28/04/2019
প্রসঙ্গঃ এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবো না, কোথাও চান্স পাবো না এবং অন্যান্য।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষা অনেকেরই মনমত হচ্ছে না। এর কারণে অনেকের মনেই এই ভয় ঢুকে গেছে যে রেজাল্ট খারাপ হবার কারণে হয়ত নিজের পছন্দের ভার্সিটিতে পরীক্ষাই দিতে পারবো না। আবার অনেকের ধারণা পয়েন্টের হিসাবে এত বেশি পিছিয়ে যাব যে তখন আর এডমিশনের জন্য চেষ্টা করেই কোন ধরনের লাভ নেই। আসলেই কি তাই? এই ব্যাপারগুলো পরিষ্কার করতে আজকের পোস্ট।
প্রশ্ন ১ঃ ভাইয়া বুয়েট/ইঞ্জিনিয়ারিং এ এপ্লাই করতে গেলেই তো ফিজিক্স+কেমিস্ট্রি+ ম্যাথ সবগুলো সাবজেক্টে এ+ থাকা লাগবে। আমার তো ফিজিক্স/কেমিস্ট্রি একটা এক্সাম খারাপ হয়েছে। বড় ভাইদের কাছে শুনেছি যে আমি হয়ত এপ্লাই করতে পারবো না। আমি কি করতে পারি এখন?
উত্তরঃ প্রথম কথা, যেসব ভাই/আপু রা এইসব কথা শুনায় তাদের কে সারাজীবন এর জন্য তোমার পারমানেন্ট ব্লকলিস্টে রেখে দাও এখনই। রাখা শেষ??? শেষ হলে পরের কথায় আসো। মূল ব্যাপার হল, বুয়েট বা অন্য কোন ইউনিভার্সিটি তেই এপ্লাই করার রিকোয়ারমেন্ট গুলো কোনদিন ফিক্সড থাকে না। একেকবার রেজাল্টের ভিত্তিতে পরিবর্তন হয়। আর সব ইউনিভার্সিটিরই লক্ষ্য থাকে যেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারে। তাই এরকম অদ্ভুত রিকোয়ারমেন্ট কোনদিনই চাওয়া হবে না বুয়েট বা অন্য কোন ভার্সিটি থেকে, যদি না সেই বছর লাখ লাখ স্টুডেন্ট গোল্ডেন পায়।
আমার কথা হয়ত অনেকের বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই না? ঠিক আছে, তাহলে গত দুই বছরের সার্কুলার দেখে আসি। সব ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি গুলোর মাঝে এপ্লাই করার জন্য সবচেয় বেশি কঠিন শর্ত থাকে বুয়েটে। সেই বুয়েটেই গত বছর এর সারকুলারে এপ্লাই করার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা হচ্ছে বাংলা+ইংরেজি+ফিজিক্স+কেমিস্ট্রি+ম্যাথ সব মিলিয়ে এই ৫ সাবজেক্টে ২৫ এর মধ্যে মাত্র ২২.৫ জিপিএ থাকতে হবে এবং সব মিলিয়ে কমপক্ষে ১২০০০ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারবে। গতবার ফিজিক্স প্রশ্ন অনেক কঠিন হওয়াতে এবং রেজাল্ট অনেক ড্রপ করার কারণেই শুধু এই সিদ্ধান্ত। শুধু কি তাই, ২০১৭ সালের সার্কুলার দেখো। সেখানেই দেখবে, এপ্লাই করার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা হচ্ছে বাংলা+ইংরেজি+ফিজিক্স+কেমিস্ট্রি+ম্যাথ সব মিলিয়ে এই ৫ সাবজেক্টে ২৫ এর মধ্যে মাত্র ২৩ জিপিএ থাকতে হবে এবং সব মিলিয়ে কমপক্ষে ১২০০০ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারবে। ২০১৭ তে কিন্তু রেজাল্ট তুলনামূলকভাবে ২০১৮ এর চেয়ে কয়েকগুণ ভালো ছিল, তারপরেও এত শিথিলতা। আরেকটা তথ্য দেই, যাদের এসএসসি খারাপ হয়েছিল তাদের জন্য। গত দুই বছরেই এসএসসির মিনিমাম জিপিএ কত চেয়েছে জানো? ৫.