13/02/2026
"ছাদের ওই আকাশটুকু"
একটি মা-মেয়ের গল্প
মা: (বৃদ্ধা, বিছানায় শুয়ে, কাশির পর কাশি) অ্যাই মা গো, জলটা একটু দে তো। গলা টা শুকিয়ে কাঠ।
মেয়ে: (ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখ শূন্য) এই যে মা... জল।
(জল এগিয়ে দেয়, চোখ নামিয়ে)
মা: (জল খেয়ে, মেয়ের হাত ধরে) তোর হাত কাঁপে কেন রে মা? তুই কি সারারাত জেগে থাকিস?
মেয়ে: (চোখ মুছে) না মা, ঠিক আছি।
মা: তুই ঠিক নেই রে। তোর মুখ দেখে বুঝি। আমার মেয়ের মুখের হাসিটা কোথায় গেল? সেই যে ছাদে বসে আকাশ দেখতে দেখতে বলতি, "মা, আমি বড় হয়ে তোমাকে ইলিশ মাছ কিনে দেব, পিঠা খাওয়াব"... সেই হাসিটা আজ কোথায়?
মেয়ে: (ফুঁপিয়ে ওঠে, কিন্তু চেপে যায়) মা, ইলিশ মাছ... মনে আছে? তুমি কত পছন্দ কর। আর পিঠা... শীতের সকালে চিতই পিঠা... (কণ্ঠ ভারী)
মা: আয় রে, আমার পাশে আয়। (মেয়েকে জড়িয়ে ধরে) কি হয়েছে বল তোকে?
মেয়ে: (হঠাৎ ভেঙে পড়ে, মায়ের কোলে মাথা রেখে) মা, আমি ব্যর্থ। আমি তোমাকে কিছু দিতে পারলাম না। তুমি অসুখে পড়েছ, আমি তোমার ওষুধ কিনে দিতে পারলাম না। তুমি ইলিশ মাছ খেতে চেয়েছিলে, আমি... আমি এক টুকরোও কিনে দিতে পারলাম না। একটা কাপড় কিনে দিতে পারলাম না, মা! একটা কাপড়! আমি কী দিয়ে মেয়ে হয়ে আছি?
মা: (মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে) ছি ছি, এমন কথা বলিস না রে। আমি কি তোর কাছে কিছু চেয়েছি? তুই আমার পাশে আছিস, এটাই কি কম?
মেয়ে: কিন্তু মা, আমি তোমার পাশেও থাকতে পারলাম না। যেদিন তোমার খুব অসুখ হয়েছিল, সেদিনও আমি কাজে আটকে ছিলাম। শুধু আটকে থাকা না, সেই টাকাও হাতে আসেনি। সেই টাকা... সেই টাকা নিয়ে একজন বলল, রাখো, ভবিষ্যতে লাগবে। কিন্তু মা, যে ভবিষ্যতে তুমি থাকবে না, সেখানে ওই টাকা দিয়ে কী হবে?
মা: কার কথা বলছিস তুই? কে তোকে বলল টাকা রাখতে?
মেয়ে: (চোখ মুছে, শূন্য দৃষ্টিতে) অফিসের বস ছিল মা। আমি ভেবেছিলাম সে আমাকে সাহায্য করবে, স্বপ্ন পূরণের পথ দেখাবে। কিন্তু সে আমার হাত-পা বেঁধে রাখল। টাকা দিত না ঠিক মত মাসের পর মাস বেতন আটকিয়ে রেখেছে, কিন্তু বলে দিত "এটা তোমার না, এটা তোমার ভবিষ্যতের জন্য"। আমি কি করতাম মা?
আমি অসহায় ছিলাম। টাকাটা দরকার ছিল। কিন্তু সেই টাকার বিনিময়ে সে নিয়ে নিল আমার স্বাধীনতা, আমার ইচ্ছে, আমার মেয়ে হয়ে ওঠার অধিকার। আমার হাতের মুঠোয় ছিল টাকা, কিন্তু সেই টাকা তোমাকে দিতে পারতাম না—কারণ ওই টাকা "আমার" ছিল না।
মা: (চোখে জল) রে বাছা, তুই এত কষ্ট করে রাখতি কেন? তুই আমাকে কিছু না দিলেও আমি তো খুশিই থাকতাম। তুই আমার মেয়ে, এটাই কি কম?
মেয়ে: না মা, কম না। কিন্তু আমি নিজের কাছে বড় লজ্জিত। আমি প্রতিদিন ভাবি, আমি কী করলাম জীবনে? শুধু ভুল সিদ্ধান্ত, শুধু ব্যর্থতা। আর এখন তুমি চলে যাবে—তোমার শেষ বয়সে আমি তোমার পাশে থাকতে পারলাম না, তোমার প্রিয় খাবার খাওয়াতে পারলাম না, তোমার অসুখের খরচ যোগাতে পারলাম না। যেদিন তুমি মরে যাবে, সেদিন তোমার মুখ দেখতে পাব কি না জানি না। তার আগেই আমি...
