18/12/2023
ইতিমধ্যেই ঠোঁটের পাশে পুড়েছে গোটা কয়েক সিগারেট। হাঁটছি। কোথায় যাবো? গন্তব্য জানা নেই। বুকের ভেতর একটা খচখচ দুঃখ নিয়ে কত দূরই বা আর যাওয়া যায়। তবুও চলে যেতে হয়, অনেকেই তো যায়। কারো কারো চলে যাওয়াই যেন নিয়ম; যে নিয়মে একটু আগে আমায় রেখে চলে গেলো আমার প্রেমিকা।
যদিও সে বলেনি তবুও আমার জানা আছে এটাই আমার সঙ্গে তার শেষ দেখা। সন্ধ্যা সাতটায় পূনিমার রাতে সে এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। রিকশায় ও আমার খুব গা ঘেষে বসেছিল, হাত ধরে ছিলো শক্ত করে। এমনভাবে শক্ত করে ধরলো যেন সে পড়ে যাবে, যেন তার ভয় করছে। অথচ আমি জানি ওর ভয়টা রিকশায় হতে পড়ে যাওয়া নয়, ভয়টা অন্য কোথাও।
সন্ধ্যায় আমরা নাস্তা করলাম রেস্তোরাঁয়। খাওয়া-দাওয়া শেষে দু'জন বসে রইলাম চুপচাপ যেন আমাদের কোন কথা নেই। নির্জনতা ভেঙে আমি জিজ্ঞেস করলাম আমি কি করতে পারি এখন, কথাটা শুনে সে বললো উত্তরটা খুব কঠিন এই কথা বলে আর কিছু বললো না । আমি বললাম কি হয়েছে? ও বনিতা করে বললো চোখে কি যেন পড়েছে,আমিও কিছু বললাম না।ওর হাতে ইদের সালামিটা দিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়লাম। সে চলে গেলো একাই। অনেকেই চলে যায় এমন করে যেন চলে যাওয়াই নিয়ম। তবুও কারোর কারোর চলে যাওয়া বুকের ভেতর খিল মেরে আসে।
ও শাড়ি পড়তে খুব ভালোবাসে । বৃষ্টি এলেই ও শাড়ি পরবে, চোখে কাজল দিবে, আমায় গান শুনাবে। গান গাইবে বৃষ্টি নামার আনন্দে।
ও রোমান্টিকতা বুঝে, আমার কাঁধে মাথা রাখতে চাইবে!
সোনার নেকলেস কিংবা ডায়মন্ডের আংটি এসব কিছুই সে চায় না আমার কাছে, শুধু জন্মদিন এলে ফুল চায়। আমি ফুলের সঙ্গে কালো টিপ দিব বলে আমার ওয়ালেটে কিনে রেখেছি কিন্তু শেষ দেখা জেনেও দেওয়া হয়নি আর।
দিনে তিন বেলা ফোনকল আর কয়েকটা ছোট ছোট মেসেজ পেয়ে ও অট্টালিকা পায়ে ঠেলে আমার সাথে মধ্যবিত্তের একটা সংসার করবার স্বপ্ন দেখেছে।
আইসক্রিম ওর খুব পছন্দ, শুধু আমি খেতে বললে বাহানা করে বলতো, ঠাণ্ডা লেগে যায়। কবিতা,উপন্যাস ওর ভালো লাগে, এজন্য তার সাথে দেখা হলেই আমি বই উপহার দিতাম।
ওর মা স্কুল মাস্টার, বড় ভাই চাকরি করে ছোট ভাইটা ভারসিটিতে পড়ে,বাবাটা ভীষণ রাগি, সমাজে নাকি তার বিরাট নাম চৌধুরী সাহেব। আমার কথা বাসায় জানালে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিবে,ওদের ওখানে করোতয়া নদী আছে আমি মজা করে বলি ও নদী আমার বাসার সামনেও আছে ভালোয় হবে ভাসতে ভাসতে আমার জেলায় পৌছে যাবে ,আর পালাতে গেলে সম্মান চলে যাবে।
শাড়ি সামলাতে না পারা প্রেমিকাটা হয়তো-বা দাপটের সাথে সামলাবে সকাল হলেই গোটা একটা সংসার।
চোখে কাজল দিতে গিয়ে আমায় মনে পড়লে হয়তো চিঠির বদলে কবিতা লিখবে, কবিতাই হয়ে উঠতে হয়তো তার দুঃখ থেকে বাঁচার একমাত্র আশ্রয়।
চেনা পথে অথবা অচেনা পথে, নিয়তি হোক বা কাকতালীয়, আজ থেকে কয়েক বছর পর আমাদের আবার দেখা হবে । তখন ওর শড়ির আঁচল ধরে টুক টুক করে হাঁটবে একটা বাচ্চা মেয়ে। ও হিমশিম খাবে বাচ্চা সামলাতে আর আমি চোখের জল। বুকের ভেতর হুহু করে উঠবে সে-সময় এ-ই ভেবে যে এমন একটি পুতুলের মত মেয়ের বাবা তো আমিও হতে পারতাম।
আড়াল থেকে ওর সুখ দেখে চোখ মুছতে মুছতে নিজেকে আমি বলবো, যেই মেয়েটি পরিবারের আত্মসম্মান রক্ষার্থে নিজের ভালোবাসাকে কবর দিয়ে ভালো থাকতে শিখে গেছে, সেই মেয়েটা আর কেউ নয়; ওই মেয়েটি আমার প্রেমিকা...
#হুতুম