22/08/2026
#বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্বল্প ব্যয়ে ভাসমান ও দীর্ঘমেয়াদি গৃহনির্মাণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা।
মোঃ আবু রাশেদ সিদ্দিক
মানবতার স্বেচ্ছাসেবক
#বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের অনেক নিম্নাঞ্চলে প্রতিবছরই বন্যা হয়। বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার কোনোভাবে নতুন করে ঘর তৈরি করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করে। কিন্তু পরবর্তী বন্যায় সেই ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে বছরের পর বছর একই পরিবারকে ঘর তৈরি, মেরামত এবং আবার ক্ষতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে একটি ঘর তৈরি করে দেওয়া নিঃসন্দেহে মহৎ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু একই ঘর যদি বারবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আমাদের একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন—আমরা কি শুধু ক্ষতি পূরণ করব, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যাতে ভবিষ্যতের বন্যার ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়?
এই চিন্তা থেকেই বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য স্বল্প ব্যয়ে, দীর্ঘস্থায়ী, বন্যা-সহনশীল এবং প্রয়োজনে স্থানান্তরযোগ্য আবাসন ও পুনর্বাসনের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরছি।
এটি কোনো চূড়ান্ত প্রকৌশল নকশা নয়। বরং একটি বাস্তবভিত্তিক ধারণা, যেটিকে প্রকৌশলী, স্থপতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও উন্নত করে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
১. #ড্রাম পদ্ধতিতে ভাসমান ঘর—মূল পরিকল্পনা
যেসব এলাকায় প্রায় প্রতিবছর বন্যা হয়, সেখানে প্রচলিত ঘর নির্মাণের পাশাপাশি ভাসমান ঘরের একটি স্থায়ী মডেল তৈরি করা যেতে পারে।
আমার প্রস্তাবিত ধারণার মূল বিষয় হলো—ঘরের নিচে এমন একটি ভাসমান কাঠামো তৈরি করা, যা পানির উচ্চতা বাড়লে ঘরটিকে ওপরে ভাসিয়ে রাখবে এবং পানি নেমে গেলে ঘরটি আবার নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরে আসবে।
এক্ষেত্রে উন্নতমানের প্লাস্টিকের তৈরি বিশেষ ফ্লোটেশন ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘরটি কীভাবে কাজ করবে?
ধরা যাক, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একটি পরিবারিক ঘর নির্মাণ করা হলো। ঘরটির নিচে শক্ত লোহার বা উপযুক্ত টেকসই কাঠের ফ্রেম তৈরি করা হবে। সেই ফ্রেমের নিচে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ভাসমান ড্রাম সমানভাবে স্থাপন করা হবে।
তবে ঘরটি সারাক্ষণ ড্রামের ওপর ভাসিয়ে রাখা হবে না। স্বাভাবিক সময়ে ঘরটি পাকা খুঁটি বা নির্দিষ্ট সাপোর্টের ওপর থাকবে।
অর্থাৎ, ঘরের মূল ওজন তখন পাকা খুঁটি বহন করবে। ড্রামগুলো থাকবে প্রস্তুত অবস্থায়।
বন্যার পানি যখন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে, তখন পানি ঘরের নিচের অংশে পৌঁছে ভাসমান ড্রামগুলোকে সক্রিয় করবে। পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ড্রামের ভাসমান শক্তি ঘরের কাঠামোকে ওপরে উঠতে সাহায্য করবে।
পানি আরও বাড়লে ঘরটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ভাসমান অবস্থায় থাকবে।
আবার বন্যার পানি যখন কমতে শুরু করবে, ঘরটিও ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে নির্দিষ্ট পাকা খুঁটি বা সাপোর্টের ওপর বসে যাবে। এভাবে ঘরটি ভাঙার পরিবর্তে পানির উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওঠানামা করবে।
২. ঘর যাতে স্রোতে ভেসে না যায়—অ্যাঙ্করিং ব্যবস্থা
শুধু ড্রাম লাগিয়ে ঘর ভাসিয়ে দিলেই হবে না। বন্যার পানির স্রোত থাকলে ঘর ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হবে নিরাপদ গাইডিং ও অ্যাঙ্করিং ব্যবস্থা।
ঘরের চারপাশে বা নির্দিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে পাকা খুঁটি স্থাপন করা যেতে পারে। ঘরটি এমন একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে, যাতে এটি পানির সঙ্গে ওপরে-নিচে চলতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে সরে যেতে না পারে।
সহজভাবে বললে—
ঘরটি ভাসবে, কিন্তু ভেসে চলে যাবে না।
তবে এই ব্যবস্থার সঠিক নকশা অবশ্যই প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। কারণ এলাকার পানির গভীরতা, স্রোতের গতি, মাটির ধরন, ঘরের ওজন এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী অ্যাঙ্করিং ব্যবস্থার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
৩. পাকা খুঁটির ভূমিকা কী হবে?
পাকা খুঁটিগুলো শুধু ঘর আটকে রাখার জন্য নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
স্বাভাবিক সময়ে ঘরটি খুঁটির ওপর থাকবে। ফলে ড্রামগুলোর ওপর সারাক্ষণ ঘরের ওজন থাকবে না।
বন্যার সময় ঘর যখন ওপরে উঠবে, তখন খুঁটিগুলো ঘরকে নির্দিষ্ট অবস্থানের মধ্যে রাখবে।
পানি কমে গেলে ঘরটি আবার খুঁটির ওপর ফিরে আসবে।
এতে ড্রামগুলোকে সারাবছর অতিরিক্ত ভার বহন করতে হবে না। ফলে ড্রামের স্থায়িত্ব বাড়ানো এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহজ করার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
৪. ড্রাম কেমন হবে?
এখানে সাধারণ বাজারের প্লাস্টিকের ড্রামের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের উপযোগী বিশেষ ফ্লোটেশন ড্রাম তৈরির কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে বড় পরিসরে প্রকল্প নেওয়া হলে কোনো দক্ষ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাপ ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ড্রাম কাস্টমাইজ করা যেতে পারে।
ড্রামগুলো এমন হওয়া ভালো, যাতে—
দীর্ঘদিন পানিতে ও রোদে ব্যবহারের উপযোগী হয়;
নির্দিষ্ট ও পরীক্ষিত ভাসমান ক্ষমতা থাকে;
সহজে কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত ও খুলে ফেলা যায়;
একটি ড্রাম নষ্ট হলে অন্যগুলো অক্ষত থাকে;
প্রয়োজনে আলাদা ড্রাম পরিবর্তন করা যায়;
প্রতিটি ড্রামের ধারণক্ষমতা ও মান নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ড্রামের সংখ্যা অনুমান করে নির্ধারণ করা যাবে না। ঘরের ওজন, মানুষের সংখ্যা, আসবাবপত্র, ছাদ, মেঝে এবং নিরাপত্তার অতিরিক্ত ভার বিবেচনা করে প্রকৌশলগত হিসাবের ভিত্তিতে ড্রামের সংখ্যা ও ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে।
৫. ঘরের সম্ভাব্য কাঠামো
প্রাথমিকভাবে একটি পরিবারের জন্য ১৫ ফুট × ১০ ফুট, অর্থাৎ প্রায় ১৫০ বর্গফুট আয়তনের ঘর বিবেচনা করা যেতে পারে।
পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তীতে বিভিন্ন আকারের মডেল তৈরি করা সম্ভব।
ঘরের কাঠামোতে উন্নতমানের লোহা অথবা প্রকৌশলগতভাবে উপযুক্ত টেকসই কাঠ ব্যবহার করা যেতে পারে। ছাদে টিন ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে ঝড় ও বন্যার চাপ বিবেচনায় ছাদের কাঠামো শক্ত ও নিরাপদ করতে হবে।
ঘরের মেঝে ও নিচের কাঠামো যতটা সম্ভব হালকা রাখা ভালো। কারণ ঘরের ওজন যত কম রাখা যাবে, ভাসমান কাঠামোর ওপর তত কম চাপ পড়বে।
৬. বন্যার সময় ঘরের ভেতর কীভাবে নিরাপদ থাকা যাবে?
ভাসমান ঘরের পরিকল্পনায় শুধু ঘর ভাসবে কি না—এটিই বিবেচ্য নয়। পরিবারের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ঘরে এমনভাবে দরজা-জানালা রাখা যেতে পারে, যাতে জরুরি অবস্থায় দ্রুত বের হওয়া যায়।
ঘরের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, শুকনো খাবার, ওষুধ, টর্চ, মোবাইল চার্জার ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রীর জন্য একটি জলরোধী স্টোরেজ বক্স রাখা যেতে পারে।
সম্ভব হলে এই স্টোরেজটিও ভাসমান বা উঁচু অবস্থানে রাখা যেতে পারে, যাতে হঠাৎ পানি ঢুকলেও জরুরি সামগ্রী নষ্ট না হয়।
৭. প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের সুযোগ
কিছু এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হতে পারে যে শুধু ঘর ভাসিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়।
তাই নকশার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত লোকজনের মাধ্যমে ঘরকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এটি সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিকভাবে করার বিষয় নয়। প্রবল স্রোত বা দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে ঘর সরানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
নিরাপত্তা যাচাই করে প্রকৌশলীদের পরামর্শ অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘর স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।
৮. প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে ছোট নৌকা
আমার মনে হয়, বন্যাপ্রবণ এলাকায় একটি পরিবারকে শুধু ঘর দিলেই পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হয় না।
প্রতিটি পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী একটি ছোট, হালকা ও টেকসই নৌকা বা বোটের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বন্যার সময় এই নৌকা দিয়ে খাদ্য সংগ্রহ, চিকিৎসার প্রয়োজনে যাতায়াত, শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া এবং জরুরি যোগাযোগের কাজ করা সম্ভব হবে।
স্বাভাবিক সময়ে এটি মাছ ধরা বা ছোটখাটো আয়ের কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, নৌকাটি হবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও জীবিকার একটি সম্পদ।
৯. প্রতিটি ঘরে সৌরবিদ্যুৎ
বন্যার সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই প্রতিটি ঘরে ছোট আকারের সোলার সিস্টেম রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে ঘরে আলো, মোবাইল ফোন চার্জ, জরুরি যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
একটি ছোট সোলার ব্যবস্থা একটি পরিবারকে দুর্যোগের সময় অনেকটা স্বনির্ভর রাখতে পারে।
১০. ঘর দেওয়ার পাশাপাশি জীবিকার ব্যবস্থা
পুনর্বাসন বলতে শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই বোঝালে চলবে না।
একটি পরিবার যাতে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সেটিও পুনর্বাসনের অংশ হওয়া উচিত।
বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন, মাছ চাষ, নৌকাভিত্তিক ছোট ব্যবসা কিংবা ঘরে বসে করা যায় এমন ক্ষুদ্র আয়ের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
যারা গরু পালন করেন, তাদের জন্য বন্যার পূর্বাভাস পাওয়ার পর গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বা প্রয়োজন হলে বিক্রি করার আগাম পরিকল্পনা থাকা দরকার।
১১. সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র
যেসব এলাকায় প্রতিবছর বন্যা হয়, সেখানে জনসংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী বন্যা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা প্রয়োজন।
এসব আশ্রয়কেন্দ্র শুধু বন্যার সময় ব্যবহার না করে স্বাভাবিক সময়ে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এতে অবকাঠামোটি সারা বছর মানুষের কাজে আসবে।
প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে আগে থেকেই নৌকা, লাইফ জ্যাকেট, দড়ি, প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, জরুরি আলো ও যোগাযোগের সরঞ্জাম রাখা যেতে পারে।
১২. স্থানীয় বন্যা ব্যবস্থাপনা দল
প্রতিটি বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্থানীয় যুবক, স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল মানুষদের নিয়ে একটি স্থানীয় বন্যা ব্যবস্থাপনা দল গড়ে তোলা যেতে পারে।
তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি যোগাযোগ, নৌকা পরিচালনা, উদ্ধারকাজ এবং শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
কারণ দুর্যোগের প্রথম মুহূর্তে স্থানীয় মানুষই অনেক সময় সবচেয়ে দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
