19/04/2021
আমাদের মানব শরীরে এই স্থূল শরীর ছাড়াও আরো এক শরীরের অস্তিত্ব আছে সেটি হলো সূক্ষ্ম শরীর।আমাদের শরীর মূলত ছ’টি সূক্ষ্ম শরীর দিয়ে তৈরি। এই সূক্ষ্ম শরীরের ছ’টি বিভিন্ন রং রয়েছে, যাকে ইংরেজিতে ‘অরো’ বলে। এই ছ’টি শরীর আবার ছ’টি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই ছ’টি কেন্দ্রই আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের মধ্যে অবস্থান করে। এই সূক্ষ্ম শরীরগুলি আমাদের স্থূল শরীরকে ঘিরেই থাকে।প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ ও তন্ত্র মতে, মানবদেহ ষট্চক্রের অধীন। মূলত মানুষের শরীরের মধ্যে যে স্নায়ুতন্ত্র আছে, তান্ত্রিকরা তাকে নাড়ি নামে অভিহিত করেছেন। এ সকল নাড়ীর মধ্যে ১৪টি নাড়িকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই চৌদ্দটি নাড়ির মধ্যে কেন্দ্রীয় নাড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়- সুষম্না নামক নাড়িকে। এই নাড়ি গুহ্য ও যৌনাঙ্গের মধ্যবর্তী স্থান থেকে মস্তিষ্কের নিম্নাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নাড়ি দ্বারা মানুষ প্রাণশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নাড়ির তথ্যসঞ্চালন এবং নিয়ন্ত্রণের পথকে তান্ত্রিকরা ছয়টি স্তরে ভাগ করেছেন। এর একটি স্তরকে তান্ত্রিকমতে বলা হয় চক্র। সুষম্নার এই প্রাণশক্তি সঞ্চালন ও নিয়ন্ত্রণে এরূপ চক্র আছে ছয়টি। এই কারণে একে ষটচক্র বলা হয়।
ষট্-চক্রের ব্যাখ্যা:
আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের ছ’টি কেন্দ্রের নাম ১) মূলাধার চক্র, ২) স্বাধিষ্ঠান চক্র, ৩) মনিপুর চক্র, ৪) অনাহত চক্র, ৫) বিশুদ্ধ চক্র, ৬) আজ্ঞা চক্র। এ ছাড়া আরও একটি চক্র রয়েছে, যা মাথার উপরে আমাদের স্থূল শরীরের বাইরে অবস্থান করে। একে বলা হয় সহস্রার চক্র। সেই হিসেবে মোট চক্র সাতটি।তন্ত্রে ষট্চক্রের বিষয় যেভাবে বর্ণিত আছে তার সারকথাংশ হলো,– ‘মেরুদণ্ডের দুই দিকে ইড়া ও পিঙ্গলা নামে দুইটি নাড়ী আছে। ঐ ইড়ার দক্ষিণে এবং পিঙ্গলার বামভাগে সুষুম্না নাড়ী মস্তক পর্যন্ত ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে। এই সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে বজ্রাখ্যা নাড়ী ও তাহার অভ্যন্তরে চিত্রিণী নামে একটি নাড়ী অবস্থিত আছে। শরীরের মধ্যে স্থান-বিশেষে সুষুম্না নাড়ীতে গ্রথিত সাতটি পদ্ম কল্পনা করা হইয়াছে। আধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা ও সহস্র-দল।’
