Green Movement

Green Movement Love The Earth. Love your Home. Love People.

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম​শেষ পর্ব ​কিন্তু বাস্তব জীবন কখনো শুধু রূপকথার মতো মসৃণ পথে চলে না। সুখের দিনগুলো যেন বড্ড দ্...
19/08/2026

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম

​শেষ পর্ব

​কিন্তু বাস্তব জীবন কখনো শুধু রূপকথার মতো মসৃণ পথে চলে না। সুখের দিনগুলো যেন বড্ড দ্রুত ফুরিয়ে যায়। একদিন সকালে সেলিনার ফোনে বাংলাদেশের কান্ট্রি কোড থেকে রিং বেজে উঠল। তার মায়ের ফোন। ​সেলিনা ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল, “সেলিনা, তুই ওখানে কী করছিস? তোর প্রকাশক তো বলল তোর কাজ শেষ। তুই এখনও কেন ঢাকায় ফিরছিস না?” সেলিনা একটু আমতা আমতা করে বলল, “মা, আসলে... আমার বইয়ের জন্য কিছু বাড়তি পড়াশোনা করতে হচ্ছে। আর...” “আর কী?” মায়ের কণ্ঠ কঠোর হয়ে উঠল। “আমাদের পরিচিত একজন প্যারিসে থাকে, সে তোকে দেখেছে এক বিদেশী ছেলের সাথে ঘুরে বেড়াতে। সেলিনা, তুই ভুলে যাস না তুই একটি রক্ষণশীল বাঙালি পরিবারের মেয়ে। এই সমস্ত বিদেশী ছেলেদের সাথে প্রেম-ভালোবাসা বড়জোর কয়েকদিনের মোহ। দিনশেষে এরা তোকে ছেড়ে চলে যাবে। এসব অস্থায়ী সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তুই দ্রুত ফিরে আয়।” ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সেলিনা বিছানায় বসে কাঁদতে লাগল। তার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। একদিকে মায়ের এই কঠোর বাস্তববাদী কথা, অন্যদিকে তার নিজের সদ্য জাগ্রত ভালোবাসা। সে তো আসলেই মাত্র কয়েকদিনের জন্য এসেছিল। তার ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে আসছে। অ্যালেক্সান্দ্রে ঘরে ঢুকে সেলিনার চোখের জল দেখে তার পাশে বসলেন। তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
​“কী হয়েছে, সেলিনা?”
​সেলিনা সব খুলে বলল। তার গলার স্বর কাঁপছিল। “আমার মা ঠিকই বলেছেন, অ্যালেক্সান্দ্রে। আমাদের সংস্কৃতি আলাদা, দেশ আলাদা। আমার ভিসার মেয়াদ আর মাত্র চার দিন আছে। আমার প্রকাশকও বইটির চূড়ান্ত খসড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমাদের এই সুন্দর স্বপ্নটা কি তাহলে এখানেই শেষ?” অ্যালেক্সান্দ্রে সেলিনার চোখের জল মুছে দিলেন। তার নিজের চোখেও ছিল এক গভীর বেদনা, কিন্তু তার গলার স্বর ছিল দৃঢ়। “আমি তোমাকে কোনো মিথ্যা আশ্বাস দেব না, সেলিনা। আমাদের দূরত্বটা বাস্তব। কিন্তু আমাদের ভালোবাসাটাও ততটাই বাস্তব। আমি তোমাকে কোনো জোর করব না। কিন্তু আমি জানি, এটি কোনো অস্থায়ী মোহ নয়। আমি তোমাকে হারাতে চাই না।” ঠিক তখনই আরও একটি সংকট এল। অ্যালেক্সান্দ্রের ইউনিভার্সিটির কাজ থেকে তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কনফারেন্সের জন্য দু’সপ্তাহের জন্য লন্ডনে যেতে হবে। আর যাওয়ার দিনটি ছিল ঠিক পরের দিন। অর্থাৎ, সেলিনার ঢাকা ফেরার আগেই তাকে প্যারিস ছাড়তে হবে। বিদায়ের আগের দিন বিকেলে তারা শেষবারের মতো গেল পের লাশেজে। ​সেদিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিল। প্যারিসের বৃষ্টি যেন সেলিনার মনের কান্নাই হয়ে ঝরছিল। তারা ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভিক্টর নোয়ারের সামনে। ব্রোঞ্জের মূর্তির গায়ে বৃষ্টির জলধারা গড়িয়ে পড়ছে। সেলিনা ছাতাটা একপাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে গেল। সে বৃষ্টিতে ভিজে ভিক্টরের ব্রোঞ্জের ঠোঁটে তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটি মেলালো। তারপর তার পকেট থেকে শেষ গোলাপ ফুলটি তার টপ হ্যাটে রাখল। শেষে, পরম আকুতিতে সেই চকচকে অংশে হাত রাখল। “যদি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তি থাকে তোমার মধ্যে, ভিক্টর,” সেলিনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “তবে আমাদের আলাদা করো না। আমাদের এই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখো।” ​অ্যালেক্সান্দ্রে পেছন থেকে এসে সেলিনাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার ছাতাটা দুজনের ওপর মেলে ধরলেন। তিনি সেলিনার কানে ফিসফিস করে বললেন, “ভিক্টর আমাদের আলাদা করবেন না, সেলিনা। কারণ তিনি নিজেই আমাদের মিলিয়েছেন। আমি লন্ডনে গিয়েই আমার কাজ দ্রুত শেষ করব। তারপর আমি ঢাকায় যাব। তোমার মায়ের সাথে, তোমার পরিবারের সাথে দেখা করব।” সেলিনা চোখ তুলে তাকাল। “তুমি সত্যি আসবে?”
​“হ্যাঁ, আমি আসব। আমি আমার অর্ধেক বাঙালি সত্তা নিয়ে, আর বাকি অর্ধেক ফরাসি জেদ নিয়ে আসব,” অ্যালেক্সান্দ্রে হাসলেন, যদিও তার চোখও ভিজে ছিল।

