11/08/2026
একটা ভাইয়ের পোস্ট তার দিদিকে নিয়ে লেখা,
আমার দিদি,
একটা ভাঙাচোরা বেড়ার ঘরে থেকে বড় হয়েছি আমরা। কতবার যে ঝড়ে টিন উড়ে গেছে, তার হিসাব নেই। আমি, মা, বাবা আর দিদি অন্যের বাড়ির বারান্দায় কাচুমাচু হয়ে রাত কাটিয়েছি। ও ছিল আমার থেকে মাত্র আড়াই বছরের বড়।
তখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। মা আমাদের দুজনকে হারিকেন আর কুপির আলোয় পড়াতেন। আমরা দুজন একটা ছোট চাটাইয়ের ওপর বসে পড়াশোনা করতাম। দিদি ছোটবেলা থেকেই খুব পড়ুয়া ছিল।
মাত্র ৪ বছর বয়সে সে স্যাটেলাইট স্কুলে ভর্তি হয়। ৬ বছর বয়সে, ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়, একদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে দেখি, সে একটি পানের বরোজে কাজ করছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বরোজ পরিষ্কার করে ২০ টাকা পাবে। কেন? সে ওই টাকা দিয়ে ময়ূরের পালক কিনবে। তার বিশ্বাস ছিল, বইয়ের ভেতরে ময়ূরের পালক রাখলে সেখান থেকে বাচ্চা হয়..
সেই ঘরেই আমাদের বড় হওয়া। দিদি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছাড়াই পড়াশোনা করেছে। অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পারিবারিক অবস্থার কারণে সে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে পারেনি। মানবিক বিভাগ থেকে পড়ে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৮ পায়। এরপর আমাদের এলাকার কলেজে ভর্তি হয়।
এইচএসসি পরীক্ষার আগে হঠাৎ তার গুটি বসন্ত (পক্স) হয়। সেই অবস্থাতেই সব পরীক্ষা দেয় এবং আবারও মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করে।
ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে মাত্র পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তোলে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিটে তার অবস্থান ছিল প্রায় ৯ম। সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (IR) বিভাগে ভর্তি হয়।
সেই প্রথম আমাদের দুজনের আলাদা হয়ে যাওয়া। দিদি ঢাকায় চলে গেল, আমি রইলাম বাড়িতে। বাড়ি থেকে তাকে মাসে কোনোরকম খরচ দেওয়া হতো। বাকি খরচ চালাত টিউশনি করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে সেরা পাঁচজনের মধ্যে থেকে পড়াশোনা শেষ করে।
পড়াশোনা শেষ করার কিছুদিনের মধ্যেই সে কৃষি ব্যাংকে চাকরি পায় এবং ২০১৮ সালে যোগদান করে। চাকরিতে যোগ দিয়ে আবার খুলনার বাড়িতে ফিরে আসে।
২০১৯ সালে একসঙ্গে তিনটি সরকারি চাকরিতে সুযোগ পায় সে—কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে সিনিয়র অফিসার পদে। দিদি হাউস বিল্ডিংয়ে যোগ দেয় খুলনা মেইন ব্রাঞ্চে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তার কর্মদক্ষতা এতটাই ভালো ছিল যে, ব্যাচের সবার আগে বয়সসীমার আগেই পদোন্নতি পেয়ে প্রিন্সিপাল অফিসার হয়।
বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। আমি তখন গোপালগঞ্জে। মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসতাম, আর দেখতাম মা-বাবা, দিদি আর আমি—কী সুন্দর, সুখী একটা পরিবার!
আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় ছিল সেটা।
দিদি বলল, সে বাড়ি করবে। আমি বললাম, “তুই আগে বিয়ে কর।” সে বলল, “আগে বাড়ি করব।” নিজের বেতনের প্রায় পুরো টাকা দিয়ে আমাদের বাড়ি বানানো শুরু করল এবং সবকিছু নিজে দেখাশোনা করল।
২০২৩ সালে তার বিয়ের জন্য ছেলে দেখা শুরু হলো। দিদির কথা ছিল, যাকে তার পছন্দ হবে না, তাকে সে বিয়ে করবে না। আমিও তাকে সেই সমর্থন দিয়েছিলাম। তার বিশ্বাস ছিল, সে এত ভালো মানুষ যে তার ভাগ্যে যখনই কেউ আসবে, নিশ্চয়ই একজন ভালো মানুষই আসবে।
হঠাৎ ২০২৫ সালে বাড়ি থেকে ফোন এলো। দিদি বলল, “ভাই, আমার ডেঙ্গু হয়েছে।” তার অসুস্থতার কথা শুনলেই আমার ভীষণ খারাপ লাগত। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি চলে গেলাম।
আমি তাকে সিটি মেডিক্যালে নিয়ে যাই। গাড়ির ভেতরে সে আমার হাত ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। তার মুখে ফোড়া উঠেছিল, অপারেশন করতে হয়েছিল। প্রায় ১৫ দিন লেগেছিল পুরোপুরি সুস্থ হতে। তার অনেক ওজন কমে গিয়েছিল। তারপরও সে চাকরি চালিয়ে যেতে থাকে।
গত ১৮ মে আমি ঢাকায় ফিরে আসি। সেদিনই ছিল বাড়িতে তাকে শেষবারের মতো দেখা।
আমার সঙ্গে তার মাঝে মাঝে অভিমান হতো। সে চাইত আমি বাইরে গিয়ে চাকরি করি, আর আমি চাইতাম পরিবারের কাছাকাছি থাকতে। এই নিয়ে আমাদের মতভেদ ছিল। কিন্তু আমি জানতাম, আমি জীবনে যা চেয়েছি, সে সবসময় তা পূরণ করার চেষ্টা করেছে।
৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মা বললেন, “তোর দিদির জ্বর, কথা বলবি?” আমি ফোনে বললাম, “দিদি, কী হয়েছে?” সে বলল, “ভাই, আমার জ্বর।” আমি বললাম, “জ্বর মেপে দেখ, ওষুধ খেয়ে নিস।” তারপর ফোন রেখে দিল।
সেদিন রাত ১০টার দিকে আবার ফোন করেছিলাম। সে ধরেনি। ভেবেছিলাম, হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।
৬ আগস্ট সকালে বাবার ফোনে ঘুম ভাঙল।
বাবা শুধু বললেন, “তোর দিদি মারা গেছে।”
আমি মুহূর্তেই পাগলের মতো হয়ে গেলাম। আমার পৃথিবী শেষ হয়ে গেল। আমার জীবনের সমস্ত সুখ, শান্তি, আনন্দ এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেল।
আজ পাঁচ দিন হলো, সে আমাকে, আমার মা-বাবাকে ছেড়ে চলে গেছে।
এখনও মনে হয়, আমি যেন কোনো দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছি। বিশ্বাস করতে পারি না।
আমার মা-বাবা তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধুসম মেয়েকে হারিয়েছে। আমি হারিয়েছি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, আমার দিদিকে।
ওকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকা এক অসহনীয় নরকযন্ত্রণা।
সবাই আমার দিদির জন্য আশীর্বাদ করবেন