Green Movement

Call Directions Contact the business

Green Movement Love The Earth. Love your Home. Love People.

হরমুজে শেষ যাত্রাপ্রথম পর্ব লবণাক্ত হাওয়া, জাহাজের ইঞ্জিনের মৃদু স্পন্দন আর অয়েল/কেমিক্যাল-ট্যাংকারের চেনা গন্ধ—এগুলোই...
24/10/2026

হরমুজে শেষ যাত্রা

প্রথম পর্ব

লবণাক্ত হাওয়া, জাহাজের ইঞ্জিনের মৃদু স্পন্দন আর অয়েল/কেমিক্যাল-ট্যাংকারের চেনা গন্ধ—এগুলোই গত তিরিশ বছর ধরে ক্যাপ্টেন মেহেদী হাসানের দ্বিতীয় অস্তিত্ব। ডেক ক্যাডেট হিসেবে যেদিন প্রথম জাহাজের গ্যাংওয়েতে পা দিয়েছিলেন, সেদিন তার ছিপছিপে পাতলা শরীরে ছিল অফুরন্ত উদ্দীপনা আর চোখে ছিল বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। একে একে সাগর, মহাসাগর, নদী, প্রণালী, খাল, দেশ, মহাদেশ আর দ্বীপপুঞ্জ পার হয়েছেন। উত্তর থেকে দক্ষিণে আর পূর্ব থেকে পশ্চিমে জাহাজ নিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছেন। আটলান্টিকের উন্মত্ত তুফান, প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে রক্ত হিম করা টাইফুন, ভারত মহাসাগরের করাল সাইক্লোন কিংবা বঙ্গোপসাগরের বিধ্বংসী ঝড়—কোনোটিই তার পথ আটকাতে পারেনি।
​জেনারেল কার্গোর সাধারণ মালবাহী জাহাজে কর্মজীবনের শুরুটা হলেও, ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে এসে চাকরির নিশ্চয়তার জন্য তাকে বেছে নিতে হয় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ও অয়েল ট্যাংকার। যে জাহাজে সামান্য এক ভুল মানেই বিশাল বিস্ফোরণ কিংবা এক ফোঁটা ক্ষতিকর কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে নিমেষেই করুণ মৃত্যু। এমন সব মারণাত্মক কেমিক্যালের সাথে তার বছরের পর বছর ওঠাবসা ছিল, যা এক মুহূর্তে মানুষের অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে। কিন্তু মেহেদী হাসান কখনো ভয় পাননি। ডেকের নিরাপত্তা, শতভাগ পেশাদারিত্ব আর আত্মবিশ্বাসই ছিল তার বর্ম। সততা আর সম্মানের সাথে দেখতে দেখতে দীর্ঘ তিরিশটি বছর কেটে গেছে। জুনিয়র অফিসার থেকে পদোন্নতি পেয়ে যখন মাস্টারের চেয়ারে বসেছিলেন, সেদিনও তার মধ্যে অহংকার স্পর্শ করেনি। বিশ্বের কত দেশের, কত ভিন্ন ধর্মের, বর্ণের, ভাষার আর সংস্কৃতির নাবিকদের সাথে তিনি কাজ করেছেন। ফিলিপিনো, ইউক্রেনিয়ান, রোমানিয়ান , রাশিয়ান, মালয়েশিয়ান, ভারতীয়, বার্মীজ, পোলিশ—কত বিচিত্র সব মানুষ! অথচ সমুদ্রের বুকে সবাই ছিল একটি একক পরিবারের মতো। সবার কাছে ক্যাপ্টেন মেহেদী ছিলেন এক শ্রদ্ধেয়, প্রাজ্ঞ এবং অত্যন্ত ভালোবাসার মানুষ। তার দীর্ঘ কর্মজীবন ছিল সাফল্যের সোনালী সুতোয় গাঁথা সুখের স্মৃতির এক বিশাল কোলাজ।

​কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর রূপ বদলে যেতে লাগল। ক্ষমতার লোভে অন্ধ একদল পরাশক্তি আর উন্মাদ বিশ্বনেতাদের আগ্রাসনে পৃথিবীর দিকে দিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। লোহিত সাগর, ওমান উপসাগর, পারস্য উপসাগর আর হরমুজ প্রণালী পরিণত হলো এক মৃত্যুপুরীতে। ভূ-রাজনীতির বিষাক্ত খেলায় বলির পাঁঠা হতে লাগল নিরীহ, অপরাধহীন নাবিকরা। মিডিয়া খুললেই দেখা যেত—কোনো না কোনো বাণিজ্য জাহাজে ড্রোন বা ক্রুজ মিসাইল হামলা হয়েছে; দাউ দাউ করে জ্বলছে লাখো টন কার্গোবাহী জাহাজ অথবা অয়েল কেমিক্যাল ট্যাংকার; পানিতে ভেসে উঠছে তেল, ধাতব কন্টেইনার আর নিরীহ মেরিনারদের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত মৃতদেহ। ঘটনাগুলো মেহেদীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ভাবছিলেন—আর কেন? যার জীবনের তিরিশটি বছর সমুদ্র গিলে খেয়েছে, যার সততা আর সম্মান অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তার কি এবার সব ছেড়ে চিরদিনের জন্য ঘরে ফিরে যাওয়া উচিত নয়? ছুটিতে এসে পরিবারকে ঘিরে এক অন্যরকম শান্তিময় সময় পার করছিলেন তিনি। স্ত্রী আর সন্তানদের সাথে সাধারণ জীবনের আনন্দ উপভোগ করছিলেন। কিন্তু মেহেদীর অজান্তেই ভাগ্যের পরিহাস তার জন্য এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ পেতে রেখেছিল। একদিন সকালে একটা নামকরা ম্যানিং এজেন্সি থেকে ফোন আসে। ফোনের ওপাশের পরিচিত কণ্ঠটি অত্যন্ত লোভনীয় একটি অফার সামনে রাখে। মেহেদী প্রস্তাবটি শুনে প্রথম দফাতেই প্রত্যাখ্যান করে দেন। মেহেদী মনে মনে ভাবেন মানুষ আসলে অনেক স্বার্থপর। যাদের সাথে দীর্ঘ এতো গুলো বছর কাজ করেছেন আজ তারাই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধা করছে না। সিদ্ধান্ত নেয় আর কখনো ঐ এজেন্সি থেকে সেইল করবেন না। কিন্তু এজেন্সিটি ছিল নাছোড়বান্দা। দিন যেতে থাকে, আর তাদের প্রস্তাবের অংকটা ক্রমান্বয়ে অকাল্পনিকভাবে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তারা এমন এক অফার নিয়ে আসে, যা যেকোনো সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মাসে ১০০,০০০ (একশো হাজার) মার্কিন ডলার বেতন! সাথে চার মাসের কন্ট্রাক্ট শেষে আকর্ষণীয় বোনাস ভাতা তো থাকবেই! শর্ত একটাই—একটা বিশালাকার খালি ক্রুড অয়েল ট্যাংকার নিয়ে শুধু হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিয়ে কুয়েতে যেতে হবে, সেখানে এসপিএম (Single Point Mooring)-এ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল লোড করে আবার সেই অভিশপ্ত হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে সোজা নর্থ চায়নার তিয়ানজিন বন্দরে নিয়ে ডিসচার্জ করতে হবে।

​তখন হরমুজ প্রণালী ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চরম যুদ্ধাবস্থা। যে কোনো দেশের, যে কোনো পতাকাবাহী জাহাজ সেখানে দেখা মাত্রই নাদান ড্রোন কিংবা মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। কেউ দেখছে না সেটা কোনো নিরপেক্ষ বা শত্রু পক্ষের জাহাজ নাকি সাধারণ কোন পণ্যবাহী ট্যাংকার। মেহেদী একা একা হিসাব কষতে লাগলেন। চার মাসে বেতন চার লক্ষ ডলার, সাথে সর্বনিম্ন ষাট-সত্তর হাজার ডলার বোনাস! এত বিপুল অর্থ! জীবনে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে তিনি বহুবার ফিরে এসেছেন। মৃত্যুর ভয় তিনি কোনোদিন পাননি। মনে মনে বললেন—“মরতে তো একদিন হবেই। তবে এই চরম ঝুঁকিটা যদি সফল হয়, তবে এই একটি ভয়েজই আমার পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ চিরদিনের মতো বদলে দেবে। জীবনে রিস্ক না নিলে তো কিছুই অর্জন করা যায় না।” তিনি এই লোভনীয় প্রস্তাব বা নিজের মানসিক টানাপোড়েনের কথা স্ত্রী, সন্তান বা কাউকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলেন না। নিজের ভেতরেই এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন—এটাই হবে তার জীবনের শেষ ভয়েজ। মেহেদী নিজে থেকে ফোন করলেন না, ম্যানিং এজেন্সির পরবর্তী কলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিন দিন পর তাদের ফোন এলে তিনি কিছুটা অনিচ্ছা ও বিরক্তি প্রকাশের অভিনয় করলেন। এজেন্সি রিকোয়েস্ট করতে থাকলে মেহেদী কঠিন কিছু শর্ত চাপিয়ে দিলেন:
​কন্ট্রাক্ট সই করার সাথে সাথে পুরো চার মাসের টাকা (৪০০,০০০ ডলার) পরিশোধ করতে হবে—অর্ধেক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং বাকি অর্ধেক ক্যাশ ডলারে।
কন্ট্রাক্ট সফলভাবে শেষ হলে জাহজে থাকতেই বোনাসের টাকা দিতে হবে।
যদি এই ভয়েজে তার মৃত্যু হয়, তবে পরিবারকে অতিরিক্ত ২০০,০০০ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; আর যদি গুরুতর আহত হন, তবে ১০০,০০০ ডলার প্রদান করতে হবে।
চলবে...