১)মূলাধার-পদ্ম : তন্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, আধার বা মূলাধার পদ্ম পায়ু-দেশের কিছু উর্ধ্বে সুষুম্না নাড়ীতে সংলগ্ন। তার চারটি দল। এই পদ্মের মধ্যে লিঙ্গরূপী মহাদেব অবিস্থিতি করেন, এবং তাঁর অমৃত-নির্গমন স্থানে মুখলগ্ন করে সর্পরূপিণী কুণ্ডলিনীশক্তি অবস্থান করেন। এই পদ্মে ‘ডাকিনী’ নাম্নী দেবীও বাস করেন। তন্ত্রচর্যার ষট্চক্র ধারণায় এই মূলাধারপদ্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
২)স্বাধিষ্ঠান-চক্র : মূলাধারের উপরিস্থিত চক্রের নাম স্বাধিষ্ঠান। স্বাধিষ্ঠান চক্র বা পদ্ম লিঙ্গ-মূলে অবস্থিত। উপস্থমূলের বিপরীত দিকে মেরুদণ্ডে তার অবস্থান। ঐ পদ্মের মধ্যস্থলে গোলাকৃতি বরুণ-মণ্ডল ও সেই মণ্ডলের মধ্যে অর্ধচন্দ্র; তাতে বং এই বর্ণ অঙ্কিত আছে। এই পদ্মের মধ্যে বারুণী (‘রাকিনী’) শক্তি স্থিতি করেন।
৩)মণিপুর-চক্র : মণিপুর পদ্ম নাভিমূলে অধিষ্ঠিত। নাভিদেশের বিপরীত দিকে মেরুদণ্ডে অবস্থিত এই মণিপূরক বা মণিপদ্মচক্রে নীল বর্ণের দশটি দল;ঐ পদ্মের মধ্যস্থলে ত্রিকোণ অগ্নি-মণ্ডল। সেই ত্রিকোণের তিন পার্শ্বে স্বস্তিকাকার তিনটি ভূপুর এবং মধ্যস্থলে রং এই বর্ণটি চিহ্নিত রয়েছে। এই পদ্মের মধ্যে ‘লাকিনী’ শক্তি অবস্থিতি করেন।
৪)অনাহত-পদ্ম : অনাহত নামক পদ্ম হৃদয়ে অবস্থিত। হৃৎপিণ্ডের বিপরীত দিকে মেরুমধ্যে এই অনাহত-চক্রের স্থান। তার দ্বাদশটি দল, দলের বর্ণ লাল; সেই পদ্মের মধ্যে ছয় কোণ বিশিষ্ট বায়ুমণ্ডল এবং তারমধ্যে যং বীজ বিদ্যমান রয়েছে। সেই পদ্মে শিব ও কাকিণী শক্তি বাস করেন।
৫)বিশুদ্ধ-পদ্ম : বিশুদ্ধ নামক পদ্ম কণ্ঠদেশে কণ্ঠের বিপরীত দিকে মেরুমধ্যে অবস্থিত। তার ষোড়শ দল, দলের বর্ণ ধূসর; সেই পদ্মের মধ্যস্থলে গোলাকার চন্দ্র-মণ্ডল এবং তার অভ্যন্তরে গোলাকৃতি নভোমণ্ডল ও হং বীজ বর্তমান আছে। সেই পদ্মে শাকিনী শক্তি অধিবাস করেন।
৬)আজ্ঞা-চক্র : ভ্রূ-মধ্যে অর্থাৎ মেরুদণ্ডের শেষ সীমায় আজ্ঞা নামক দ্বিদল পদ্ম অবস্থিত। তার শ্বেতবর্ণের; তার মধ্যস্থলে ত্রিকোণাকৃতি শক্তি ও সেই শক্তির মধ্যে শিব অবস্থিতি করেন। এই পদ্মে হাকিনী শক্তি বাস করে থাকেন। তার কিছু উর্ধ্বে প্রণবাকৃতি পরমাত্মা আছেন। তার উপরভাগে চন্দ্র বিন্দু, এবং তার উপরে শঙ্খিণী নাড়ী।
(*)সহস্রদল-পদ্ম : আজ্ঞাচক্রের উপরে অর্থাৎ সমস্ত পদ্মের শীর্ষে শঙ্খিনী নাড়ীর উপরে সর্বোপরি সহস্রদল পদ্মের অবস্থান। তার পঞ্চাশ দলে আকার পর্যন্ত সবিন্দু পঞ্চশটি বর্ণ আছে। এই পদ্মের মধ্যে গোলাকৃতি চন্দ্র-মণ্ডল, তারমধ্যে ত্রিকোণ যন্ত্র, এবং সর্ব-মধ্যে শিবস্থানে পরম শিব অবস্থিতি করেন।
✍️- সৌ মী. ভুল ক্রুটি মার্জনীয়।
#রাইকিশরি