14/06/2020
বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা করোনাকালে অমানবিক আচরণ করছেন। তাঁদের অর্থলিপ্সার নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং তাঁরা একের পর এক অসত্য আর মিথ্যা কথা বলছেন। গার্মেন্টস মালিকরা করোনার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত গত ৩২ দিনে অন্তত দশটি দণ্ডনীয় অপরাধ করেছেন। যে অপরাধগুলোর জন্য তাঁদের শাস্তি হতে পারে। গার্মেন্টস মালিকরা বিত্তশালী এবং তাঁরা প্রত্যেকে বিপুল অর্থ সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা শ্রমিকদেরকে ঠকাচ্ছেন। শ্রমিকদেরকে জিম্মি করে তথাকথিত বিদেশি অর্ডার বাতিল হয়ে যাবে- এরকম জুজুর ভয় দেখিয়ে সরকারি আইন, নীতি এবং জনস্বাস্থ্য বিধি লঙ্ঘন করছেন এবং সেই সাথে গোটা দেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। বাংলাদেশে যদি এরপর করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়, সেজন্য দায়ী থাকবেন শুধুমাত্র গার্মেন্টস মালিকরা। আসুন দেখে নেই গার্মেন্টস মালিকদের দশটি অপরাধ কি কি-
১. ২৬ মার্চ সাধারন ছুটি ঘোষণার পরেও অনেক গার্মেন্টস কারখানা খোলা ছিল এবং এখানে তাঁরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল। অনেক গার্মেন্টস মালিক পিপিই বা মাস্ক তৈরি করছে বলে গার্মেন্টস খোলা রাখলেও, আসলে সেই সময়ে তাঁরা তাঁদের নিজস্ব অর্ডারের কাজগুলো করছিল।
২. ২৬ মার্চ পর্যন্ত গার্মেন্টসগুলো খোলা ছিল। অথচ অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিকরাই মার্চ মাসের বেতন (যেটা এপ্রিলে দেবার কথা ছিল) সেটা দেননি। বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় আন্দোলন করলে গার্মেন্টস মালিকরা নানা অজুহাত দেখিয়েছেন। গার্মেন্টস মালিকরা ৩ মাস শ্রমিকদের বেতন দিতে পারবে না সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য? সবথেকে বড় কথা ২৬ মার্চ পর্যন্ত শ্রমিকরা কাজ করার পরেও কেন বেতন দেবেন না, এটাও আরেকটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
৩. সরকারি প্রণোদনা শ্রমিকদের একাউন্টে দেয়ার কথা বললে গার্মেন্টস মালিকরা নানা ধরণের টালবাহানা শুরু করেছে। সরকার যখন করোনার কারণে সারাদেশে ছুটি ঘোষণা করে, তখন প্রথম যে শিল্পের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা দেয়, তা ছিল গার্মেন্টস শিল্প। তাঁদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এই প্রণোদনার টাকা গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ করা হবে। এরপরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় যে, এই টাকা সরাসরি শ্রমিকদের একাউন্টে যাবে এবং শ্রমিকদের যে মোবাইল একাউন্ট, সেই একাউন্টে টাকা পাঠানো হবে। গার্মেন্টস মালিকদের কাছে শ্রমিকদের যে তালিকা এবং তাঁদের মোবাইল ব্যাংক একাউন্ট তা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। গার্মেন্টস মালিকরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং নানারকম টালবাহানা দেখাতে থাকেন। প্রশ্ন হলো যে, কেন তাঁরা সরকারি নির্দেশনা বা বিজ্ঞপ্তি মানবেন না, কেন টাকা তাঁদেরকে দিতে হবে? তাঁর মানে কি শ্রমিকদের টাকা আত্মসাতের যে পুরনো অভ্যাস, সেই অভ্যাস তাঁরা আরেকবার চর্চা করতে চান?