সেলিনা ঢাকায় ফিরে এল। ঢাকার ধুলোবালি, যানজট আর কোলাহলের মাঝে সে নিজেকে বড় বেশি পরবাসী মনে করতে লাগল। তার মনের একাংশ প্যারিসের সেই চারতলার অ্যাপার্টমেন্টে, সেন নদীর ধারের জানালায় রয়ে গেছে। তার মা তাকে নিয়ে বিয়ের কথাবার্তা শুরু করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেলিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। এ নিয়ে মা-মেয়ের মধ্যে এক নীরব যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এরই মধ্যে কেটে গেল দুটি সপ্তাহ। সেলিনা প্রতিদিন অ্যালেক্সান্দ্রের সাথে ভিডিও কলে কথা বলত। দূরত্ব যতই হোক না কেন, ইন্টারনেটের স্ক্রিনের ওপার থেকে অ্যালেক্সান্দ্রের শান্ত কণ্ঠস্বর তাকে শক্তি যোগাত। একদিন রাতে অ্যালেক্সান্দ্রে কল করে বললেন, “সেলিনা, আমি টিকিট কেটে ফেলেছি। আগামী পরশু সকাল আটটায় আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামছি।” সেলিনার হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। “তুমি সত্যি আসছ?” “হ্যাঁ। আমি আমার মাকে সাথে নিয়ে আসছি না, কারণ মা অসুস্থ। কিন্তু আমি একা আসছি না, আমি ভিক্টরের আশীর্বাদ সাথে নিয়ে আসছি,” অ্যালেক্সান্দ্রে ওপার থেকে হাসলেন। বিমানবন্দরের বাইরে সেলিনা দাঁড়িয়ে ছিল অধীর আগ্রহে। ঘড়ির কাঁটা যেন আর কাটছিল না। অবশেষে, কাচের দরজা পেরিয়ে যখন লম্বা, চশমা পরা সেই পরিচিত মানুষটি তার ট্রলি ব্যাগ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন, সেলিনা নিজের সমস্ত সামাজিক জড়তা ভুলে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। অ্যালেক্সান্দ্রেও তাকে শক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে ধরলেন। ঢাকার তপ্ত বাতাস আর মানুষের ভিড়ের মাঝেও তারা যেন এক স্বর্গীয় শান্তি খুঁজে পেল। সেলিনার বাড়িতে অ্যালেক্সান্দ্রের আগমন খুব একটা সহজ ছিল না। সেলিনার মা প্রথমে অত্যন্ত গম্ভীর ছিলেন। কিন্তু অ্যালেক্সান্দ্রে যখন চমৎকার বাংলায় তাদের সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সেলিনার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা বললেন, তখন মায়ের ভেতরের বরফ গলতে শুরু করল। অ্যালেক্সান্দ্রে বলেছিলেন, “খালাম্মা, আমি হয়তো এদেশের পুরো সংস্কৃতিতে বড় হইনি। কিন্তু আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন ভালোবাসার মর্যাদা দিতে। আমি সেলিনাকে ভিক্টর নোয়ারের মতোই ভালোবাসব—যতদিন বেঁচে থাকব। তার সম্মানে, তার স্বাধীনতায় আমি কখনো বাধা দেব না।” মায়ের চোখে জল এসে পড়েছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত তাদের এই বিয়েতে সায় দিলেন। ঢাকার একটি ছোট, ছিমছাম কমিউনিটি সেন্টারে অতি সাধারণ আয়োজনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। সেলিনার পরনে ছিল লাল জামদানি শাড়ি, আর অ্যালেক্সান্দ্রে পরেছিলেন সাদা শেরওয়ানি। তাদের বিয়েতে প্যারিসের সেই ক্যাফের ধূসরতা কেটে গিয়ে ঢাকার লাল-সবুজের রঙিন উৎসব মুখরিত হয়ে উঠেছিল।

​তিন বছর পর।
​প্যারিসের বসন্তকাল এবার অন্যরকম সেজেছে। গাছে গাছে নতুন সবুজ পাতা, চেরি ব্লসমের গোলাপি ছড়াছড়ি।
​পের লাশেজ কবরস্থানের সেই পরিচিত ৯২ নম্বর সেকশনে তিন বছর পর আবার ফিরে এসেছে সেলিনা ও অ্যালেক্সান্দ্রে। তবে এবার তারা দুজন নয়, তাদের সাথে আছে এক নতুন অতিথি। তাদের দুই বছরের ফুটফুটে কন্যাসন্তান—ভিক্টোরিয়া। ভিক্টোরিয়াকে দেখতে একদম তার বাবার মতো হয়েছে, তবে তার চোখ দুটো সেলিনার মতো চঞ্চল আর ডাগর। সেলিনা ভিক্টোরিয়াকে কোলে নিয়ে ভিক্টর নোয়ারের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়াল। ভিক্টোরিয়া তার ছোট্ট হাতটি বাড়িয়ে মূর্তির জুতোর চকচকে অংশটি ধরার চেষ্টা করছিল। “দেখো মা,” সেলিনা হেসে বলল, “এই যে এখানে শুয়ে আছেন যে ভদ্রলোক, ওনার নামেই তোমার নাম রাখা হয়েছে। ভিক্টোরিয়া।” অ্যালেক্সান্দ্রে পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা নিয়ে তাদের এই সুন্দর মুহূর্তটির ছবি তুলছিলেন। তার চশমার আড়ালে চোখ দুটো আজ কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে ভেজা। ​সন্ধ্যা নেমে আসছিল। তারা সেন নদীর পাড়ে গিয়ে বসল। ভিক্টোরিয়া ততক্ষণে ক্লান্ত হয়ে তার বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। সেলিনা তার মাথাটি আলতো করে রাখল অ্যালেক্সান্দ্রের চওড়া কাঁধের ওপর। নদীর মৃদু বাতাস তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল। “তুমি জানো, অ্যালেক্সান্দ্রে,” সেলিনা বলল, “আমি প্রথম যেদিন ভিক্টরের কাছে গিয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম আমি কেবল আমার উপন্যাসের জন্য একটা চমৎকার রোমান্টিক গল্প খুঁজছি। কিন্তু আমি জানতাম না, ভিক্টর আমাকে একটা সম্পূর্ণ জীবন উপহার দেবেন।” অ্যালেক্সান্দ্রে সেলিনার কপালে এবং চুলে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। “আর আমি ভেবেছিলাম আমি কেবল ইতিহাস খুঁড়ে বেড়াচ্ছি, লাইব্রেরির ধুলোবালির মাঝে অতীতকে খুঁজছি। কিন্তু আমি পেয়ে গেলাম আমার ভবিষ্যৎ—তোমাকে আর আমাদের ভিক্টোরিয়াকে।” দূরের আকাশে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। গোধূলির লাল আভা এসে পড়েছে আইফেল টাওয়ারের গায়ে। পের লাশেজের সেই প্রাচীন গাছের ছায়ায় শুয়ে থাকা ব্রোঞ্জের ভিক্টর নোয়ারের ঠোঁটটি যেন পড়ন্ত আলোয় আরও একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে হাসছিল। ​কারণ প্রেম আসলে কখনো মরে না। সে কখনো এক ফোঁটা রক্ত হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঝরে পড়ে, কখনো ব্রোঞ্জের শীতলতায় মানুষের বিশ্বাস হয়ে বেঁচে থাকে, আবার কখনো সমুদ্র পেরিয়ে দুটি ভিন্ন হৃদয়ের মিলনে এক নতুন জীবনের জন্ম দেয়। সে বেঁচে থাকে। চিরকাল।

সমাপ্ত

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম​তৃতীয় পর্ব ​পরের দিনগুলো যেন এক জাদুকরী ঘোর নিয়ে এল সেলিনার জীবনে। সে প্যারিসে এসেছিল মাত্র ...
18/08/2026