১৩. আগাম সতর্কবার্তা ও জরুরি কল সেন্টার
বন্যার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল ফোন, SMS, মাইকিং এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পানি বৃদ্ধির খবর দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
এর পাশাপাশি বন্যার মৌসুমে একটি নির্দিষ্ট জরুরি কল সেন্টার চালু রাখা যেতে পারে।
কোথায় মানুষ আটকা পড়েছে, কোথায় নৌকা প্রয়োজন, কোথায় খাবার বা চিকিৎসা প্রয়োজন—এসব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
১৪. বন্যার পর রক্ষণাবেক্ষণ
একটি ঘর তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়।
বন্যার পর ড্রাম, লোহার কাঠামো, পাকা খুঁটি, ছাদ, নৌকা ও সোলার সিস্টেম পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ছোট সমস্যা শুরুতেই মেরামত করলে ভবিষ্যতে বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
তাই প্রতিটি এলাকায় কয়েকজন প্রশিক্ষিত কারিগর বা রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী রাখা যেতে পারে।
১৫. দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য একটি ভিন্ন চিন্তা
দাতব্য ও মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রতিবছর বিচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন ঘর তৈরি করার পরিবর্তে কোনো একটি নির্দিষ্ট বন্যাপ্রবণ এলাকায় “দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন গ্রাম” গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়, তাহলে এর সুফল অনেক বেশি হতে পারে।
ধরা যাক, একটি প্রকল্পে ৫০টি বন্যা-সহনশীল ঘর তৈরি করা হলো। এর সঙ্গে থাকল একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, কয়েকটি উদ্ধারকারী নৌকা, সৌরবিদ্যুৎ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, ছোট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ক্ষুদ্র জীবিকা প্রকল্প।
তাহলে শুধু ৫০টি পরিবার নয়, একটি পুরো সম্প্রদায়কে ধীরে ধীরে দুর্যোগ-সহনশীল করে তোলা সম্ভব হবে।
১৬. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমে পরীক্ষামূলক প্রকল্প
ভাসমান ঘরের এই ধারণাটি বাস্তবসম্মত হতে পারে, কিন্তু এটিকে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই প্রকৌশলগত পরীক্ষা দরকার।
আমার প্রস্তাব হলো, প্রথমে একটি ছোট পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
১০টি পরিবার → ১০টি ঘর → বিভিন্ন নকশা পরীক্ষা → বন্যার মৌসুম পর্যবেক্ষণ → ফলাফল মূল্যায়ন → প্রয়োজনীয় পরিবর্তন → এরপর বড় পরিসরে বাস্তবায়ন।
এতে ভুল নকশায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি কমবে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আরও ভালো ও নিরাপদ মডেল তৈরি করা যাবে।
#শেষ_কথা:-
বন্যার্ত একজন মানুষকে একটি ঘর বানিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ। যারা এই মানবিক কাজটি করেন, তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।
তবে সেই ঘর যদি পরের বন্যায় আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে শুধু মেরামত করে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথাও ভাবতে হবে।
আমার প্রস্তাবনার মূল কথাটি খুব সহজ—
“বারবার ঘর মেরামত নয়, একবার পরিকল্পিতভাবে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ।”
বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যেখানে একটি পরিবার শুধু একটি ঘর পাবে না; বরং পাবে নিরাপদ আবাসন, প্রয়োজনীয় যোগাযোগের সুযোগ, জরুরি প্রস্তুতি, বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা এবং জীবিকা ধরে রাখার সুযোগ।
এই পরিকল্পনাটি আমার একটি চিন্তা ও প্রস্তাবনা। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে হলে প্রকৌশলী, স্থপতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগণ, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার সম্মিলিত পরামর্শ ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
হয়তো শুরুটা হবে একটি পরীক্ষামূলক ঘর দিয়ে। তারপর কয়েকটি পরিবার। এরপর একটি গ্রাম। সফল হলে ধীরে ধীরে এই মডেল দেশের অন্যান্য বন্যাপ্রবণ এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
আমরা যদি আজ একটু দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করি, তাহলে হয়তো আগামী দিনে একটি পরিবারকে প্রতিবছর নতুন করে ঘর তুলে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
মানবিক সহায়তা শুধু আজকের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য নয়—আগামী দিনের নিরাপদ জীবন গড়ে তোলার জন্যও হোক।
আবু রাশেদ সিদ্দিক
মানবতার স্বেচ্ছাসেবক