14/05/2025
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
---
নবম অধ্যায়: শহরের নীরবতা, গ্রাম্য ছায়া
চরভদ্রাসনের সেই পুরনো বাড়ির ভেতর থেকে যখন অমি বেরিয়ে আসে, তার হাতে তখনও সেই চকচকে সাদা পাথর আর কাঠের ফলক।
সানজিদ তাকে বলে, “এখন তোর যা দরকার, তা হলো বুঝে নেওয়া—এটা সব কী বোঝাতে চায়। তুই শহরে ফিরে যা। তোর একজন বন্ধু আছে না—তাহসিন?”
অমি ঘাড় নাড়ে।
তাহসিন—ঢাকায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। প্রযুক্তি, লিপি বিশ্লেষণ, আর ইতিহাস নিয়ে বরাবরই আগ্রহ তার। অমির বিশ্বাস, সে কিছু একটা বুঝতে পারবে।
---
ঢাকা, তিন দিন পর
তাহসিনের বাসায় বসে টেবিলের ওপর পাথর আর ফলক রেখে অমি বলে, “দেখ, আমি জানি না এগুলা আসলে কী। কিন্তু এই জিনিসটাই ওই পাঁচজন গায়েব হওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে।”
তাহসিন পাথরটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর ফিসফিস করে বলে,
“এই পাথরটা সাধারণ নয়, ভাই। এটাতে মেটালিক ট্রেইস আছে, কিন্তু ধাতু না—খুব সম্ভবত, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা।”
অমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “মানে?”
“মানে,” তাহসিন বলে, “এই পাথর সম্ভবত কিছু একটা ‘অ্যাক্টিভেট’ করে। নিচের খাঁজটা দেখেছিস? এটা কোনো একটা লকের অংশ হতে পারে। আর এই খোদাই?”
তাহসিন কাঠের ফলকটার লেখা পড়ে, তারপর তার ল্যাপটপে টাইপ করতে থাকে।
“এটা পুরনো ধরণের ছায়া-ভিত্তিক কোডের মতো,” সে বলে।
“তুই বলছিলি না—‘একজন ঘুমিয়ে পড়লে আরেকজন জেগে ওঠে’? মনে হচ্ছে এটা প্রতীকী কোনো প্রক্রিয়া বা ফেজ শিফটের কথা বলছে।”
অমি বসে বসে ভাবে—তাহলে এটা শুধু ধর্মীয় কোনো রেফারেন্স না, এর পেছনে সম্ভবত বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি লুকানো আছে। একটা খেলা? না কি একটা পরীক্ষা?
তাহসিন একসময় উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“চল, আবার চরভদ্রাসনে যাই। কিন্তু এবার শুধু আবেগ নিয়ে নয়—তথ্য নিয়ে যাবো।”
---
চরভদ্রাসন, পাঁচ দিন পর
দুজনের হাতে ফিল্ড নোট, একাধিক ছবি, স্ক্যান করা পাথরের প্রতিলিপি।
তারা সেই বাড়িতে আবার ফিরে যায়, কিন্তু এবার আর আগের মতো ভয় নেই—এবার তারা জানে, তারা খুঁজছে কী।
“তাহসিন,” অমি নিচু স্বরে বলে, “এই বাড়িটা কোনোভাবে ওই পাথরের সাথে যুক্ত। তুই বলছিলি না, লক?”
তাহসিন দেয়ালের এক পাশে কিছু খোঁজে, তারপর একটা জায়গায় থেমে যায়।
একটা কাঠের খোপ। তার মাঝে ঠিক পাথরের আকারের খাঁজ।
দুজন একে অপরের দিকে তাকায়।
অমির হাত কাঁপে।
সে পাথরটা খাঁজে রাখে।
একটা ক্লিক শব্দ।
আর তখনই দেয়ালের পাশ থেকে একটা প্যানেল ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে।
তার পেছনে অন্ধকার, কিন্তু সেখানে বাতাস ঠাণ্ডা নয়—গরম।
তাহসিন ফিসফিস করে বলে, “দরজা খুলে গেছে, ভাই। এখন দেখতে হবে, ভিতরে কী আছে।”
অমির গলা শুকিয়ে আসে।
এই রহস্যের শেষটা কি তাদের জন্য তৈরি ছিল?
