10/04/2026
উপন্যাসের নাম: মায়া-নগরের শেষ প্রদীপ
প্রথম পরিচ্ছেদ: কুয়াশার পদধ্বনি
পাহাড়ি শহর শিলং-এ তখন সন্ধ্যা নামছে। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়া আলোটা ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। অঞ্জন জানলার ধারে বসে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। ঠিক তিন বছর আগে এই দিনেই সে তার পৈতৃক বাড়িটা ছেড়ে কলকাতায় চলে গিয়েছিল। আজ আবার ফিরে আসা, কিন্তু পরিবেশটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি থমথমে।
শহরের এই প্রান্তে মানুষের আনাগোনা কম। জনশ্রুতি আছে, এই পাহাড়ি ঢালের পুরনো বাংলোগুলোতে নাকি এখনো অতীতের অতৃপ্ত আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। অঞ্জন এসব বিশ্বাস করে না, কিন্তু আজ তার নিজের ঘরের কোণগুলোকেও কেন যেন অচেনা মনে হচ্ছে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। তিনবার। ছোট ছোট, পরিমিত আঘাত।
অঞ্জন ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত আটটা। এই নির্জন জায়গায় এই সময়ে কেউ আসার কথা নয়। সে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ। পরনে জীর্ণ ওভারকোট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বৃদ্ধের হাতে একটা ছোট কাঠের বাক্স। "আপনি কি মিস্টার রায়?" বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে। অঞ্জন অবাক হয়ে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ, আমিই। কিন্তু আপনি কে?" বৃদ্ধ কোনো উত্তর না দিয়ে হাত বাড়িয়ে বাক্সটা অঞ্জনের দিকে এগিয়ে দিলেন। "আপনার বাবা এটা দিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যেদিন আপনি এই শহরে ফিরে আসবেন, সেদিন যেন এটা আপনার হাতে পৌঁছায়।"
কথাটা বলেই বৃদ্ধ অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। অঞ্জন তাকে ডাকার সুযোগটুকুও পেল না। ঘরে ফিরে এসে সে যখন কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সটা খুলল, দেখল ভেতরে কোনো দামি গয়না বা টাকা নেই। আছে কেবল একটা পুরনো হলদে হয়ে যাওয়া মানচিত্র আর একটা ভাঙা কম্পাস। মানচিত্রের এক কোণে লাল কালিতে লেখা— "যেখানে মায়া শেষ হয়, সেখান থেকেই সত্যের শুরু।" অঞ্জনের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। তার বাবা একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক ছিলেন বলেই সে জানত। কিন্তু এই রহস্যময় বাক্স আর মানচিত্র কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? অঞ্জন বুঝল, এই ফেরাটা কেবল নিজের শিকড়ে ফেরা নয়, বরং এমন এক রহস্যের মুখোমুখি হওয়া যা তার জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেবে।