25/08/2026
শৈশবের পাতার দিকে পেছন ফিরে তাকালে একটা সুন্দর স্মৃতি আমাদের অনেকের মনেই ভেসে ওঠে। আমাদের ছোটবেলায় পাড়ার মসজিদে বেশ কিছু মুরুব্বি বা বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ থাকতেন, যাঁদের উপস্থিতি ছিল পরম মমতার।
যে পরিবারগুলো হয়তো খুব একটা প্র্যাকটিসিং বা ধর্মীয় নিয়মনীতি কঠোরভাবে মেনে চলত না, সেই পরিবারের সন্তানটিকেও মসজিদের এই মানুষগুলো কখনোই পর ভাবতেন না। কোনো শর্ত ছাড়াই পরম স্নেহে কাছে টেনে নেওয়া, নামাজ শেষে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, মিষ্টিমুখ করানো কিংবা ছোট ছোট সুন্দর কথার মাধ্যমে তারা আমাদের এক অপূর্ব সামাজিক ও দ্বীনি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে দিতেন। তাদের সেই ভালোবাসা আর পরম স্নেহের শাসনই ছিল আমাদের ইসলামকে ভালোবাসতে শেখার প্রথম ও সবচেয়ে খাঁটি পাঠ।
অথচ আজকের সমাজের দিকে তাকালে বুকটা কেমন যেন খালি খালি লাগে। আমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছি—আজকের এই চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক দুনিয়ায় আমাদের নতুন প্রজন্ম কি সেই আগের মতো দরদী মুরুব্বিদের সান্নিধ্য বা অভিভাবকত্ব পাচ্ছে?
সবচেয়ে তেতো সত্যটি হলো, বয়সের বিচারে আজ কিন্তু সেই মুরুব্বির ভূমিকায় আমাদেরই দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়, ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল দেয়ালে বন্দি হয়ে আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেই ভালোবাসার অভিভাবকত্ব তৈরি করতে পারছি?
সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানব ইতিহাসের যেকোনো সুস্থ ও সফল সমাজ ব্যবস্থার মূলে ছিল 'কমিউনিটি কেয়ার' বা সামষ্টিক অভিভাবকত্ব। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত অনুযায়ী, একটি শিশুর নীতি-নৈতিকতা ও মানসিক বিকাশের জন্য কেবল পারিবারিক অভিভাবকত্ব যথেষ্ট নয়; বরং সমাজ ও প্রতিবেশীদের ইতিবাচক ভূমিকা তার চারিত্রিক দৃঢ়তা গঠনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অতীতের সমাজে যখন কোনো শিশু ভুল পথে পা বাড়াত, তখন পাড়ার জ্যেষ্ঠরা তাকে পরম মমতায় শুধরে দিতেন, কোনো হিংসা বা অহংকার ছাড়াই।
কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে আমরা নিজেদের অতিমাত্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। বর্তমানে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড়িয়েছে—"আমার সন্তান তো ঠিক আছে, অন্যের ঘরের খবর নিয়ে আমার দরকার কী?" এই তীব্র আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার সবচেয়ে বড় মাশুল গুনছে আমাদের তরুণরা। কিশোর গ্যাং কালচার, ইন্টারনেটের ক্ষতিকর আসক্তি কিংবা তীব্র হতাশার পেছনে কিন্তু কেবল পারিবারিক ত্রুটি দায়ী নয়; বরং সমাজে অভিভাবকত্বের এই চরম অভাব এবং বিচ্ছিন্নতাবোধই তরুণদের বিভ্রান্তির মূল কারণ।
আগে আমাদের স্থানীয় মসজিদগুলো কেবল দিনে পাঁচবার কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়ার কোনো আনুষ্ঠানিক স্থাপনা ছিল না। এটি ছিল সমাজের পারস্পরিক সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কেন্দ্রবিন্দু, আত্মিক মেলবন্ধন এবং তরুণদের আগলে রাখার মূল দুর্গ। একজন প্রবীণ মানুষের একটি ছোট স্মিত হাসি কিংবা স্নেহের স্পর্শ একটা ভুল পথে হাঁটা তরুণকে রাতারাতি ভালো হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতে পারত।
অথচ আজ আমরা মসজিদ থেকে বের হয়েই যার যার ব্যক্তিগত দুনিয়ায় ছিটকে পড়ি। পেছনের কাতার থেকে কোন তরুণ হাতা গুটিয়ে বের হয়ে গেল, তার মনের অবস্থাটা কেমন, তা জানার মতো মানসিক অবকাশ কিংবা দরদ আমাদের কারোরই নেই।
একটি অর্থপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে কেবল সুন্দর উপদেশ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় লম্বা পোস্ট দিয়ে কাজ হবে না। যদি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে চাই, তবে আমাদের সামষ্টিক অভিভাবকত্বের সংস্কৃতিতে ফিরে আসতেই হবে। আজকের এই বিচ্ছিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে নিজেদের বদলে ফেলার দায়ভার কিন্তু আমাদেরই নিতে হবে।
আসুন, আমরা নিজেরাই আবার আমাদের স্থানীয় তরুণদের জন্য সেই পরম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, বড় ভাই ও স্নেহের অভিভাবক হয়ে উঠি। যাদের কঠোরতা নয়, বরং ভালোবাসা ও সার্বিক দিকনির্দেশনার হাত ধরে আগামী প্রজন্ম আবার আপন মনে দ্বীন ও সুন্দর সমাজ গঠনের পথ খুঁজে পাবে।
কথাগুলো নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কী? আপনার শৈশবে বা কৈশোরে কি এমন কোনো শ্রদ্ধেয় মুরুব্বির স্মৃতি আছে, যা আজ আজও আপনার মনে দাগ কেটে আছে? কমেন্টে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করুন, আর পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করে সচেতনতার এই হাওয়াটি ছড়িয়ে দিন।