16/12/2023
ঢাকার ফুসফুস হিসেবে খ্যাত বলধা গার্ডেনে সূর্য আলোর অভাবে থেমে আছে সূর্যঘড়ি
রিপোর্ট সাইফুল : রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততাকে বর্তমান এই সময়ে ছুটি দেওয়ার কোনো সুযোগ-ই আমাদের অধিকাংশের হচ্ছে না। এভাবেই নগর জীবনে প্রকৃতির সাথে আমাদের অনেকের দেখাও হয় না বহুদিন। সেই সাথে রুচিশীলতার প্রশ্নও আমাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে সবখানে টানেও না। নিছক ভুল কোনো ধারণার কারণে হলেও হয়তো আমরা বলধা গার্ডেন সহ নানা পার্ক বিনোদন কেন্দ্রে পরিবার সন্তান নিয়ে যেতে আগ্রহী হই না। সেই কল্পিত ভুল চিন্তার ভাঁজ ভেঙ্গেছে আমার। কর্তৃপক্ষের রুচিশীল ব্যবস্থাপনায় রাজধানীর বলধা গার্ডেন হয়ে উঠেছে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্থান। পুরান ঢাকার ফুসফুস হিসেবে খ্যাত বলধা গার্ডেনে নিশ্চয়ই প্রকৃতিপ্রেমিদের মন ছুয়ে যাবে। গাছের শিক্ষা বা বৃক্ষ, লতা, উদ্ভিদ নিয়ে যারা জানতে আগ্রহী তাদের তৃষ্ণা পূরণে বলধা গার্ডেন হাতছনি দিয়ে ডাকছে। অন্যদিকে ব্যস্ত নগরীতে পরিবার পরিজন নিয়ে মানসিক পরিতৃপ্ত হতে চাইলেও পুরান ঢাকার ফুসফুস হিসেবে খ্যাত বলধা গার্ডেন সবার ঘুরে আসা দরকার। আশা করি অবশ্যই আপনার মন ভরে যাবে। পরিবারসহ নিরিবিরিলি সময় অতিবাহিত করুন। সূর্যঘড়ি হয়তো কখনো দেখেননি এজন্য হলেও চলে আসুন রাজধানীর বলধা গার্ডেনে। তবে সূর্যের আলোর অভাবে থেমে আছে বলধার সূর্যঘড়ি। খনিকটা সূর্য সোজা রেখায় আসলে তখন সে প্রাণটা ফিরে পায়। ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখানে নাগরিকদের অবহেলার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আজকে মনোরম এই বলধা গার্ডেন সম্পর্কে প্রিয় পাঠক আপনাকে আরও কিছু ভালো লাগার তথ্য দিবো।
“ঢাকা’র অফিসে আসুন”
Explore Bangladesh with us..
Call on What's app : +8801978222646
বলধা গার্ডেনের বর্তমান সম্মানিত কিউরেটর তাছলিমা খাতুন একান্ত সাক্ষাতে বলেন, রাজধানীর বলধা গার্ডেন মূলত পুরান ঢাকার ফুসফুস হিসেবেই খ্যাত। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে আমরা বলবো, আমাদের এই বলধা গার্ডেনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল শিক্ষা, গবেষণা ও জিনপুল কনজারভেশন করা। কনজারভেশন এর আক্ষরিক অর্থ হলো সংরক্ষণ। অর্থাৎ, প্রকৃতির ইকোসিস্টেমকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থাদি।
এই বলধা গার্ডেন বাংলাদেশের একটি দর্শনীয় স্থান, যা ঢাকা জেলার অন্তর্গত। এটি রাজধানী ঢাকার পুরাতন অংশ হিসাবে পরিচিত। ঢাকার ওয়ারীতে ১৯০৯ সালে স্থাপন করা হয় এই বলধা গার্ডেন। এখানকার বিশেষত্ব হল; এই উদ্ভিদ উদ্যানটিতে প্রচুর দূর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। তদানীন্তন ঢাকা জেলার (বর্তমান গাজীপুর জেলার) বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী বলধা গার্ডেনের সূচনা করেন। তিনি দু’টি উদ্যান তৈরি করেন - প্রথম উদ্যানটির নাম রাখেন “সাইকী” এবং পরবর্তিতে তৈরি করা হয় দ্বিতীয় উদ্যান “সিবলী”। নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর কোনো এক সময়ে এ দু’টি উদ্যানকে সম্মিলিতভাবে বলধা গার্ডেন নামে আখ্যায়িত করা হতে থাকে। ৩.৩৮ একর জায়গার উপর এই উদ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। নরেন্দ্র নারায়ণ এখানে একটি পারিবারিক জাদুঘরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
