20/01/2026
পর্ব ১৫
পরীর অভিমান
দেলোয়ার হোসেন
এক সময় প্রচণ্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করলো শারকী। বনের মধ্যে খুঁজতে লাগলো কোথাও কোনো ঝর্ণা আর কিছু ফলমূল পাওয়া যায় কি না। কিন্তু কোথাও কিছু চোখে পড়লো না। অথচ হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা তৃষ্ণা বেড়ে গেলো দ্বিগুণ। সাবিহা পরী শারকীর দৃষ্টির আড়াল থেকে দেখছে সবই। বার বার তার চোখের পাতাও ভিজে উঠছে। শেষে পাখির ঠোঁট থেকে শারকীর সামনেই পড়লো একটি টসটসে পাকা ফল। ক্ষুধার্ত শারকী সঙ্গে সঙ্গে ফলটা খেয়ে ক্লান্ত শরীরে অবার ঘুমিয়ে পড়লো।
এভাবেই চারদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ সাবিহা পরী এসে দাঁড়ালো শারকীর সামনে। সাবিহা বললো, শারকী! তুমি আর একবার শুধু আমার কথাটা ভেবে দেখো। শারকী কাতর কণ্ঠে আবার সেই একই কথা বললো। সাবিহা যা হবার নয়, তা নিয়ে কেন আমাকে এতো কষ্ট দিচ্ছ কেন?
সাবিহা পরী আর কিছু না বলে মিলিয়ে গেলো সেখান থেকে। শারকীর পেটে আবার
জ্বলে উঠলো ক্ষুধার আগুন।
পাঁচদিন সেই শূন্যে ভাসা বাগানে পড়ে থাকার পর এক সকালে শারকী চোখ খুলেই দেখলো, সে ওদের দোতলার ছাদে শুয়ে আছে। আনন্দে চিৎকার করে বললো, মা আমি ফিরে এসেছি মা! সে ডাক মায়ের কানে পৌঁছে মাকে করে তুললো উতলা। পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে মা উঠে গেলেন ছাদে। শারকীর শুকনা চোখে আর পানি গড়ালো না। শেকড় কাটা লতার মতো সে ঢলে পড়লো মায়ের বুকে। দুর্বল ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন মা। বাবা ভাইবোন সবাই ঘিরে ধরলো শারকীকে। একি কঙ্কাল সার হয়ে গেছে সেই সুন্দর শারকী। দেখলে যেনো চেনাই যায় না।
সেই সকাল বেলা গায়ের মানুষ এসে জড়ো হলো শারকীকে দেখতে। একে একে এলেন, হুজুর, কবিরাজ এবং ডাক্তার। সবাই ওষুধ, ঝাড় ফুক আর পথ্য দিলেন যেনো শারকী তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। প্রায় সপ্তাহ খানেক পর শারকী একটু সুস্থ হলে মা বলল, তোর এই ঘটনার পর মেয়ে পক্ষ অনেক কথাই বলেছিলো। কিন্তু এখন আবার বিয়ের জন্য খুব ধরা পড়া করছে। মেয়েটা নাকি কেঁদে কেটে অস্থির।
শারকী বললো মেয়েটার আর দোষ কি বলো। তা, তোমরা কি বলেছো?
কি আর বলবো, বলেছি সুস্থ হয়ে উঠুক, তারপর ভাবা যাবে। তাছাড়া আমাদের মতামতে চেয়ে তুই যা বলিস তাই হবে।
যা হবার হয়ে গেছে। এখন এ বিয়েতে মেয়ের পূর্ণ সম্মতি থাকলে আমার কিছু বলার নেই।
তারপর শারকী সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর ঐ মেয়ের সাথেই তার বিয়ে হয়ে গেলো।
বিয়ের পর তার স্ত্রী বললো, একদিন একটি মেয়ে এসে আমার হাতে এই গহনাগুলো তুলে দিয়ে বললো, এগুলো আমি তোমার বিয়ের উপহার হিসেবে দিলাম। আমি তো অবাক। বললাম ছেলেটার পরিচয় কি তাতো আগে বলো। সে বললো, তার নাম শারকী। খুব ভালো গান গায়। আর একটুও বাজে ছেলে নয় সে। তাকে বিয়ে করলে তুমি সুখী হবে।
আমি বললাম, সে তো সাবিহা নামে এক পরীকে ভালো জানে। তার সাথে যার যোগাযোগ তার সাথে কখনই বিয়ে হতে পারে না। সে বললো পরী তাকে কোন ক্ষতি করেনি আর সেও সাবিহাকে একজন বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না। আমি বললাম, এসব কথা তুমি জানলে কি করে? সে বললো, আমি সব জানি। আমি অনেক কষ্ট স্বীকার করে তোমার কাছে এসেছি এই কথা বলতে যে, শারকী তোমাকেই বিয়ে করতে চায়। তুমি তাকে ভুল বুঝ না।
আমি বললাম, তাকে তো সাবিহা পরী নিয়ে গেছে। সবাই বলছে, পরী হয় তো তাকে মেরে ফেরেছে। মেয়েটি বললো- সে কালই ফিরে আসবে। আর তখনই তুমি বিয়ের জন্য লোক পাঠাবে সেখানে।
তখন আমার খুব ভয় করতে লাগলো। আমি বললাম, এবার সত্যি করে বলো, তুমি কে? সে বললো, আমিই সেই সাবিহা পরী। তোমাদের বিয়ের পর আমি আর কোনোদিন তোমাদের এই মাটির পৃথিবীতে আসবো না। তোমরা সুখী হও। এই বলেই সে ভেজা চোখ মুছতে মুছতে বললো, শুকরিয়া।
শারকী এতক্ষণ অবাক হয়ে শুনতে শুনতে কেমন যেনো হয়ে গেলো। সে বললো, সাবিহা সত্যি ভাল মেয়ে। ও যত সহজ তার চেয়ে অনেক বেশি অভিমানী। আমি জানি, সাবিহা আর কেনোদিন আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে না।...
সমাপ্ত