02/07/2023
ভ্রমন অভিজ্ঞতা -২
জাফলং, সিলেট।
২০১৯ সাল,খুব সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাস।কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে ২৮ তম বারের মতো সিলেট গিয়েছিলাম।কিন্তু জাফলং গিয়েছিলাম প্রথম বারের মতো!সাথে ছিলো বন্ধু রিয়াদ,ইসমাইল কাকা এবং রিয়াদের বাবা সহ তার পরিবারের সবাই!আমরা বরাবরই সিলেট গিয়ে ইসমাইল কাকা'র বাসায় উঠি,সে'বারও ব্যাতিক্রম হয়নি! কাজ শেষ করে পরে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা জাফলং যাবো।সে অনুযায়ী রওনা হলাম পরেরদিন ভোরে-
মীরাবাজার থেকে মিনিবাস চলে সরাসরি জাফলং পর্যন্ত,তখন মাথাপিছু যাতায়াত ভাড়া ছিলো ষাট টাকা!
সেদিন সকাল থেকেই রৌদ্রের তাপ ছিলো প্রখর,ভ্যাপসা গরমে একটা বিরক্তিকর অবস্থা। কিছুক্ষণ পরেই আমরা শাহপরান ছাড়িয়ে শহরের বাইরে, খোলামেলা পরিবেশ রোদ থাকলেও গরম নেই। বাসের জানালা খুলতেই বাইরে থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে মুহুর্তেই সব শান্ত করে দিলো। আরো কিছুদূর যেতেই দেখা মিললো পাহাড় বেষ্টিত নদী আর হাওর।সমতল থেকে রাস্তার উচ্চতা অনেকখানি,বলতে গেলে পাহাড় বললেই চলে। পিচঢালা প্রসস্ত রাস্তা আর বাসের গতি দেখে মনে হলো আমরা উড়োজাহাজে আছি।হঠাৎ চোখে পড়লো সুবিশাল ধানের মাঠ আর মহিষের পাল! একেকটা মহিষের পালে অন্তত শ'খানেক মহিষ। দৃশ্যটা ছিলো এ'রকম-
যারা হুমায়ুন আহমেদের "আমার আছে জল" চলচ্চিত্রটা দেখেছেন তারা বলতে পারবেন সেখানে শুরুর দিকটাই সোহাগি রেলওয়ে স্টেশনে নামার পর মহিষের গাড়ি দিয়ে সেই বাংলো-বাড়ি যাওয়ার কথা! কাদামিশ্রিত পথ আর মহিসের ডাক!
ঠিক সেইরকম!
আরেকটু সামনে যেতেই চোখে পড়লো দূরে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণাধারা! কি অপূর্ব লাগছিলো দেখতে তা লিখে বা বলে প্রকাশ করা আমার পক্ষে অসম্ভব! বাঁয়ে তাকাতেই দেখলাম বিসৃত চায়ের বাগান যেখানে শ'য়ে-শ'য়ে শ্রমিকেরা কাজ করছে।প্রখর রৌদ্রে মাথায় একপ্রকার ঝুড়ি বেঁধে লাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছে তারা!হাঁটার মধ্যেও একটা চমৎকার ভঙ্গিমা ছিলো,কেমন তালে-তালে ছন্দ তোলে হাঁটা!
যখন আমরা কাছাকাছি পৌঁছালাম তখন দেখলাম রাস্তার দু'পাশেই অসংখ্য স্টোন ক্রাসার! সেখানে তারা বড়বড় গোল পাথর গুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করছে! আর এই পাথর দিয়েই নির্মান করা হচ্ছে সারাদেশের যত স্থাপনা, সরক থেকে মহাসড়ক! পাথর ভাঙার সে'কি বিকট শব্দ, কান ভাড়ি হয়ে আসে।
অবশেষে আমরা এসে পৌঁছলাম বল্লারঘাট নামক একটা স্থানে,সেখান থেকে টোটো'তে করে যেতে হয় জাফলং জিরো পয়েন্ট! ভাঙা রাস্তার কারণে সরাসরি জাফলং জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বাস আসেনা!
সেখানে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম,ততক্ষণে দুপুরের খাবার সময় হয়ে এসেছে। একটা হোটেল থেকে আমরা কিছু হাল্কা পাতলা খাবার খেয়ে নিলাম।তারপর নামলাম গোসলে,সূর্য তখনো মাথার উপর। খাড়া হয়ে কিরণ দিচ্ছে, তীব্রতাও ছিলো প্রকট!
কিন্তু পানিতে নামার পর একবারও মনে হলোনা যে কতটা গরম ছিলো কিছুক্ষণ আগেও। সাদা পাথরের উপর সচ্ছ পানি,ছোট ছোট মাছগুলো দেখে মনে হয় যেন এটা পুরোটাই একটা এ্যাকোরিয়াম।ভিজলাম, ফটোসেশান করলাম স্রোতে গাঁ ভাসালাম। সব মিলিয়ে চমৎকার উপভোগ করছিলাম!কিন্তু হঠাৎ এমন একটা কান্ড ঘটলো যার জন্য কেউই আশা করেনি -!
সানগ্লাস আদান-প্রদান করতে গিয়ে আমার পা পড়লো একটা ভাঁঙা কাঁচের টুকরোই,ইশ্!
গোঁরালীর ডানপাশে, আগেই বলেছি সচ্ছ পানি সেজন্যই দেখিনি যে এমন একটা কাঁচের টুকরো আমাকে বঁদ করার জন্য পানির নিচে অপেক্ষা করছে!
পা ফেলার সাথে সাথে চিৎকার করে উঠলাম। সবাই দৌড়ে আসলো আমার কাছে, কি হলো কি হলো??
কোনো কথা নেই!
পানি থেকে পা তুলতেই রক* ভেসে যাচ্ছে -
চোখের সামনে এ অবস্থা দেখে সবারই আনন্দ নিমিষেই মাটি হয়ে গেলো!আমারও চোখ গুলো কেমন অন্ধকার হয়ে আসছিলো।
সেখানকার স্থানীয় কয়েকজন পরামর্শ দিলো বল্লারঘাট নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারপর বোটে করে নদী পার হয়ে কমলা বাগান, সেখান থেকেই বন্ধু রিয়াদ আর তার বাবা অনেক কষ্টে আমাকে কোলে তুলে বল্লারঘাট একটা নার্সিংহোমে নিয়ে আসলো!
ডাক্তার সাহেব ড্রেসিং সেরেই ইয়া লম্বা সিরিঞ্জ বের করলো,তারপর একে একে ৬ টা শেলায় করলো!
আমি তখনো ইসমাইল কাকার কোলে শুয়ে, আমার চিৎকার শুনে ঈসমাইল কাকাও কান্নাকাটি শুরু করলো!
আন্টির মানে বন্ধু রিয়াদের আম্মুরও ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেলো! অবশেষে ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশান হাতে নিয়ে আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম! তখন প্রায় বিকেল পাঁচটা, আর আমরা সিলেটে এসে পৌঁছালাম রাত আটটায়! সেদিন সিলেট থেকে পরে রাত দশটার বাসে আমরা ধোবাউড়ার উদ্দেশ্য যাত্রা করলাম। হাসি,আনন্দ, ব্যাথা আর পরিশ্রমের পরের জাফলং ভ্রমনটা ছিলো আমাদের চরম উপভোগ্য!
সব মিলিয়ে মনে রাখার মতো!
রাকিবুল হাসান হৃদয়
৪ঠা জুন,রবিবার -২০২৩ ইং
০২.৪২ এ.এম