19/08/2026
ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম
শেষ পর্ব
কিন্তু বাস্তব জীবন কখনো শুধু রূপকথার মতো মসৃণ পথে চলে না। সুখের দিনগুলো যেন বড্ড দ্রুত ফুরিয়ে যায়। একদিন সকালে সেলিনার ফোনে বাংলাদেশের কান্ট্রি কোড থেকে রিং বেজে উঠল। তার মায়ের ফোন। সেলিনা ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল, “সেলিনা, তুই ওখানে কী করছিস? তোর প্রকাশক তো বলল তোর কাজ শেষ। তুই এখনও কেন ঢাকায় ফিরছিস না?” সেলিনা একটু আমতা আমতা করে বলল, “মা, আসলে... আমার বইয়ের জন্য কিছু বাড়তি পড়াশোনা করতে হচ্ছে। আর...” “আর কী?” মায়ের কণ্ঠ কঠোর হয়ে উঠল। “আমাদের পরিচিত একজন প্যারিসে থাকে, সে তোকে দেখেছে এক বিদেশী ছেলের সাথে ঘুরে বেড়াতে। সেলিনা, তুই ভুলে যাস না তুই একটি রক্ষণশীল বাঙালি পরিবারের মেয়ে। এই সমস্ত বিদেশী ছেলেদের সাথে প্রেম-ভালোবাসা বড়জোর কয়েকদিনের মোহ। দিনশেষে এরা তোকে ছেড়ে চলে যাবে। এসব অস্থায়ী সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তুই দ্রুত ফিরে আয়।” ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সেলিনা বিছানায় বসে কাঁদতে লাগল। তার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। একদিকে মায়ের এই কঠোর বাস্তববাদী কথা, অন্যদিকে তার নিজের সদ্য জাগ্রত ভালোবাসা। সে তো আসলেই মাত্র কয়েকদিনের জন্য এসেছিল। তার ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে আসছে। অ্যালেক্সান্দ্রে ঘরে ঢুকে সেলিনার চোখের জল দেখে তার পাশে বসলেন। তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
“কী হয়েছে, সেলিনা?”
সেলিনা সব খুলে বলল। তার গলার স্বর কাঁপছিল। “আমার মা ঠিকই বলেছেন, অ্যালেক্সান্দ্রে। আমাদের সংস্কৃতি আলাদা, দেশ আলাদা। আমার ভিসার মেয়াদ আর মাত্র চার দিন আছে। আমার প্রকাশকও বইটির চূড়ান্ত খসড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমাদের এই সুন্দর স্বপ্নটা কি তাহলে এখানেই শেষ?” অ্যালেক্সান্দ্রে সেলিনার চোখের জল মুছে দিলেন। তার নিজের চোখেও ছিল এক গভীর বেদনা, কিন্তু তার গলার স্বর ছিল দৃঢ়। “আমি তোমাকে কোনো মিথ্যা আশ্বাস দেব না, সেলিনা। আমাদের দূরত্বটা বাস্তব। কিন্তু আমাদের ভালোবাসাটাও ততটাই বাস্তব। আমি তোমাকে কোনো জোর করব না। কিন্তু আমি জানি, এটি কোনো অস্থায়ী মোহ নয়। আমি তোমাকে হারাতে চাই না।” ঠিক তখনই আরও একটি সংকট এল। অ্যালেক্সান্দ্রের ইউনিভার্সিটির কাজ থেকে তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কনফারেন্সের জন্য দু’সপ্তাহের জন্য লন্ডনে যেতে হবে। আর যাওয়ার দিনটি ছিল ঠিক পরের দিন। অর্থাৎ, সেলিনার ঢাকা ফেরার আগেই তাকে প্যারিস ছাড়তে হবে। বিদায়ের আগের দিন বিকেলে তারা শেষবারের মতো গেল পের লাশেজে। সেদিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিল। প্যারিসের বৃষ্টি যেন সেলিনার মনের কান্নাই হয়ে ঝরছিল। তারা ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভিক্টর নোয়ারের সামনে। ব্রোঞ্জের মূর্তির গায়ে বৃষ্টির জলধারা গড়িয়ে পড়ছে। সেলিনা ছাতাটা একপাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে গেল। সে বৃষ্টিতে ভিজে ভিক্টরের ব্রোঞ্জের ঠোঁটে তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটি মেলালো। তারপর তার পকেট থেকে শেষ গোলাপ ফুলটি তার টপ হ্যাটে রাখল। শেষে, পরম আকুতিতে সেই চকচকে অংশে হাত রাখল। “যদি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তি থাকে তোমার মধ্যে, ভিক্টর,” সেলিনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “তবে আমাদের আলাদা করো না। আমাদের এই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখো।” অ্যালেক্সান্দ্রে পেছন থেকে এসে সেলিনাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার ছাতাটা দুজনের ওপর মেলে ধরলেন। তিনি সেলিনার কানে ফিসফিস করে বললেন, “ভিক্টর আমাদের আলাদা করবেন না, সেলিনা। কারণ তিনি নিজেই আমাদের মিলিয়েছেন। আমি লন্ডনে গিয়েই আমার কাজ দ্রুত শেষ করব। তারপর আমি ঢাকায় যাব। তোমার মায়ের সাথে, তোমার পরিবারের সাথে দেখা করব।” সেলিনা চোখ তুলে তাকাল। “তুমি সত্যি আসবে?”
