মনভাসা シ︎ 𝙼 𝙾 𝙽 𝚅 𝙰 𝚂 𝙷 𝙰

মনভাসা シ︎ 𝙼 𝙾 𝙽 𝚅 𝙰 𝚂 𝙷 𝙰 Follow for heartfelt moments! MONVASHA Our mission is to create emotionally powerful content that connects deeply with your heart and soul. What We Offer 🎥📷

1.

মনভাসা シ︎ 𝙼 𝙾 𝙽 𝚅 𝙰 𝚂 𝙷 𝙰 | Heart-Melting Tears ❤️ | Emotional Videos, Heart-Touching Photography & Videography | Bangladesh-Based | Capturing emotions through soulful storytelling. Welcome to Monvasha | Heart-Melting Tears 🌿

Monvasha (মনভাসা) means "Heart Floating in Emotions" or "Soulful Feelings" in Bengali. At Monvasha, we specialize in producing heart-touching videos, cinematic videography,

and emotion-driven photography that speak to universal emotions. Whether it’s love, loss, or inspiration, our content is crafted to stir feelings that resonate with your own experiences. Emotional Videos:
Our emotional videos are designed to move and inspire. Whether it’s a touching love story, an inspirational journey, or a moment of reflection, each video is crafted with high-quality editing to capture the deepest emotions. Emotional storytelling is at the heart of our content, and we aim to connect with viewers on a personal level. Heartfelt videos are shared with a purpose—to make you feel and remember.

2. Cinematic Videography:
We offer high-quality cinematic videography that brings emotion and art together. Our videos are created using advanced filming techniques and professional video production equipment, ensuring that each frame speaks volumes. Whether it’s a dramatic scene or a subtle emotional moment, our content focuses on stunning visuals while conveying raw emotions that are felt deeply.

3. Heart-Touching Photography:
At Monvasha, we specialize in emotion-filled photography that captures real-life moments and emotions. From joyful family celebrations to introspective moments of solitude, our photos freeze feelings in time. Our portrait photography and lifestyle photography focus on portraying genuine expressions and true emotions that speak louder than words. Why Choose Monvasha? 🤔

1. Emotional Content That Connects:
At Monvasha, we believe that emotions are the heart of all storytelling. Every video, photo, and story is crafted to evoke powerful emotions like love, nostalgia, hope, and inspiration. If you're looking for emotional connection, we offer content that truly resonates with your heart.

2. High-Quality Production:
We prioritize high-quality video and photography production to ensure that every piece of content is visually stunning. Using the latest tools in video editing and photography techniques, we deliver professional, cinematic results. Our HD videos and crisp photography provide an immersive experience for viewers, making them feel like they are part of the story.

3. Authentic Stories & Relatable Content:
We focus on authentic stories that capture real, raw emotions. Our content is designed to make you feel, reflect, and connect with life’s most powerful moments. Whether it’s a moment of joy, heartache, or inspiration, we aim to share content that is not only relatable but also meaningful.

4. Inspiring & Uplifting Videos:
Alongside emotionally charged content, we also create motivational videos that uplift and inspire. Whether through motivational quotes, life lessons, or inspiring stories, we aim to bring positivity and hope to our viewers. Our uplifting content is designed to encourage you to stay strong, follow your dreams, and never give up. Why Follow Monvasha? 💬

If you seek emotional connection, cinematic storytelling, and inspirational content, Monvasha is for you. We provide a visual experience that goes beyond just entertainment. Our heartfelt videos, beautiful photography, and uplifting stories aim to touch your soul and make you feel connected to something greater. We create content that reminds you of the beauty of human emotions and the stories that shape our lives. Join Our Emotional Journey! 🚀

Become a part of the Monvasha community and follow us for emotional storytelling, heartfelt videos, and inspirational content. We are here to offer you moments of reflection, emotional healing, and visual stories that make you feel more deeply. Whether you're looking for motivational inspiration or emotional stories, we provide content that speaks to your heart.

📧 For collaborations or inquiries, contact us at:
Email: [email protected]
📍 Location: Bangladesh
Follow Monvasha | Heart-Melting Tears and be part of the emotional journey where we celebrate life’s most powerful moments through cinematic videography, heartfelt stories, and inspirational videos. 💙

05/07/2026

# বিশ্বাসের মূল্য

# # পর্ব–০৩ (শেষ পর্ব)

পরদিন বিকেল চারটার অনেক আগেই আমি ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম।

এটি ছিল শহরের একটি ছোট আইনজীবীর চেম্বার।

ভেতরে ঢুকতেই আগের দিনের সেই লোকটি উঠে দাঁড়াল।

— "আমি রায়হান।"

আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,

— "আপনার সঙ্গে আমার স্ত্রীর সম্পর্ক কী?"

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে টেবিলের ওপর একটি ফাইল রাখল।

— "আমার কথা শোনার পর আপনি চাইলে আমাকে ঘৃণা করবেন। কিন্তু আগে এগুলো দেখুন।"

ফাইল খুলতেই আমি কয়েকটি মেডিকেল রিপোর্ট, হাসপাতালের কাগজপত্র এবং ব্যাংকের রসিদ দেখতে পেলাম।

সবগুলোতেই শিমুর নাম।

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,

— "এসব কী?"

রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— "ছয় মাস আগে শিমুর মায়ের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন হয়েছিল। সে কারও কাছে হাত পাততে চায়নি। আপনার কাছেও না। কারণ আপনি তখন নিজের বাবার চিকিৎসা আর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলেন।"

আমি নির্বাক হয়ে শুনছিলাম।

— "আমি শিমুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। অনেক বছর ধরে আমাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচয়। আমি তাকে সুদ ছাড়া টাকা ধার দিয়েছিলাম। গতকাল সে সেই টাকার শেষ কিস্তি ফেরত দিয়েছে। যে খামটা আপনি দেখেছিলেন, সেটাতে ছিল ঋণ পরিশোধের রসিদ।"

আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

আমি ধীরে বললাম,

— "তাহলে... সেই নখের আঁচড়?"

রায়হান মৃদু হেসে বলল,

— "গতকাল হাসপাতালে তার মাকে হুইলচেয়ার থেকে উঠানোর সময় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাকে ধরে তুলতে গিয়ে শিমুর বুকে নখের আঁচড় লেগে যায়। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনাটা আছে।"

আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

ঠিক তখনই দরজা খুলে শিমু ভেতরে ঢুকল।

তার চোখ লাল হয়ে ছিল।

সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আমি তোমার কাছে সত্য লুকিয়েছি। কিন্তু প্রতারণা করিনি। আমি শুধু চাইনি তুমি আরও দুশ্চিন্তায় পড়ো।"

আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,

— "তাহলে রাতে ঘুমের মধ্যে 'রায়হান, আমাকে ক্ষমা করো' বলেছিলে কেন?"