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম

​তৃতীয় পর্ব

​পরের দিনগুলো যেন এক জাদুকরী ঘোর নিয়ে এল সেলিনার জীবনে। সে প্যারিসে এসেছিল মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য। কিন্তু প্রতিটি দিন এখন এক নতুন অর্থ পেতে শুরু করল। অ্যালেক্সান্দ্রে তাকে পুরো প্যারিস শহরটা অন্যভাবে দেখাতে লাগলেন। পর্যটকদের সাধারণ দর্শনীয় স্থানগুলোর বাইরেও যে একটা আসল প্যারিস আছে, তা সেলিনা আগে জানত না। তারা মঁত্মার্ত্রের (Montmartre) আঁকাবাঁকা পাথুরে পথ ধরে হাঁটলেন, যেখানে তরুণ শিল্পীরা ক্যানভাসে রঙ ছড়াচ্ছিল। তারা ‘শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি’ বইয়ের দোকানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুরনো বইয়ের গন্ধ নিলেন। এক বিকেলে তারা সেন নদীর (Seine River) পাড় ঘেঁষে হাঁটছিলেন। নদীর বুকে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়ছিল, জলধারাটি রূপোলি ফিতার মতো চকচক করছিল। “জানেন অ্যালেক্সান্দ্রে,” সেলিনা বলল, “আমি আমার উপন্যাসের খসড়াটা লিখতে শুরু করেছি। ভিক্টরের চরিত্রের ভেতর আমি যেন একটা অদ্ভুত প্রাণ খুঁজে পাচ্ছি। কিন্তু আমার উপন্যাসের নায়িকা বড় বেশি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।” “কীসের দ্বিধা?” অ্যালেক্সান্দ্রে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
​“সে বুঝতে পারছে না, সে যে অনুভূতিগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কি কেবলই প্যারিস শহরের মায়া, নাকি সত্যিই কোনো মানুষের প্রতি তার মনের টান,” সেলিনা সোজা অ্যালেক্সান্দ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
​অ্যালেক্সান্দ্রে কিছুক্ষণ হাঁটলেন। নদীর বাতাস তার কোটের কলার উড়িয়ে দিচ্ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে সেলিনার মুখোমুখি হলেন। “কখনো কখনো আমাদের মন যা খুব সহজে বুঝতে পারে, বুদ্ধি তাকে কুসংস্কার বা সাময়িক মোহ বলে উড়িয়ে দিতে চায়,” অ্যালেক্সান্দ্রে অত্যন্ত গভীরভাবে বললেন। “কিন্তু হৃদয় কখনো ভুল সংকেত দেয় না। আপনি কি সত্যিই মনে করেন এটি কেবলই একটি শহরের মায়া?” সেলিনা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। সন্ধ্যায় তারা নটরডাম ক্যাথেড্রালের অদূরে একটি ছোট কাফেতে গিয়ে বসলেন। ক্যাথেড্রালের পুনর্নির্মাণের কাজ চলছিল, তবুও তার বিশাল ঐতিহাসিক কাঠামোটি সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে এক রোমহর্ষক রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কফি খেতে খেতে সেলিনা তার ডায়েরি থেকে কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে শোনাল। তার বাংলা লেখার সাবলীলতা আর আবেগের তীব্রতা অ্যালেক্সান্দ্রে ফরাসি অনুবাদের সাহায্য ছাড়াই যেন বুঝতে পারছিলেন। “আপনার লেখা অসাধারণ, সেলিনা,” অ্যালেক্সান্দ্রে মুগ্ধ হয়ে বললেন। “আপনার শব্দগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত আর্দ্রতা আছে। ঠিক যেন বর্ষার বাংলার মতো।” “আপনি বাংলা বর্ষা দেখেছেন?” সেলিনা হাসল। “ছোটবেলায় মায়ের সাথে কয়েকবার গিয়েছি। ওই মেঘ, অবিরাম বৃষ্টি আর মাটির সোঁদা গন্ধ... আমি কখনো ভুলিনি। আমার ভেতরের অর্ধেকটা তো বাঙালিই রয়ে গেছে,” অ্যালেক্সান্দ্রে আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বললেন। ​প্যারিসে কাটানো দশম দিনে, বিকেলটা ছিল অত্যন্ত নিস্তব্ধ। আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা ছিল না, কিন্তু এক চমৎকার মিঠে রোদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল পের লাশেজের গাছে গাছে। তারা আবার ফিরে গিয়েছিল ভিক্টর নোয়ারের কাছে। কবরস্থান তখন প্রায় জনমানবহীন। দর্শনার্থীরা চলে গেছে। শুধু শুকনো পাতা ঝরে পড়ার মৃদু শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা দু-একটি পাখির ডাক। ভিক্টরের ব্রোঞ্জের শরীরটি পড়ন্ত বিকেলের আলোয় চকচক করছিল। “আমি ভাবছি,” সেলিনা ভাস্কর্যের হাতটির দিকে তাকিয়ে বলল, “ভিক্টর কি কখনো ভেবেছিলেন যে মৃত্যুর দেড়শো বছর পরেও তিনি মানুষের হৃদয়ের এত কাছাকাছি থাকবেন? তিনি তো চেয়েছিলেন বিপ্লব, চেয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতা। কিন্তু পেলেন মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখ আর একাকীত্বের দায়ভার।” অ্যালেক্সান্দ্রে তার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “মৃত্যু আসলে এক অদ্ভুত জিনিস, সেলিনা। জীবন যেখানে অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকে, মৃত্যু সেখানে অসীম হয়ে যায়। ভিক্টর হয়তো নিজের জীবনে এক ফোঁটা ভালোবাসা পূর্ণাঙ্গভাবে পেয়ে যেতে পারেননি, কিন্তু আজ তিনি কোটি মানুষের ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এর চেয়ে সুন্দর সার্থকতা আর কী হতে পারে?” সেলিনা একটু এগিয়ে গেল। সে ভিক্টরের জুতোর ব্রোঞ্জের অংশে হাত রাখল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে অ্যালেক্সান্দ্রের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক অপার্থিব আকুলতা। “অ্যালেক্সান্দ্রে...” সেলিনার গলাটা বুজে এল। “আমি আর শুধু গল্প লিখতে চাই না। আমি আর কল্পনার জগতে বাঁচতে চাই না। আমি অনুভব করতে চাই। এই মুহূর্তটাকে বাস্তব করতে চাই।”
​অ্যালেক্সান্দ্রে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর তার ভেতরের সমস্ত সংশয়, সমস্ত অতীত ক্ষত ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি এক পা এগিয়ে এলেন। সেলিনার ফর্সা, কাঁপা কাঁপা হাত দুটি নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় নিলেন। “আমিও চার বছর ধরে এক পাথুরে সমাধি হয়ে বেঁচে ছিলাম, সেলিনা,” ফিসফিস করে বললেন অ্যালেক্সান্দ্রে। “তোমার ছোঁয়ায় আমার ব্রোঞ্জের শরীরেও যেন প্রাণ ফিরে এসেছে।” তিনি আলতো করে সেলিনার চিবুক স্পর্শ করলেন। সেলিনার চোখ দুটি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এল। ভিক্টর নোয়ারের সেই শতাব্দী প্রাচীন ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে, বিকেলের শেষ সোনালী রোদের আলোয় তাদের ঠোঁট দুটি একে অপরকে খুঁজে নিল। চুমুটি ছিল অত্যন্ত নরম, দ্বিধাদ্বন্দ্ব জড়ানো, অথচ তার গভীরে ছিল এক তীব্র আকুলতা। যেন দেড়শো বছরের পুরনো এক বিষণ্ণতার অবসান ঘটিয়ে নতুন এক জীবনের সূচনা হলো। ভিক্টরের সমাধিবেদীর ব্রোঞ্জ যেন তাদের এই স্পর্শে একটু বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