(চার পর্বে সমাপ্য হবে)

23/10/2026

আয়নার ওপারে

আয়নার ওপারে আজ অন্য এক মুখ ভেসে ওঠে
ধীরে ধীরে, যেন কুয়াশা সরে গিয়ে
দেখা দেয় এক পরিচিত অথচ অচেনা মুখ।
বলিরেখা জমেছে কপালে, চোখের কোণে
সময়ের আঙুল এঁকে গেছে গভীর রেখা—
যেন নদীর তীর থেকে কেটে নেওয়া মাটির ছাপ,
যেন কোনো নিঃশব্দ কান্না জমে আছে চামড়ার নিচে।

একদিন যারা হেসে উঠে বলত
“এ মানুষটা তো চিরকাল সবুজ থাকবে,”
আজ তারা নিঃশব্দে গোনে আমার বছরগুলো।
তাদের চোখে আমি আর সেই আগের মানুষ নই—
শুধু একটা সংখ্যা, একটা ক্লান্ত ছায়া,
একটা মুখ যা হারিয়ে ফেলেছে তার নিজের আলো।

চুলের ঘন অরণ্য আজ পাতলা হয়ে এসেছে।
যেখানে একসময় রাতের মতো কালো ঢেউ খেলত,
আজ সেখানে শুধু হালকা বাতাস বয়ে চলে যায়
শূন্যতার দিকে। ত্বকের উজ্জ্বলতার আলো
মিটে গিয়ে এসেছে ভাঁটার টান—
যেন সূর্য তার শেষ রশ্মি গুটিয়ে নিচ্ছে
ধীরে ধীরে, কোনো কথা না বলে,
শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যাচ্ছে দূরে।

চোখের জ্যোতি আজ মিইয়ে এসেছে অনেকটাই,
কাছের জিনিসও ঝাপসা লাগে—
যেন পরিচিত মুখগুলো ধীরে ধীরে
কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
বইয়ের অক্ষর, প্রিয় মানুষের হাসি,
এমনকি নিজের হাতের রেখাও
আজ আর আগের মতো স্পষ্ট নয়।
সময় শুধু দূরের দিগন্ত নয়,
এখন কাছের সবকিছুকেও
আস্তে আস্তে ঝাপসা করে দিচ্ছে।

চোখের এক নিমিষে কেটে গেল এতগুলো বছর।
কেমন করে যে বদলে গেল চেনা সুর,
চেনা গানের তাল। যে সুরে একদিন
পাখি উড়ত আকাশের দিকে, আজ সে সুরে
শুধু পাতা ঝরে পড়ে মাটির বুকে
নিঃশব্দে, কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই।
প্রতিটি ঝরে পড়া পাতা যেন আমারই কোনো অংশ।

ফিরে যেতে খুব ইচ্ছে করে সেই শৈশবে—
যেখানে দুপুরের রোদ ছিল শুধু খেলার সঙ্গী,
রাতের চাঁদ ছিল গল্পের অমলিন পৃষ্ঠা।
কোনো হিসাব ছিল না, কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
শুধু ছিল খোলা মাঠ, অসীম আকাশ,
খোলা পুকুরে সাঁতার কাটা,
আর একটা হৃদয় যা কোনো সীমা জানত না।
আজ সেই হৃদয়ের ওপর চেপে বসেছে
দায়িত্বের ভারী ছায়া—
প্রতিটি পদক্ষেপে কাঁধ একটু একটু ভারী হয়,
যেন কেউ ধীরে ধীরে আমার ভেতরের আলো
নিভিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিনিধি হয়ে চলা এক ক্লান্ত নীরবতা—
যেন নদী তার গতি হারিয়ে শুধু
অভ্যাসের টানে বয়ে চলে।
কতদিন হলো আমি নিজের কণ্ঠস্বর শুনিনি?
কতদিন হলো আমি নিজের হাসি চিনতে পারিনি?

কিন্তু আয়নার এপাশে যে লোকটা দাঁড়িয়ে,
তাকে আমি রোজ ভুল বুঝি।
শরীরে বার্ধক্য এলেও মন তো একই রয়ে গেছে।
বুকের গভীর কোণে এখনো দামাল হাওয়া বয়—
হৈ-হুল্লোড়ের তৃষ্ণা, আড্ডার তৃষ্ণা
এখনো বেঁচে আছে অক্ষয় হয়ে।
সে হাওয়া আজও নাচতে চায় বৃষ্টিভেজা পথে।
আড্ডার টেবিলে এখনো খুঁজে পায়
পুরনো হাসি, পুরনো কথা—
যেন সময়ের কোনো ক্ষমতা নেই তাকে মুছে ফেলার।

মনের ভেতর এখনো জেগে আছে এক অদম্য বালক—
যে হার মানে না সময়ের কোনো শাসনে,
যে এখনো বিশ্বাস করে আকাশের রঙ
কখনো ফিকে হয় না।
সে এখনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে দূরে,
যেখানে দিগন্ত মেশে আকাশের সঙ্গে
নীলের অমলিন রঙে।
সে এখনো শোনে পাতার ফিসফিসানি, বৃষ্টির কথা,
আর রাতের নিস্তব্ধতায় খুঁজে পায়
নিজের অস্তিত্বের সেই পুরনো সুর।

মন তো হারায়নি তার যৌবনের উচ্ছলতা।
সে আজও তেমনি উন্মুখ, তেমনি অবাধ্য,
তেমনি চঞ্চল। কোনো অপরাধবোধের ছায়া
এসে নামেনি এখনো তার ওপর।
জীবনের হিসাবের খাতায় মন চিরকালই অমল—
শুধু আলো, শুধু হাওয়া, শুধু ভালোবাসা।
সে এখনো ভালোবাসতে চায় এমনভাবে
যেন কোনো শেষ নেই, কোনো বিদায় নেই।

একদিন হয়তো আসবে সেই অনিবার্য শেষ প্রহর।
নশ্বর এই মাটির শরীর নুয়ে পড়বে অবশেষে।
হাড়, রক্ত, শ্বাস—সব মিশে যাবে ধুলোর সঙ্গে।
তবুও এই পৃথিবীর আলো, হাওয়া, রূপের মায়ায়
প্রতিটা মুহূর্ত বেঁচে থাকবো আমি
অকৃত্রিম ভালোবেসে।
প্রতিটি সূর্যোদয়কে জড়িয়ে ধরবো দু’হাতে
যেন এটিই শেষ সূর্যোদয়।
প্রতিটি সন্ধ্যার আলোকে চুমু দেবো চোখের পাতায়
যেন এটিই শেষ সন্ধ্যা।
প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটায় শুনবো জীবনের সুর
যেন এটিই শেষ বৃষ্টি।

কারণ আমি জানি—আয়নাযর ওপাশে বয়সের ছাপ
থাকবে তার নিজের নিয়মে।
কিন্তু মনের ভেতরের মানুষটা চিরসবুজ।
জীবনকে ভালোবেসে যাওয়ার এই সুন্দর যাত্রায়
আমি আজও সেই আগের মতোই ব্যাকুল, অবুঝ।
আমি আজও দৌড়াতে চাই খোলা মাঠে।
আমি আজও হাসতে চাই কোনো কারণ ছাড়াই।
আমি আজও ভালোবাসতে চাই এমনভাবে
যেন সময়ের কোনো হিসাব নেই—
শুধু আছে অসীম মুহূর্ত, অসীম আলো,
আর একটা হৃদয় যা এখনো কাঁদে, এখনো হাসে,
এখনো ভালোবাসে।