শিমু চোখের জল মুছে বলল,

— "কারণ আমি ওকে অনুরোধ করেছিলাম যেন তোমাকে কিছু না বলে। কিন্তু ও বলেছিল, সন্দেহ যদি আমাদের সংসার ভেঙে দেয়, তাহলে সত্য লুকিয়ে রাখা অন্যায় হবে।"

আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।

এক রাতের সন্দেহ আমাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে শিমুর দিকে তাকালাম।

— "ক্ষমা করবে?"

সে কিছু না বলে এগিয়ে এসে আমার হাতটা ধরে ফেলল।

বাড়ি ফেরার পথে আমি উপলব্ধি করলাম—

সম্পর্ক ভাঙে শুধু মিথ্যায় নয়, অকারণ সন্দেহেও।

সেদিন যদি আমি রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে হয়তো একটি নির্দোষ মানুষকে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলতাম।

সেই দিন থেকে আমরা একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—

**যে কোনো কষ্ট, যে কোনো সমস্যা, যে কোনো সত্য—লুকিয়ে নয়, একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেব। কারণ বিশ্বাসই একটি সংসারের সবচেয়ে বড় সম্পদ।**

সমাপ্ত।

05/07/2026

# বিশ্বাসের মূল্য

# # পর্ব–০২

শিমু দরজার সামনে এসে থেমে গেল।

তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তির ছায়া ফুটে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে হাসিমুখে বলল,

— "খালাম্মা, কিছু বলছিলেন?"

বৃদ্ধা খালাম্মা আমার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,

— "না মা, তেমন কিছু না। পরে কথা হবে।"

তিনি চলে যেতেই ঘরে নীরবতা নেমে এলো।

শিমু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "তুমি এমন চুপচাপ কেন?"

আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

— "আজ দুপুরে কেউ এসেছিল?"

প্রশ্নটা শুনে সে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।

তারপর দ্রুত উত্তর দিল,

— "হ্যাঁ... আমার এক বান্ধবী এসেছিল।"

আমি বললাম,

— "খালাম্মা তো বললেন একজন পুরুষকে বের হতে দেখেছেন।"

কথাটা শুনেই শিমুর মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

কিন্তু পরক্ষণেই সে বলল,

— "ওহ... তুমি রাকিবের কথা বলছ? ও আমার মামাতো ভাই। কাছেই কাজে এসেছিল, তাই একটু দেখা করে গেছে।"

আমি আর কিছু বললাম না।

তবে আমার মনে পড়ে গেল, বিয়ের পাঁচ বছরে আমি কখনো "রাকিব" নামে কোনো মামাতো ভাইয়ের কথা শুনিনি।

সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—রাগ নয়, সত্য জানতে হবে।

পরদিন অফিসে যাওয়ার ভান করে সকালেই বের হলাম।

কিন্তু অফিসে না গিয়ে রাস্তার অপর পাশের একটি কফি শপে বসে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশপথের দিকে নজর রাখতে লাগলাম।

সকাল গড়িয়ে দুপুর।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল।

প্রায় দুইটার দিকে একটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামল।

গাড়ি থেকে নেমে এল একজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের সুদর্শন যুবক।

সে চারপাশে একবার তাকিয়ে দ্রুত আমাদের বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে গেল।

আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর লোকটি বেরিয়ে এল।

কিন্তু এবার সে একা ছিল না।

তার সঙ্গে ছিল শিমু।

দুজনেই নিচে নেমে কিছুক্ষণ কথা বলল।

হঠাৎ লোকটি শিমুর হাতে একটি খাম তুলে দিল।

শিমু সেটি নিজের ব্যাগে রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

এরপর তারা আলাদা হয়ে গেল।

আমি দূর থেকে সবকিছু দেখলাম।

কিন্তু একটি বিষয় আমার নজর এড়াল না।

তাদের মধ্যে কোনো ঘনিষ্ঠ আচরণ ছিল না।

না হাত ধরা।

না আলিঙ্গন।

না এমন কিছু, যা দেখে নিশ্চিতভাবে সম্পর্কের প্রকৃতি বোঝা যায়।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আমি কিছুই বললাম না।

রাতে শিমু ঘুমিয়ে পড়ার পর আমার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

— "আপনি কি শিমুর স্বামী?"

— "জি। কে বলছেন?"

লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

— "আপনি যা ভাবছেন, সত্যটা আসলে তা নয়। কিন্তু আপনি যদি আর একদিন দেরি করেন, তাহলে হয়তো অনেক বড় ভুল করে ফেলবেন।"

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,

— "আপনি কে? কী বলতে চাইছেন?"

লোকটি শুধু একটি ঠিকানা বলল।

তারপর বলল,

— "আগামীকাল বিকেল চারটায় সেখানে একা আসবেন। আপনার স্ত্রীর জীবনের এমন একটি সত্য জানতে পারবেন, যা সে নিজেও আপনাকে বলতে সাহস পায়নি।"

কথা শেষ করেই সে ফোন কেটে দিল।

আমি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

ঠিক তখনই ঘুমন্ত শিমু হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে একটি নাম উচ্চারণ করল—

"রায়হান... আমাকে ক্ষমা করো..."

আমার শরীর শীতল হয়ে গেল।

কারণ কালো গাড়ি থেকে নামা লোকটির নামও...

দারোয়ানের রেজিস্টারে লেখা ছিল—

রায়হান।

চলবে...

01/07/2026

# বিশ্বাসের মূল্য

# # পর্ব–০১

যেদিন অফিস থেকে ফিরে আমার স্ত্রী শিমুর বুকে নখের আঁচড়ের দাগ দেখলাম, প্রথমে মনে হলো হয়তো কোথাও অসাবধানতাবশত লেগেছে।

কিন্তু আমি যখন ঘনিষ্ঠভাবে তাকালাম, বুঝলাম দাগগুলো একেবারেই নতুন। সর্বোচ্চ দুই-তিন ঘণ্টা আগের।

আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

তবুও আমি নিজেকে সামলে নিলাম।

রাগে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে—এ কথাটা আমার বাবা সবসময় বলতেন।

শিমু তখন রান্নাঘরে রাতের খাবার গরম করছিল।

আমাকে দেখে স্বাভাবিক হাসি দিয়ে বলল,

— "আজ এত দেরি হলো কেন?"

