাথে দেখা করবেন জরুরি ভাবে। সেদিন এত কিছু বুঝিনি, বুঝতে চাইনিও আসলে!
সত্যিই উনি দেশে আসলেন পরের মাসেই। আমার লোকেশনের কাছাকাছি একটা শপিংমলে বাচ্চাদের নিয়ে আমাকে আসতে বললেন। আমরা নিরিবিলি একটা ফুড কর্নারে বসেছিলাম আলাপচারিতায়। যেহেতু সব বাচ্চাদের এনেছিলাম তাই চাচিকেও সাথে নিয়েছিলাম। ভদ্রমহিলা আমাদের সবাইকে দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। অনেক কিছু খাওয়ালেন। বাচ্চাদের জন্যে কেনাকাটা করে দিলেন।
একসময় বাচ্চাদেরকে চাচিকে দিয়ে প্লে গ্রাউন্ডে পাঠিয়ে আড়ালে আমার কাছে উনার উদ্দেশ্য প্রকাশ করলেন। আসলে উনি উনার বেবিদের নিরাপত্তা খুঁজছেন!
উনার আরও একজন বাচ্চা ছিল, টুইনদের বড়ো। সে বাচ্চাকে ওর বাবা লুকিয়ে মেক্সিকো নিয়ে চলে যায়। কিছু দিন পর খবর পান সে বাচ্চাটা মারা গিয়েছে। এরপর থেকে ভদ্রমহিলা মানসিক ভাবে ট্রমায় আছেন। তার বাচ্চার বাবা নাকি অপরাধ চক্রের সাথে যুক্ত! এ বাচ্চাদেরও নিতে লোকটা নানান কু প্রচেষ্টা করে চলছে! এতে উনি বাচ্চাদের নিয়ে সবসময় আতঙ্ক উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
উনি চাচ্ছেন বাংলাদেশে টুইনদের রাখতে। কিন্তু দেশে নির্ভরযোগ্য কেউ নেই উনার! আমাকে রিকোয়েস্ট করছিলেন, আমার বাচ্চাদের সাথে যেন তার বাচ্চা দু'টোকে রাখি! তাদের ইসলামি অনুশাসনে, ধর্মীয় শিক্ষায় বড়ো করি! এর বিনিময়ে উনি আমাকে আমার বাচ্চাদের নিয়ে বসবাস করার জন্যে একটা নিরাপদ সুন্দর ব্যাবস্থা করে দেবেন! সেখানে আমাদের সাথে তার বেবিরাও থাকবে। মাঝেমধ্যে উনি আসবেন দেশে, বাচ্চাদের দেখে যাবেন। আর বাংলাদেশে এই অখ্যাত আমার কাছে টুইনদের বাবা কখনোই পৌঁছুতে পারবেনা বলে তার আত্মবিশ্বাস।
সব শুনে আমি পাহাড় সমান বিস্ময় নিয়ে ভাবনার গহ্বরে পড়ে যাই। সত্য কি মিথ্যা ঠাহর করতে পারছিলামনা। কোন টোপ কিনা এটিও বুঝেছিলামনা। কিন্তু মনে একটি কথাই মাথাচাড়া দিচ্ছিল বারবার- আমার জন্যে জেলখানার মতো ছোট্ট রুমটার অসুস্থ, দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তিটাই সবচেয়ে বড়ো। অমন অপমান জনক বিদঘুটে, অশান্তির বেড়াজাল থেকে বাচ্চাদের নিয়ে বেরিয়ে আসাটাই আমার জন্যে বড় প্রাপ্তি।
আমি হ্যা সূচক মাথা নাড়াই, সম্মতি দেই। বলি, ঢাকা শহরে আমাদের এই এলাকাটাকে মোটামুটি ভালো চিনি। এখানে বা এর নিকটবর্তী এরিয়ায় একটা বাসা নিয়ে দিলে আমি আমার বাচ্চাদের সাথে তার বাচ্চাদেরও রাখব, মানুষ করব, যা যা করতে হয় তার বাচ্চাদের করব। চাচিও থাকবেন আমাদের সাথে সব বাচ্চাদের দেখভালের জন্যে। আর একই এলাকায় থাকলেও আমি আপাতত কোন ধরনের যোগাযোগ রাখবনা আমার হাসবেন্ড বা তার পরিচিতজনদের সাথে।
উনি এক দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি প্রচন্ড ভয় অস্থিরতায় রিতীমতো ঘামছিলাম! কি করতে যাচ্ছি, কি হবে সামনে এমন চিন্তা উৎকন্ঠায় ঠকঠক করে কাঁপছিলাম।