তাই আয়নায় যখন দেখি অন্য এক মুখ,
আমি হাসতে হাসতে বলি—
তুমি শুধু শরীর।
আমি তো মন।
আমি তো সেই চিরসবুজ বাতাস
আমি তো সাগরের ছলছল উর্মি মালা
যে কখনো থেমে যায় না,
কখনো মরে যায় না।
যতদিন এই পৃথিবীতে আলো থাকবে,
যতদিন হাওয়া বইবে গাছের পাতায়,
যতদিন অঝোর বর্ষনে সিক্ত হবে প্রকৃতি,
যতদিন শীতের সকাল ঘিরে রাখবে ঘন কুয়াশা—
ততদিন আমি বেঁচে থাকবো সেই ভালোবাসায়,
যে ভালোবাসা কোনো বয়স মানে না,
কোনো সীমা জানে না।

কলমে: উদধি
২২.১০.২০২৬

রস দ্বীপের (Ross Island)গোপন দলিল।শেষ পর্ব ​"না! না! ম্যানহোলটা বন্ধ হয়ে গেছে!" সায়ন ব্যাকুল হয়ে ঢাকনাটায় ধাক্কা দিতে লা...
22/10/2026

রস দ্বীপের (Ross Island)
গোপন দলিল।

শেষ পর্ব

​"না! না! ম্যানহোলটা বন্ধ হয়ে গেছে!" সায়ন ব্যাকুল হয়ে ঢাকনাটায় ধাক্কা দিতে লাগল। কিন্তু ওপরের শত কেজির পাথরের ভার কনিষ্ঠ আঙুল পরিমাণ ও নড়ানো সম্ভব নয়। "আমরা মাটির নিচে জ্যান্ত কবর হয়ে গেলাম নাকি?!" তানিয়া প্যানিক অ্যাটাকে কাঁপতে শুরু করল।
​"শান্ত হ, তানিয়া! প্যানিক করিস না!" আবীর চারপাশের দেয়ালে টর্চের আলো ফেলে অন্য কোনো পথের সন্ধান করতে লাগল। "এই সুড়ঙ্গটা যদি সমুদ্রের নজরদারি ঘাঁটি হয়, তবে নিশ্চয়ই এর আরও একটা এক্সিট বা ভেন্টিলেশন শ্যাফট ছিল!" তারা সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্ত ধরে এগোতে লাগল। আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ পথ ধরে প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট হাঁটার পর তারা দেয়ালের এক কোণে দেখতে পেল একটি ঢালু সুড়ঙ্গপথ যা সোজা ওপরের দিকে উঠে গেছে। অত্যন্ত কষ্ট করে, একে অপরের হাত ধরে, পাথর আর মাটির ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যখন তারা বাইরে বেরিয়ে এল—তখন তারা সমুদ্রের একেবারে খাঁজের ওপরের এক বিপজ্জনক বুনো ঝোপের ভেতর!
​ধুলোমাখা শরীরে হাপাতে হাপাতে তারা যখন খোলা বাতাসে নিশ্বাস নিল, ততক্ষণে ওপরের আকাশ বদলে গেছে। পুবের বঙ্গোপসাগরের ওপর থেকে দিনের সব আলো মুছে গিয়ে নেমে এসেছে ঘুটঘুঁটে, নিশ্ছিদ্র কালোর ছায়া। সময়ের খেয়াল তাদের একদম ছিল না। ঘড়িতে তখন বাজছে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট!
​"সর্বনাশ হয়েছে..." সায়ন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ডুকরে উঠল। অ্যাবারডিন জেটিগামী পর্যটকদের শেষ চারটের ফেরি বহু আগেই রস দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে! জেটি পুরো জনমানবহীন। দ্বীপে পর্যটকদের আসার সমস্ত কোলাহল উধাও। কেবল চারপাশের ঘন জঙ্গলে ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র গর্জন, আর সমুদ্রের প্রকাণ্ড ঢেউগুলোর পাথরে আছড়ে পড়ার ভীতিকর শব্দ। পুরো রস দ্বীপ বা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস দ্বীপ এখন এক নির্জন, অন্ধকার, নীরব কঙ্কাল!
​"আমাদের ফোনগুলো দেখ!" তানিয়া কান্নার গলায় বলল।
​তিনজনের ফোনেই 'নো সার্ভিস'। কোনো মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল নেই।
​রাতের অন্ধকার ঘন হওয়ার সাথে সাথে দ্বীপের আবহাওয়ায় চরম পরিবর্তন এল। হুহু করে বুনো হাওয়া বইতে লাগল। ঘন বটগাছগুলোর ডালপালা একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে অদ্ভুত সব ভৌতিক শব্দ তৈরি করতে লাগল। চারপাশে ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশদের সেই ধসে পড়া দালানকোঠা আর হাসপাতালের হাড়গোড়। মাঝে মাঝে অন্ধকারের ভেতর থেকে স্পটেড ডিয়ার আর বুনো জন্তু জানোয়ারের তীক্ষ্ণ চিৎকার আর অদ্ভুত কোনো পাখির গুমরে ওঠা ডাক তাদের হূৎপিণ্ড থামিয়ে দেওয়ার জোগাড় করছিল।
​"আমরা এখন কী করব আবীর?" সায়ন একটা গাছের গুঁড়িতে বসে মাথা চেপে ধরল। "রাতভর এই আদিম জঙ্গলে আর শয়তানের মতো ভৌতিক ধ্বংসাবশেষের মাঝে আটকে থাকব? যদি কোনো বুনো বিষাক্ত সাপ বা অন্য কিছু থাকে?"
​আবীর তানিয়া আর সায়নকে কাছে টেনে এনে বসল। "ভয় পাবি না। আমরা দ্বীপের ওপেন কোস্টের কাছাকাছি থাকব। তোরা খেয়াল করিসনি—পোর্ট ব্লেয়ারের হোটেলে আমাদের ফেরির রিটার্ন টিকিটের হিসাব থাকে। আর জেটিতে পর্যটকের সংখ্যা না মিললে নেভি সার্ভিস অ্যালার্ট পাবেই।"
​প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি যুগের মতো কাটতে লাগল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হতে লাগল সেই কালরাত্রিতে। ওখান থেকে হেঁটে হেঁটে একটা সমতল জায়গায় এসে পৌঁছায় তারা। সেখানেই তিন বন্ধু একে অপরকে ধরে বসে রইল শীত ও আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে। অন্ধকার ধ্বংসাবশেষগুলোর আড়ালে মনে হচ্ছিল একশ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ কয়েদী আর ইতিহাস ছায়ামূর্তি হয়ে ঘুরঘুর করছে।
​রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটা।
​হঠাৎ করে সমুদ্রের বুকের কালো জলরাশি চিরে একটি প্রকাণ্ড সার্চলাইটের আলোর চাবুক এসে পড়ল রস দ্বীপের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ঠিক তাদের দিকে! বাতাসে ভেসে এল শক্তিশালী স্পিডবোটের মোটরের প্রকম্পিত গর্জন!
​“দিস ইজ ইন্ডিয়ান নেভি সি-পেট্রোল! রস দ্বীপে অনধিকার প্রবেশকারী বা আটকে পড়া পর্যটকরা যদি থেকে থাকেন, কোস্টাল জেটির দিকে আসুন! রিপিট, কোস্টাল জেটির দিকে আসুন!”
​"নেভি! নেভি এসেছে রে!" সায়ন চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল। তারা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে উন্মাদের মতো নাড়াতে নাড়াতে সমুদ্রের জেটির অভিমুখে দৌড়াতে লাগল। জেটিতে যখন স্পিডবোটটি এসে ভিড়ল, সেখান থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর (INS Jarawa) চারজন সশস্ত্র কম্যান্ডো এবং ডেক অফিসার দ্রুত নেমে এলেন। তাদের চোখেমুখে তীব্র বিরক্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ।
​"আপনারা কারা?!" অফিসার গর্জে উঠলেন। "আপনাদের জন্য পোর্ট ব্লেয়ারের কোস্টগার্ড থেকে পুরো নেভি পেট্রোল ইউনিট রাত থেকে সার্চ অপশনে নেমেছে! পুরো গ্রুপের মধ্যে কেবল আপনাদের তিনজনের কোনো এন্ট্রি ছিল কিন্তু রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছিল না! আইন অমান্য করে এই নিষিদ্ধ দ্বীপে রাত কাটানোর পরিণতি জানেন?"
​আবীর, সায়ন আর তানিয়া নিঃশর্তে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারা কোনো মিথ্যা বা অজুহাত বানানোর চেষ্টা করল না। আবীর হাতজোড় করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "স্যার, আমাদের শাস্তি আপনারা যা দেবেন মাথা পেতে নেব। আমরা সত্যি ভুল পথ ধরে ট্রেইল থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমরা কোনো অপরাধ করতে চাইনি... আমরা ভুমিকম্পের সময় মাটির নিচের এক গোপন ধসে পড়া সুড়ঙ্গে পড়ে গিয়ে আটকে গিয়েছিলাম।"
​"সুড়ঙ্গ?" ডেক অফিসার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। আবীর তার ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ থেকে জিংকের তৈরি কৌটো, ১৯৪৩ সালের সেই মোম-সিল মারা ঐতিহাসিক চিঠি আর প্রাচীন ম্যাপটি বের করে অফিসারের হাতে তুলে দিল। "স্যার, এগুলো চার্চের নিচের ভূগর্ভস্থ ভল্ট থেকে পাওয়া নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আর তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের আসল আর্কাইভ। দয়া করে এটা দেখুন।"
​অফিসার প্রথমে অবিশ্বাস্য চোখে কাগজগুলোর দিকে তাকালেন। তারপর নিজের পকেট থেকে টর্চ জ্বালিয়ে যখন নথির সিলমোহর এবং নেতাজির স্বহস্তে লেখা চিঠির প্রতিলিপি দেখলেন, তার হাত থমকে গেল। অফিসারদের গম্ভীর মুখের বিরক্তি এক মুহূর্তে উধাও হয়ে সেখানে বাসা বাঁধল চরম বিস্ময় ও শ্রদ্ধামিশ্রিত স্তম্ভিত ভাব!
​"মাই গড..." অফিসার ফিসফিস করে উঠে দাঁড়িয়ে আবীরদের দিকে তাকালেন। "আপনারা কি বুঝতে পারছেন স্রেফ ভুল করে পথ হারিয়ে আপনারা ভারতের ইতিহাসের কী অমূল্য সম্পদ উদ্ধার করেছেন?" অফিসার তাদের নিয়ে খুঁজতে বের হলো সেই সুরঙ্গের মুখের সন্ধানে। সারারাত ধরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর সেই ম্যানহোলের ঢাকনা খুঁজে পেল না তারা।
​ভোরের আলো যখন পোর্ট ব্লেয়ারের দিগন্তে ধীরে ধীরে ফুটতে শুরু করেছে, তখন নেভির বিশেষ টহলদারি বোটটি তিন বন্ধুকে নিয়ে সাবধানে অ্যাবারডিন জেটিতে এসে পৌঁছাল। সমুদ্রের জলে তখন ভোরের লালচে-সোনালি আলোর প্রতিফলন। নেভি কমান্ড্যান্ট তাদের সাথে হেঁটে এসে আন্তরিকভাবে হ্যান্ডশেক করলেন। উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া ও প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের হাতে সেই নথি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাদের সম্মানের সাথে ছাড়পত্র দেওয়া হলো। তানিয়া তার ক্যামেরার স্ক্রিনে সুড়ঙ্গে তোলা ছবিগুলো দেখছিল। সায়নের মুখে এখনো রাতের সেই আতঙ্কের চিহ্ন, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে এক অবিশ্বাস্য প্রাপ্তির ট্রাইয়াম্ফ (Triumph)। আবীর জেটিতে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো সমুদ্রের ওপারে ভেসে থাকা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস দ্বীপের দিকে তাকাল। ভোরের প্রথম আলোতে রস দ্বীপের বটগাছে ঢাকা ধ্বংসাবশেষগুলোকে আর ভৌতিক বা ভয়াল লাগছিল না; বরং মনে হচ্ছিল—শতাব্দীর অভিশাপ ও গোপন সত্যকে মুক্তি দিয়ে দ্বীপটি এখন একদম শান্ত, চিরন্তন ও চিরভাস্বর। সখের ট্রিপে এসে তারা যে রহস্যের মুখোমুখি হয়ে সত্য উন্মোচন করে এল, তা তাদের সারা জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে রইল।

