09/11/2023
#নিশিকন্যা
মেঘনা নদীর তীরে ছোট একটা শহরে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছি।
স্কুলের ছেলেমেয়েদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, আয়োজকরা খুব খাটাখাটুনি করে আয়োজন করেছেন। অসংখ্য ছোট ছোট বাচ্চা-কাচ্চারা পুরস্কার নিতে এসেছে, আমিও পুরস্কার দিতে দিতে মোটামুটি এক্সপার্ট হয়ে গেছি। বাচ্চারা আগে পুরষ্কারটা নেবে নাকি আগে হ্যান্ডশেক করবে সেটা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে, আমি সেগুলো মিটিয়ে দিই। দিশেহারা টাইপের বাচ্চাগুলোর নাম জিজ্ঞেস করে সার্টিফিকেটের সাথে মিলিয়ে নিই এবং যাদের বাবামায়েরা ছেলেমেয়ের পুরস্কার গ্রহণের দৃশ্যের ছবি তোলার জন্যে ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত ছবিটা ঠিকমতো না তুলছেন ততক্ষণ পর্যন্ত পুরস্কারটা ধরে রেখে বাচ্চাটাকে স্টেজে আটকে রাখি। এই ধরনের অনুষ্ঠান সাধারণত শুরু হয় দেরি করে এবং কখনোই সময়মতো শেষ হয় না। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম যে আয়োজকরা ঠিক সময়মতো অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলেছেন— আমি হাতে কিছু সময় রেখেছিলাম
এবং সেই পুরো সময়টুকু এখন উদ্বৃত্ত ! বাড়তি সময় নিয়ে কী করা যায় সেটা নিয়ে আলোচনা করছি তখন মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্রলোক বলেন, “স্যার আমাদের গ্রামে চলেন।”
আয়োজকদের একজন ধমক দিলেন, বললেন, "স্যারের এখন খেয়েদেয়ে। কাজ নেই আপনার গণ্ডগ্রামে যাবেন!"
ভদ্রলোক তবু দুর্বলভাবে চেষ্টা করলেন, বললেন, "খুব সুন্দর গ্রাম স্যার। নদীর তীরে একেবারে ছবির মত|
একজন হা হা করে হেসে বললেন, “রাস্তাঘাট নাই, ইলেকট্রিসিটি নাই, হাঁটু উঁচা কাদা, কোন জায়গাটা ছবির মতো?"
অন্য একজন বললেন, "স্যারের হাতে সময় খুব বেশি হলে তিন ঘণ্টা। আপনার গ্রামে নৌকা করে যেতেই তো লাগবে তিন ঘণ্টা।"
মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, “ট্রলারে গেলে এক ঘণ্টায় যাওয়া যাবে, আর টি.এন.ও সাহেবকে বলে স্পীড বোটটা নিলে তো কথাই নাই। আধা ঘণ্টার মাঝে—"
অন্যেরা রীতিমতো হৈ হৈ করে তাকে থামিয়ে দিল। ভদ্রলোক তবু হাল ছাড়লেন না, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চলেন স্যার, আপনি রাজি হলেই হয়ে যাবে। আপনি খুব পছন্দ করবেন স্যার। একটা বট গাছ আছে কম পক্ষে এক হাজার বছরের পুরানো। একটা গোরস্তান— "
আয়োজকদের একজন রাগ হয়ে বললেন, “মাষ্টার সাহেব, আপনি তো আচ্ছা মানুষ, স্যারকে গোরস্তানে নিয়ে যেতে চাইছেন।
অন্য একজন বলল, “এদিকে চেয়ারম্যান সাহেব খবর পাঠিয়েছেন, স্যারকে নিয়ে যাবার জন্যে। চা-নাস্তার ব্যবস্থা করবেন।"
চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় চা-নাস্তা খাবার আয়োজন শুনে আমি অবশ্যি নার্ভাস হয়ে গেলাম। এর চাইতে মেঘনা নদীতে ট্রলারে করে ঘণ্টাখানেক নৌকা ভ্রমণ মন্দ ব্যাপার নয়। হাজার বছরের পুরানো বট গাছ এবং গোরস্তান কেক এবং সমুছা থেকে অনেক ভালো। আমি তাই মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে বললাম, “মাস্টার সাহেব, আপনি গোরস্তানের কথা কী যেন বলছিলেন?"
আমার কথায় মধ্যবয়স্ক মাস্টার সাহেব উৎসাহ পেলেন, চোখ বড় বড় করে বললেন, “স্যার গোরস্তানটা কত পুরানো কেউ জানে না। ভাঙ্গা একটা দেওয়াল আছে, দেখে মনে হয় কয়েক হাজার বছরের পুরানো!"
ভদ্রলোকের একটু বাড়িয়ে বলার বাতিক আছে, কথাবার্তা বলার জন্যে এরকম মানুষ মন্দ নয়। আমি অন্যদের দিকে তাকিয়ে বললাম, “বেশ ইন্টারেস্টিংই তো মনে হচ্ছে। ঘুরে আসলে মন্দ হয় না, কী বলেন?”
আয়োজকদের একজন বললেন, “কষ্ট হবে স্যার অনেক।"
চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় চা-নাস্তা খাবার ভয়ে আমি হাত নেড়ে উড়িয়ে দিয়ে বললাম, “কিছু কষ্ট হবে না। ট্রলারে করে যেতে আমার খুব ভালো লাগে!"
চলবে......
Part-1