“হ্যাঁ, আমি আসব। আমি আমার অর্ধেক বাঙালি সত্তা নিয়ে, আর বাকি অর্ধেক ফরাসি জেদ নিয়ে আসব,” অ্যালেক্সান্দ্রে হাসলেন, যদিও তার চোখও ভিজে ছিল।
সেলিনা ঢাকায় ফিরে এল। ঢাকার ধুলোবালি, যানজট আর কোলাহলের মাঝে সে নিজেকে বড় বেশি পরবাসী মনে করতে লাগল। তার মনের একাংশ প্যারিসের সেই চারতলার অ্যাপার্টমেন্টে, সেন নদীর ধারের জানালায় রয়ে গেছে। তার মা তাকে নিয়ে বিয়ের কথাবার্তা শুরু করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেলিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। এ নিয়ে মা-মেয়ের মধ্যে এক নীরব যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এরই মধ্যে কেটে গেল দুটি সপ্তাহ। সেলিনা প্রতিদিন অ্যালেক্সান্দ্রের সাথে ভিডিও কলে কথা বলত। দূরত্ব যতই হোক না কেন, ইন্টারনেটের স্ক্রিনের ওপার থেকে অ্যালেক্সান্দ্রের শান্ত কণ্ঠস্বর তাকে শক্তি যোগাত। একদিন রাতে অ্যালেক্সান্দ্রে কল করে বললেন, “সেলিনা, আমি টিকিট কেটে ফেলেছি। আগামী পরশু সকাল আটটায় আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামছি।” সেলিনার হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। “তুমি সত্যি আসছ?” “হ্যাঁ। আমি আমার মাকে সাথে নিয়ে আসছি না, কারণ মা অসুস্থ। কিন্তু আমি একা আসছি না, আমি ভিক্টরের আশীর্বাদ সাথে নিয়ে আসছি,” অ্যালেক্সান্দ্রে ওপার থেকে হাসলেন। বিমানবন্দরের বাইরে সেলিনা দাঁড়িয়ে ছিল অধীর আগ্রহে। ঘড়ির কাঁটা যেন আর কাটছিল না। অবশেষে, কাচের দরজা পেরিয়ে যখন লম্বা, চশমা পরা সেই পরিচিত মানুষটি তার ট্রলি ব্যাগ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন, সেলিনা নিজের সমস্ত সামাজিক জড়তা ভুলে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। অ্যালেক্সান্দ্রেও তাকে শক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে ধরলেন। ঢাকার তপ্ত বাতাস আর মানুষের ভিড়ের মাঝেও তারা যেন এক স্বর্গীয় শান্তি খুঁজে পেল। সেলিনার বাড়িতে অ্যালেক্সান্দ্রের আগমন খুব একটা সহজ ছিল না। সেলিনার মা প্রথমে অত্যন্ত গম্ভীর ছিলেন। কিন্তু অ্যালেক্সান্দ্রে যখন চমৎকার বাংলায় তাদের সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সেলিনার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা বললেন, তখন মায়ের ভেতরের বরফ গলতে শুরু করল। অ্যালেক্সান্দ্রে বলেছিলেন, “খালাম্মা, আমি হয়তো এদেশের পুরো সংস্কৃতিতে বড় হইনি। কিন্তু আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন ভালোবাসার মর্যাদা দিতে। আমি সেলিনাকে ভিক্টর নোয়ারের মতোই ভালোবাসব—যতদিন বেঁচে থাকব। তার সম্মানে, তার স্বাধীনতায় আমি কখনো বাধা দেব না।” মায়ের চোখে জল এসে পড়েছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত তাদের এই বিয়েতে সায় দিলেন। ঢাকার একটি ছোট, ছিমছাম কমিউনিটি সেন্টারে অতি সাধারণ আয়োজনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। সেলিনার পরনে ছিল লাল জামদানি শাড়ি, আর অ্যালেক্সান্দ্রে পরেছিলেন সাদা শেরওয়ানি। তাদের বিয়েতে প্যারিসের সেই ক্যাফের ধূসরতা কেটে গিয়ে ঢাকার লাল-সবুজের রঙিন উৎসব মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