সমাপ্ত

কলমে: উদধি

রস দ্বীপের (Ross Island)গোপন দলিল।চতুর্থ পর্ব "ওপরে কে?" সায়নের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে টর্চটা পেছনের সিঁড়ির দিকে ঘোর...
21/10/2026

রস দ্বীপের (Ross Island)
গোপন দলিল।

চতুর্থ পর্ব

"ওপরে কে?" সায়নের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে টর্চটা পেছনের সিঁড়ির দিকে ঘোরাতে যেতেই আবীর দ্রুত তার হাত চেপে ধরে আলোটা নিভিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে তারা নেমে এল ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে। কেবল তানিয়ার ক্যামেরার ছোট্ট লাল ইন্ডিকেটর লাইটটা পিটপিট করে জ্বলছে। তিনজনেরই বুকের স্পন্দন দ্রুততর হয়ে উঠেছে। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের ওপর থেকে মনে হলো একটি ভারী, কর্কশ মানুষের কণ্ঠস্বর ক্ষণিকের জন্য প্রতিধ্বনিত হলো—যা কোনো ট্যুরিস্টের গলা নয়, আবার নেভির কোনো সাধারণ নির্দেশও মনে হচ্ছে না! কেউ কি তবে তাদের অনুসরণ করছিল? পোর্ট ব্লেয়ারের সেই অ্যান্টিক শপের কোনো তথ্য কি অন্য কারোর কাছেও পৌঁছেছিল? অন্ধকারের ভেতরে দাঁড়িয়ে তিন বন্ধু স্পষ্ট অনুভব করতে পারল—রস দ্বীপের মাটির নিচের এই রহস্যময় সুড়ঙ্গটি কেবল ইতিহাসের এক রূপকথা নয়, এটি অত্যন্ত বাস্তব এবং চরম বিপজ্জনক এক ফাঁদ!

সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের মাথার ওপর সেই অজানা ভারী বুটের শব্দ আর খসখস প্রতিধ্বনি শুনে তিনবন্ধুর বুকের ভেতরটা যেন এক মূহুর্তের জন্য হিম হয়ে গেল। অন্ধকারের ভেতরে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। নিশ্বাস নেওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। মিনিট দুয়েক পর ওপরের সেই রহস্যময় শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই আবীর ফিসফিস করে বলল, "ওপরের ম্যানহোলটায় কেউ হয়তো কৌতূহলবশত হাত দিয়েছিল, কিংবা টহলদারি বুনো হরিণ বা শুয়োর ওটার উপর দিয়ে হেঁটে গেছে। "ম্যানহোলের ঢাকনা আসার সময় তো সায়ন বন্ধ করে দিয়েছিলি তাই না" আবীর জানতে চায়। যা-ই হোক না কেন, আমাদের এখন আর থামলে চলবে না।" তারা টর্চের তীব্র আলোর বলয় তৈরি করে সতর্ক পায়ে গভীর সুড়ঙ্গ ধরে এগোতে লাগল। প্রায় ১০০ গজ পথ অতিক্রম করার পর সংকীর্ণ সুড়ঙ্গটি হঠাৎ করেই একটি গোলাকার ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে গিয়ে শেষ হলো। ঘরটির ভেতরে পা রাখতেই গা শিউরে ওঠে। মাটির তলার বাসি পুরোনো গন্ধ, আর তার সাথে মিশে আছে মেটালের এক তীব্র তামাকুটে ঘ্রাণ। ঘরের এক কোণে ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে রয়েছে ভিক্টোরিয়ান যুগের কাঠ ও লোহা দিয়ে বানানো ফার্নিচারের কঙ্কাল। চারপাশের দেয়ালে জাপানি মিলিটারি আর্টলারির মরচে ধরা কিছু পুরোনো ক্যাসিং আর ব্রিটিশ আমলের সিরামিকের বাতি রাখার ব্র্যাকেট তখনও বিপজ্জনকভাবে ঝুলে রয়েছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাড়িয়ে তিনবন্ধুর নজর গিয়ে আটকে গেল ঘরের একেবারে মাঝখানে শক্ত গ্রানাইট পাথরের বেদির ওপর রাখা একটি বস্তুর দিকে। ওটা একটি বিশালাকার প্রাচীন আয়রন সেফ বা ধাতব ভল্ট। সমুদ্রের আর্দ্র বাতাসে লোহার উপরিভাগে প্যাটিনা আর মোটা মরচে পড়লেও তার দৃঢ়তা বিন্দুমাত্র কমেনি।
​"অবিশ্বাস্য...!" আবীর মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটুমুড়ে সেটার সামনে বসে পড়ল।
​তানিয়া ক্যামেরা প্রস্তুত করে হাতের হাই-পাওয়ারড ফ্লাশলাইটটা সরাসরি সেফের ওপর ফেলল। আবীর তার হাত দিয়ে ওপরের মোটা ধুলোর আস্তরণ আর জং সরাতেই একটি চকচকে মেটাল প্লেইট ফুটে উঠল। সেখানে অত্যন্ত স্পষ্টাক্ষরে খোদাই করা দুটি ঐতিহাসিক সাল—১৮৫৮ এবং ১৯৪৩!
​"১৮৫৮ হলো দণ্ড উপনিবেশ বা কালাপানি শুরুর বছর," আবীর উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে লোহাটা স্পর্শ করে বলল। "আর ১৯৪৩... তানিয়া, বুঝতে পারছিস?"
​"১৯৪৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস যখন এই রস দ্বীপে পা রেখেছিলেন!" তানিয়া উত্তেজনায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল। "নেতাজি এখানে এসে এই ঐতিহাসিক গভর্নমেন্ট হাউসে ভারতের স্বাধীন তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়েছিলেন এবং দ্বীপের নাম রেখেছিলেন 'শহীদ ও স্বরাজ দ্বীপ'! তার মানে ওই সময়েই এই গোপন প্রকোষ্ঠের সত্য সামনে এসেছিল!" সায়ন ব্যাকপ্যাক থেকে মেটাল স্প্যাচুলা বের করে আবীরের হাতে দিল। সেফটিতে একটি চার-সংখ্যার ভিক্টোরিয়ান অ্যানালগ লক সিস্টেম ছিল। আবীর তার পকেটে রাখা সেই পুরোনো চামড়ার স্মারকের ভেতরের কোডের সাথে মিলিমিটার মেপে কম্বিনেশন ঘুরিয়ে চেষ্টা করতে লাগল।
​১-৮-৫-৮... তারপর ১-৯-৪-৩...
​প্রতিটি ঘূর্ণনে মরচে ধরা গিয়ারগুলোর শুষ্ক ঘর্ষণশব্দ নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল। হঠাৎ এক বিকট ভারী 'ক্ল্যাংক' শব্দে ভেতরের শতাব্দী প্রাচীন স্প্রিংগুলো লাফিয়ে উঠল এবং ভারী মেটালের দরজাটি ধীরে ধীরে সামনে খুলে গেল! ঘরে যেন সময়ের এক নতুন রূপ উদ্ভাসিত হলো। সেফের ভেতরে কোনো সোনা বা রত্ন ছিল না। সেখানে রাখা ছিল সিসা দিয়ে আবৃত, সম্পূর্ণ মরচে-রোধী একটি ধাতব জিংকের কৌটো। অতি সাবধানে আবীর সেই কৌটোটি বের করে আনল। সায়ন আলো ধরে রইল, আর আবীর তার সিল করা ক্যাপটি মোচড় দিয়ে খুলল। কৌটোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল লাল রেশমি কাপড়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোড়ানো কয়েক পাতা প্রাচীন হস্তলিখিত নথি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিছু গোপন ম্যাপ এবং একটি মোম-সিল মারা ঐতিহাসিক চিঠি! চিঠির ওপর লেখা ব্রিটিশ সামরিক ইন্টেলিজেন্সের লোগো এবং নিচে নেতাজির নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকারের বিশেষ সিলমোহর।
​তানিয়া দ্রুত ক্যামেরার লেন্স সেদিকে ফোকাস করল। আবীর কাপড়ের ভাজ খুলে হাত দিয়ে চিঠিটি সোজা করে কাঁপা কাঁপা গলায় পড়তে শুরু করল:
​"This underground complex was constructed by British Royal Engineers (1863-70) using penal laborers to guard India's maritime secrets and deep sea maps. During the Japanese evacuation of 1943, these files were rescued under the direct order of Netaji Subhash Chandra Bose..."

​পড়া শেষ হতেই তিনবন্ধুর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। চিঠির বয়ানে স্পষ্ট লেখা ছিল—ব্রিটিশরা এই দ্বীপে কেবল বিলাসিতার শহর গড়ে তোলেনি; এটি ছিল বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে নজরদারি চালানোর সর্ববৃহৎ সামরিক ঘাঁটি। আর ১৯৪৩ সালে নেতাজি এই দ্বীপে এসে এই গোপন সুড়ঙ্গের সন্ধান পেয়েছিলেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে তৎকালীন ভারতের ভূখণ্ডগত নিরাপত্তার এই মূল ম্যাপগুলো এখানেই নিরাপদ আমানত হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন! "মাই গড..." সায়ন চোখ বড় বড় করে বলল। "আমরা স্রেফ একটা সাধারণ ট্রিপে এসে ইতিহাস বইয়ের হারিয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় পাতাটা ছুঁয়ে ফেলেছি!"
​হঠাৎ করেই তাদের এই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দকে মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দিল এক ভয়াবহ কাণ্ড।
​হুট করে সুড়ঙ্গের ওপর থেকে এক তীব্র, কানে তালা লাগা শব্দ হলো—ধপ! ক্যাঁচক্যাঁচ... বোম!
​পুরো পাতালঘরটা কেঁপে উঠল। ছাদ থেকে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়তে লাগল শত বছরের পুরনো ইট আর ধুলো।
​"কী হলো?!" তানিয়া চিৎকার করে উঠল। "মনে হয় ছোট খাটো একটা ভুমিকম্প হলো" সায়ন ভিত সন্ত্রস্ত হয়ে ফিসফিস করে বললো। "দ্রুত চলো! ওপরের ম্যানহোলের কাছে চলো!" আবীর সেই ঐতিহাসিক জিংকের কৌটো আর চিঠিগুলো নিজের ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে পুরে নিয়ে ছুট দিল। তিন বন্ধু অন্ধকারের ভেতর প্রাণপণ দৌড়ে আবার যখন চার্চের নিচের সেই সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাল, তাদের রক্ত জল হয়ে গেল। ওপর থেকে আসা একফালি আলোর রেখাও আর দেখা যাচ্ছে না! অতি প্রাচীন বটগাছের একটি বিশাল ঝুরি আর চার্চের ধসে পড়া লাল ইটের বিরাট স্তূপের নিচে ম্যানহোলের ভারী লোহার ঢাকনাটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে! ওপরে বিশাল ইটের স্তূপ ধসে পড়েছে!
চলবে...

(পাঁচ পর্বে সমাপ্য হবে)

রস দ্বীপের (Ross Island)গোপন দলিল।তৃতীয় পর্ব বুনো ঝোপঝাড় আর বিষাক্ত ফার্নের জঙ্গল পেরিয়ে তিন বন্ধু যখন প্রেসবিটেরিয়ান চ...
20/10/2026