উনি বললেন, আমি যেন প্রিপারেশন নিয়ে থাকি! এক সপ্তাহের মধ্যে উনি সব ঠিকঠাক করে ফেলতে চান। তার লইয়ারের কাছে গিয়ে আমাকে স্ট্যাম্পে সই করতে হবে! আমার ন্যাশনাল আইডি ও অন্যান্য সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি উনাকে দিতে হবে। এবং আমার দুজন নিকটস্থ, বিশ্বস্ত মানুষের সাথে উনাকে কথা বলিয়ে দিতে হবে। উনি তাদের সাক্ষী করে রাখবেন।
আমি ভালো মন্দ সব বুঝছিলাম, কিন্তু শাশুড়ির অত্যাচারের কাছে এসব ঠুনকো মনে হতে লাগছিলো। মনে হচ্ছিল ঝুঁকি নিতে হলে নেই! তবুও স্বাধীন ভাবে শ্বাস নিতে পারব। লড়াই করেই বাঁচতে হবে আমাকে। জুবুথুবু হয়ে পড়ে থাকলে আমার উপর চড়াও হতে দিনকে দিন মানুষ বাড়বে। ঘুড়ে দাঁড়িয়ে একটু সাহস ও শক্তি না দেখালে যে কোনো সময় এই শহরের জনসমুদ্রে বাচ্চাদের নিয়ে খড়কুটোর মতো ভেসে যাব। ঘোর অন্ধকারে পা বাড়াতে পিছপা হলাম না আমি।
বাসায় ফিরে আসলাম স্বাভাবিক ভাবে। ফোনে সবিস্তারে বাবা মা'র সাথে কথা বললাম এ ব্যাপারে। সব শুনে উনারাও খেই হারিয়ে ফেলছিলেন যেন। যেহেতু ভদ্রমহিলা আমার নিকটস্থ মানুষের সাথে কথা বলবেন সেক্ষেত্রে আমার বাবা মা'কেই চুজ করলাম। তাদের বললাম ভদ্রমহিলার সাক্ষী হতে! বাবা মা ভয় পাচ্ছিলেন প্রচন্ড। আসলে আমি একা হলে তো কথা ছিল, কিন্তু সাথে ছোট্ট ছোট্ট তিনজন বাচ্চা! এই চিন্তাই তাদের মানসিক ভাবে দুশ্চিন্তায় কাবু করে দিচ্ছিল। আমিও ভেতর থেকে চিন্তায় দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম বেশ। তবুও কন্ঠে দৃঢ়তা ধরে তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছিলাম শুধু।
ভদ্রমহিলাকে জানালাম, আমার বাবা মা সাক্ষী হবেন। উনি সেদিনই তাদেরকে আনার ব্যাবস্থা করলেন ঢাকায়। কয়েকদিনের জন্যে একটা হোটেলে বাবা মা'কে রেখে আমরা ল ইয়ারের মাধ্যমে সব কিছু ফায়নাল করলাম। বাবা মা উনাকে সামনাসামনি দেখে, কথা বলে কিছুটা আস্বস্ত হলেন, ভরসা পেলেন।
আমি বাবা মা'কে অনুরোধ করি, কিছুদিন যেন আমার সাথে ভদ্রমহিলার দেওয়া সে বাসায় থাকে। হঠাৎ এমন কিছুতে আমি ভেতরে ভেতরে অসম্ভব নার্ভাস হয়ে পরছিলাম! মনে হচ্ছিল তাদের উপস্থিতি আমার ভয় দুর করবে এবং মানসিক শক্তি যোগাবে। মা বাবা বুঝলেন ব্যাপারটা। পাশে থাকার ভরসা দিলেন আমাকে।
দু'দিন পর ভদ্রমহিলা আমাকে সুবিধামতো তার বাসায় চলে আসতে জানান। আমি আর সময় নিলাম না! হাসবেন্ড তো সকালে অফিস চলে যায়। বাকি শশুর শাশুড়ী। তারা সেদিনকার নিরব দুপুরে যখন ভাতঘুমে, তখন চাচিকে আমাদের কাপড়চোপড়ের ব্যাগ পোটলা হাতে দিয়ে আগে বের করে দেই, পরে বাচ্চাদের নিয়ে আমি বের হই। দরজার আওয়াজে শাশুড়ী শোয়া থেকে উঠে ভ্রু কুঁচকে তাকায় আমার দিকে! আমি দ্রুত বাচ্চাদের নিয়ে বেরিয়ে পরি। এবং নিচে গিয়ে চাচিকে নিয়ে সামনে থাকা একটা সিএনজিতে চেপে বসি। পেছন ফিরে একটিবারও আর তাকাইনি! ভালো মন্দ চিন্তাও করতে চাইনি! সোজা চলে আসি আমাদের জন্যে রেডি রাখা বাসায়।