​সেই সন্ধ্যার পর তাদের সম্পর্ক এক নতুন মাত্রা পেল। অ্যালেক্সান্দ্রে সেলিনাকে নিয়ে গেলেন তার ছোট্ট কিন্তু অসম্ভব নান্দনিক অ্যাপার্টমেন্টে। এটি ছিল সেন নদীর একদম তীর ঘেঁষে, ল্যাটিন কোয়ার্টারের এক পুরনো দালানের চারতলায়। ভেতরে ঢুকতেই সেলিনার মন ভালো হয়ে গেল। চারপাশের দেয়াল জুড়ে কাঠের বড় বড় তাক, যাতে ঠাসা হাজার হাজার বই। ফরাসি ইতিহাস, বাংলা সাহিত্য, কবিতা, দর্শনের বইয়ে ঘরটা ভরপুর। জানালার পাশে একটি ছোট পড়ার টেবিল, আর জানালা দিয়ে সরাসরি দেখা যায় সেন নদী ও দূরের আইফেল টাওয়ারের চূড়া।
​“তোমার ঘরটা তো একদম একটা ছোট লাইব্রেরি!” সেলিনা মুগ্ধ হয়ে বলল।
​“হ্যাঁ, এটাই আমার পৃথিবী,” অ্যালেক্সান্দ্রে হেসে বললেন। “তবে আজ থেকে এই পৃথিবীতে তোমারও প্রবেশাধিকার মিলল।” সেই রাতগুলো ছিল স্বপ্নের মতো বাস্তব। তারা একসাথে রান্না করত। সেলিনা তাকে ঢাকাই স্টাইলে ইলিশ মাছের সর্ষে ঝোল আর গরম ভাত রান্না করে খাওয়াত, আর অ্যালেক্সান্দ্রে চমৎকার ফরাসি কায়দায় ক্র্যাপ্স (Crepes) আর ওয়াইন পরিবেশন করতেন।
​খাওয়ার পর তারা জানালার পাশে বসে থাকত। বাইরে প্যারিসের আলো ঝলমলে রাত, নিচে বয়ে চলা শান্ত নদী। সেলিনা খুব মৃদু স্বরে গুনগুন করে রবীন্দ্রনাথের গান গাইত—
“তোমার খ্যাপা হাওয়ায় কোকিল-ডাকা রাতে...”
​অ্যালেক্সান্দ্রে গানের সুরের গভীরে হারিয়ে যেতেন। তিনি ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। ভাষার প্রাচীর ভেঙে তাদের মনের সুর এক হয়ে মিলেমিশে যেত। এক রাতে, যখন বাইরে ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল, ঘরের ভেতর মৃদু হলদে আলোর ওম। সেলিনা অ্যালেক্সান্দ্রের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ছিল। তার হাতটি ছিল অ্যালেক্সান্দ্রের হৃদস্পন্দনের ওপর।
​“জানেন অ্যালেক্সান্দ্রে,” সেলিনা ফিসফিস করে বলল, “আমার মনে হচ্ছে আমি যেন ভিক্টরের সেই চকচকে ব্রোঞ্জটি ছুঁয়ে ফেলেছি। এক অলৌকিক উষ্ণতা আমার পুরো সত্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।” অ্যালেক্সান্দ্রে তার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন। “এটি কোনো অলৌকিকতা নয়, সেলিনা। এটি হলো ভালোবাসা। যা অত্যন্ত বাস্তব, অত্যন্ত সাধারণ, অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ।” ​সেই রাতে তাদের প্রেম শুধু মনের সীমানায় আটকে রইল না। তা এক শারীরিক পূর্ণতা পেল। অত্যন্ত ধীর, যত্নশীল আর ভালোবাসার চাদরে ঢাকা সেই মিলন ছিল যেন ভিক্টর নোয়ারের চিরন্তন গল্পের এক বাস্তব সংস্করণ।
চলবে...

(চার পর্বে সমাপ্য হবে)

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম​দ্বিতীয় পর্ব ​“খুব সুন্দর নাম,” অ্যালেক্সান্দ্রে বললেন। “লেখিকা?”​সেলিনা অবাক হয়ে বলল, “কী ক...
17/08/2026

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম

​দ্বিতীয় পর্ব

​“খুব সুন্দর নাম,” অ্যালেক্সান্দ্রে বললেন। “লেখিকা?”
​সেলিনা অবাক হয়ে বলল, “কী করে বুঝলেন?”
​“আপনার চোখের অস্থিরতা আর যেভাবে আপনি ভিক্টরের ভাস্কর্যটি পর্যবেক্ষণ করছিলেন—সেটা কেবল একজন সাধারণ পর্যটকের কৌতূহল ছিল না। ওখানে একটা গভীর সন্ধান ছিল। কোনো চরিত্রের সন্ধান, হয়তো?” অ্যালেক্সান্দ্রের চোখ দুটো চশমার আড়ালে ঝিকমিক করে উঠল। সেলিনা হাসল, এবার তার হাসিটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। “হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি মূলত গল্প-উপন্যাস লিখি। আমার পরের উপন্যাসের পটভূমি প্যারিসকে নিয়ে করার ইচ্ছে। আর ভিক্টর নোয়ারের এই গল্পটা আমাকে অনেকদিন ধরেই টানছিল।” “ভিক্টরের গল্পটা আসলেই জাদুকরী,” অ্যালেক্সান্দ্রে ভাস্কর্যের দিকে তাকিয়ে বললেন। “আমি এখানে প্রায়ই আসি। 'পের লাশেজ' নিয়ে আমার একটা ঐতিহাসিক গবেষণামূলক বই লেখার কাজ চলছে। আমি সোরবোন ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাসের শিক্ষকতা করি।” ​“ওহ, তাহলে তো আপনি এই জায়গার জীবন্ত ইতিহাস!” সেলিনার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “জীবন্ত কি না জানি না, তবে এই সমাধিগুলোর নীরব ভাষা আমি কিছুটা বুঝি,” অ্যালেক্সান্দ্রে বললেন। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। এখানে দাঁড়িয়ে ভেজার চেয়ে, চলুন কাছেই একটা চমৎকার ক্যাফে আছে। সেখানে বসে কফি খেতে খেতে যদি ভিক্টরের গল্পটা শোনা যায়, কেমন হয়?” সেলিনা একটু ভাবল। অপরিচিত একজনের সঙ্গে ক্যাফেতে যাওয়া কতটা নিরাপদ? কিন্তু অ্যালেক্সান্দ্রের চোখের ভদ্রতা আর তার মার্জিত ব্যবহার সেলিনাকে এক অদ্ভুত ভরসা দিল। সে মাথা নাড়ল। “চলুন। এক কাপ গরম কফি এই মুহূর্তে সত্যিই খুব দরকার।”