আমি জুতোর ফিতা খুলতে খুলতে বললাম,

— "অফিসে কাজ ছিল।"

আমার কণ্ঠে কোনো পরিবর্তন ছিল না।

আমি চাইনি, সে বুঝতে পারুক যে আমি কিছু লক্ষ্য করেছি।

খাওয়ার সময়ও সে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছিল। কিন্তু আমার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সেই আঁচড়ের দিকে।

খাওয়া শেষ করে সে বলল,

— "আমি একটু গোসল করে আসি।"

সে বাথরুমে ঢুকতেই টেবিলের ওপর রাখা তার মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এল।

স্ক্রিন জ্বলে উঠল।

বার্তার প্রেরকের নাম ছিল শুধু একটি ইংরেজি অক্ষর—

**"R"**

বার্তার প্রথম লাইনটুকুই দেখা যাচ্ছিল।

*"আজকের জন্য ধন্যবাদ..."*

এরপর আর কিছু পড়া যাচ্ছিল না।

আমি ফোনে হাত দিলাম না।

অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভাঙতে চাইনি।

কিন্তু আমার মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমতে লাগল।

ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।

দরজা খুলতেই দেখি, আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের বৃদ্ধা খালাম্মা দাঁড়িয়ে।

তিনি অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে বললেন,

— "বাবা, একটা কথা বলব... ভুল বুঝো না।"

আমি অবাক হয়ে বললাম,

— "জি, বলুন।"

তিনি ইতস্তত করে বললেন,

— "আজ দুপুরে তোমার ফ্ল্যাট থেকে একজন অচেনা লোককে বের হতে দেখেছি। আমি ভেবেছিলাম হয়তো তোমার আত্মীয়। কিন্তু পরে দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, লোকটাকে সে আগে কখনো দেখেনি।"

আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঠিক সেই সময় বাথরুমের দরজা খুলে শিমু বেরিয়ে এল।

আমাদের দুজনকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থমকে গেল।

আর তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে আমার মনে প্রথমবারের মতো প্রশ্ন জাগল—

সে কি শুধু বিস্মিত হয়েছে...

নাকি ভয় পেয়েছে?

চলবে...

01/07/2026

# বাবার নীরবতা

# # পর্ব–০৩ (শেষ পর্ব)

ফাইলটি মেঝেতে পড়ে যেতেই কনফারেন্স রুমে নীরবতা নেমে এলো।

আমি কাঁপা হাতে আবার সেটি তুলে নিলাম।

প্রথম পাতায় লেখা নামটি ছিল—

**"মো. কামাল উদ্দিন"।**

এই নামটি আমি ভুলতে পারিনি।

তিনি ছিলেন আমার মায়ের বড় ভাই, আমার মামা।

দশ বছর আগে এক ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনার পর সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই। তাঁর কোনো মরদেহও পাওয়া যায়নি। সেই থেকেই তাঁকে মৃত বলেই সবাই বিশ্বাস করত।

আমি বিস্মিত হয়ে অ্যাডভোকেট আরিফ রহমানের দিকে তাকালাম।

— "এটা কীভাবে সম্ভব?"

তিনি শান্ত গলায় বললেন,

— "তিনি মারা যাননি। দুর্ঘটনার পর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিদেশে চিকিৎসা নেন। পরে নিরাপত্তাজনিত কিছু কারণে তিনি প্রকাশ্যে আর ফিরে আসেননি। তবে আপনার মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।"

আমার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

— "মা আমাকে কিছুই বলেননি কেন?"

— "কারণ তিনি ভয় পেতেন। ব্যবসা নিয়ে তখন অনেক চাপ ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, সঠিক সময় না আসা পর্যন্ত বিষয়টি গোপন থাকুক।"

ঠিক তখনই সভাকক্ষের দরজা খুলে একজন প্রবীণ ভদ্রলোক ভেতরে প্রবেশ করলেন।

চুল পুরো সাদা।

হাতে একটি লাঠি।

কিন্তু তাঁর চোখ দুটো ছিল দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসে ভরা।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— "রেসমিকা... আমাকে চিনতে পারছো?"

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।

দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম।

— "মামা..."

অনেক বছরের জমে থাকা কান্না সেদিন আর থামানো গেল না।

তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,

— "তোমার মা আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যেদিন তোমার সম্মান নিয়ে কেউ খেলবে, সেদিন যেন আমি তোমার পাশে দাঁড়াই।"

কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভা ডাকা হলো।

সেখানে বাবা, সাবিহা এবং অন্য পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

সভার শুরুতেই আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম,

— "আজ আমি কাউকে অপমান করতে আসিনি। আমি শুধু আমার মায়ের শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে এসেছি।"

সাবিহা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।

আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম,

— "যেদিন আপনি নিরাপত্তারক্ষী ডেকে আমাকে বের করে দিতে বলেছিলেন, সেদিন আপনি শুধু আমাকে নয়, এই হোটেলের প্রকৃত ইতিহাসকেও অপমান করেছিলেন।"

পুরো কক্ষে নীরবতা নেমে এলো।

এরপর আমি বাবার দিকে তাকালাম।

তিনি মাথা নিচু করে বসে ছিলেন।

আমি ধীরে বললাম,

— "আপনি যদি সেদিন শুধু একটি বাক্য বলতেন—'সে আমার মেয়ে'—তাহলে আজকের এই সভার প্রয়োজন হতো না।"

বাবার চোখ ভিজে উঠল।

তিনি আস্তে করে বললেন,

— "আমি ভুল করেছি, রেসমিকা। আমি ক্ষমা চাইছি।"

এটাই ছিল জীবনে প্রথমবার, যখন তিনি সবার সামনে নিজের ভুল স্বীকার করলেন।

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলাম,

— "ক্ষমা করা যায়। কিন্তু বিশ্বাস ফিরে পেতে সময় লাগে।"

এরপর ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত পড়ে শোনানো হলো।

হোটেলের সব কর্মচারী আগের মতোই চাকরিতে বহাল থাকবেন।

কোনো কর্মচারীর বেতন কমানো হবে না।

দাতব্য কার্যক্রম আরও বাড়ানো হবে।

এবং প্রতিবছর হোটেলের লাভের একটি অংশ এতিম শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে—যেটি ছিল আমার মায়ের আজীবনের স্বপ্ন।

সবশেষে আমি একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলাম।

— "বাবা, আপনি চাইলে উপদেষ্টা হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থাকতে পারেন। তবে সব সিদ্ধান্ত এখন থেকে ট্রাস্টের নিয়ম অনুযায়ী হবে।"

তিনি ধীরে মাথা নাড়লেন।

সাবিহাও আর কোনো আপত্তি করলেন না।

হয়তো তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষমতা দিয়ে সম্মান কেনা যায় না।

সন্ধ্যায় আমি একা হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

সেই পুরোনো দেয়ালঘড়িটি এখনো ঠিক আগের মতোই চলছে।

আমি মায়ের ছবির সামনে একটি সাদা ফুল রেখে মৃদু স্বরে বললাম,

— "মা, তোমার স্বপ্ন আমি রক্ষা করেছি।"

ঠিক তখনই ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা ছয়টা স্পর্শ করল।

মনে হলো, কোথাও থেকে মা হাসছেন।

আমি ধীরে ধীরে হোটেলের প্রধান দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

আজ আর কেউ আমাকে থামাতে এল না।

কারণ আজ আমি শুধু এই হোটেলের উত্তরাধিকারী নই—

আমি আমার মায়ের সম্মান, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর স্বপ্নেরও উত্তরাধিকারী।