রস দ্বীপের (Ross Island)
গোপন দলিল।

তৃতীয় পর্ব

বুনো ঝোপঝাড় আর বিষাক্ত ফার্নের জঙ্গল পেরিয়ে তিন বন্ধু যখন প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের ধ্বংসাবশেষের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। ১৮৬৩ সালে গথিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ঐতিহাসিক প্রেসবিটেরিয়ান চার্চটি আজ এক নির্জন নিঃসঙ্গ কঙ্কাল। ছাদ ধসে পড়েছে বহু বছর আগে। আকাশ থেকে আসা একফালি আলোর রেখা বটগাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে ইটের ওপর এসে পড়েছে, যা পুরো জায়গাটিতে এক মায়াবী আলো-ছায়ার বৈপরীত্য তৈরি করেছে। লাল ইটের দেয়ালে জমে আছে পুরু সবুজ শ্যাওলা। প্রকাণ্ড বট ও ফাইকাস গাছের শিকড়গুলো রক্তচোষা অক্টোপাসের মাংসল বাহুর মতো চার্চের অলটার, খিলান আর স্তম্ভগুলোকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরেছে, যেন কোনো প্রাচীন অভিশাপ এই উপাসনালয়টিকে স্থবির করে রেখেছে। "অসাধারণ... একেবারেই অবিশ্বাস্য!" তানিয়া মোহাচ্ছন্ন গলায় ফিসফিস করে উঠল। সে তার ক্যানন ক্যামেরার লেন্স অ্যাডজাস্ট করে ধসে পড়া অলটার (Altar)-এর নিখুঁত কিছু শট নিতে শুরু করল। চার্চের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলার গন্ধের সাথে যেন মিশে আছে শতাব্দী প্রাচীন বাসি বাতাস। তানিয়া অলটারের কাছে জমে থাকা লাল ইটের স্তূপ আর বটগাছের শেকড়ের জটলার আরও গভীরে গিয়ে একটি ভালো অ্যাঙ্গেল খোঁজার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ করে তার বুট জুতোটা শক্ত এবং অনমনীয় ধাতব কিছু একটার সাথে সশব্দে ধাক্কা খেল।
​"আহ্! কিসের সাথে হোঁচট খেলাম রে?" তানিয়া যন্ত্রণায় হালকা কুঁকড়ে গিয়ে নিচু হয়ে নিজের পা চেপে ধরল।
​"কী হলো, তানিয়া? আঘাত পেলি নাকি?" আবীর আর সায়ন তৎক্ষণাৎ কৌতূহলী ও চিন্তিত মুখে তার কাছে ছুটে এল। "না, বড় কোনো চোট লাগেনি... কিন্তু মাটির নিচে বটের শিকড়ের জটলায় শক্ত ধাতব কিছু একটা আছে," তানিয়া নিজের ক্যামেরার স্ট্র্যাপ সামলে নিয়ে জায়গাটির দিকে নির্দেশ করল। আবীর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নিজের ব্যাকপ্যাকের পকেট থেকে তার ট্যুরিস্ট নাইফ আর মাল্টি-টুল কিটটা বের করে মাটির আস্তরণ, ঝরা পাতা এবং বটগাছের মাঝারি আকারের শিকড়গুলো ছাঁটতে শুরু করল। সায়ন তার আইফোনের হাই-ইনটেনসিটি টর্চ জ্বালিয়ে আলো ফেলল সেই নির্দিষ্ট স্থানে। কয়েক মিনিটের একটানা প্রচেষ্টায় পলিমাটি আর বুনো গাছের মূলের আস্তরণ সরতেই উন্মোচিত হলো এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! ঝরা পাতার নিচে লুকিয়ে ছিল প্রায় তিন ফুট বাই তিন ফুটের এক বিশালাকার, মরচে ধরা শক্ত ঢালাই লোহার বর্গাকার ঢাকনা বা ম্যানহোল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তীব্র ক্ষয় সত্ত্বেও সেই লোহার পাতের ওপর স্পষ্টভাবে ভেসে উঠেছে জোড়া প্রতীক! ওপরে খোদাই করা রয়েছে ব্রিটিশ রয়্যাল আর্টলারির ক্রাউন লোগো, আর তার ঠিক পাশেই প্যাটিনা পড়া ধাতুর ওপর ক্ষোদিত রয়েছে ১৯৪৩ সালে জাপানিদের ব্যবহৃত ইম্পেরিয়াল আর্মির সূর্যমুখী সিল এবং কিছু কঞ্জি (Kanji) অক্ষর।
​"ভাইরে ভাই! সেই অ্যান্টিক শপের বৃদ্ধ লোকটা তো একবিন্দুও বাজে বকেনি!" আবীর উত্তেজিত হয়ে স্বগতোক্তি করে উঠল, তার চোখের তারা ছানাবড়া। "এই তো সেই প্রবেশপথ! ১৮৬৩ সালে চার্চের নিচে দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের রক্তপানি করে খোদাই করা গোপন সুড়ঙ্গ! আর এই প্রতীক প্রমাণ দিচ্ছে—ব্রিটিশদের বানিয়ে যাওয়া এই আস্তানা ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে দখলদার জাপানি বাহিনীও তাদের স্ট্র্যাটেজিক হাইডআউট হিসেবে পুনর্ব্যবহার করেছিল!"
​"কিন্তু এটা এত বছর ধরে কারো চোখে পড়েনি কেন?" সায়ন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
​"কারণ ট্যুরিস্টদের নজর থাকে মূল রাস্তা আর ছবি তোলার সৌন্দর্যে। তা ছাড়া বটগাছের এই দৈত্যাকার শেকড় এমনভাবে একে ঢেকে রেখেছিল যে, আজ তানিয়ার দুর্ঘটনাবশত হোঁচট না লাগলে হয়তো আরও এক শতাব্দী এটা এভাবেই চাপা পড়ে থাকত," আবীর দ্রুত জবাব দিল। আবীর আর সায়ন দুজনে মিলে তাদের মাল্টি-টুলসের মেটাল লিভারগুলোকে ম্যানহোলের প্রান্তে আটকে পুরো গায়ের জোর প্রয়োগ করল। শতাব্দী প্রাচীন জং ধরা কবজাগুলো তীব্র ধাতব ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে প্রতিবাাদের ঝড় তুলল, যেন কোনো ঘুমন্ত দৈত্য জেগে উঠছে। ধুলো আর শুকনো মাটি ঝরে পড়ার সাথে সাথে ভারী লোহার ঢাকনাটা ইঞ্চিখানেক সরে গিয়ে ফাঁক তৈরি করল। মুহূর্তের মধ্যে সেই সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে বের হয়ে এল শতাব্দী ধরে আটকে থাকা এক দমবন্ধ করা, তীব্র স্যাঁতসেঁতে, গন্ধ আর পচা মাটির চটচটে বাতাস।
​মোবাইলের পাওয়ারফুল টর্চের আলো সেই ফাঁক গলিয়ে নিচের দিকে ফেলতেই দেখা গেল—পাহাড় কেটে বানানো খাঁজকাটা পাথরের সিঁড়ি সোজা ধেয়ে গেছে মাটির গভীর আঁধারে। ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া সেই সিঁড়ির শেষ কোথায়, তা ওপর থেকে বোঝা অসম্ভব। সায়নের বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল। সে দ্রুত তার হাতের স্মার্টওয়াচের দিকে তাকাল—বিকেল ৩টা ২০ মিনিট!
​"শোন আবীর, তানিয়া... আমাদের মাথায় কিন্তু স্পষ্ট সময়সীমা ঝুলছে," সায়নের গলায় চরম শঙ্কার সুর ফুটে উঠল। "মাত্র ৪০ মিনিট বাকি! চারটের সময় পুরো আইএনএস জারাওয়ার (INS Jarawa) সি-পেট্রোল সেন্ট্রিরা দ্বীপ স্ক্যন করা শুরু করবে। তা ছাড়া আমাদের কাছে কোনো অফিশিয়াল পারমিট নেই। চার্চের এই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে যদি আমরা নেমে আটকে যাই বা নিচে বিষাক্ত কোনো গ্যাস থাকে—আমাদের বাঁচানোর মতো কেউ থাকবে না!"
​"মাত্র দশটা মিনিট, সায়ন! প্লিজ!" তানিয়া উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে নিজের ক্যামেরার পোর্টেবল প্যানেল লাইট অন করল। "ভাব একবার! আমরা রস দ্বীপের এমন এক অজানা পাতালঘরে পা রাখতে যাচ্ছি, যা গত আশি বছরে কোনো পর্যটক কেন, হয়তো কোনো সাধারণ মানুষ চোখেও দেখেনি! এটা জীবনের সেরা ট্রাভেল এক্সপেরিয়েন্স হতে চলেছে!" আবীর ততক্ষণে তার ব্যাকপ্যাক থেকে মাস্ক বের করে মুখে এঁটে নিয়েছে। "চিন্তা করিস না সায়ন, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আসা বাতাসের চাপে বোঝা যাচ্ছে নিচে অন্য কোনো দিক দিয়ে হাওয়া চলাচলের ছোট ফাঁক বা ভেন্টিলেশন আছে—অর্থাৎ কার্বন মনোক্সাইডের ঝুঁকি কম। আমরা ঠিক পাঁচ থেকে সাত মিনিট নিচে থাকব, শুধু দেখে নেব সুড়ঙ্গটা কোনো দিকে গেছে এবং ম্যাপে দেখানো মেটালের সেই ট্রাঙ্ক বা কোড পাওয়ার কোনো আলামত আছে কিনা। তারপরই সোজা ওপরে উঠে আসব।" সায়নের অসম্মতি প্রকাশ করার আগেই তানিয়া আর আবীর সাবধানে হাতের উপর ভর রেখে আধখোলা ম্যানহোলের ভেতরের পাথুরে সিঁড়িতে পা বাড়াল। অগত্যা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের ভীতি ঝেড়ে ফেলে সায়ন তাদের ঠিক পেছনে নেমে পড়ল। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই মনে হলো তারা অন্য এক জগতে এসে প্রবেশ করেছে। ওপরে রস দ্বীপের মৃদু দিনের আলো একদম উধাও। টর্চের তীব্র আলোর বলয় ছাড়া চারপাশ এক নিশুতি, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত। সুড়ঙ্গটি প্রায় ছয় ফুট উঁচু এবং চার ফুট চওড়া। পাহাড়ের শক্ত বেলেপাথর কেটে এটি তৈরি করা হয়েছে। দেয়ালে ছেনি আর হাতুড়ির গভীর ক্ষতচিহ্নগুলো আজও কালাপানির কয়েদীদের সেই অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের নিঃশব্দ সাক্ষ্য বহন করছে। প্রতি দশ ফুট অন্তর দেয়ালে ছোট ছোট কুলুঙ্গি করা রয়েছে, যেখানে এককালে ব্রিটিশদের কেরোসিনের বাতি বা জাপানি সৈন্যদের মশাল রাখা হতো। তারা নিঃশব্দে এগোতে লাগল। পায়ের নিচে জমে থাকা পলিমাটি আর পুরোনো ধ্বংসাবশেষের মচমচ শব্দ ছাড়া সুড়ঙ্গে আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ করে আবীর সুড়ঙ্গের মাঝপথে থমকে দাঁড়াল।
​"কী হলো, থামলি কেন?" তানিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
​"চুপ!" আবীর হাত দিয়ে দুজনকে থামার ইশারা করল।
​তারা সবাই শান্ত হয়ে দাঁড়াতেই চারপাশের নীরবতা চিরে এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল।
​টপ... টপ... টপ...
​সুড়ঙ্গের ছাদ থেকে নোনা জল ঝরে পড়ার শব্দ। কিন্তু না, কেবল জলের শব্দ নয়! তাদের ঠিক মাথার ওপরের অংশে—সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের কাছাকাছি এলাকা থেকে যেন খুব হালকা, ভারী জুতোর মচমচ শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে নিচের দিকে নেমে আসছে!
চলবে...