কবরস্থানের সীমানা পেরিয়ে তারা একটি ছোট, ঐতিহ্যবাহী ফরাসি ক্যাফেতে এসে বসল। ক্যাফেটির নাম ‘লে দো মগো’ (Les Deux Magots)-এর মতো প্রাচীন না হলেও, এর ভেতরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক ওমমাখা ও উষ্ণ। কাঠের তৈরি ছোট গোল টেবিল, দেয়ালে ঝুলছে সাদাকালো ফ্রেমের পুরনো প্যারিসের ছবি, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব মৃদু স্বরে বাজছে এডিথ পিয়াফের ফরাসি গান। জানালার কাচ ঘেঁষে তারা বসল। বাইরে ততক্ষণে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। কাচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বিন্দু বিন্দু জমছে। ওয়েটার এসে দুটো ধোঁয়া ওঠা ‘ক্যাফে ও লে’ (Café au lait) আর সাথে দুটো ক্রিস্পি ক্রোসাঁ দিয়ে গেল।‌ সেলিনা কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল, “তাহলে বলুন প্রফেসর, ভিক্টর নোয়ারের এই রূপান্তর কীভাবে হলো? একজন সাহসী সাংবাদিক থেকে প্রেমের দেবতা?” ​অ্যালেক্সান্দ্রে চশমাটা নাক বরাবর একটু ঠেলে দিয়ে বলতে শুরু করলেন, “ভিক্টর নোয়ার আসলে ভীষণ আদর্শবাদী একজন তরুণ ছিলেন। ১৮৭০ সালের জানুয়ারি মাসে যখন তিনি মারা যান, তখন ফ্রান্সে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের শেষ সময়। নেপোলিয়নের বংশধর প্রিন্স পিয়ের বোনাপার্টের সাথে এক সম্পাদকের একটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গিয়েছিলেন ভিক্টর। কিন্তু তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে প্রিন্স হঠাৎ রিভলভার বের করে ভিক্টরকে সরাসরি বুকে গুলি করেন। মাত্র বাইশ বছর বয়সে সেই তাজা প্রাণটি নিভে যায়।” সেলিনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। অ্যালেক্সান্দ্রের কণ্ঠের গভীরতা গল্পটাকে আরও জীবন্ত করে তুলছিল। “তার মৃত্যুর পর প্যারিসের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল,” অ্যালেক্সান্দ্রে বলতে থাকলেন। “প্রায় এক লক্ষ মানুষ তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়। সেটি ছিল এক নীরব বিপ্লব। পরবর্তীতে যখন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার দেহ 'পের লাশেজে' স্থানান্তরিত করা হয় এবং ভাস্কর জুলস দালুকে ১৮৯০ সালে দায়িত্ব দেওয়া হয় তার সমাধিফলক তৈরির জন্য। দালু নিজে ছিলেন একজন বাস্তববাদী শিল্পী। তিনি ভিক্টরের মৃতদেহ যেভাবে দেখেছিলেন, হুবহু সেভাবেই ব্রোঞ্জে ঢালাই করেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, দালু কেন তার ট্রাউজারের ওই অংশটি এতটা প্রস্ফুটিত করেছিলেন, তা আজও রহস্য।”
​“তাহলে এই কিংবদন্তি কীভাবে শুরু হলো?” সেলিনা জিজ্ঞেস করল।
​“এটি মূলত শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে,” অ্যালেক্সান্দ্রে হাসলেন। “কিছু মিথ বা লোককথা চিরকালই মানুষের অবদমিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে জন্ম নেয়। মহিলারা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে, ভিক্টরের ভাস্কর্যটি এক অসীম উর্বরতার প্রতীক। যদি কেউ তার ঠোঁটে চুমু খায়, তবে সে এক চমৎকার স্বামী পাবে। যদি তার টপ হ্যাটে ফুল রাখে, তবে দাম্পত্য জীবনে কোনো বাধা থাকবে না। আর যদি... ওই বিশেষ অংশে হাত রাখা যায়, তবে বন্ধ্যাত্ব দূর হবে।” ​সেলিনা নিজের অজান্তেই কফির মগটা শক্ত করে ধরল। “বাস্তবে কি এর কোনো প্রমাণ আছে?”
​“বিশ্বাস কোনো প্রমাণ দেবে না, সেলিনা,” অ্যালেক্সান্দ্রে নরম গলায় বললেন। “কিন্তু মানুষের বিশ্বাস অনেক সময় বিজ্ঞানকেও হার মানায়। আমি নিজে এখানে গত পাঁচ বছর ধরে গবেষণা করছি। কত শত নারীকে দেখেছি অশ্রুসিক্ত চোখে এসে ভিক্টরের পা ছুঁয়ে প্রার্থনা করতে। এবং বিশ্বাস করুন, অনেকেই পরে এসে ধন্যবাদ জানিয়ে ফুল রেখে গেছেন।” সেলিনা একটু নীরব রইল। বাইরের বৃষ্টি এখন আরও জোরে পড়ছে। সে মৃদু স্বরে বলল, “আমিও বোধহয় আজ একটু বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম। ঢাকাতে আমার জীবনটা... বড্ড একঘেয়ে আর শূন্য হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি চারপাশের ভিড়ের মাঝেও বড্ড একা।” অ্যালেক্সান্দ্রে সেলিনার চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে এক গভীর বিষাদের ছায়া দেখতে পেলেন তিনি। তিনি নিজের কফির কাপটি নামিয়ে রেখে বললেন, “বিশ্বাস করা কখনো ভুল নয়, সেলিনা। বিশ্বাসই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমিও তো একসময় সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
​সেলিনা চোখ তুলে তাকাল। “তাই?” ​“হ্যাঁ,” অ্যালেক্সান্দ্রে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আমার বিয়ে হয়েছিল আজ থেকে সাত বছর আগে। কিন্তু চার বছর আগে আমাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ফরাসি সংস্কৃতি আর আমার ভেতরের অর্ধেক বাঙালি সত্তার যে টানাপোড়েন, তা হয়তো আমার প্রাক্তন স্ত্রী মেনে নিতে পারেনি। সে ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী, আর আমি বেঁচে থাকি অতীত আর ইতিহাস নিয়ে। সেই থেকে... আমিও এই বিশাল শহরে একাই থাকি। ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি, আর নিজের ভেতরের শূন্যতা ঢাকতে চেষ্টা করি।” দুটি ভিন্ন দেশ থেকে আসা, অথচ মনের দিক থেকে একই রকম একা দুটি মানুষ জানালার পাশে বসে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরব বোঝাপড়া তৈরি হতে শুরু করল, যা হয়তো ভিক্টর নোয়ারের সেই ব্রোঞ্জের ছায়া থেকেই উৎসারিত হয়েছিল।
চলবে...

(চার পর্বে সমাপ্য হবে)

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম​প্রথম পর্ব প্যারিসের আকাশটা সেদিন সকাল থেকেই এক অদ্ভুত ধূসর চাদরে ঢাকা ছিল। এই শহরে শরৎকাল মা...
16/08/2026