‘সূর্যঘড়ি’ কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে সোজা কথায় বলা যায়, সূর্যের আলোর সাহায্যে যে ঘড়ির সময় নির্ণয় করা হয় সেটাই সূর্যঘড়ি। দেশে দেশে সূর্যঘড়ি বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। বলধা গার্ডেনে ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেশের সম্ভবত একমাত্র সূর্যঘড়িটি রয়েছে।
এই বলধা গার্ডেনের পূর্ব দিকের সুউচ্চ ভবনের কারণে আটকা পড়েছে আলো আসার পথ। তাই আলোর অভাবে সকালে কাজ করে না শতবর্ষী বলধা গার্ডেনের সমবয়সী সূর্যঘড়িটি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্য যখন মাথার ওপর উঠতে শুরু করে তখনই কেবল সক্রিয় হয় সময় দেখার প্রকৃতিনির্ভর এই প্রাচীন মাধ্যম। আবার বিকেল গড়ানোর আগেই গাছের ছায়া আর পশ্চিম দিকের অন্যান্য স্থাপনার কারণে উদ্যানের আলো দ্রুত মরে আসে। তাই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও বিকেল চারটার পর ঘড়ির কার্যকারিতা আর থাকে না।
সোজা কথায় বলা যায়, সূর্যের আলোর সাহায্যে যে ঘড়ির সময় নির্ণয় করা হয় সেটাই সূর্যঘড়ি। ইতিহাস বলছে, এটাই হচ্ছে সময় দেখার জন্য মানুষের তৈরি প্রথম প্রকৃতিনির্ভর মাধ্যম। আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মিসর ও ব্যাবিলনে এমন ঘড়ির উৎপত্তি হয়েছিল। আর ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের জৌলুশ বাড়ানো এই ঘড়ি স্থাপন করা হয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার সময়েই। সেই ১৯০৯ সালে, বলধা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর উদ্যোগে।
ঘড়িটার অবস্থান বলধা গার্ডেনের সিবলি (প্রকৃতির দেবী) অংশে। এখানকার মাঝের রাস্তা বাগানটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। বাগানে ঢুকে এই রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলে হাতের বামে পড়বে শঙ্খনদ পুকুর। আর ডান পাশে রট আয়রন দিয়ে ঘেরা একটা অর্ধবৃত্তাকার সিমেন্টের স্থাপনা, যার পশ্চিম থেকে পুবে ঢালু হয়ে আবার উঁচু হয়ে উঠেছে। সেখানে সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত দাঁগ কেটে সময় লেখা আছে। মাঝ বরাবর একটি লোহার রড। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে পশ্চিমে যেতে থাকলে সেই রডের ছায়া ক্রমে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় নির্দেশ করে। সূর্য পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায় আর রডের ছায়া পশ্চিম থেকে পূর্বে যায়। সেই ছায়া দেখে বলে দেওয়া যায় কয়টা বাজে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর দেখা যায়, রডের ছায়া বেলা ১ টার ঘরে স্থির হয়ে আছে। এ সময় হাতঘড়িতে সময় দেখাল তার চেয়ে দুই মিনিট বেশি। তবে সূর্যঘড়ির মাঝের অংশে চিহ্নিত সময়ের দাঁগগুলো মুছে গেছে। এ সময় স্কুল পালিয়ে উদ্যানে আসা কয়েক কিশোর ঘড়িটার সামনে থমকে দাঁড়ায়। নিজেদের মুঠোফোনের ঘড়ির সময়ের সঙ্গে সূর্যঘড়ির সময় মিলে যাওয়ায় উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে তাদের চোখে-মুখে।
কথা হয় উদ্যানের মালি হাফিজুলের সাথে। তিনি এখানে কাজ করছেন ৬ বছর ধরে। তিনি বলেন, উদ্যানের পূর্ব অংশের উঁচু ভবনটার কারণে সকালের আলো ঘড়ি পর্যন্ত পৌঁছায় না। তবে রোদ থাকলে বেলা ১১টার পর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই ঘড়িতে সময় দেখা যায়।