সমাপ্ত।

01/07/2026

# বাবার নীরবতা

# # পর্ব–০২

দরজায় ধাক্কা পড়তেই থাকল।

— "রেসমিকা! আমি জানি তুমি ভেতরে আছো। দরজা খোলো!"—সাবিহার কণ্ঠে এবার আদেশের বদলে আতঙ্ক স্পষ্ট।

আমি দরজা খুললাম না।

কয়েক সেকেন্ড পর বাবার কণ্ঠ ভেসে এল।

— "মা... একবার শুধু কথা বলো।"

অনেক বছর পর তিনি আমাকে আবার "মা" বলে ডাকলেন।

কিন্তু সেই একটি শব্দও আমার ভেতরের জমে থাকা শূন্যতাকে আর ভরাতে পারল না।

আমি নীরবে সোফায় বসে রইলাম।

প্রায় পনেরো মিনিট পর দরজার বাইরে আর কোনো শব্দ শোনা গেল না।

জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, বাবা মাথা নিচু করে গাড়িতে উঠে বসেছেন। আর সাবিহা মোবাইলে কারও সঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন।

পরদিন সকাল আটটায় আমার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আরিফ রহমান ফোন করলেন।

— "রেসমিকা, আজ সকাল থেকেই হোটেলে বড় ধরনের সমস্যা শুরু হয়েছে।"

— "কী হয়েছে?"

— "ট্রাস্টের নামে মালিকানা পরিবর্তনের নোটিশ ব্যাংক, পরিচালনা পর্ষদ এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ সবাই পেয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী আগের ব্যবস্থাপনা কমিটির ক্ষমতা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।"

আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম।

তারপর শুধু বললাম,

— "সবকিছু আইনের মধ্যেই হচ্ছে তো?"

— "অবশ্যই। আপনার মা প্রতিটি কাগজ এত নিখুঁতভাবে তৈরি করেছিলেন যে আপত্তি করার সুযোগ খুবই কম।"

ফোন রাখার কিছুক্ষণ পরেই টেলিভিশনের সংবাদে হোটেলের নাম ভেসে উঠল।

"শহরের অন্যতম বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলের মালিকানা পরিবর্তন। নতুন ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হবে প্রতিষ্ঠানটি।"

সংবাদটি ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

কেউ বলছিল, ব্যবসায়িক বিরোধ।

কেউ বলছিল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব।

কিন্তু প্রকৃত সত্য জানত মাত্র কয়েকজন।

সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমার ফোনে বাবার একটি বার্তা এল।

"একবার দেখা করো। পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও।"

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

দুপুরে ট্রাস্টের প্রথম জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হলো।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, অডিটর এবং আমার মায়ের সময়ের দুইজন প্রবীণ পরিচালক।

সভার শুরুতেই একজন বৃদ্ধ পরিচালক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— "তোমাকে শেষ দেখেছিলাম যখন তোমার বয়স মাত্র ষোল বছর। তোমার মা সবসময় বলতেন, একদিন এই হোটেল তুমি সামলাবে।"

আমার চোখ অজান্তেই ভিজে উঠল।

তিনি টেবিলের ওপর একটি পুরোনো সিল করা খাম রেখে বললেন,

— "এটা তোমার মা আমাদের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। নির্দেশ ছিল, মালিকানার দায়িত্ব তোমার হাতে আসার আগে যেন কেউ এটি না খোলে।"

আমার হাত কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে খামটি খুললাম।

ভেতরে একটি হাতে লেখা চিঠি।

মায়ের পরিচিত হাতের লেখা।

"রেসমিকা,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে আমি আর তোমার পাশে নেই।

একটা কথা সবসময় মনে রাখবে—সম্পত্তি মানুষকে বড় করে না, মানুষের চরিত্রই সম্পত্তির মর্যাদা বাড়ায়।

যেদিন দেখবে কেউ তোমার সম্মান কেড়ে নিতে চায়, সেদিন নীরব থেকো; কিন্তু নিজের অধিকার কখনো ছেড়ে দিও না।

আর একটা সত্য হয়তো তুমি জানো না...

হোটেলের নিচের জমি আর এই ট্রাস্টই শুধু নয়, আমি তোমার জন্য আরও একটি দায়িত্ব রেখে গেছি।

সঠিক সময়ে অ্যাডভোকেট আরিফ তোমাকে সব জানাবে।

ভালোবাসা রইল।

— তোমার মা, নাসরিন।"

চিঠির শেষ লাইন পড়তেই আমার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

আমি অবাক হয়ে আরিফ রহমানের দিকে তাকালাম।

তিনি ধীরে মাথা নাড়লেন।

— "হ্যাঁ, আপনার মা আরও একটি গোপন নথি রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই চিঠি পড়ার পরই সেটা আপনাকে দিতে।"

তিনি তাঁর ব্রিফকেস থেকে একটি মোটা ফাইল বের করলেন।

ফাইলের প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা—

**"ব্যক্তিগত ও গোপনীয়। শুধুমাত্র রেসমিকা নাসরিনের জন্য।"**

আমি ফাইলটি খুলতেই প্রথম পাতায় যে নামটি দেখলাম...

সেটি দেখে আমার হাত থেকে পুরো ফাইলটি মেঝেতে পড়ে গেল।

কারণ সেখানে লেখা ছিল এমন একজনের নাম...

যাকে আমরা সবাই দশ বছর আগে মৃত বলে বিশ্বাস করেছিলাম।

চলবে...

**পর্ব–০৩-এ প্রকাশ পাবে, সেই মানুষটি কে? আর কেন নাসরিন এত বছর ধরে এই সত্য গোপন রেখেছিলেন?

01/07/2026

আমার বাবার হোটেলের অনুষ্ঠানে সৎ মা বলেছিলেন, "সিকিউরিটি, ওকে বের করে দাও"

আমি যখন বাবার মালিকানাধীন পাঁচ তারকা হোটেলের বার্ষিক দাতব্য অনুষ্ঠানে ঢুকলাম, তখনও আমার গায়ে ছিল অফিস থেকে সরাসরি আসা গাঢ় নীল রঙের সাদামাটা পোশাক। কানে ঝুলছিল মায়ের রেখে যাওয়া মুক্তোর দুল—যেটা তিনি মৃত্যুর আগে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

বলরুমে প্রবেশ করতেই ধীরে ধীরে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

প্রথমে হোটেলের কর্মচারীরা আমাকে লক্ষ্য করল। তারপর অতিথিরা। এরপর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। সবশেষে আমার বাবা, মিস্টার ইয়াসিন, যিনি হাতে এক গ্লাস জুস নিয়ে মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে তখনই অস্বস্তি আর অপরাধবোধের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমাকে দেখতে পেল আমার সৎমা সাবিহা।

কয়েক সেকেন্ড আগেও তিনি শহরের প্রভাবশালী অতিথিদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছিলেন। কিন্তু আমাকে দেখেই তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ঠোঁট শক্ত হয়ে উঠল।

তিনি বিরক্ত গলায় বললেন,

— "ও এখানে কী করছে?"