০০ এর মধ্যে মাত্র ৪.০০ । তারপরেও বিশ্বাস হচ্ছে না? ঠিক আছে, পোস্টের প্রথম কমেন্ট চেক করো। সেখানে ২০১৭ আর ২০১৮ সালের বুয়েট সার্কুলার এর অফিশিয়াল লিংক দিয়ে দিয়েছি। ^_^
আর অন্যান্য ইউনিভার্সিটি তে এপ্লাই করার যোগ্যতা বুয়েটের থেকেও অনেক শিথিল হয়। তাহলে এখন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করো, তোমার কি হতাশ হওয়া উচিত কিনা? আশা করি উত্তরটা নিজেই পাবে। ওহ আচ্ছা, আরেকটা কথা, একদম শুরুতে বলেছিলাম, যেসব ভাই/আপু তোমাদের কে উলটাপালটা কথা শুনায় তাদের কে তো ব্লক দিতে বলেছিলাম তাই না? আরেকবার বলছি, তাদের কে আর কোনদিন আনব্লকও করবে না। কারণ তাদের কাজ একটাই, খুব বেশি ফালতু গুজব ছড়ানো আর তোমাদের কে ভয় দেখানো। এছাড়া তাকে দিয়ে তোমার কোনদিন কোন উপকার হবে না।
প্রশ্ন ২ঃ ভাইয়া আমার রেজাল্ট খুব একটা ভাল হবে না। ৫ তো পাবই না, হয়ত ৪ থেকে ৪.২৫ আশা করছি। আমি কি কোন ভাল পাবলিকে চান্স পাবো? সব জায়গাতেই তো জিপিএ এর জন্য একটা পয়েন্ট যোগ হয়। এখানেই তো পিছিয়ে গেলাম, তাহলে আর এডমিশন টেস্ট ভাল দিয়ে কি লাভ? তাহলে কীভাবে কি করবো?
উত্তরঃ রেজাল্ট খারাপ হলে মার্কস কমে যায় এটা যদি ১০০ ভাগ সত্যি হয়, তাহলে তুমি এটার জন্য চান্স পাবে না কোথাও এই কথাটা ২০০ ভাগ মিথ্যা। গানিতিকভাবেই হিসাব দেই, তুমি বাংলাদেশের যেখানেই পরীক্ষা দাও না কেন, সেখানেই খুব বেশি হলে তোমার এসএসসি আর এইচএসসি এর রেজাল্ট (ফোরথ সাবজেক্ট সহ) মিলিয়ে ৩০-৪০ পারসেন্ট মার্কস যোগ হবে। বাকি ৬০-৭০ পারসেন্ট থাকে মূল এডমিশন টেস্টে। এমনকি অনেক জায়গায় এসএসসি/এইচএসসি এর মার্ক্স কাউন্টই করা হয় না প্রাথমিক বাছাই এর পর।
একটা ছোট হিসাব দিচ্ছি। সায়েন্স কমার্স আর্টস নির্বিশেষে অনেকেরই ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার। সেখানে ভর্তির জন্য এইচএসসি এর জিপিএ কে ১০ আর এসএসসি এর ৬ দিয়ে গুণ করা হয়। এখন ধরো, তোমার এইচএসসি এর জিপিএ ৪.৫ আর এসএসসি তে ৪.৬। তাহলে জিপিএ এর জন্য তোমার মোট মার্কস হবে, ৪.৫ *১০ + ৪.৬*৬ = ৪৫ + ২৭.৬ অর্থাৎ ৭২.৬। ৮০ এর মধ্যে ৭২.৬। ৭ মার্ক বেশ বড় একটা বিষয় আমি জানি। কিন্তু, বাকি আছে কিন্তু আরো ১২০ মার্কস যার উপর হবে ভর্তি পরীক্ষা। গত কয়েক বছরের হিসাব থেকে সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, চান্স পেতে হলে ৮০+১২০ অর্থাৎ মোট ২০০ মারক্সের মাঝে অন্তত ৭৫ ভাগ মার্কস অর্থাৎ ১৫০ পেলেই চান্স অনেকটাই নিশ্চিত। তাহলে তোমাকে সেটা মাথায় রেখেই পরীক্ষা দিতে হবে।