ভিক্টর নোয়ারের ছায়ায় প্রেম

​প্রথম পর্ব

প্যারিসের আকাশটা সেদিন সকাল থেকেই এক অদ্ভুত ধূসর চাদরে ঢাকা ছিল। এই শহরে শরৎকাল মানেই এক অন্যরকম বিষণ্ণতা, যা চারপাশের ঐতিহাসিক দালানকোঠার পাথুরে গায়ে যেন এক প্রাচীন স্মৃতির ধুলো জমিয়ে রাখে। ঠান্ডা একটা বাতাস বইছিল চারপাশ দিয়ে। ঢাকা থেকে আসা ঊনত্রিশ বছর বয়সী তরুণী লেখিকা সেলিনা রহমান। এখনো ব্যাচেলর, তার নাকি বিয়ে শাদি ভালো লাগে না। সে ছোট্ট চার চাকার স্যুটকেসটা টেনে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিখ্যাত ‘পের লাশেজ’ (Père Lachaise Cemetery) কবরস্থানের প্রধান ফটকের সামনে। তার পরনে ছিল একটা গাঢ় নীল রঙের ওভারকোট, গলায় জড়ানো লাল মাফলার। কপালে এসে পড়েছে কিছু অবাধ্য চুল। সেলিনার চোখে ছিল একরাশ ক্লান্তি আর তার চেয়েও বেশি এক অস্থিরতা। ঢাকার কোলাহল, ট্রাফিক আর চেনা জীবনের একঘেয়েমি থেকে বাঁচতে এবং নিজের লেখার একটা নতুন মোড় খুঁজতে সে প্যারিসে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে সে ফরাসি এক প্রকাশকের সঙ্গে তার প্রথম অনুবাদ গ্রন্থের বিষয়ে দেখা করতে এসেছিল বটে, কিন্তু মনের ভেতরে চাপা ছিল অন্য এক উদ্দেশ্য। একটা গল্প। একটা অদ্ভুত, রোমান্টিক, অথচ বাস্তব ও অলৌকিকের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা গল্প। আর সেই গল্পের মূল চরিত্রে ছিলেন একজন মৃত তরুণ সাংবাদিক—ভিক্টর নোয়ার। সেলিনা বড় একটা শ্বাস নিয়ে ফটকের ভেতর পা রাখল। পের লাশেজ সাধারণ কোনো কবরস্থান নয়। এটি যেন এক বিশাল পাথুরে অরণ্য, যেখানে শত বছরের ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে। সরু নুড়ি পাথরের পথ, দুপাশে প্রাচীন ওক আর ম্যাপল গাছের ডালপালা আকাশকে ঢেকে রেখেছে। সারি সারি কারুকার্যময় সমাধিস্তম্ভ, ভাস্কর্য আর ছোট ছোট পারিবারিক চ্যাপেল। চারপাশটা এতটাই নিস্তব্ধ যে, নিজের পায়ের শব্দও সেলিনার কানে বাজছিল।‌ হাঁটতে হাঁটতে সেলিনা তার ডায়েরির পাতাগুলো মনে মনে ওল্টাচ্ছিল। ভিক্টর নোয়ার। ১৮৭০ সাল। মাত্র বাইশ বছর বয়সের এক তেজী, তরুণ সাংবাদিক। প্রিন্স পিয়ের বোনাপার্টের (নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভ্রাতুষ্পুত্র) সঙ্গে এক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সশরীরে দেখা করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন তিনি। তার সেই অকালমৃত্যু তৎকালীন ফ্রান্সে এক বিশাল রাজনৈতিক ঝড় তুলেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই রাজনৈতিক ইতিহাস একপাশে সরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে এক অদ্ভুত লোকগাথা। আজ প্রায় দেড়শো বছর পরেও, মানুষ তার কবরে শুধু একজন শহীদ সাংবাদিক হিসেবে শ্রদ্ধা জানাতে আসে না। নারীরা আসে এক চিরন্তন বিশ্বাস নিয়ে—যাঁরা ভালোবাসার কাঙাল, যাঁরা মাতৃত্বের স্বাদ পেতে চান, কিংবা যাঁরা নিজেদের জীবনে একটুখানি রোমান্সের ছোঁয়া চান। সেলিনা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। চড়াই-উতরাই পথ পার হয়ে অবশেষে সে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাল। ৯২ নম্বর সেকশন। সেখানেই শুয়ে আছেন ভিক্টর নোয়ার। ব্রোঞ্জের তৈরি এক পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য। বিখ্যাত ভাস্কর জুলস দালুর নিখুঁত কারুকার্য। ভিক্টর ঠিক যেভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে, ঠিক সেই ভঙ্গিতেই তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গায়ে তার ওভারকোট, পাশে পড়ে আছে তার বিখ্যাত টপ হ্যাটটি। চোখ দুটি আধবোঁজা, ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে যেন শেষ নিঃশ্বাসটি এইমাত্র বের হয়ে গেল। কিন্তু এই ভাস্কর্যের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং বিতর্কিত বিষয় হলো তার ট্রাউজারের সামনের নির্দিষ্ট অংশটি। ভাস্কর দালু অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে প্যান্টের উপর দিয়ে তার পুরুষাঙ্গের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীদের বিশ্বাস—এই ভাস্কর্যের ঠোঁটে চুমু খেলে, টপ হ্যাটে ফুল রাখলে এবং সেই বিশেষ অংশে স্পর্শ করলে নাকি প্রেম মেলে, উর্বরতা বাড়ে এবং দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। সেলিনা লক্ষ্য করল, ভাস্কর্যের বাকি অংশ সময়ের সাথে সাথে কালো ও তামাটে হয়ে গেলেও, তার ঠোঁট, টুপি, জুতো এবং সেই বিশেষ অংশটি একদম সোনার মতো চকচক করছে। হাজার হাজার মানুষের হাতের স্পর্শ, ঘর্ষণ আর আকুল আকুতি ব্রোঞ্জের সেই অংশগুলোকে ঘষে ঘষে উজ্জ্বল করে তুলেছে। সেলিনা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকে একটা ঠান্ডা বাতাস ধাক্কা দিল। সে তার ব্যাগ থেকে এক গুচ্ছ সদ্য কেনা টকটকে লাল গোলাপ বের করল। ঢাকা শহরে থাকতে সে এসব কুসংস্কারে হাসত। কিন্তু আজ, জীবনের এক গভীর শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কেন যেন তার মনে হচ্ছিল—মানুষ তো আসলে বিশ্বাসের ওপরই বাঁচে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ভাস্কর্যটির দিকে। তার চারপাশের বাতাস যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। সেলিনা অত্যন্ত মৃদু হাতে একটি লাল গোলাপ ভিক্টরের ব্রোঞ্জের টপ হ্যাটের ভেতর রাখল। তারপর গভীর এক সম্মোহনে ঝুঁকে পড়ল সে। নিজের ঠোঁট দুটি আলতো করে ছুঁইয়ে দিল ভিক্টরের ঠান্ডা, ব্রোঞ্জের ঠোঁটে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড। পাথুরে শীতলতা তার ঠোঁট বেয়ে শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। এরপর, তার বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগল। সে হাতটা বাড়াল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল। একটু ইতস্তত করে সে তার ডান হাতের তালুটা রাখল ভিক্টরের সেই বিখ্যাত চকচকে অংশে। ধাতব উষ্ণতা যেন তার শিরায় শিরায় এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। চোখ বন্ধ করে সেলিনা ফিসফিসিয়ে বলল, “যদি এই কিংবদন্তি সত্যি হয়... তবে আমাকে একটা সুযোগ দাও, ভিক্টর। এই ধূসর শহরে আমি বড় একাকী। আমি আর নিজের ভেতরে এই শূন্যতা বইতে পারছি না। আমাকে ভালোবাসতে শেখাও, ভালোবাসার মানুষ দাও।”

​“প্রথমবার?”
​পেছন থেকে ভেসে আসা এক গম্ভীর, অথচ অত্যন্ত মার্জিত এবং নরম কণ্ঠস্বরে সেলিনা বিদ্যুদ্বেগে চমকে উঠল। সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে ঝটকা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। লজ্জায় আর সংকোচে তার ফর্সা গাল দুটি মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠল। তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ভদ্রলোক। বয়স তিরিশের কোঠার মাঝামাঝি। লম্বা গড়ন, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত এবং কুচকুচে কালো। গায়ে জড়িয়ে আছে একটা ছাই রঙের উলের ওভারকোট। তার কাঁধে ঝোলানো একটা চামড়ার ব্যাগ, যার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে কিছু মোটা বই। তার মুখে এক চিলতে মৃদু, আশ্বস্তকারী হাসি। সেলিনা অপ্রস্তুত হয়ে চটপট বলল, “আই... আই অ্যাম স্যরি। আমি আসলে...”
​ভদ্রলোক হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করলেন। বাংলায় বললেন, “ব্যস্ত হবেন না। ভিক্টরের কাছে এসে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তিনি প্রতিদিন এমন শত শত মানুষের আকুতি শোনেন।” ​সেলিনার চোখ কপালে উঠল। “আপনি... আপনি বাংলা বলছেন?”
​ভদ্রলোক মৃদু হেসে এগিয়ে এলেন। “হ্যাঁ। আমার নাম অ্যালেক্সান্দ্রে ল্যভয়। আমার বাবা ফরাসি, কিন্তু মা বাংলাদেশী। মা ঢাকার মেয়ে, তাই ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে বাংলা বলার অভ্যাস। আর আপনার উচ্চারণ, চেহারার গড়ন আর হাতে ওই লাল গোলাপ দেখেই বুঝেছিলাম—আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।” তাছাড়া আপনার লাগেজে লাগানো ঐ যে ট্যাগ যেখানে ডিএইসকে লেখা সেটা তো আছেই। সেলিনা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এত বড় এক অচেনা শহরে, তাও আবার এই গূঢ় মুহূর্তে নিজের ভাষার কাউকে পেয়ে বুকের ভেতরের জড়তা অনেকটাই কেটে গেল। সে নিজের কোটের পকেট থেকে রুমাল বের করে হাতটা একটু মুছে নিয়ে বলল, “আমি সেলিনা। সেলিনা রহমান। ঢাকা থেকে এসেছি।”
চলবে...