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শুধু বলরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম।

বাবা আমার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বললেন,

— "রেসমিকা..."

কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাবিহা নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় আদেশ দিলেন,

— "সিকিউরিটি! ওকে এখনই বাইরে বের করে দিন।"

কথাটা যেন আমার গালে সজোরে একটা চড় মেরে বসল।

দুজন নিরাপত্তারক্ষী প্রথমে আমার দিকে, তারপর বাবার দিকে তাকাল। উপস্থিত সবাই অপেক্ষা করছিল—বাবা নিশ্চয়ই কিছু বলবেন। কারণ হোটেলটি তাঁর নামে পরিচালিত হলেও, এর প্রতিটি ইটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার প্রয়াত মা নাসরিন-এর স্বপ্ন আর পরিশ্রম।

কিন্তু বাবা কিছুই বললেন না।

আমি তাঁর দিকে মাত্র তিন সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলাম।

তারপর নীরবে ঘুরে দাঁড়ালাম।

কোনো ঝগড়া করলাম না।

কাউকে দোষারোপ করলাম না।

এক ফোঁটা চোখের জলও ফেললাম না।

শুধু হেঁটে বেরিয়ে এলাম।

লবিতে এসে সেই বড় দেয়ালঘড়িটির নিচে দাঁড়ালাম, যেটি বহু বছর আগে মা নিজ হাতে পছন্দ করে এখানে লাগিয়েছিলেন।

আমি মোবাইল বের করে আমার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আরিফ রহমান-কে ফোন করলাম।

তিনি ফোন ধরতেই আমি শান্ত গলায় বললাম,

— "স্যার, আজ রাতেই ট্রাস্টের সব কাগজ কার্যকর করে দিন।"

তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,

— "আপনি কি নিশ্চিত, রেসমিকা?"

আমি কাঁচের দরজা দিয়ে ভেতরে তাকালাম।

দেখলাম, সাবিহা আবার অতিথিদের সঙ্গে হাসছেন, যেন কিছুই ঘটেনি। যেন আমি কখনোই এই পরিবারের অংশ ছিলাম না।

আমি ধীরে উত্তর দিলাম,

— "হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত। হোটেল, জমি আর পরিচালনা তহবিল—সবকিছু আমার ট্রাস্টে স্থানান্তর করে দিন।"

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,

— "সব সম্পদ? পুরো চব্বিশ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ?"

আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম,

— "হ্যাঁ, সবকিছু।"

আমার মা অনেক দূরদর্শী ছিলেন।

মৃত্যুর আগে তিনি সব সম্পত্তির কাগজ নতুন করে তৈরি করেছিলেন। হোটেল কিংবা এর নিচের জমি কখনোই বাবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। বাবা শুধু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।

আইন অনুযায়ী, আমার আটাশতম জন্মদিনের দিন থেকেই সব সম্পদের একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকারী ছিলাম আমি।

আজ থেকে মাত্র তিন সপ্তাহ আগে আমি সেই অধিকার পেয়েছি।

আমি চেয়েছিলাম বাবা আগের মতোই হোটেল পরিচালনা করুন।

কিন্তু আজ...

আমার মায়ের গড়া হোটেল থেকে আমার সৎমা আমাকে অপমান করে বের করে দিতে বললেন, আর বাবা নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

রাত ৯টা ১৪ মিনিটে অ্যাডভোকেট আরিফ রহমান একটি বার্তা পাঠালেন—

"সব কাগজ জমা হয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন। সম্পত্তি সফলভাবে ট্রাস্টের নামে স্থানান্তর হয়েছে।"

মাত্র তিন মিনিট পর থেকেই আমার ফোন অবিরাম বেজে উঠতে লাগল।

প্রথমে বাবা।

তারপর সাবিহা।

আবার বাবা।

একটি অচেনা নম্বর।

আবার বাবা।

রাত দশটার মধ্যেই আমার ফোনে চুয়াত্তরটি মিসড কল জমে গেল।

ঠিক মধ্যরাতে আমার ফ্ল্যাটের দরজায় প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা পড়তে শুরু করল।

বাইরে থেকে সাবিহার চিৎকার ভেসে এল—

— "রেসমিকা! দরজা খোলো! এখনই দরজা খোলো!"

আমি খালি পায়ে অন্ধকার ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে দরজার কাঁপতে থাকা হাতলটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সেই রাতের প্রথমবারের মতো...

আমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

চলবে...পরবর্তী অংশ আজকেই পড়তে চাইলে কমেন্ট করে জানিয়ে দিন তাহলে দ্রুত লিখব।

বাবার_নীরবতা
পর্ব-০১

01/07/2026

অদেখা_প্রতিধ্বনি
পর্ব ৩

আমার হাত কাঁপছিল।

তবু একের পর এক কাগজ উল্টে যাচ্ছিলাম।

প্রথম পাতায় দেখলাম, যৌথ হিসাবটা খোলা হয়েছে তিন বছর আগে।

আর সেই হিসাবে প্রথম জমা পড়েছিল ২০ হাজার টাকা।

জমাটা এসেছিল সরাসরি আমার স্বামী রাশেদের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে।

তারপর থেকে প্রতি মাসেই নিয়ম করে পাঁচ হাজার, কখনো দশ হাজার, কখনো আরও বড় অঙ্কের টাকা জমা হয়েছে সেই হিসাবে।

আমি যত সামনে এগোচ্ছিলাম, ততই বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যাচ্ছিল।

কারণ টাকাগুলো কোথায় খরচ হয়েছে, তারও বিস্তারিত লেখা ছিল।

দেশের নামকরা গয়নার দোকান...

দামী বিদেশি ব্র্যান্ডের ব্যাগ ও পোশাক...

একটি নতুন গাড়ির অগ্রিম মূল্য...

সবকিছুর তারিখ মিলিয়ে দেখতেই আমার শরীর শিউরে উঠল।

যেদিন যেদিন সাবিহাকে নতুন গয়না পরে দেখেছি...

যেদিন নতুন গাড়ি নিয়ে সবাইকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি...

সবকিছুর হিসাব যেন এই কাগজের পাতায় লেখা।

অথচ ইমরানের মাসিক আয় দিয়ে এসব কেনা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

প্রতিটি পাতা উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছিল, আমার চারপাশের পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে।

আমি ধীরে ধীরে শেষ পাতায় এসে থামলাম।

হঠাৎ একটি লেনদেনে চোখ আটকে গেল।

মাত্র তিন দিন আগে...

অর্থাৎ শাশুড়ি মারা যাওয়ার দুদিন আগের তারিখ।

সেখানে লেখা—

দুই লক্ষ টাকা উত্তোলন।

বিবরণে উল্লেখ ছিল—

পারিবারিক কবরস্থান ক্রয় বাবদ সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ।

আমি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে রইলাম।

তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে রাশেদের দিকে তাকালাম।

সে আমার চোখ এড়িয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল।

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

— এটা কী, রাশেদ?