৪. ৫ এপ্রিল সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে গার্মেন্টস খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে। বাণিজ্য মন্ত্রী নিজেই একজন গার্মেন্টস মালিক। তাঁরা তথাকথিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে গার্মেন্টস চালুর সিদ্ধান্ত নেন। এটি সরকারি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সংক্রমণ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই কাজটি করা হয়েছে। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৫. যখন এই গার্মেন্টস খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, তখন সরকারি নির্দেশনা বা সরকারি কোনরকম বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা না করে সরাসরি টেলিফোনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলো। হুমকি দেয়া হলো অন্যথায় তাঁদের চাকরি চলে যাবে। চাকরি হারানোর ভয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকরা সামাজিক যোগাযোগ বা বিছিন্নতার নিয়মের তোয়াক্কা না করে যে যেভাবে পারে ঢাকার দিকে ছুটে আসলো এবং বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের একটি বড় ভীতি সৃষ্টি হলো, এজন্য দায়ী গার্মেন্টস মালিকরা।
৬. এই গার্মেন্টস মালিকরা যখন গার্মেন্টস খুলে দিল, তখন সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী এর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন এবং প্রতিক্রিয়ার পর গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদেরকে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলো। প্রশ্ন হলো যে, শ্রমিকরা কোথায় ফিরে যাবে? একদিকে গণপরিবহন বন্ধ, তাঁরা পায়ে হেঁটে এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে কারখানায় এসেছিল এখন তাঁরা ফিরবে কিভাবে- এমন প্রশ্নের উত্তর গার্মেন্টস মালিকদের কাছে নেই। এটাও একটি দণ্ডনীয় অপরাধ করেছে আমাদের গার্মেন্টস মালিকরা।
৭. এফবিসিসিআই -এর বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো যে গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমূখী কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করা হবে এবং এজন্য একটি গাইডলাইন করতে হবে। এফবিসিসিআই-এর সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন যে, এই গাইডলাইন তৈরি করার জন্য তাঁরা একটি এক্সপার্ট প্যানেল তৈরি করবেন। কিন্তু এই গাইডলাইন বা এফবিসিসিআই -এর সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত রূপ হবার আগেই আবার গার্মেন্টস মালিকরা গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো এবং সাথে সাথে প্রায় ১ হাজার গার্মেন্টস খুলে দেয়া হলো। এতে সরকারী কোন নির্দেশনা নেই, এটা সরকারি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
৮. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়ে গার্মেন্টস মালিকরা মিথ্যাচার করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়ে তাঁরা বলেছেন যে, শুধুমাত্র ঢাকার শ্রমিক দিয়ে গার্মেন্টসগুলো চালানো হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সমস্ত গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষ থেকে সকল শ্রমিকদের টেলিফোন করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, অবিলম্বে কারখানায় যোগ না দিলে তাঁরা চাকরি হারাবে। এরকম মিথ্যাচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ বটে।
৯. কোন গার্মেন্টসেই সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি এখনো মানা হচ্ছেনা। গায়ে ঘেঁষে এবং যেভাবে তাঁরা ঢুকছে, বেরোচ্ছে তাতে সামাজিক সংক্রমণের ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এটাও সংক্রমণ আইন অনুযায়ী অপরাধ।
১০. সরকারের নির্দেশ সত্ত্বেও অনেক গার্মেন্টস মালিক শ্রমিকদের ছাঁটাই করেছে এবং চাকরীচ্যুত করেছেন- এটা অপরাধ।
এরকম একটি দেশে দুটি আইন থাকতে পারেনা। গার্মেন্টস মালিকরা দেশে প্রচলিত আইন কানুনের উর্ধ্বে হতে পারেনা। তাঁরা সবকিছুকে তোয়াক্কা করতে পারেনা। তাই অবিলম্বে গার্মেন্টস মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নেয়া দরকার, তেমনি তাদের কারণে যদি করোনা মহামারি তৈরি হয় বা পরিস্থিতির অবনতি হয়- সেজন্য অবশ্যই দায় গার্মেন্টস মালিকদের নেয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।