24/10/2026
হরমুজে শেষ যাত্রা
প্রথম পর্ব
লবণাক্ত হাওয়া, জাহাজের ইঞ্জিনের মৃদু স্পন্দন আর অয়েল/কেমিক্যাল-ট্যাংকারের চেনা গন্ধ—এগুলোই গত তিরিশ বছর ধরে ক্যাপ্টেন মেহেদী হাসানের দ্বিতীয় অস্তিত্ব। ডেক ক্যাডেট হিসেবে যেদিন প্রথম জাহাজের গ্যাংওয়েতে পা দিয়েছিলেন, সেদিন তার ছিপছিপে পাতলা শরীরে ছিল অফুরন্ত উদ্দীপনা আর চোখে ছিল বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। একে একে সাগর, মহাসাগর, নদী, প্রণালী, খাল, দেশ, মহাদেশ আর দ্বীপপুঞ্জ পার হয়েছেন। উত্তর থেকে দক্ষিণে আর পূর্ব থেকে পশ্চিমে জাহাজ নিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছেন। আটলান্টিকের উন্মত্ত তুফান, প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে রক্ত হিম করা টাইফুন, ভারত মহাসাগরের করাল সাইক্লোন কিংবা বঙ্গোপসাগরের বিধ্বংসী ঝড়—কোনোটিই তার পথ আটকাতে পারেনি।
জেনারেল কার্গোর সাধারণ মালবাহী জাহাজে কর্মজীবনের শুরুটা হলেও, ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে এসে চাকরির নিশ্চয়তার জন্য তাকে বেছে নিতে হয় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ও অয়েল ট্যাংকার। যে জাহাজে সামান্য এক ভুল মানেই বিশাল বিস্ফোরণ কিংবা এক ফোঁটা ক্ষতিকর কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে নিমেষেই করুণ মৃত্যু। এমন সব মারণাত্মক কেমিক্যালের সাথে তার বছরের পর বছর ওঠাবসা ছিল, যা এক মুহূর্তে মানুষের অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে। কিন্তু মেহেদী হাসান কখনো ভয় পাননি। ডেকের নিরাপত্তা, শতভাগ পেশাদারিত্ব আর আত্মবিশ্বাসই ছিল তার বর্ম। সততা আর সম্মানের সাথে দেখতে দেখতে দীর্ঘ তিরিশটি বছর কেটে গেছে। জুনিয়র অফিসার থেকে পদোন্নতি পেয়ে যখন মাস্টারের চেয়ারে বসেছিলেন, সেদিনও তার মধ্যে অহংকার স্পর্শ করেনি। বিশ্বের কত দেশের, কত ভিন্ন ধর্মের, বর্ণের, ভাষার আর সংস্কৃতির নাবিকদের সাথে তিনি কাজ করেছেন। ফিলিপিনো, ইউক্রেনিয়ান, রোমানিয়ান , রাশিয়ান, মালয়েশিয়ান, ভারতীয়, বার্মীজ, পোলিশ—কত বিচিত্র সব মানুষ! অথচ সমুদ্রের বুকে সবাই ছিল একটি একক পরিবারের মতো। সবার কাছে ক্যাপ্টেন মেহেদী ছিলেন এক শ্রদ্ধেয়, প্রাজ্ঞ এবং অত্যন্ত ভালোবাসার মানুষ। তার দীর্ঘ কর্মজীবন ছিল সাফল্যের সোনালী সুতোয় গাঁথা সুখের স্মৃতির এক বিশাল কোলাজ।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর রূপ বদলে যেতে লাগল। ক্ষমতার লোভে অন্ধ একদল পরাশক্তি আর উন্মাদ বিশ্বনেতাদের আগ্রাসনে পৃথিবীর দিকে দিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। লোহিত সাগর, ওমান উপসাগর, পারস্য উপসাগর আর হরমুজ প্রণালী পরিণত হলো এক মৃত্যুপুরীতে। ভূ-রাজনীতির বিষাক্ত খেলায় বলির পাঁঠা হতে লাগল নিরীহ, অপরাধহীন নাবিকরা। মিডিয়া খুললেই দেখা যেত—কোনো না কোনো বাণিজ্য জাহাজে ড্রোন বা ক্রুজ মিসাইল হামলা হয়েছে; দাউ দাউ করে জ্বলছে লাখো টন কার্গোবাহী জাহাজ অথবা অয়েল কেমিক্যাল ট্যাংকার; পানিতে ভেসে উঠছে তেল, ধাতব কন্টেইনার আর নিরীহ মেরিনারদের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত মৃতদেহ। ঘটনাগুলো মেহেদীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ভাবছিলেন—আর কেন? যার জীবনের তিরিশটি বছর সমুদ্র গিলে খেয়েছে, যার সততা আর সম্মান অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তার কি এবার সব ছেড়ে চিরদিনের জন্য ঘরে ফিরে যাওয়া উচিত নয়? ছুটিতে এসে পরিবারকে ঘিরে এক অন্যরকম শান্তিময় সময় পার করছিলেন তিনি। স্ত্রী আর সন্তানদের