30/09/2026
তবে কি মৃৎশিল্পও ইতিহাসের পথে?
ঢাকার অদূরে ভুলতা কুমারপাড়ায় গিয়েছিলাম মৃৎশিল্প আর সেখানকার মানুষের বর্তমানটা একটু কাছ থেকে দেখতে। ভেবেছিলাম, হয়তো এখনো কোথাও কুমারের চাকা ঘুরছে, মাটির গন্ধে ভরে আছে উঠোন, রোদে শুকোচ্ছে সারি সারি মাটির হাঁড়ি-পাতিল।
কিন্তু গিয়ে মনে হলো—আমি যেন কোনো জীবন্ত শিল্পের কাছে নয়, বরং তার শেষ অধ্যায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি।
একসময় যে উঠোনে কুমারের চাকা ঘুরত, মাটির দলা থেকে জন্ম নিত হাঁড়ি, কলসি, পাতিল কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় অসংখ্য জিনিস—আজ সেখানে কোথাও রান্নাঘর, কোথাও ফাঁকা উঠোন। কোথাও পড়ে আছে পুরোনো কাঠামো, ভাঙা সরঞ্জাম আর কিছু অব্যবহৃত স্মৃতি।
ব্রজকৃষ্ণ পাল ও শুশীল পালের বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে কথা হলো। দুজনের কথাতেই যেন একই দীর্ঘশ্বাস।
ভালো মাটি নেই।
নদীমাতৃক এই দেশে, যেখানে মাটি ও নদী একসময় মানুষের জীবন আর জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, আজ সেই মাটিই যেন দুর্লভ। কোথাও মাটি পাওয়া গেলেও তার দাম এত বেশি যে সেই মাটি দিয়ে তৈরি জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। শহরে মাটির পাত্রের চাহিদা হয়তো আছে, কিন্তু সেই চাহিদা আর কুমারের জীবনের নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারছে না।
ফলে ব্রজকৃষ্ণদের মতো অনেকেই আর নিজের হাতে মাটি কেটে, মেখে, চাকার ওপর তুলে নতুন কোনো পাত্র তৈরি করেন না। দূর-দূরান্ত থেকে তৈরি জিনিস কিনে এনে হাটে বিক্রি করেন। পুরোনো পেশাটাকে একেবারে ছেড়ে দিতে পারেননি—কারণ এর সঙ্গে শুধু জীবিকা নয়, জড়িয়ে আছে বংশের ইতিহাস, পরিচয় আর বহু প্রজন্মের স্মৃতি।
কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম?
তাদের কেউ আর এই পেশায় ফিরতে চায় না।
হয়তো ফিরবেও না।
শুশীল পালের বৃদ্ধা মা আক্ষেপ করে বললেন—
“কতজন তো কত কিছু লিখল। কিন্তু আমাদের তো কিছুই হলো না।”
কথাটা খুব সাধারণ। অথচ তার ভেতরে যেন কয়েক প্রজন্মের জমে থাকা অভিমান।
কত গবেষক এসেছেন, কতজন ছবি তুলেছেন, কত গল্প লিখেছেন—কিন্তু একটি হারিয়ে যেতে বসা পেশাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু গল্প কি যথেষ্ট?
একসময় বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবন মাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। মাটির হাঁড়িতে রান্না, কলসিতে পানি, মাটির পাত্রে খাবার—এসব ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কুমারের চাকা ছিল সেই জীবনেরই একটি চলমান প্রতীক। একটি পরিবারের হাতে তৈরি একটি মাটির পাত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত শ্রম, দক্ষতা, ঐতিহ্য এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এক অদৃশ্য জ্ঞান।
আজ সেই চাকা থেমে গেলে শুধু একটি পেশা হারাবে না।
হারাবে একটি জীবনধারা।
একটি কারুশিল্প।
একটি লোকজ জ্ঞান।
একটি সামাজিক ইতিহাস।
মসলিন একদিন হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের চোখের সামনে। আজ তার গল্প আমরা ইতিহাসের পাতায় পড়ি। হয়তো কোনো একদিন বাংলার মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রেও আমরা একইভাবে বলব—“একসময় এখানে কুমারের চাকা ঘুরত।”
ভুলতা কুমারপাড়ার এই নিস্তব্ধ উঠোনে দাঁড়িয়ে তাই মনে হলো, ইতিহাস সবসময় যুদ্ধ, রাজা কিংবা প্রাসাদের মধ্যেই তৈরি হয় না। কখনো কখনো ইতিহাস তৈরি হয় একজন কুমারের হাতে, এক টুকরো মাটিতে, একটি ঘুরতে থাকা চাকায়।
আর ইতিহাস হারিয়েও যায় খুব নীরবে।
হয়তো খুব শিগগিরই মৃৎশিল্পও আমাদের জীবনের অংশ না হয়ে শুধু স্মৃতির অংশ হয়ে যাবে—মসলিনের মতো, একটি হারিয়ে যাওয়া বাংলার গল্প হয়ে।