সে কোনো উত্তর দিল না।

আমি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।

উঁচু গলায় বললাম,

— আমি তোমাকেই জিজ্ঞেস করছি! এটা কী?

রাগে আর অপমানে পুরো স্টেটমেন্টের কাগজগুলো তার দিকে ছুড়ে মারলাম।

কাগজগুলো বাতাসে উড়ে পুরো ব্যাংকের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

আমার গলাটা কেঁপে উঠল।

— গয়না কিনেছ, গাড়ি কিনেছ, দামি জিনিস কিনেছ—সবই বুঝলাম। কিন্তু কবরের জায়গা কিনলে কেন? আর সেটা তোমাদের দুজনের নামে কেন?

আমার কথা শুনে পুরো ব্যাংক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কর্মকর্তা থেকে শুরু করে গ্রাহক—সবাই আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।

ইমরান কাগজগুলো তুলে নিয়ে একে একে পড়তে শুরু করল।

প্রতিটি লাইন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের রঙ বদলে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত সে টলতে টলতে পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।

মনে হচ্ছিল, সে যেন এক মুহূর্তেই সব হারিয়ে ফেলেছে।

সাবিহা ভয় পেয়ে তার কাছে ছুটে গেল।

কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— ইমরান, আমার কথা বিশ্বাস করো। কবরের জায়গাটা আমাদের জন্য না। বাবা-মায়ের জন্য নেওয়া হয়েছিল।

আমি তিক্ত হেসে বললাম,

— সত্যি?

তারপর ধীরে ধীরে বললাম,

— তোমার শ্বশুর তো তিন বছর আগেই গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন হয়েছেন। আর এই কাগজে স্পষ্ট লেখা আছে, নতুন কবরের জায়গাটা রাশেদ আর সাবিহার নামে নেওয়া হয়েছে।

আমার কথা শেষ হতেই সাবিহা আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।

তার মুখটা একেবারে সাদা হয়ে গেল।

সব মিথ্যা যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল।

ইমরান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার চোখ দুটো রক্তের মতো লাল।

সারা জীবন শান্ত স্বভাবের মানুষটাকে আমি কখনো এমন দেখিনি।

হঠাৎ করেই সে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না।

সবার সামনে সাবিহাকে একটি চড় মেরে বসল।

সাবিহা ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।

অবিশ্বাসে সে শুধু ইমরানের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইমরান রাগে কাঁপছিল।

সে আবার তার দিকে এগিয়ে যেতেই ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী আর কয়েকজন কর্মকর্তা দ্রুত এসে তাকে থামিয়ে দিলেন।

চারদিকে হইচই পড়ে গেল।

আমি রাশেদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

সে যেন পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চুপ।

আমি ধীরে বললাম,

— এ তো কেবল শুরু। সত্যিটা এখনো পুরোটা বের হয়নি।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে আমাদের চারজনকেই থানায় নিয়ে গেল।

সেখানে বসে আমি পুরো ঘটনাটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুলে বললাম।

ব্যাংকের সিল দেওয়া হিসাবের কাগজগুলোও তদন্ত কর্মকর্তার হাতে তুলে দিলাম।

ইমরান এক কোণে মাথা নিচু করে বসেছিল।

তার চোখে ছিল ভাঙা বিশ্বাসের যন্ত্রণা।

সাবিহা তখনও কাঁদছিল।

বারবার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল।

আর রাশেদ...

সে পুরো সময় মাথা নিচু করে বসে রইল।

একটা কথাও বলল না।

হয়তো সে বুঝে গিয়েছিল, এতদিন ধরে যে গোপন খেলাটা চালিয়ে এসেছে, তার শেষ আজই।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে অনেক রাত হয়ে গেল।

আমরা থানা থেকে বেরিয়ে এলাম।

ইমরান একবারও কারও দিকে তাকাল না।

চুপচাপ অন্ধকার রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।

সাবিহা তার পেছনে দৌড়ে গিয়ে হাত ধরতে চাইল।

কিন্তু ইমরান ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে দিল।

ঘৃণাভরা চোখে শুধু বলল,

— আর কোনোদিন আমার সামনে আসবে না।

কিছুক্ষণ পর রাস্তার পাশে শুধু আমি আর রাশেদ দাঁড়িয়ে রইলাম।

সে ধীরে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল।

চোখে রাগ, ঘৃণা আর পরাজয়ের ছাপ।

চাপা গলায় বলল,

— এবার নিশ্চয়ই তুমি খুশি?

আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

অদ্ভুতভাবে বুকটা অনেক হালকা লাগছিল।

কারণ আজ অন্তত আমি সত্যিটা জেনে গেছি।

শান্ত গলায় শুধু একটা কথাই বললাম—

— আমাকে তালাক দাও।

তারপর আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে সোজা হেঁটে চলে গেলাম।

সমাপ্ত

অদেখা_প্রতিধ্বনি

01/07/2026

অদেখা_প্রতিধ্বনি
পর্ব ২

আমার মুখ থেকে কথাগুলো বের হতেই ঘরের ভেতরের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল।

আমি শান্ত গলায় বললাম,

— আমি আজ ব্যাংকে গিয়েছিলাম।

রাশেদ, ইমরান আর সাবিহা—তিনজনই আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি ধীরে ধীরে সব খুলে বলতে শুরু করলাম।

যৌথ হিসাবের কথা...

সেই হিসাবে গত দুই বছরে কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে...

আর সবচেয়ে বড় কথা, সব বড় অঙ্কের টাকা জমা হয়েছে আমার স্বামী রাশেদের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে।

আমার কথা শেষ হতেই সাবিহার মুখের রঙ এক মুহূর্তে বদলে গেল।

সে অবাক হয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলল,

— ইমরান, আল্লাহর কসম, আগে আমার কথাটা শোনো। আমার আর ভাইয়ার মধ্যে কোনো খারাপ সম্পর্ক নেই। ব্যাপারটা তুমি যেভাবে ভাবছ, সেরকম কিছুই না।

কথা শেষ করেই সে কান্না শুরু করে দিল।

— আমরা শুধু ভেবেছিলাম, কোম্পানির টাকায় আমাদেরও অধিকার আছে। তাই... তাই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর বাইরে আর কিছুই না।

তারপর আমার দিকে আঙুল তুলে বলল,

— আসল কথা হলো, আপা আমার ওপর হিংসা করছে। আম্মা আমাকে দুইটা বাড়ি দিয়ে গেছেন, সেটা উনি মানতে পারছেন না। তাই এখন মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমার সংসার ভাঙতে চাইছেন।

কথাগুলো শুনে ইমরানের মুখ নরম হয়ে গেল।

সে বরাবরই সহজ-সরল মানুষ।

স্ত্রীর চোখের পানি দেখেই যেন সব বিশ্বাস করে ফেলল।

আমার দিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে বলল,

— ভাবি, আমি জানি মা আপনার সঙ্গে অন্যায় করেছেন। কিন্তু তাই বলে আমার স্ত্রীকে নিয়ে এমন অভিযোগ করবেন? আমি ওকে চিনি। ও এমন মেয়ে না।