সাথে সাধারণ জীবনের আনন্দ উপভোগ করছিলেন। কিন্তু মেহেদীর অজান্তেই ভাগ্যের পরিহাস তার জন্য এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ পেতে রেখেছিল। একদিন সকালে একটা নামকরা ম্যানিং এজেন্সি থেকে ফোন আসে। ফোনের ওপাশের পরিচিত কণ্ঠটি অত্যন্ত লোভনীয় একটি অফার সামনে রাখে। মেহেদী প্রস্তাবটি শুনে প্রথম দফাতেই প্রত্যাখ্যান করে দেন। মেহেদী মনে মনে ভাবেন মানুষ আসলে অনেক স্বার্থপর। যাদের সাথে দীর্ঘ এতো গুলো বছর কাজ করেছেন আজ তারাই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধা করছে না। সিদ্ধান্ত নেয় আর কখনো ঐ এজেন্সি থেকে সেইল করবেন না। কিন্তু এজেন্সিটি ছিল নাছোড়বান্দা। দিন যেতে থাকে, আর তাদের প্রস্তাবের অংকটা ক্রমান্বয়ে অকাল্পনিকভাবে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তারা এমন এক অফার নিয়ে আসে, যা যেকোনো সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মাসে ১০০,০০০ (একশো হাজার) মার্কিন ডলার বেতন! সাথে চার মাসের কন্ট্রাক্ট শেষে আকর্ষণীয় বোনাস ভাতা তো থাকবেই! শর্ত একটাই—একটা বিশালাকার খালি ক্রুড অয়েল ট্যাংকার নিয়ে শুধু হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিয়ে কুয়েতে যেতে হবে, সেখানে এসপিএম (Single Point Mooring)-এ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল লোড করে আবার সেই অভিশপ্ত হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে সোজা নর্থ চায়নার তিয়ানজিন বন্দরে নিয়ে ডিসচার্জ করতে হবে।
তখন হরমুজ প্রণালী ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চরম যুদ্ধাবস্থা। যে কোনো দেশের, যে কোনো পতাকাবাহী জাহাজ সেখানে দেখা মাত্রই নাদান ড্রোন কিংবা মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। কেউ দেখছে না সেটা কোনো নিরপেক্ষ বা শত্রু পক্ষের জাহাজ নাকি সাধারণ কোন পণ্যবাহী ট্যাংকার। মেহেদী একা একা হিসাব কষতে লাগলেন। চার মাসে বেতন চার লক্ষ ডলার, সাথে সর্বনিম্ন ষাট-সত্তর হাজার ডলার বোনাস! এত বিপুল অর্থ! জীবনে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে তিনি বহুবার ফিরে এসেছেন। মৃত্যুর ভয় তিনি কোনোদিন পাননি। মনে মনে বললেন—“মরতে তো একদিন হবেই। তবে এই চরম ঝুঁকিটা যদি সফল হয়, তবে এই একটি ভয়েজই আমার পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ চিরদিনের মতো বদলে দেবে। জীবনে রিস্ক না নিলে তো কিছুই অর্জন করা যায় না।” তিনি এই লোভনীয় প্রস্তাব বা নিজের মানসিক টানাপোড়েনের কথা স্ত্রী, সন্তান বা কাউকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলেন না। নিজের ভেতরেই এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন—এটাই হবে তার জীবনের শেষ ভয়েজ। মেহেদী নিজে থেকে ফোন করলেন না, ম্যানিং এজেন্সির পরবর্তী কলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিন দিন পর তাদের ফোন এলে তিনি কিছুটা অনিচ্ছা ও বিরক্তি প্রকাশের অভিনয় করলেন। এজেন্সি রিকোয়েস্ট করতে থাকলে মেহেদী কঠিন কিছু শর্ত চাপিয়ে দিলেন:
কন্ট্রাক্ট সই করার সাথে সাথে পুরো চার মাসের টাকা (৪০০,০০০ ডলার) পরিশোধ করতে হবে—অর্ধেক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং বাকি অর্ধেক ক্যাশ ডলারে।
কন্ট্রাক্ট সফলভাবে শেষ হলে জাহজে থাকতেই বোনাসের টাকা দিতে হবে।
যদি এই ভয়েজে তার মৃত্যু হয়, তবে পরিবারকে অতিরিক্ত ২০০,০০০ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; আর যদি গুরুতর আহত হন, তবে ১০০,০০০ ডলার প্রদান করতে হবে।
চলবে...
(চার পর্বে সমাপ্য হবে)