তিন বছর পর।
প্যারিসের বসন্তকাল এবার অন্যরকম সেজেছে। গাছে গাছে নতুন সবুজ পাতা, চেরি ব্লসমের গোলাপি ছড়াছড়ি।
পের লাশেজ কবরস্থানের সেই পরিচিত ৯২ নম্বর সেকশনে তিন বছর পর আবার ফিরে এসেছে সেলিনা ও অ্যালেক্সান্দ্রে। তবে এবার তারা দুজন নয়, তাদের সাথে আছে এক নতুন অতিথি। তাদের দুই বছরের ফুটফুটে কন্যাসন্তান—ভিক্টোরিয়া। ভিক্টোরিয়াকে দেখতে একদম তার বাবার মতো হয়েছে, তবে তার চোখ দুটো সেলিনার মতো চঞ্চল আর ডাগর। সেলিনা ভিক্টোরিয়াকে কোলে নিয়ে ভিক্টর নোয়ারের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়াল। ভিক্টোরিয়া তার ছোট্ট হাতটি বাড়িয়ে মূর্তির জুতোর চকচকে অংশটি ধরার চেষ্টা করছিল। “দেখো মা,” সেলিনা হেসে বলল, “এই যে এখানে শুয়ে আছেন যে ভদ্রলোক, ওনার নামেই তোমার নাম রাখা হয়েছে। ভিক্টোরিয়া।” অ্যালেক্সান্দ্রে পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা নিয়ে তাদের এই সুন্দর মুহূর্তটির ছবি তুলছিলেন। তার চশমার আড়ালে চোখ দুটো আজ কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে ভেজা। সন্ধ্যা নেমে আসছিল। তারা সেন নদীর পাড়ে গিয়ে বসল। ভিক্টোরিয়া ততক্ষণে ক্লান্ত হয়ে তার বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। সেলিনা তার মাথাটি আলতো করে রাখল অ্যালেক্সান্দ্রের চওড়া কাঁধের ওপর। নদীর মৃদু বাতাস তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল। “তুমি জানো, অ্যালেক্সান্দ্রে,” সেলিনা বলল, “আমি প্রথম যেদিন ভিক্টরের কাছে গিয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম আমি কেবল আমার উপন্যাসের জন্য একটা চমৎকার রোমান্টিক গল্প খুঁজছি। কিন্তু আমি জানতাম না, ভিক্টর আমাকে একটা সম্পূর্ণ জীবন উপহার দেবেন।” অ্যালেক্সান্দ্রে সেলিনার কপালে এবং চুলে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। “আর আমি ভেবেছিলাম আমি কেবল ইতিহাস খুঁড়ে বেড়াচ্ছি, লাইব্রেরির ধুলোবালির মাঝে অতীতকে খুঁজছি। কিন্তু আমি পেয়ে গেলাম আমার ভবিষ্যৎ—তোমাকে আর আমাদের ভিক্টোরিয়াকে।” দূরের আকাশে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। গোধূলির লাল আভা এসে পড়েছে আইফেল টাওয়ারের গায়ে। পের লাশেজের সেই প্রাচীন গাছের ছায়ায় শুয়ে থাকা ব্রোঞ্জের ভিক্টর নোয়ারের ঠোঁটটি যেন পড়ন্ত আলোয় আরও একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে হাসছিল। কারণ প্রেম আসলে কখনো মরে না। সে কখনো এক ফোঁটা রক্ত হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঝরে পড়ে, কখনো ব্রোঞ্জের শীতলতায় মানুষের বিশ্বাস হয়ে বেঁচে থাকে, আবার কখনো সমুদ্র পেরিয়ে দুটি ভিন্ন হৃদয়ের মিলনে এক নতুন জীবনের জন্ম দেয়। সে বেঁচে থাকে। চিরকাল।
সমাপ্ত