(চার পর্বে সমাপ্য হবে)

14/08/2026

তুমি আমার সেই ব্ল্যাকহোল

​মহাবিশ্বের সব আলো যেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়,
সেখানে আমার সমস্ত আবেগ তোমার দিকেই ধেয়ে যায়।
তুমি মহাশূন্যের সেই গভীর, মায়াবী এক টান,
যার কাছে হেরে যায় আমার সব যুক্তি, সব অভিমান।

​আমি তো এক সামান্য আলোর কণা, তীব্র বেগে ছুটি,
অথচ তোমার সীমানায় এসে কেমন যেন আছড়ে পড়ি!
বিজ্ঞান বলে, তোমার থেকে নাকি কিছুই ফিরতে পারে না আর,
আমার এ মনও তো চূর্ণ হলো ছুঁয়ে তোমার 'ইভেন্ট হরাইজন' এর পার।

তুমি যেন সেই ব্ল্যাকহোল, এক চিরন্তন রহস্যের চাদর,
যার টান এড়ানোর সাধ্য নেই আমার কোনো আলোর কণারও।
যত দূরেই যেতে চাই, এক অদৃশ্য সুতোয় আমায় বাঁধো,
তোমার ওই গভীর দুচোখে আমায় শুধু কাছে টানো।
হারিয়ে যাওয়াই যদি হয় তোমার ওই অসীম অন্ধকারের বুকে,
তবে আমি সহস্রবার বিলীন হতে রাজি, চরম সুখে।

​তোমার মাঝেই শুরু আমার, তোমার মাঝেই হোক শেষ,
আমি আলোর কণা হয়েই ভালো, যদি জড়িয়ে থাকে তোমার রেশ।

১০.০৮.২০২৬

ফিওনা দ্যা মাদার শেষ পর্ব ভোর রাতের সেই হিমশীতল অন্ধকার তখন আরও জমাট বেঁধেছে। কুয়াশার চাদর এতটাই ঘন যে হাতের তালুও দেখা ...
13/08/2026