সেখানে ঢুকেই তো আমার চোখ ছাড়াক গাছ! বিশাল বড় সতেরো শত স্কয়ার ফিটের বাসা। বিশাল বিশাল রুম! গার্ড, সিসি ক্যামেরা সহ সে এ্যাপার্টমেন্টে চব্বিশ ঘণ্টা কড়া সিকিউরিটি। শশুড়ের বাসার অপজিট সাইডের এলাকাতেই আমাদের বাসাটা। চাচিও অসম্ভব খুশি, থাকার কষ্ট আর হবেনা উনার। আমাদের থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় ফার্নিচার, ঘরোয়া সাংসারিক জিনিসপত্র সব দেওয়া হয়েছে। ভদ্রমহিলা উনার মেয়েদের নিয়ে এসেছেন। মেয়েরা তো আমাকে চেনে। কিন্তু কেন যেন কাছে আসতে চাইছিলনা আমার! আমি ও চাচি আদর করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তাদের হাতটিও ধরতে দেবেনা। কিন্তু পজিটিভ ছিল আমার তিন বাচ্চার প্রতি! ওদের দেখে খুব খুশি হচ্ছিল টুইনেরা। খেলতে চাচ্ছিল। কথা বলতে আগ্রহ দেখাচ্ছিল। এটা ওর মা'কে স্বস্তি দেয়, খুশি করে। আমরাও হালকা হলাম এতে। যাক আমার বাচ্চাদের সাথে তারা খুশিতেই থাকবে তাহলে। টুইনদের সব জিনিসপত্র তার মা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। একটা রুমে শুধু নানান ধরনের টয় ও গাড়ি দিয়ে ভরা। দোলনা টানানো। ভদ্রমহিলা বললেন আপনার বাচ্চাদের সাথে এগুলো দিয়ে আমার মেয়েরা খেলবে। উনি আমাকে তার মেয়েদের কথা বলছিলেন আর ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিলেন! আমি তাকে জড়িয়ে ধরে দোয়া চাই। বলি, তার বেবিরা আমার কাছে আমানত। আমার দ্বারা যেন কিছুতেই এই আমানতের খেয়ানত না হয়। আজ থেকে পাঁচটা বাচ্চা আমার।
দু'দিন উনি ছিলেন আমাদের সাথে। এরপর চলে যান সেই সূদুরে নিজের ঠিকানায়। আর এদিকে আমার শুরু হয় পাঁচজন বাচ্চা নিয়ে একাকী এক ভিন্ন রকম যাত্রা। আমার সাথে যোগাযোগের সব ধরনের কন্টাক্ট নাম্বার, ইমেইল, অনলাইন প্লাটফর্মের যাবতীয় পথ সব কিছুই বন্ধ করে দেই। নিজের প্রফেশনের জন্যে আবারও সব নতুন ভাবে এ্যাকাউন্ট তৈরি করি।
আর আমার হাসবেন্ডের শুরু হয়, তার জীবনে কঠিন শাস্তি হয়ে আসা এক প্রবল দুঃসময়। সে পাগলের মতো আমাদের খুজতে শুরু করে। উদভ্রান্তের মতো আমার দেশের বাড়ি ও সব আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমার সন্ধান করতে থাকে এবং কান্নাকাটি করতে থাকে কিন্তু আমার ইচ্ছে সে একটা শাস্তি পাক। বুঝুক স্ত্রীকে অবমূল্যায়ন করার ব্যাপারটা কেমন ভয়াবহ। স্ত্রীর গুরুত্ব জীবনে কেমন তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করুক। প্রচন্ড অভিমান, ক্ষোভ থেকে ভালবাসার মানুষটার প্রতি আমার একটা জিঘাংসা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। আর তার প্রতি সেই কষ্ট অভিমান ও ক্ষোভ নিয়ে আমি বাচ্চাদের নিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম দীর্ঘ একটা সময়!!
#অভিমান
Ayisha Yashfah