নাকি তারা ভুল দরজা খুলে ফেলল?
------
দশম অধ্যায়: দরজার ওপারে
অমি আর তাহসিন ধীরে ধীরে প্যানেলটা পেছনে ঠেলে ভেতরের গোপন কক্ষে প্রবেশ করে।
এটা ছিল অন্ধকার, তবুও কিছুটা আলোর ঝলক দেখা যাচ্ছিল—এ যেন একটা দীর্ঘ পথ, যার শেষে কিছু নেই। তবে তাতে কোনো ভয়ের আবহ ছিল না; বরং এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি ছিল, যেন একটা অতৃপ্ত সুরভি।
তাহসিন হালকা স্বরে বলে, “এটা কী? কোথায় পৌঁছেছি আমরা?”
অমি সজাগ চোখে চারপাশ পরখ করে, “এটা—এটা কী ছিল আগে? কী গোপন ছিল এখানে?”
এতদিনের অনুসন্ধান, এত রহস্য—এটা এক ধরনের তীব্র উপলব্ধি ছিল। কিন্তু এমন কি কিছু ছিল যা তারা এত দিন পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল? মনের মধ্যে আগের ভয়েস মেসেজের কথাগুলো ভেসে ওঠে—“গল্পটা অমির নয়।”
তাহসিন পেছন ফিরে অমির দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি ভুলে গেছ ভাই... গল্পটা তো তোমার নয়। তুমি শুধুই একজন দর্শক।”
অমি চমকে উঠে তাহসিনের দিকে তাকায়। তাহসিনের চোখে একটা শূন্যতা, যেন সে পুরো গল্পটা জানে, কিন্তু অমি এখনও শুধু অনুসন্ধান করে যাচ্ছে, সেই ভয়াবহ সত্যকে বুঝতে পারছে না।
“তাহসিন, তুমি কী বলছো?” অমি বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করে।
তাহসিন এক ঠান্ডা হাসি হাসে, “তুমি আসলে পুরো ব্যাপারটা ভুল বুঝেছ। আমি তোমার পাশে ছিলাম, কারণ তুমি শুধু গল্পটা জানার জন্য আগ্রহী ছিলে। কিন্তু... তুমি ভুলে গেছ, তুমি শুধুই একজন দর্শক। তোমার নাম আর এই গল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি পুঁজি হয়ে উঠেছ, আর এই রহস্য তোমার জীবনের অন্তিম অধ্যায় হতে চলেছে।”
অমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তার সবকিছু চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
“তাহসিন, তুমি কী বলছো?”
তাহসিন তখন একটু থেমে গিয়ে বলে, “এই পাথর, এই খোদাই—এগুলোর পেছনে কোন ম্যাজিক ছিল না, ভাই। এটা একটা খেলা ছিল। একটা দীর্ঘ খেলাধুলা, যেখানে তোমাকে শুধু পুতুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।"
অমি তার চোখে জিজ্ঞাসা এবং সন্দেহ নিয়ে তাকায়।
“তাহলে, আমি কেন এখানে আছি? আমি কেন এই সমস্ত কিছু দেখতে পাচ্ছি?”
তাহসিন ঠান্ডা মাথায় বলে, “যতটুকু জানি, তুমি এখানে আছো কারণ তুমি নিজেই কিছু একটা খুঁজছিলে। কিন্তু সেই খোঁজ তোমার জন্য নয়, এই গল্পের জন্য। এটা ছিল তোমার শুরুর পয়েন্ট, আর এখন তোমার গল্প শেষ হয়েছে।”
অমি তার চোখ বন্ধ করে নেয়। সব কিছু যেন এক মুহূর্তে অন্ধকারে ডুবে যায়।
তাহসিন আবার বলে, “তুমি ভুলে গেছ, ভাই। গল্পটা তো তোমার নয়। তুমি শুধুই একজন দর্শক।”
তাহসিন ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছনে চলে যায়, একে একে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়।
অমি দাঁড়িয়ে থাকে, তার চারপাশে সেই অন্ধকার ঘর আর অবশেষে সিলিংয়ে থাকা একমাত্র বাতি ঝিম মেরে নিভে যায়।
---
চলবে.......
#থ্রিলার #বাংলাগল্প #পর্বগল্প #মির্জা_মোঃ_জুলকার_নাঈম #নতুন #গল্প