৭ মার্কস হয়তোবা এখন মনে হচ্ছে অনেক বেশি কিছু। কিন্তু সত্যি কথা কি, আমরা এটলিস্ট ৫ মার্কস পরীক্ষার হলে ভুল করে আসি শুধুমাত্র নিজের খামখেয়ালির জন্য, নার্ভাসনেসের জন্য আর ঠিকমত শেষ মুহূর্তে রিভিশন না দেওয়ার জন্য। তাহলে বুঝতে পারছো কোন জায়গায় তোমাকে অন্যের থেকে একটু বেশি স্মার্ট হতে হবে? হ্যাঁ, তোমার খামখেয়ালি জনিত ভুল থেকে বের হয়ে আসতে হবে, আর শেষ মুহূর্তের রিভিশন টা খুব পারফেক্ট হতে হবে। আর অবশ্যই ভয়কে জয় করতে হবে। ভর্তি পরীক্ষার ১ সপ্তাহ আগে প্রায় সবার প্রস্তুতি অনেক কাছাকাছি থাকে। কিন্তু, যারা ভাল করতে পারে না, তাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় জায়গাটা থাকে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতেই। এরপরেও যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে থাকো, তাহলে তোমাদের জন্যই বলি। আমরা গত বছর Online Sohopathi থেকে একটা বিশেষ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলাম। প্রজেক্টের নাম ছিল "Humans of Online Sohopathi" । আমরা প্রায় ৩০ জনের জীবনের গল্প সংগ্রহ করেছিলাম, যারা এইচএসসি তে অনেক বড় ধরনের ধাক্কা খেয়ে ঘুরে দাড়িয়েছে এবং ঢাবি, ঢাকা মেডিকেল, জাবি, কুয়েট এর মত স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। প্রায় সবার একটা সাধারণ বিশেষত্ব ছিল, সেটা হচ্ছে তারা কেউই জিপিএ ৫ পায় নি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে, তাদের মুখ থেকেই শুনে আসতে পারো আর তাদের গল্পগুলো পড়ে আসতে পারো আমাদের ওয়েবসাইটে থেকে।
অনেক বেশিই বলে ফেললাম। শেষ করি একটা উপদেশ দিয়ে। "আর যাই করো না কেন, কখনোই কোন নির্দিষ্ট ইউনিভার্সিটি কে নিজের জীবনের লক্ষ্য বা প্যাশন হিশেবে মনে করো না। তোমার জীবনের লক্ষ্য বা প্যাশন হতে পারে তুমি কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছো সেটা, একটা সামান্য বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই তোমার জীবনের লক্ষ্য বা জীবনের থেকে বড় হতে পারে না। তাই চেষ্টা করো কোন সাবজেক্টে পড়বে সেই দিকের ফোকাস টা ঠিক করতে। একটা ভাল বিশ্ববিদ্যালয় হয়ত তোমাকে একটা ভাল পরিচয় দিবে সমাজে, কিন্তু তুমি যদি তোমার পছন্দের সাবজেক্ট এ না পড়তে পারো, সাবজেক্টে পড়ে মজা না পাও, তাহলে বাকি জীবন ভাল থাকার মিথ্যা অভিনয় করেই জীবন পার করতে হবে। শুভকামনা তোমাদের সবার জন্য।