অন্য আরও সবার থেকে জানা যায়, এই ঘড়ি নিয়ে নতুন দর্শনার্থীদের মধ্যে এখনো আগ্রহ কাজ করে। এ সময় ঘড়ির মাঝের অংশে মুছে যাওয়া সময়ের চিহ্নগুলো সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বলা হয়, ‘এটা আমরাও লক্ষ করেছি। ঘড়িটায় নতুন করে রং করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’
উদ্যানের ভেতরে শঙ্খনদ লাগোয়া দোতলা বাড়ির নাম ‘জয় হাউস’। পুরোনো কাঠামোতে দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা লোহার, সামনে তিন দিকে খোলা বারান্দা। সেখানে দাঁড়িয়ে একনজরেই পুরো বাগানের প্রাকৃতিক শোভা দেখে নেওয়া যায়। জয় হাউসে বসেই বলধা গার্ডেনের ক্যামেলিয়া ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ক্যামেলিয়া’। এর বারান্দা থেকে সূর্যঘড়িটাও হয়তো তাঁর নজর এড়ায়নি! কর্তৃপক্ষের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পুকুরে মাছের খেলা মন ভরিয়ে দেয়। পুকুর পাড়ে রাজা-রাণী, মন্ত্রী-বর্গ এবং তাদের আলিশান বসার স্থান আজও দর্শনার্থীদের মন ছুয়ে যায়। ব্যস্ততার মাঝে হলেও একটি দিন রাজধানীর বলধা গার্ডেন ঘুরে দেখুন।
কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে :
বলধা গার্ডেন
এই গার্ডেনের দুইটি আফ্রিকান টিউলিপ, পারুল, কৃষ্ণ বট, এ্যামহাসটিয়া, এ্যারো পয়জন গাছ ও তাজবা সহ অনেক বিরল প্রজাতির গাছ। ফার্ন হাউজ, সূর্যঘড়ি এবং জমিদারের পূত্র ও জমিদারের সমাধি। ‘সাইকী’ অংশ (এই সাইকী অংশে নীল, সাদা, গোলাপি জাতের শাপলা ভরা শাপলা হাউজ, (প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত) প্রবেশ করেই ডান ও বাম পাশে দেখা যাবে হলুদ, দেশী বিদেশী ক্যাকটাস ও অর্কিড। আরও আছে হংস লতা গাছ, স্বর্ণ বিরল প্রজাতি গাছ গাছড়া। বলধা গার্ডেনের ‘সিবলি অংশ’ দর্শনার্থীদের জন্য অশোক, জ্যাকুইনিয়া, হৈমন্তি, প্যাপিরাস, উলট চন্ডাল, উসটেরিয়া প্রভৃতি।
প্রতিদিন খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে ১২টা, আর বিকাল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত।
টিকেটের বিবরনী :
প্রতিজন - ২০/- (বিশ) টাকা। শিক্ষার্থী (অনুমোদন স্বাপেক্ষে) প্রতিজন -১০/- (জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও বলধা গার্ডেনের জন্য প্রযোজ্য)। অপ্রাপ্ত বয়স্ক (পাঁচ) টাকা। শিশু (দশ বছর পর্যন্ত বয়স) প্রতিজন-৫/- (পাঁচ) টাকা।
জেনে রাখা ভালো :
১. বাগানে সূর্যাস্তের পর থাকা নিষেধ।
২.সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ নিষেধ ।
৩. গাছের ফুল, ফল ছেড়া, ডাল ভাঙ্গা বা অন্য কোনো ক্ষতি সাধন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৪. গাছে পোকা ও ছত্রাক নাশক বিষ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে ।
৫. অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু খাবেন না ।
৬. জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান একটি শিক্ষা ও গবেষণা মূলক প্রতিষ্ঠান। গাছপালা সম্পর্কে জানার জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন।
৭. উদ্যানের ভিতর আগুন জ্বালানো, মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করা, যেকোনো বন্য প্রাণী ধরা বা মারা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৮. গবাদি পশু-ছাগল, ভেড়া, গরু, ঘোড়া ইত্যাদি প্রবেশ করানো এবং জলাশয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কাজ হিসাবে গণ্য হইয়া থাকে।
৯. ধুমপান সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ।
১০. উদ্যানে শালীনতা বজায় রাখুন।
১৬ ডিসেম্বর ২০২৩
ঢাকা।