(পাঁচ পর্বে সমাপ্য হবে)

রস দ্বীপের (Ross Island)গোপন দলিল।দ্বিতীয় পর্ব আবীর মুচকি হাসল। "ল্যাফা বানাতে তোকে কে বলছে সায়ন? আমরা তো আইন ভাঙব না। ...
19/10/2026

রস দ্বীপের (Ross Island)
গোপন দলিল।

দ্বিতীয় পর্ব

আবীর মুচকি হাসল। "ল্যাফা বানাতে তোকে কে বলছে সায়ন? আমরা তো আইন ভাঙব না। আমরা কেবল তাদের চোখের সামনের সেই অদৃশ্য পথটা খুঁজে বের করব, যা সবাই দেখেও দেখে না। ১৯৪৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস যখন এই দ্বীপে পা রেখে স্বাধীন ভারতের প্রথম তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেছিলেন গভর্নমেন্ট হাউসে, তার আগে তিনি সেখানে কিছু সময় অতিবাহিত করেছিলেন। ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া কিছু অতি গোপন ফাইল আর ম্যাপ জাপানিদের থেকে মুক্ত করে তিনি এই দ্বীপেরই এক সুনির্দিষ্ট স্থানে নিরাপদ করে রেখে যান। সেই তথ্য সংকেতরূপেই এই কাগজের গায়ে ল্যাটিন কোডে খোদাই করা আছে।"
​তানিয়া নিজের ক্যামেরার লেন্স ক্যাপটা সশব্দে আটকে দিল। তার ভেতরে ইতিহাস অনুসন্ধানী ব্লগারের রক্ত নেচে উঠেছে। সে বলল, "সায়ন, তুই অত ভয় পাচ্ছিস কেন? আমাদের উদ্দেশ্য তো কোনো প্রত্নসম্পদ চুরি করা নয়! আমরা কেবল সত্যটা উদ্ঘাটন করতে চাই। যদি আমরা সত্যি ওই গোপন সংকেতের সূত্র ধরে কোনো হারিয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গের সন্ধান পাই, তবে ভেবে দেখিস—এটা শুধু আমার ব্লগের ট্র্যাফিক বাড়াবে না, আন্দামানের ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে আলোর মুখ দেখাবে!"
​সায়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ভালো করেই জানে—একবার যখন আবীর কোনো রহস্যের পেছনে ছোটে, আর তানিয়া তার সঙ্গী হয়, তখন তাকে পেছনে ফেলে রাখা অসম্ভব।
​"ঠিক আছে," সায়ন নিজের ওয়ালেট বের করে কফির বিলটা টেবিলে রাখল। "কিন্তু আমার দুটো শর্ত আছে। এক, চারটের আগেই আমাদের যেকোনো মূল্যে ফেরিতে উঠে পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরতে হবে। আর দুই, যদি সামান্যতম নিরাপত্তার ঝুঁকি দেখি, আমরা ঠিক সেখান থেকেই ব্যাকট্র্যাক করব। কোনো হিরোইজম চলবে না।"
​"ডিল!" আবীর হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। সে সাবধানে চামড়ার পুরোনো মানচিত্রটা নিজের ওয়াটারপ্রুফ কেসে পুরে নিল।
​বাইরে তখন বোকার মতো আছড়ে পড়ছে তরঙ্গমালা। দূর থেকে কুয়াশা ও জলকণার মধ্য দিয়ে আবছা দেখা যাচ্ছে রস দ্বীপের সেই সবুজ রেখা—যেন সমুদ্রের বুক থেকে জেগে থাকা এক রহস্যময় কঙ্কাল, যা শতাব্দী ধরে ধারণ করে আছে রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা, কয়েদীদের আর্তনাদ আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চরম ও অপ্রকাশিত ঐতিহাসিক সত্য। তিন বন্ধু হাঁটা দিল অ্যাবারডিন জেটির দিকে। তাদের রস দ্বীপের (Ross Island) যাত্রা কেবল এক সাধারণ ট্যুরিস্ট ট্রিপ হিসেবে শুরু হলেও, তারা জানত না—আজকের এই দিনটি তাদের জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও কৌতূহলোদ্দীপক রহস্য উন্মোচনের সাক্ষী হতে চলেছে।

