01/06/2024
অনেকেই বলেন, ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব নাকি আদৌ সম্ভব নয়। প্রেম নাকি হবেই তাদের মধ্যে। এই কথাটা আমার কাছে খুবই হাস্যকর মনে হয়েছে।
১) এই সময়ের ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রেম ছাড়াও শুধুই বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে ওঠে, তা কলকাতার শিল্পী অঞ্জন দত্তের গানের মধ্যেই প্রকাশ পায়। অথচ ২০/৩০ বছর আগেও ব্যাপারটা এতটা খোলামেলা ছিল না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শামছুন নাহারের ভাষায়, “ছাত্রজীবনে ছেলে বন্ধু ছিল। মেয়েদের চাইতে ছেলেদের সঙ্গে আমার মিলত ভালো। কারণ তারা বিভিন্ন রকম বিষয়ভিত্তিক গল্প করত। যা মেয়েদের মধ্যে দেখতাম না।” স্মিত হেসে তিনি আরও বলেন, “তবে সেই বন্ধুত্বেও একটা সীমারেখা টানা থাকত। যেমন রাস্তা পার হব একসঙ্গে। আমার ছেলে বন্ধুদের একজন একটা গাছের ডাল নিয়ে এসে বলল, ‘নে এটা ধরে আমার সঙ্গে পার হ। যত যাই হোক একটা মেয়ের হাত তো আর ধরা যায় না।”এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে অনেকদিন হলো। এখন ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বে হাত ধরা কোনো ব্যাপারই নয়। সেই সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কের গভীরতা হিসেবে পিঠ চাপড়ানো থেকে দুষ্টুমি-- সবই চলে। তবে অনেক সময়ই আমাদের সমাজেরও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে সাধারণ বন্ধুত্বেও পোহাতে হয় যন্ত্রণা।
এ রকমই একটি কাহিনি বলছি।
২) গার্লস স্কুল আর কলেজে পড়ার কারণে দিয়ার কখনও তেমন কোনো ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়নি। তবে কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এক সহপাঠী তোহার সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তার। যাকে বলে ‘বেস্টফ্রেন্ড’। দিয়ার পারিবারে তোহার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। তবে ঝামেলার শুরু হল, যখন দিয়ার এক আত্মীয় তোহার সঙ্গে তাকে (দিয়া) রিকশায় দেখে ফেলে। ক্লাস শেষ হতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় দিয়াকে বাসায় পৌঁছে দিতে এসেছিল তোহা। এরপর সেই আত্মীয় কোনো কিছু চিন্তা না করেই পরিচিত অনেকের কাছেই তোহাকে দিয়ার ‘প্রেমিক’ বানিয়ে নানান রকম গল্প বানিয়ে ফেলে। বিষয়টি দিয়ার কানে আসলেও সে হাজার চেষ্টার পরও তাদের ভুল ভাঙাতে পারেনি।
এখনও এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সমাজের অনেক ছেলে-মেয়েকেই পরতে হয়।
৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম। ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বকে বাঁকা চোখে দেখার পেছনে আমাদের সমাজব্যবস্থা ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন আসল কারণ হিসেবে মনে করেন তিনি। মেহতাব খানমের ভাষায়, “আমাদের সমাজের মানুষ একদম শুরু থেকেই মাইন্ড সেট করে রেখেছে যে, ছেলে এবং মেয়ের একসঙ্গে মেলামেশা করা ঠিক নয়। ছোটবেলা থেকেই ছেলে এবং মেয়েকে আলাদা রাখা হয়। তারা পড়াশোনা করে আলাদা স্কুলে বা কলেজে। সমাজের অনুশাসণ অনুসারে ছেলে এবং মেয়ে একে অপরের জন্য নিষিদ্ধ। আর এ কারণেই দেখা যায় ছেলে ও মেয়ে একে অপরের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে পারে না।”
এখনও এমন হয়, প্রেমিকার ছেলেবন্ধু থাকার কারণে সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে তার প্রেমিক। একটি মেয়ের একাধিক ছেলে বন্ধু থাকলেই যেন সবকিছু রসাতলে গেল। এ ক্ষেত্রে ছেলের অনেক বান্ধবী থাকলেও তেমন সমস্যা হয় না।
৪) জীবনের চলার পথে বন্ধুর হাত তো ধরতেই হয়।
ইংরেজি সাহিত্যের লেখক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউ কবিতার কাছে, আমি যাই বন্ধুর কাছে।’ বন্ধু কিংবা বন্ধুত্ব। স্কুলজীবনের শুরুর দিনগুলোতে অনেকেরই নতুন অভিজ্ঞতার নাম বন্ধুত্ব। পরিবারের চেনা জগৎটা যে এক লাফে অনেক দূর চলে গিয়েছিল সে তো বন্ধুদের হাত ধরেই। জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে যে যেখানেই থাক না কেন, চলার পথে বন্ধুত্ব নামের এই পাথেয়টির তুলনা বোধ হয় আর কিছুর সঙ্গেই চলে না। এ এমনই বিষয় যেন কিছু না থাকলেও বন্ধুত্ব থাকলে চলে। আবার সব থাকলেও বন্ধুত্ব ছাড়া চলে না!