এক মুহূর্তেই যেন আমি সবার চোখে অপরাধী হয়ে গেলাম।

কেউ সত্যিটা জানতে চাইল না।

কেউ একটা প্রশ্নও করল না।

আমি কিছুক্ষণ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

একজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

একজন কান্না করে অভিনয় করছে।

আর একজন সব জানার পরও নীরব।

আমার ভেতরের কষ্টটা হঠাৎ করেই বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।

খুব শান্ত গলায় বললাম,

— ঠিক আছে। আমি-ই খারাপ। আমি-ই মিথ্যা বলছি।

তারপর সাবিহার দিকে তাকিয়ে বললাম,

— তাহলে একটা কাজ করো। এখনই আমার সঙ্গে ব্যাংকে চলো। সবার সামনে সেই ৫০ হাজার টাকা তুলে দেখাও। আর প্রমাণ করে দাও, তোমার লুকানোর কিছু নেই।

আমার কথা শুনে সাবিহার কান্না থেমে গেল।

সে একবার রাশেদের দিকে তাকাল, আবার ইমরানের দিকে।

চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা।

ঠিক তখনই রাশেদ রেগে উঠে বলল,

— ব্যাংকে যাওয়ার কী দরকার? একটা সামান্য বিষয় নিয়ে তুমি পুরো পরিবারকে অশান্ত করে দিচ্ছ!

আমি ওর কথার কোনো উত্তর দিলাম না।

শুধু সাবিহার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

— যেতে পারবে তো?

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে জোর করে নিজেকে সামলে নিল।

— অবশ্যই পারব। আমার ভয়ের কিছু নেই।

আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না।

সঞ্চয়পত্রটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

রাশেদ আমার হাত ধরতে চেয়েছিল।

আমি শক্ত করে হাত ছাড়িয়ে নিলাম।

শেষ পর্যন্ত চারজনই একসঙ্গে ব্যাংকের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

সারা রাস্তা কেউ একটা কথাও বলল না।

গাড়ির ভেতরের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠছিল।

ব্যাংকে ঢুকতেই আগের দিনের সেই কর্মকর্তাই আমাদের দেখতে পেলেন।

আমাদের চারজনকে একসঙ্গে দেখে তাঁর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

আমি কাউন্টারের সামনে গিয়ে সঞ্চয়পত্র আর কাগজপত্র এগিয়ে দিয়ে বললাম,

— আমরা যৌথ হিসাব থেকে বাকি টাকাটা তুলতে এসেছি।

কর্মকর্তা নিয়মমতো কাগজপত্র যাচাই করলেন।

তারপর সাবিহার দিকে একটি ফরম এগিয়ে দিয়ে বললেন,

— এখানে স্বাক্ষর করুন।

সাবিহা কলম হাতে নিল।

কিন্তু তার হাত এতটাই কাঁপছিল যে ঠিকমতো কলম ধরতেই পারছিল না।

রাশেদ তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।

আমি ধীর স্বরে বললাম,

— স্বাক্ষর করো।

শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে সাবিহা স্বাক্ষর করল।

কিছুক্ষণ পর কর্মকর্তা কাউন্টারের ওপরে ৫০ হাজার টাকা গুনে রেখে দিলেন।

রাশেদ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

তার চোখে এমন একটা ভাব, যেন সে মনে করছে আমি ভুল প্রমাণিত হয়েছি।

সাবিহাও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে ঠোঁটে হালকা হাসি এনে বলল,

— এবার নিশ্চয়ই আপনার সন্দেহ দূর হয়েছে? টাকা তো তুলে ফেললাম।

আমি তার কথার কোনো উত্তর দিলাম না।

বরং কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,

— আমাকে এই যৌথ হিসাবের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ লেনদেনের বিবরণ দিন।

কর্মকর্তা একটু ইতস্তত করে বললেন,

— এটা যৌথ হিসাব। দুই পক্ষের সম্মতি লাগবে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,

— আমিও তো এই হিসাবের একজন মালিক। আর উনিও এখানে উপস্থিত। দয়া করে স্টেটমেন্টটা বের করে দিন।

আমার কথা শুনে রাশেদের মুখের রঙ বদলে গেল।

সে তাড়াতাড়ি কিছু বলতে চাইল।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলাম।

— কী হলো? সত্যিটা সামনে চলে আসবে বলে ভয় পাচ্ছ?

সাবিহার ঠোঁট শুকিয়ে গেল।

মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল মুহূর্তেই।

কর্মকর্তা আর কিছু না বলে কম্পিউটারে কাজ শুরু করলেন।

কিছুক্ষণ পর প্রিন্টারের শব্দ ভেসে এল।

একটার পর একটা কাগজ বের হতে লাগল।

অনেকগুলো পৃষ্ঠা একসঙ্গে সাজিয়ে তিনি আমার হাতে দিলেন।

আমি ধীরে ধীরে প্রথম পাতাটা খুললাম।

উপরের প্রথম লাইনেই লেখা—

এই যৌথ হিসাবটি খোলা হয়েছে তিন বছর আগে।

আর সেই মুহূর্তেই আমার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা আরও গভীর হয়ে উঠল...

চলবে…

01/07/2026

শাশুড়ি মারা যাওয়ার আগে আমার জাকে দিয়ে গেলেন দুইটা দোতলা বাড়ি... আর আমার হাতে তুলে দিলেন মাত্র ৫০ হাজার টাকার একটা সঞ্চয়পত্র!

মনে মনে হেসেই ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। ভেবেছিলাম টাকাটা তুলে নিয়ে জীবনের এই অধ্যায়টাই চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেব।

কিন্তু এক মিনিটও পেরোয়নি, ব্যাংকের কর্মকর্তা বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— "আপনি কি নিশ্চিত, এই টাকাটা এখনই তুলতে চান? কারণ এই হিসাবের সঙ্গে এমন একটা বিষয় জড়িয়ে আছে, যেটা আগে আপনার জানা দরকার..."

সেদিনই বুঝেছিলাম, আমার শাশুড়ি মৃত্যুর আগে একটা গোপন সত্য লুকিয়ে রেখে গেছেন। আর সেই সত্য পুরো পরিবারকে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

প্রথম পর্ব

হাসপাতালের কেবিনজুড়ে শুধু ভেন্টিলেটরের টানা শব্দ।

টিট... টিট... টিট...