অ্যাবারডিন জেটি থেকে ছাড়ে কাঠের কাঠামো আর মরচে পড়া লোহার পাটাতনের ছোট ফেরিটি। পলি পড়ে ঘোলা হয়ে যাওয়া জেটির কাছের জল ছাড়িয়ে ফেরি বোটটি যখনই খোলা সমুদ্রের বুকে আছড়ে পড়ল, অমনি নোনা জলের রঙ বদলে গেল গভীর নীল আর ফিরোজায়। ফেরির ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল তিন বন্ধু। চারপাশের বাতাস তখন আন্দামান সাগরের উন্মুক্ত আর্দ্রতা আর লোনা গন্ধে ভরপুর। মাত্র আধা নটিক্যাল মাইলের পথ—কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত পারাপারেই যেন সময়ের গতি শ্লথ হয়ে আসছিল। চোখের সামনে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল রস দ্বীপ, যা এখন সরকারি দলিলে 'নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস দ্বীপ'। দূর থেকে মনে হয় সমুদ্রের বুক ফুঁড়ে জেগে রয়েছে ঘন একখণ্ড নীল-সবুজ জঙ্গল। কিন্তু সেই সবুজ শুধুই প্রকৃতির নয়; তা যেন এক ঐতিহাসিক বিলাসপুরীর ওপর প্রকৃতির নির্মম বিজয়গাথা। ফেরি যখন ধীরগতিতে দ্বীপের জেটিতে ভিড়ল, তখন পর্যটক গাইডদের হাঁকডাক, ক্যামেরার ক্লিক আর শিশুদের কৌতূহলী চিৎকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু জেটির কাঠের তক্তায় পা রাখতেই আবীরদের গায়ে এসে লাগল এক অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়া। দ্বীপে প্রবেশের মুখে প্রাচীন কাঠের জেটির ভগ্নাবশেষের পাশে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় এখানে এসে থমকে গেছে।
​"দেখেছিস দৃশ্যটা?" তানিয়া তার ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে বলে উঠল। সে একের পর এক শট নিচ্ছিল। "সামনে চার্চ আর ভিক্টোরিয়ান আমলের তোরণগুলোর ওপর যেভাবে বিশাল বট আর ফাইকাস গাছের আঁকাবাঁকা, মোটা শিকড়গুলো জালের মতো জড়িয়ে ধরেছে—মনে হচ্ছে যেন বিরাট কোনো অক্টোপাস হাজার বছর ধরে এই আস্ত শহরটাকে চুষে খাচ্ছে!" দ্বীপের ভেতরের আবহাওয়া একদম আলাদা। প্রখর রোদের তাপ বড় বড় মেহগনি, ফাইকাস, রেইনট্রি আর বটবৃক্ষের ঘন ছাতার মতো পাতাবৃত ডালপালায় বাধা পেয়ে মাটিতে এসে পৌঁছাচ্ছে আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত আলপনা হয়ে। শ্যাওলা পড়া প্রাচীন লাল ইটের দেওয়ালগুলোকে চিরে ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে প্রকাণ্ড গাছের শিকড়। একসময়ের বলরুম, বেকারি, হাসপাতাল, বাজার, প্রিন্টিং প্রেস এবং সুইমিং পুল—যা দিয়ে একদা ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ কর্তাদের এক আরামদায়ক স্বর্গ তৈরি হয়েছিল—আজ তা নিছকই ভগ্নস্তূপ। ধ্বংসাবশেষের ফাঁকফোকর দিয়ে অনায়াসে ও নির্ভয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে চিত্রা হরিণের দল (Spotted Deer)। কোনো গাছের উঁচু ডালে বসে গম্ভীর গলায় ডাক দিচ্ছে ময়ূর, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অচেনা জলচর ও বুনো পাখিদের ডানা ঝাপটানির শব্দ।
​"ভাবা যায়?" তানিয়া এক বিশালাকার গথিক আর্চের লাল ইটের ভগ্নস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। "যাকে একসময় 'পূর্বের প্যারিস' (Paris of the East) বলা হতো—যেখানে সন্ধেবেলা অর্কেস্ট্রা বাজত, টেনিস কোর্টে হাসির শব্দ উঠত, সুস্বাদু পেস্ট্রির গন্ধে বেকারি মেতে থাকত—তার পেছনের সত্যটা কত বীভৎস ছিল! ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস অফিসারদের এই বিলাসিতার বিনিময়ে ঝরেছে হাজার হাজার ভারতীয় কয়েদীর রক্ত আর ঘাম। 'কালাপানি'র বন্দিদের দণ্ড হিসেবে জঙ্গল পরিষ্কার করতে হতো, ইট বইতে হতো, আর চাবুকের আঘাতে এই প্রাসাদ বানাতে হতো।"
​"আর আজ প্রকৃতির বিচার দেখ," সায়ন চারপাশে চোখ বুলিয়ে শান্ত গলায় যোগ করল। "যে রাজপ্রাসাদ তারা তৈরি করেছিল অমরত্বের আকাঙ্খা করে, সেই সব রাজকীয়তা আজ বুনো জঙ্গল আর হরিণদের বাসস্থান। সময় সত্যিই কাউকে ক্ষমা করে না।" আবীর কিন্তু এদের কথাবার্তায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারছিল না। তার দৃষ্টি তখন হাতের সেই মানচিত্র আর ডিসপ্লেতে খোলা জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের দিকে। সে সাবধানে জেটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত থেকে পুরোনো চিফ কমিশনারের বাসভবন বা 'গভর্নমেন্ট হাউস'-এর দিকে যাওয়ার মূল পাকা ট্যুরিস্ট ট্রেইলটির দিকে তাকাল।
​"শোন," আবীর দুজনকে আরও কাছে ডেকে নিচু স্বরে বলল। "ট্যুরিস্টদের মূল ট্রেইলটা ডানদিকে ঘুরে চলে গেছে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোর গ্যালারি আর বেকারি মিউজিয়ামের দিকে। ওই পথে গেলে আমরা সাধারণ ভিউ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাব না। কিন্তু অ্যান্টিক শপের সেই চামড়ার ম্যাপে স্পষ্ট সংকেত দেওয়া আছে—আমাদের যেতে হবে বাম দিকের ওই ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে থাকা পুরোনো চার্চের পেছনের ঢালু পাহাড়ি খাঁজটির দিকে।" সায়ন আবীরের চোখ অনুসরণ করে বাঁদিকে তাকাল। সেখানে বিশাল বিশাল রেইনট্রির ঘন ছায়া এবং ফার্ন ও কাঁটাঝোপের এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছে। তার মাঝখান দিয়ে একটা ছোট জং ধরা লোহার শৃঙ্খল এবং তার ওপর ঝোলানো একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তার লাল সাইনবোর্ড ঝুলছে:
“RESTRICTED AREA: NO ADMITTANCE WITHOUT NAVAL PERMISSION”
(সংরক্ষিত এলাকা: নৌবাহিনীর অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ)।

​সায়নের চশমার পেছনের চোখ দুটো উদ্বেগে ছোট হয়ে এল। "আবীর! তুই কি বদ্ধ পাগল? ওখানে স্পষ্ট লাল হরফে নৌবাহিনীর ওয়ার্নিং নোটিশ ঝুলছে! আইএনএস জারাওয়ার পেট্রোল টিম পুরো দ্বীপে অন-ডিউটি থাকে। ধরে ফেললে কোনো ক্ষমা নেই, সোজা কাস্টডি!"
​"আরে ভাই, একটু রিল্যাক্স কর তো!" তানিয়া সায়নের কাধে হালকা ধাক্কা দিয়ে আবীরের পক্ষ নিল। "পর্যটকদের জন্য তো এরা সব জায়গায় লাল বোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। চার্চের ওই পেছনের ঢালু অংশে পুরোনো স্থাপত্যের কত দারুণ এঙ্গেল পাব বল তো? তা ছাড়া আবীর যখন বলছে ওখানে গোপন পথ বা নকশার কিছু থাকতে পারে, তখন মাত্র দশটা মিনিটের জন্য ট্রেইল ছাড়লে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। ছবি তুলে আমরা তো আবার মূল রাস্তায় চলে আসব!"
​"তানিয়া ঠিকই বলেছে, সায়ন," আবীর মৃদু হেসে সায়নের কাঁধে হাত রাখল। "আমরা তো কোনো জাতীয় সম্পত্তি ধ্বংস করতে যাচ্ছি না। শুধু হারিয়ে যাওয়া একটা ইতিহাসকে চোখ দিয়ে দেখে আসতে চাই। তোদের কি মনে হয়, ব্রিটিশরা নিজেদের প্রশাসনিক গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সাধারণ ট্রেইলের ওপর সব বানিয়ে রেখেছিল? আসল সত্য লুকিয়ে থাকে সবসময় সাধারণের চোখের সীমানার বাইরে।" সায়ন অগত্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ভালো করেই জানে, বন্ধুদের এই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর ক্ষ্যাপামি আটকানো এখন তার সাধ্যের বাইরে। আবীর চারপাশে একবার সতর্ক চোখে তাকিয়ে দেখে নিল। সাধারণ ট্যুরিস্টদের ভিড় তখন রস দ্বীপের বেকারি ধ্বংসাবশেষের কাছে ছবি তুলতে ব্যস্ত, আর ডিউটিতে থাকা নেভি গার্ডরা জেটির পেছনের পুলিশ বুথের দিকে নজর রাখছে। উপযুক্ত সুযোগ বুঝতেই আবীর কাঠের রেলিং ও দড়ির‌ বাধাটি টপকে ঢালু ঝোপঝাড়ের ভেতর পা বাড়াল। তার দেখাদেখি তানিয়া ক্যামেরাটা শক্ত করে ধরে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ল, আর সায়ন অসন্তোষজনক মুখে চারপাশ দেখতে দেখতে তাদের পিছু নিল। ঘন বুনো ফার্ন, বিষাক্ত কাঁটাঝোপ আর শতাব্দীর পুরোনো গাছের শেকড় ঠেলে তারা যতই এগোতে লাগল, চারপাশের পরিবেশ ততই নিস্তব্ধ ও ছায়াবৃত হতে শুরু করল। সমুদ্রের বাতাসের তোড় সেখানে গাছের পাতার বাধার মুখে পড়ে এক অদ্ভুত সোঁ সোঁ শব্দ তৈরি করছে। পায়ের নিচে মচমচ করে ভাঙছে কতকালের শুকনো ডালপালা আর পচা পাতার মোটা আস্তরণ। মাত্র কয়েক গজ এগোতেই মূল পর্যটন কেন্দ্রের সব হট্টগোল যেন এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। তিন বন্ধু এখন দাঁড়িয়ে আছে গভীর, অন্ধকারময় ও রহস্যাবৃত এক অতীতে—যেখানে প্রতিটি ইটের ফাটল আর বুনো গাছের শিকড়ের নিচে নীরব হয়ে অপেক্ষা করছে রস দ্বীপের সবচেয়ে অন্ধকার ও চাঞ্চল্যকর সত্য।
চলবে...

(পাঁচ পর্বে সমাপ্য হবে)

Address

Khulna
9100

Telephone

+8801911173656

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Green Movement posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Green Movement:

Shortcuts

Share

Category