ফিওনা দ্যা মাদার

শেষ পর্ব

ভোর রাতের সেই হিমশীতল অন্ধকার তখন আরও জমাট বেঁধেছে। কুয়াশার চাদর এতটাই ঘন যে হাতের তালুও দেখা যাচ্ছে না। ফিওনা, মার্গারেট আর ছোট্ট লিলিকে নিয়ে যখন একটা পরিত্যক্ত, প্রাচীন খনির টানেলটার মুখে এসে পৌঁছালেন, তখন তাঁদের শরীরের শেষ বিন্দু রক্তটুকুও যেন জমে বরফ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। টানেলের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের ভেতর লিলিকে নিজের বুকের ওমে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন মার্গারেট। বৃদ্ধা নার্সের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর ফার্স্ট-এইডের নিখুঁত জ্ঞানের কারণেই ফিওনার পিঠের গভীর ক্ষত থেকে রক্তপাতটা কিছুটা কমেছে। কিন্তু ফিওনার শরীরের তাপমাত্রা তখন দ্রুত নামছিল, প্রতিটা শ্বাস নিতে বুকটা চিরে যাচ্ছিল তাঁর। কিন্তু নিয়তি তাঁদের জিরোনোর সুযোগটুকুও দিল না। হঠাৎ করেই টানেলের বাইরের নিস্তব্ধতা চিরে গর্জে উঠল একাধিক শক্তিশালী গাড়ির ইঞ্জিন। কুয়াশা ভেদ করে খনির মুখে আছড়ে পড়ল সার্চলাইটের তীব্র, অন্ধ করে দেওয়া আলো। ভারী বুটের শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। একটা নয়, দুটো নয়... অন্তত চার-পাঁচটা গাড়ি এসে থামল বাইরে। পাচারকারী চক্রের মূল হোতা নিজে এসেছে। তার সঙ্গে রয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক বিশাল ব্যাকআপ ফোর্স। তারা ইতিমধ্যে বুঝে গেছে যে তাদের দুজন দক্ষ লোক নিখোঁজ, আর মেমোরি কার্ডটা এখনো ফিওনার কাছেই আছে। “ভেতরে যারা আছ, ভদ্র ছেলের মতো বের হয়ে এসো!” টানেলের মুখে একটা লাউডস্পিকারে ভেসে এল একটা কর্কশ, ধাতব কন্ঠস্বর। সেই আওয়াজ টানেলের পাথুরে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক ভয়ানক আবহ তৈরি করল। “আমরা জানি তোমরা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছ। আমাদের কাছে মিলিটারি-গ্রেড থার্মাল স্ক্যানার আছে। তোমাদের শরীরের উষ্ণতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আমরা আঙুল বাঁকাতে জানি। ওই ফোন আর ড্যাশক্যামের মেমোরি কার্ডটা নিয়ে যদি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বের না হও, তবে আমরা পুরো টানেলটাই উড়িয়ে দেব। জ্যান্ত কবর হবে তোমাদের!” ফিওনার হৃদস্পন্দন তখন কান ফাটানো আওয়াজে নিস্তব্ধতা ভাঙছিল। তিনি দেয়ালে হাত বুলালেন। প্রাচীন সোনার খনি। শত বছরের পুরনো কাঠের বিমগুলো পচে গেছে, পাথরগুলো আলগা। সামান্য আঘাতেই পুরো পাহাড় ধসে পড়তে পারে।
​ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে একটা হাড়হিম করা শব্দ এল— টিক... টিক... টিক...
​ওরা অহেতুক কোনো ভয় দিচ্ছিল না। সত্যি সত্যিই টানেলের মুখে ডিনামাইট সেট করা শুরু করে দিয়েছে ওরা। সময় শেষ।
​“দাদি, লিলিকে শক্ত করে ধরো! একদম মাথা তুলবে না!” ফিওনা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।
​বুম!
​এক নরকীয় বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল গোটা পাহাড়। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার মতো শব্দে টানেলের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ল। বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই, জ্বলন্ত কাঠ আর বিষাক্ত ধুলোর ঝড়ে চারপাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। বাতাস থেকে অক্সিজেন উধাও হয়ে গেল নিমেষেই। মৃত্যু যখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে, ফিওনা শেষ মুহূর্তে মার্গারেট আর লিলিকে ধাক্কা দিয়ে টানেলের আরও গভীরে, একটা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সরু পাথরের ফাটলের ভেতর গুঁজে দিলেন। নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করলেন তাঁদের। পিঠের ওপর এসে পড়ল ছোটখাটো পাথরের টুকরো। ধুলোর ঝড় যখন কিছুটা শান্ত হলো, ফিওনা কাশতে কাশতে চোখ মেললেন। টানেলের মূল প্রবেশপথ এখন এক বিশাল পাথরের স্তূপ— সম্পূর্ণ বন্ধ। জ্যান্ত কবর! কিন্তু ঠিক তখনই ফিওনার নজর গেল ওপরের দিকে। ফাটলের একেবারে শেষ মাথায়, পাথরের ফাঁক গলে ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে। একটা অত্যন্ত সরু, খাড়া পথ ওপরের পাহাড়ি হাইওয়ের দিকে চলে গেছে।
​“আমাদের ওপরে উঠতে হবে, এখনই!” ফিওনার কণ্ঠে তখন আদিম বেঁচে থাকার লড়াই। ভাঙা কাঁধের তীব্র, নারকীয় যন্ত্রণা ফিওনার চেতনা কেড়ে নিতে চাইছিল। প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে হচ্ছিল যেন কেউ তপ্ত ছুরি দিয়ে হাড় চূর্ণ করছে। কিন্তু সেদিকে তাকানোর সময় নেই। তিনি প্রথমে মার্গারেটকে ঠেলে ওপরে তুলতে সাহায্য করলেন। বৃদ্ধা নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে ওপরে উঠলেন। এরপর ফিওনা ছোট্ট লিলিকে নিজের বুকের সাথে জ্যাকেট দিয়ে শক্ত করে বাঁধলেন। লিলি ভয়ে পাথর হয়ে গেছে, তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে। এক হাত আর দুই পায়ের ওপর ভর করে, দেয়ালের ধারালো পাথরে হাত-পা কেটে রক্তারক্তি করে, ফিওনা ইঞ্চি ইঞ্চি করে ওপরে উঠতে লাগলেন। ওপর থেকে আলগা পাথর খসে পড়ছিল। পায়ের নিচে মাটি পিছলে যাচ্ছিল। এক বার হাত ফসকালেই সোজা কয়েকশো ফুট নিচে পাথরের ওপর মৃত্যু। কিন্তু ফিওনা থামলেন না। যন্ত্রণায় দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কেটে ফেললেন তিনি, তাও লিলিকে হাতছাড়া করলেন না।
​অবশেষে, এক অলৌকিক লড়াই শেষে, তারা তিনজন যখন হাইওয়ের ঠিক পাশে এসে পৌঁছালেন, সকালের রক্তিম সূর্য তখন কুয়াশার বুক চিরে উদিত হচ্ছে।
​আর ঠিক তখনই, দিগন্ত চিরে ধেয়ে এল এক তীব্র, কানফাটানো সাইরেনের আওয়াজ। ফিওনার করা সেই শেষ মুহূর্তের স্যাটেলাইট কলের সূত্র ধরে জিপিএস ট্র্যাক করে চলে এসেছে কুইন্সল্যান্ড পুলিশের স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল রেসপন্স গ্রুপ (TRG) এবং সামরিক বাহিনীর তিনটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার। আকাশ চিরে নেমে এল ব্ল্যাকহকগুলো। হাইওয়ে এবং খনির চারপাশ নিমেষের মধ্যে কর্ডন করে ফেলা হলো। পাচারকারীদের গাড়িগুলোকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল স্নাইপার আর ট্যাকটিক্যাল টিম।
​“অস্ত্র ফেলে হাত ওপরে তোলো!” লাউডস্পিকারে গর্জে উঠল কমান্ডারের গলা।
​কিন্তু পাচারকারীরা মরিয়া হয়ে গুলি চালাতে শুরু করল। শুরু হলো এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র, কানফাটানো গুলির লড়াই। গ্রেনেড আর স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের আওয়াজে কেঁপে উঠল পুরো উপত্যকা। কিন্তু সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্বের সামনে আন্তর্জাতিক সেই পাচারকারী চক্রের মূল হোতা এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। কয়েকজন নিহত হলো, আর মূল হোতাসহ বাকিদের হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হলো। ঠিক তখনই একজন প্যারামেডিক ছুটে এসে ফিওনার ক্ষতবিক্ষত শরীরে একটা গরম কম্বল জড়িয়ে দিলেন। লিলিকে আলতো করে মার্গারেটের কোল থেকে নেওয়া হলো প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য। ফিওনা তখন ক্লান্তিতে, যন্ত্রণায় স্ট্রেচারের ওপর ভেঙে পড়েছেন। চোখ দুটো বুজে আসছিল তাঁর। কিন্তু ঠিক তখনই একটা সামরিক গাড়ি চাকা চিৎকার করে ব্রেক কষল ঠিক তাঁদের সামনে। গাড়ি থেকে প্রায় ছুটে নেমে এলেন অ্যাডাম। তাঁর চুল উস্কোখুস্কো, পোশাকে ধুলো, চোখে জল আর মুখে এক চরম, অপার্থিব স্বস্তির আভা। অ্যাডাম সমস্ত পৃথিবী ভুলে ছুটে এসে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা ফিওনা আর লিলিকে নিজের দুই বাহুর মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চোখ দিয়ে তখন আনন্দের অশ্রু ঝরছে। ফিওনার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে অ্যাডাম রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে উঠলেন, “তুমি পেরেছ, ফিও... ঈশ্বর, তুমি পেরেছ! তুমি ওদের সবাইকে বাঁচিয়েছ। তুমি সত্যি পেরেছ।” ফিওনা অ্যাডামের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। ভোরের সূর্যের আলোয় তাঁর ঠোঁটের কোণে তখন ফুটে উঠল এক বিজয়ী, ক্লান্ত হাসি। নরক গুলজার করে তারা অবশেষে আলোর মুখ দেখেছে।

​এই ঘটনার পর কুইন্সল্যান্ডের ইতিহাস বদলে গিয়েছিল। ফিওনার সাহসিকতার কারণে কেবল একটি পরিবারই বাঁচেনি, বরং একটি অত্যন্ত মারাত্মক জৈব অস্ত্রের ব্ল্যাক-মার্কেট ডিল পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া সরকার ফিওনা সিম্পসনকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সাহসিকতা পুরস্কার ‘ক্রস অফ ভ্যালর’-এ ভূষিত করে।
​কিন্তু ফিওনার জীবনের আসল রূপান্তর ঘটেছিল অন্য জায়গায়। তার ভেতরের যে অ্যাডভেঞ্চারার আর সারভাইভাল ট্রেইনার এতদিন সুপ্ত ছিল, তা এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তিনি পরবর্তীকালে একটি আত্মজীবনীমূলক থ্রিলার বই লিখেছিলেন, যার নাম ছিল ‘মাদার্স শ্যাডো’ (Mother's Shadow)। বইটি বিশ্বজুড়ে বেস্টসেলার হয়েছিল, যেখানে মাতৃত্বের আদিম শক্তি আর চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার এক অনন্য দলিল লিপিবদ্ধ ছিল। বহু বছর পরও, যখনই কুইন্সল্যান্ডের আকাশে কোনো তীব্র ঝড় উঠত, বা মেঘের রঙ কালচে-সবুজ হয়ে আসত, ফিওনা জানালার পাশে এসে দাঁড়াতেন। লিলি তখন আর চার মাসের শিশু নয়, সে স্কুলে যায়। ফিওনা লিলিকে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন, “মাঝে মাঝে ঝড় আমাদের ধ্বংস করতে আসে না লিলি, আসে আমাদের ভেতরের আসল শক্তিটাকে জাগিয়ে তুলতে। মনে রাখবে, তোমার মায়ের ছায়া সবসময় তোমার সাথে আছে।”

সমাপ্ত।

Address

Khulna
9100

Telephone

+8801911173656

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Green Movement posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Green Movement:

Shortcuts

Share

Category