মা: (হঠাৎ জোর ধরে মেয়ের হাত) চুপ! এমন কথা বলবি না। তুই থাকবি। তোর জন্যেই আমি বেঁচে আছি। তুই আমার মেয়ে। সেই ছোট্ট মেয়ে, যে ছাদে বসে আকাশ দেখত, স্বপ্ন বুনত। সেই স্বপ্নগুলো ফুরিয়ে যায়নি রে। তুই আবার শুরু করতে পারবি।
মেয়ে: (মায়ের দিকে তাকায়, চোখ জলে ভরা) আবার শুরু? কিভাবে মা? আমার শরীরে প্রাণ নেই। আমি খাই, কিন্তু গলা দিয়ে নামে না। আমি ঘুমাই, কিন্তু স্বপ্ন দেখি না। শুধু একটাই স্বপ্ন ছিল—তোমাকে একটু ভালো খাওয়াব, তোমার পাশে থাকব। সেই স্বপ্নটাই তো পূরণ করতে পারলাম না।
মা: (মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে) তুই আমার পাশে আছিস না? এই মুহূর্তে? এটাই তো পাশে থাকা রে। তুই যে শুধু আমার পাশে বসে আছিস, এইটুকুতেই আমি স্বার্থক। তুই আমাকে জল দিচ্ছিস, আমার হাত ধরে রাখছিস—এইটাই তো দায়িত্ব পালন।
মেয়ে: কিন্তু মা, আমি তোমাকে সাহায্য করতে দিল না কেউ। আমার হাত-পা বেঁধে রাখল। সেই মানুষগুলো—ওদের আমি ক্ষমা করব না, মা। যেদিন তুমি চলে যাবে, সেদিনও আমি ওদের থুথু দেব। কারণ ওরা কেড়ে নিয়েছে আমার মেয়ে হয়ে ওঠার সময়গুলো। ওরা কৃপণতা করেছে একটু টাকা দিতেও, অথচ মানুষ কতটুকুই বা খায়?
মা: (চোখ মুছে) ক্ষমা কর, মা। নিজের জন্য না হোক, আমার জন্য কর। তুই যদি ওদের ক্ষমা না করিস, তাহলে তোর ভিতর এই জ্বালা থেকেই যাবে। আমি চাই না তোর মনে এই আগুন জ্বলুক। তুই মুক্ত হ, ওই ঘৃণা থেকে।
মেয়ে: (ফুঁপিয়ে) পারব না মা, পারব না। যে আমার তোমাকে দেওয়া টাকাটা পর্যন্ত আটকে রাখল, যে আমার স্বপ্ন চুরি করল—ওকে ক্ষমা? না মা, না।
মা: (অনেকক্ষণ চুপ থেকে, আকাশের দিকে তাকিয়ে) তুই জানিস, আমি প্রতিদিন ছাদের দিকে তাকাই। তোকে দেখি সেখানে বসে থাকতে। তোর চোখে সেই স্বপ্নগুলো আজও দেখি। ওরা তোর টাকা আটকে রাখতে পারে, তোর হাত-পা বাঁধতে পারে, কিন্তু তোর স্বপ্নগুলোকে বাঁধতে পারেনি রে। ওরা পারেনি তোর এই আকাশটাকে ঢেকে দিতে।
মেয়ে: (মায়ের দিকে তাকিয়ে) মা, আমি কি সত্যিই আবার স্বপ্ন দেখতে পারি?
মা: দেখবি রে। আমার মেয়ে পারবে। তুই একদিন না একদিন এই ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে হাসবি। আমার জন্য ইলিশ মাছ রান্না করবি, পিঠা বানাবি। সেদিন আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু তুই জানবি—আমি ওপর থেকে দেখছি। তোর সেই হাসি দেখছি।
মেয়ে: (মাকে জড়িয়ে ধরে) মা, আমি যদি না পারি?
মা: পারবি রে। আমার মেয়ে পারবে। শুধু একটু সময় দে নিজেকে। তোর ভুলগুলোকে ক্ষমা করে দে। তুই যা করতে পারিসনি, সেগুলো ভুলে যা। যা করতে পারবি, সেদিকে তাকিয়ে থাক।
মেয়ে: (অনেকক্ষণ চুপ থেকে, মায়ের কাঁধে মাথা রেখে) মা, আমি চেষ্টা করব। তোমার জন্য।
মা: (মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে) না রে, তোর জন্য। তুই বাঁচবি তোর জন্য। তুই স্বপ্ন দেখবি তোর জন্য। তুই শুরু করবি তোর জন্য। আমি তো শুধু পাশে আছি—এই শেষ সময়টুকু।
মেয়ে: মা, তুমি চলে গেলে আমি কী করব?
মা: তখনও তুই ছাদে উঠবি। আকাশ দেখবি। আমার কথা মনে পড়বে। তারপর হাসবি। কারণ আমি তখনও তোর পাশেই থাকব, শুধু চোখে দেখা যাবে না।
মেয়ে: (আকাশের দিকে তাকায়) এই আকাশটুকুই তো আমাদের, মা। এখানে বসে আমি নতুন করে শুরু করব। তুমি দেখবে।
মা: (হাসে) আমি দেখব রে। আমি সব দেখব।
(অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে দুজনে। হাত ধরে থাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মা। মেয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখে।)
মেয়ে: (ধীরে ধীরে) মা, আমি তোমাকে কিছু দিতে পারিনি। কিন্তু তুমি আমাকে সব দিয়েছ। এই ভালোবাসা, এই আকাশ, এই স্বপ্ন দেখার শক্তি—সব তুমি দিয়েছ। আমি চেষ্টা করব, মা। সত্যিই চেষ্টা করব। তোমার মতো শক্ত থাকার চেষ্টা করব।
মা: (চোখ বুজে, শান্ত গলায়) আমার মেয়ে পারবে। আমার মেয়ে সব পারবে।
(রাত নামে। ছাদে বসে মা-মেয়ে। হাতে হাত। আকাশে তারা ফোটে। মেয়ে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে যায়—অন্তহীন ভালোবাসায়।)
সমাপ্ত
সুকন্যা আহমেদ লিপি
ব কলম
প্রবাসী জীবন লিপিবদ্ধ ২০২৬ 🇫🇷🇧🇩☕