এই বন্ধুত্ব যদি ছেলেমেয়ের মধ্যে হয়? তা কি নিছকই বন্ধুত্ব নাকি ভিন্ন কিছু। এ ক্ষেত্রে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি উদ্ধৃতি—ছেলে এবং মেয়ে বন্ধু হতে পারে কিন্তু তারা অবশ্যই একে অপরের প্রেমে পড়বে। হয়তো খুবই অল্প সময়ের জন্য অথবা ভুল সময়ে। কিংবা খুবই দেরিতে, আর নাহয় সব সময়ের জন্য। তবে প্রেমে তারা পড়বেই। কী হাস্যকর কথাবার্তা! আমি মনে করি নিচু মনমানসিকতা ও লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনা বলেই ছেলে ও মেয়েদের বন্ধুত্ব হতে পারেনা এইসব বলে মানুষ।
৬) ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও কি বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের বিষয়টি কাজ করে? এ রকম প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমেরিকার নিউ ইয়র্কের ভ্যালি স্ট্রিমের মনোবিজ্ঞানী লিন্ডা সাপাডিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ধারণা করা হয়, অনেক যুগ আগে নারীরা ঘরে থাকত আর পুরুষরা বাইরে কাজ করত। একমাত্র মিলনের সময়ই পুরুষরা ঘরে আসত।” সাইকোলজি ডটকমে প্রকাশিত ‘ক্যান মেন অ্যান্ড ওমেন বি ফ্রেন্ডস?’-বিষয়ক প্রতিবেদনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লিন্ডা আরও ব্যাখ্যা করেন, “এখন নারীপুরুষ একসঙ্গে কাজ করছে, পড়ছে। খেলাধুলা নিয়ে আড্ডা থেকে শুরু করে নিজেদের আগ্রহের বিষয়গুলো ভাগাভাগি করছে।” মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সংস্কৃতির এই বিকাশ সমাজ ব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে রোমান্টিক সম্পর্কের সহজ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “ফ্ল্যার্ট বা প্রেম প্রেম ভাব, ডেট বা প্রেম করা, বিয়ে করা এবং বাচ্চা নেওয়া। এই রকম সম্পর্কের বাইরে যদি কোনো সম্পর্ক হয় তবে ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব হতেই পারে। যদিও নারী-পুরুষের সম্পর্কে প্লাটোনিক বা নিষ্কাম প্রেমের উদাহরণ খুব নয় কম।”
৭) তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ছেলে-মেয়ের মাঝে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হলেই, বেশিরভাগ সময় সেখানে অন্যরকম সম্পর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রেও আমাদের সমাজ ও ধর্মীয় ব্যবস্থাই দায়ী। ছোটবেলা থেকেই ছেলে ও মেয়েশিশু বড় হয় ভিন্ন পরিবেশে। দুজনের জন্য রয়েছে আলাদা স্কুল ও কলেজ। স্বভাবতই যে জিনিস থেকে মানুষকে দূরে রাখা হয় সেই বস্তুর প্রতি একধরনের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। আর তাই বরাবরই ছেলেরা মেয়েদের প্রতি এবং মেয়েরা ছেলেদের প্রতি আকর্ষণবোধ করে। আর যদিও-বা বন্ধুত্ব হয় সেখানে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হতে বেশি সময় লাগে না। মেহতাব খানম বলেন, “একটি মেয়েকে কখনও একটি ছেলেকে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হিসেবে দেখতে শেখানো ঠিক নয়। ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন, তার প্রথম পরিচয় হলো সে একজন মানুষ। তাই মা-বাবার উচিত সন্তানকে সেভাবেই বড় করে তোলা। যদি পরিবার থেকেই একটি ছেলে বা মেয়ে বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে ছেলে বা মেয়ে হিসেবে না দেখে প্রথমেই তাকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়, তবে আর বন্ধুত্বে বাধা থাকে না। আমাদের সমাজে প্রতিটি মেয়ের মধ্যে তাদের জন্য ছেলেরা হলো নিষিদ্ধ বা ছেলে মানেই খারাপ— এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে দেওয়া হয় পরিবার থেকেই। ছেলে-মেয়ে কখনওই বন্ধু হতে পারে না, এমন ধারণাও শেকড় গেড়ে বসেছে তরুণ প্রজন্মের অনেকের মনে। তবে এসব কথার তেমন কোনো ভিত্তি নেই। শুধু দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
৮) আমি মনে করি, যারা বলে ছেলে-মেয়েদের বন্ধুত্ব সম্ভব না তাদের বলবো বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বিভেদে কোনো সমস্যাই না। তাছাড়া একটি ছেলে তার মেয়ে বন্ধুর কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারে। যেমন, যে ছেলেটির মেয়ে বন্ধু থাকে সে বিয়ের পর তার স্ত্রীকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে। একইভাবে একটি মেয়েও যদি ছেলে বন্ধুর সঙ্গে মেশে তাহলে ভবিষ্যতে তার স্বামীর সঙ্গে জীবনযাপন করা সহজ হবে।