শব্দটা যেন কাউকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং শেষ কয়েকটা মুহূর্ত গুনে চলেছে।

কেবিনের ভেতরে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিলাম। শাশুড়ি রওশন আরা বেগম-এর শ্বাস তখন খুবই ক্ষীণ। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবী ধীরে ধীরে তাঁর রেখে যাওয়া উইল খুলছিলেন।

আমার নাম মেহরীন।

এই বাড়ির বড় ছেলে রাশেদ-এর স্ত্রী আমি। পাঁচ বছর ধরে এই সংসারে আছি। কখনো নিজের জন্য কিছু চাইনি। সংসারের মানুষগুলোর জন্য যতটা পেরেছি করেছি। শাশুড়ির ওষুধ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, আত্মীয়-স্বজনের আপ্যায়ন—সবকিছু নিজের দায়িত্ব ভেবেই সামলেছি।

কিন্তু সেই পাঁচ বছরের হিসাবের শেষ প্রাপ্তি হলো—

মাত্র ৫০ হাজার টাকার একটি সঞ্চয়পত্র।

আর আমার জা সাবিহা, যে এই বাড়িতে এসেছে মাত্র দুই বছর আগে, সে পেল ঢাকার অভিজাত এলাকায় থাকা দুটি দোতলা বাড়ি।

আইনজীবী উইল পড়া শেষ করতেই পুরো কেবিনে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন কেউ নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

হঠাৎ অনুভব করলাম, আশেপাশের সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

কেউ করুণা নিয়ে।

কেউ কৌতূহল নিয়ে।

আবার কারও চোখে লুকোনো আনন্দও স্পষ্ট।

ওদিকে সাবিহা যেন অভিনয়ের মঞ্চে উঠে গেছে।

সে দৌড়ে গিয়ে শাশুড়ির হাত ধরে কান্না শুরু করল।

— "আম্মা... আপনি আমাকে এত কিছু দিয়ে গেলেন কেন? আমি তো এসবের যোগ্যই না..."

তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে।

শাশুড়ি শেষ শক্তিটুকু দিয়ে কাঁপা হাতে সাবিহার হাত স্পর্শ করলেন। সেই স্পর্শে এমন মমতা ছিল, যা আমি কোনোদিন নিজের জন্য পাইনি।

আমি শুধু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

হাতে শক্ত করে ধরা সেই সঞ্চয়পত্র।

কাগজটা যেন হঠাৎ করেই অনেক ভারী হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই আমার স্বামী রাশেদ পাশে এসে দাঁড়াল।

নরম গলায় বলল,

— "মেহরীন, মন খারাপ করো না। আমি জানি তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। কিন্তু মা ছোটবেলা থেকেই আমার ছোট ভাইকে বেশি ভালোবাসতেন। তাই হয়তো সাবিহাকেও বেশি আপন মনে করেছেন।"

সে আমার কাঁধে হাত রাখল।

— "আমি পরে ইমরানের সঙ্গে কথা বলব। দুইটা বাড়ির ব্যাপারে নিশ্চয়ই একটা সমাধান হবে। আর এই ৫০ হাজার টাকা... এটাকে আপাতত একটা উপহার হিসেবেই রাখো। নিজের জন্য যা ইচ্ছা কিনে নিও।"

আমি কিছু বললাম না।

শুধু মনে মনে একটা কথাই ঘুরছিল।

পাঁচ বছরের ভালোবাসা, ত্যাগ আর সম্মানের দাম কি সত্যিই মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা?

সেই রাতেই শাশুড়ি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

পরদিন জানাজা আর দাফন শেষ হলো।

বাসায় মানুষের ভিড়।

সাবিহা সাদা-কালো ওড়না মাথায় দিয়ে এমনভাবে কাঁদছিল, যেন পৃথিবীতে শাশুড়িকে সবচেয়ে বেশি সে-ই ভালোবাসত।

আত্মীয়-স্বজন সবাই তাকে ঘিরে রেখেছে।

— "আহা মা, নিজেকে সামলাও।"

— "রওশন আরা আপা তোমাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন।"

— "দুইটা বাড়ি তোমার হাতে দিয়ে গেছেন মানে নিশ্চয়ই তোমার ওপর তাঁর ভরসা ছিল।"

সাবিহা চোখ মুছতে মুছতে বলল,

— "আম্মার দোয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা সবসময় তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী চলব।"

তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার স্বামী ইমরান।

সরল মানুষ।

স্ত্রীর কথাগুলো শুনে তার চোখে গর্ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

আর আমার স্বামী?

সে শুধু অতিথিদের চা-নাস্তা পৌঁছে দিচ্ছিল।

মনে হচ্ছিল, এই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।

সবকিছু শেষ হতে রাত হয়ে গেল।

বাসায় ফিরে আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম।

রাশেদ ক্লান্ত শরীরে সোফায় বসেই আধো ঘুমে বলল,

— "মেহরীন... তুমি কষ্ট পেও না... সব ঠিক করে দেব..."

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আজ প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই মানুষটা আমাকে বোঝে ঠিকই, কিন্তু আমার জন্য দাঁড়ানোর সাহস তার নেই।

পরদিন সকালেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।

এই ৫০ হাজার টাকা তুলে নেব।

তারপর এই অপমানের অধ্যায় চিরদিনের জন্য শেষ করে দেব।

সকালবেলা সঞ্চয়পত্রটা নিয়ে ব্যাংকে গেলাম।

কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,

— "আসসালামু আলাইকুম। আমি এই সঞ্চয়পত্রের টাকাটা তুলতে চাই।"

ব্যাংকের কর্মকর্তা কাগজপত্র নিয়ে কম্পিউটারে তথ্য দেখতে শুরু করলেন।

প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিকই লাগছিল।

কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

তিনি বারবার স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছেন।

আবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন।

শেষ পর্যন্ত ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

— "আপনার নাম কি মেহরীন রাশেদ?"

— "জি।"

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— "ম্যাডাম... এই সঞ্চয়পত্রটা আসলে সাধারণ কোনো হিসাবের সঙ্গে যুক্ত নয়। এটা একটা যৌথ হিসাবের অংশ।"

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,

— "যৌথ হিসাব? কার সঙ্গে?"

তিনি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখেই উত্তর দিলেন,

— "আপনার... আর আপনার জা সাবিহা ম্যাডামের নামে।"

আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

আমি তো কোনোদিন এমন কোনো হিসাব খোলার কথা জানিই না!

কর্মকর্তা আবার বললেন,

— "আর একটা বিষয় আছে..."

আমি উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করলাম,

— "কী বিষয়?"

তিনি ধীরে ধীরে বললেন,

— "এই হিসাবে এখন আর ৫০ হাজার টাকা নেই..."

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

গলাটা শুকিয়ে গেল।

কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলতে পারলাম,

— "তাহলে... কত টাকা আছে?"

চলবে…

অদেখা_প্রতিধ্বনি

প্রথম পর্ব

(এই গল্পের দ্বিতীয় পর্ব সবার আগে এই পেজে পোস্ট করা হবে ফলো করে রাখুন, নেক্সট পর্ব খুব শীঘ্রই পোস্ট করা হবে।)

Address

Krishnapur, Bariya Krishnapur, Chandina
Comilla
3633

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when মনভাসা シ︎ 𝙼 𝙾 𝙽 𝚅 𝙰 𝚂 𝙷 𝙰 posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share