05/07/2026
# বিশ্বাসের মূল্য
# # পর্ব–০৩ (শেষ পর্ব)
পরদিন বিকেল চারটার অনেক আগেই আমি ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম।
এটি ছিল শহরের একটি ছোট আইনজীবীর চেম্বার।
ভেতরে ঢুকতেই আগের দিনের সেই লোকটি উঠে দাঁড়াল।
— "আমি রায়হান।"
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,
— "আপনার সঙ্গে আমার স্ত্রীর সম্পর্ক কী?"
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে টেবিলের ওপর একটি ফাইল রাখল।
— "আমার কথা শোনার পর আপনি চাইলে আমাকে ঘৃণা করবেন। কিন্তু আগে এগুলো দেখুন।"
ফাইল খুলতেই আমি কয়েকটি মেডিকেল রিপোর্ট, হাসপাতালের কাগজপত্র এবং ব্যাংকের রসিদ দেখতে পেলাম।
সবগুলোতেই শিমুর নাম।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,
— "এসব কী?"
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "ছয় মাস আগে শিমুর মায়ের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন হয়েছিল। সে কারও কাছে হাত পাততে চায়নি। আপনার কাছেও না। কারণ আপনি তখন নিজের বাবার চিকিৎসা আর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলেন।"
আমি নির্বাক হয়ে শুনছিলাম।
— "আমি শিমুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। অনেক বছর ধরে আমাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচয়। আমি তাকে সুদ ছাড়া টাকা ধার দিয়েছিলাম। গতকাল সে সেই টাকার শেষ কিস্তি ফেরত দিয়েছে। যে খামটা আপনি দেখেছিলেন, সেটাতে ছিল ঋণ পরিশোধের রসিদ।"
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
আমি ধীরে বললাম,
— "তাহলে... সেই নখের আঁচড়?"
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
— "গতকাল হাসপাতালে তার মাকে হুইলচেয়ার থেকে উঠানোর সময় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাকে ধরে তুলতে গিয়ে শিমুর বুকে নখের আঁচড় লেগে যায়। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনাটা আছে।"
আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
ঠিক তখনই দরজা খুলে শিমু ভেতরে ঢুকল।
তার চোখ লাল হয়ে ছিল।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমি তোমার কাছে সত্য লুকিয়েছি। কিন্তু প্রতারণা করিনি। আমি শুধু চাইনি তুমি আরও দুশ্চিন্তায় পড়ো।"
আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
— "তাহলে রাতে ঘুমের মধ্যে 'রায়হান, আমাকে ক্ষমা করো' বলেছিলে কেন?"
শিমু চোখের জল মুছে বলল,
— "কারণ আমি ওকে অনুরোধ করেছিলাম যেন তোমাকে কিছু না বলে। কিন্তু ও বলেছিল, সন্দেহ যদি আমাদের সংসার ভেঙে দেয়, তাহলে সত্য লুকিয়ে রাখা অন্যায় হবে।"
আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
এক রাতের সন্দেহ আমাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে শিমুর দিকে তাকালাম।
— "ক্ষমা করবে?"
সে কিছু না বলে এগিয়ে এসে আমার হাতটা ধরে ফেলল।
বাড়ি ফেরার পথে আমি উপলব্ধি করলাম—
সম্পর্ক ভাঙে শুধু মিথ্যায় নয়, অকারণ সন্দেহেও।
সেদিন যদি আমি রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে হয়তো একটি নির্দোষ মানুষকে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলতাম।
সেই দিন থেকে আমরা একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—
**যে কোনো কষ্ট, যে কোনো সমস্যা, যে কোনো সত্য—লুকিয়ে নয়, একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেব। কারণ বিশ্বাসই একটি সংসারের সবচেয়ে বড় সম্পদ।**
সমাপ্ত।