08/07/2024
আবেদ আলী গ্রামের একজন সাধারন মানুষ, কুলির কাজ করে টেনেটুনে সংরার চলে। সামাজিক বৈষ্যম্যের কারনে হোক আর দারিদ্রের কারনে হোক তিনি তো লেখাপড়া শিখে তথাকথিত মেধাবী হতে পারেননি। তিনি দেখেন তার চারপাশে অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে রাতারাতি। তিনি উপায় খুঁজতে থাকেন। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঢাকায় পাড়ি জমান। সেখানে ড্রাইভিং শিখে চাকুরি নেন পিএসসি তে। একেবারে পিএসসি চেয়ারম্যানের ড্রাইভার হয়ে বসেন। তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়, তিনিও রাতারাতি কোটিপতি বনে যান।
আবেদ আলীকে নিয়েই নিউজে নিউজে সয়লাব নেট দুনিয়া। কিন্তু যদি তুলনা করেন তবে আবেদ আলীরা খুব ছোট প্লেয়ার। তিনি শুধু নিজের ভাগ্য বদলের উপায় খুঁজে পেয়েছিলেন, অন্যদের ভাগ্য বদলের মাধ্যম হয়েছিলেন। তিনি কাদের জন্য প্রশ্নপত্র আউট করেছেন? যারা তার মতো রাতারাতি ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখে তাদের জন্য। সরকারী চাকুরী বা স্পেসিফিক্যালি বলতে গেলে বিসিএস এখন ছাত্ররা এতো সিরিয়াসলি নেয় কেন? দেশসেবার জন্য? সিরিয়াসলি? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, পড়াশুনা, জ্ঞান-গবেষনা বাদ দিয়ে সবাই লাইব্রেরীতে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে গাইড বই পড়ে। কেন পড়ে? তারাও বেনজীর, মতিউর হয়ে ভাগ্য বদলাতে চায় রাতারাতি। আবেদ আলীর সামনে তাহলে কোন পথা খোলা? আবেদ আলী কী একা? বিসিএস দেয়ার বয়স হওয়ার পর থেকেই শুনে আসছি প্রশ্ন আউট হয়, টাকার বিনিময়ে নিয়োগ হয়। তাহসানের মা জেড এন তাহমিদা খাতুন যখন পিএসসি'র চেয়ারম্যান ছিলেন তখন থেকেই এই রেওয়াজ জোরেশোরে শুরু হয়েছিলো।
দেশের চারিদিকে যে যেভাবে পারে কোটিপতি হচ্ছে। এখন আর লাখ টাকা কোন হিসাবে ধরা হয় না। কোটি টাকার নীচে কেউ গননায় ধরে না। এখানে মেধা দিয়ে, যোগ্যতা দিয়ে মানুষ ঠকানোর কারবার করতে হয়, সময়মতো সুযোগ না ধরতে পারলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। সেজন্য অন্য কারো ক্ষতি হচ্ছে কিনা, অন্য কেউ বঞ্চিত হচ্ছে কিনা, অন্য কেউ মারা যাচ্ছে কিনা সেগুলো দেখতে গেলে আপনার জন্য বাংলাদেশ নামক ভূখন্ড না। টাকা বানানোর অনেক মেশিন আছে বাংলাদেশে। রাজনীতি, ভূমিদস্যুতা, জালিয়াতি, দুর্নীতি, লুটপাট, হায় হায় ব্যবসা, চেতনা ব্যবসা, ধর্ম ব্যবসা, কমিশন ব্যবসা, দালালি এগুলো সহজ তরিকা।
আপনি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ব্যবসা করবেন? চাকুরী খুঁজবেন? আপনার স্টার্ট-আপ দাঁড় করাবেন? পথে নেমে দেখুন সেগুলো কতটা কঠিন বাংলাদেশে। প্রায় অসম্ভব। আপনার পূঁজি, মেধা, আইডিয়া, থিওরি, প্ল্যান খেয়ে দেয়ার জন্য ওৎ পেতে বসে আছে হাজার হাজার মানুষ। আমি বাংলাদেশে বসে নিজের স্বল্প মেধা খাটিয়ে এক সময় বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা রেমিট্যান্স নিয়ে গেছি। দেশ কী করেছে? প্রতি পদে পদে হয়রানি করেছে, অসহযোগীতা করেছে, ইনকাম ট্যাক্সে ঘুষ দিয়ে হয়রানি থেকে বাঁচতে হয়েছে। সেজন্য বাংলাদেশ এখন আর নিয়মতান্ত্রিক পথে ধনী হওয়ার দেশ নয়। এখানে ভালো পোস্টিং মানে যেখানে ঘুষের সুযোগ বেশী এমন জায়গা, এখানে ভালো অফিসার মানে যিনি কম ঘুষ নিয়ে, কম হয়রানি করে বড় বড় অনিয়ম করার সুযোগ দেন তিনি, এখানে ভালো মানুষ মানে লুটপাটের টাকা মসজিদ, মাদ্রাসায় যারা অঢেল ঢালতে পারবে তারা।
যাদেরকে ছোট থাকতে মেধাবী বলে সীল মেরে দেয়া হয় তাদের জীবনের একটা বড় সময় কেটে যায় পড়াশুনা করে। এখন এই পড়াশুনা করে মেধাবী তকমা পাওয়া কুতুবরা বেছে নেয় বিসিএস বা অন্য সরকারী চাকুরীতে ঢোকার সুযোগ, এ ছাড়া সমাজের মানুষ তাদের মূল্য দেয় না। অনেক পড়াশুনা করে আপনি যদি এলাকায় অনেক দান করতে না পারেন, এলাকার মানুষের, আত্মীয় স্বজনের অন্যায় কাজ ক্ষমতার জোরে অনুমোদন না করতে পারেন, এলাকার অযোগ্য মানুষকে চাকুরী না দিতে পারেন তবে আপনি হবেন এলাকার সবচেয়ে বড় অপদার্থ। সামাজিক সম্মান পেতে হলে আপনাকে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা বানাতে হবে।
আজ যারা বড়লোক তাদের কোন না কোন প্রজন্ম কোন এক সময় টাকা বানিয়েছে সেটা হোক বৈধ বা অবৈধ যে কোন উপায়ে। দরিদ্র, মধ্যবিত্ত পরিবার স্বপ্ন দেখে তাদের ছেলেমেয়েরা তাদের পরিবারের সেই খুটিটি হোক যার মাধ্যমে তাদের উত্তর প্রজন্ম ধনীদের খাতায় নাম লেখাবে। বাংলাদেশে যেখানে নানান সহজ তরিকা আছে সেখানে মেধা, যোগ্যতা, পরিশ্রম, প্রতিযোগীতা দিয়ে কে নিজের ভবিষ্যতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চায়? সেজন্য ২/৪ বছর কঠিনভাবে গাইড পড়ে, প্রশ্ন কিনে তারা বিসিএস অফিসার হতে চায়, কোটা বাতিল করার আন্দোলন করে নিজের পথ পরিষ্কার রাখতে চায়। কারন তারা জানে বিসিএস অফিসার হয়ে গেলে তাদের জীবনে ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আর কোন দুঃশ্চিন্তা নেই। সুন্দরী বউ, অঢেল টাকা, অনেক ক্ষমতা সবই পাবে।
আর পাবে কী? সম্মান! আপনি সৎভাবে আয় করে এলাকার মানুষকে, মসজিদ, মাদ্রাসায় কত দান খয়রাত করতে পারবেন? আপনাকে মানুষ নিন্দা করবে, সমালোচনা করবে, বলবে বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে আপনি অপদার্থ, আপনার সঙ্গে কেউ মেয়ে বিয়ে দিবে না। ওদিকে সহজ তরিকায় কোটিপতি বনে যাওয়া মানুষেরা লক্ষ লক্ষ টাকা বিলাতে পারে। সেজন্য এলাকায়, ধর্মীয় নেতাদের কাছে, মিডিয়ায় তারা খুব সম্মানিত থাকে সবসময়। তো এই যখন অবস্থা তখন কে না চাইবে সহজ তরিকাগুলো বেছে না নিতে? বিসিএসওয়ালারা পারলে, ব্যবসায়ীরা পারলে, রাজনীতিবিদরা পারলে আবেদ আলীরা কেন পারবে না? তাদের স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? তারাও যে উপায়েই হোক নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাইবে। পুরো সমাজ ব্যবস্থা যে পথে হাটছে সেখানে একজন আবেদ আলী বা একজন আফজাল কেন পিছে পড়ে থাকবেন? তিনি বরং দৌড় দিয়ে এগিয়ে আছেন, সেটাকে তো এই সমাজে যোগ্যতা হিসাবে দেখবেন, সমালোচনা কেন করছেন আপনারা? তিনি তো চাইলেই বিসিএস দিয়ে মতিউর, বেনজীর, বিপ্লব, জিয়াউল হতে পারবেন না, কারন তার লেখাপড়া নেই, তিনি বিসিএস দিতে পারেননি। আবেদ আলী থেকে উপরে উঠুন, যাদের আপনারা নিয়োগ দিয়েছেন, যাদেরকে আপনারা প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠিয়েছেন দেশ শাসনের জন্য তাদের আমলনামা দেখুন। আমলনামায় সাদা পাতা পাবেন? সবই দেখা যাবে কালো আর কালো।
সেজন্য গ্রামের এক স্বপ্নবাজ আবেদ আলী, আফজাল, আরাভ খান এদের দিকে আর আঙুল তোলার সুযোগ নেই। পারলে সমাজকে আগে বদলান।