15/01/2025
"ভালো ছাত্র, জিনিয়াস — এই মনগড়া ভ্রান্ত ধারণাগুলো এখনো কেন প্রচলিত আছে, তা আমি জানি না। আমি একটি স্বনামধন্য ক্যাডেট কলেজে ক্লাসের দ্বিতীয় শেষ ছাত্র ছিলাম। ক্লাস এইট থেকে নাইন ওঠার সময় অঙ্কে ১২, বিজ্ঞানে ১৭, আর ইংরেজিতে ২৩ পেয়েছিলাম। আমার পরে যে ছেলে ছিল, সে পরীক্ষাই দিতে পারেনি অসুস্থতার কারণে। নইলে আমিই শেষ হতাম।
ক্যাডেট কলেজে খারাপ রেজাল্টের যে কী পরিমাণ অপমান, তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে। আমার কারণে পুরো ক্লাসের সামগ্রিক ফল খারাপ হলো। সিনিয়ররা র্যাগিং করল, বন্ধুরা তিরস্কার করল, আর কলেজ কর্তৃপক্ষ করল অপমানের চূড়ান্ত। কলেজ থেকে বের করে না দিলেও আমাকে সায়েন্স গ্রুপ থেকে বাদ দিয়ে জোর করে আর্টসে দিয়ে দিল।
বাবা বলছেন, সায়েন্স নিয়ে পড়তে। আমিও চাই। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল — সায়েন্স পড়ার যোগ্যতা আমার নেই। অপমান, প্রত্যাখ্যান, এবং নিঃসঙ্গতার ভারে পিষ্ট হয়ে ১৪ বছরের এক কিশোর গিয়ে দাঁড়াল ভাইস প্রিন্সিপালের সামনে। কাঁদলাম, হাত-পা ধরলাম। কিন্তু তাতে লাভ হলো না। অনেক অনুরোধের পর লিখিত মুচলেকা দিলাম, যদি সায়েন্স পড়তে দিলে এসএসসি ও এইচএসসিতে অন্তত ফার্স্ট ডিভিশন পাব।
এরপরও অপমান আর টিটকারি চলতেই থাকল। কত দিন যে বাথরুমে, ছাদে, অন্ধকারে কেঁদেছি! সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া একটা ছেলের সহ্যশক্তি কতটুকুই বা থাকে? একদিন ঠিক করলাম —আর না, এই অসম্মানের সমুচিত জবাব দিতে হবে।
তখন থেকেই শুরু করলাম। সবকিছু ছেড়ে দিলাম। বন্ধুবান্ধব, টিভি, সিনেমা, আত্মীয়স্বজন সব গোল্লায় যাক। আমার পৃথিবী শুধু বই আর পড়াশোনা। কী আছে এর মধ্যে, সেটা জানার জন্য পাগল হয়ে উঠলাম। অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বাংলার নোট তৈরি করলাম বিশ্বভারতীর বই ঘেঁটে। অঙ্কের পারমুটেশন-কম্বিনেশন-ইন্টিগ্রেশন কীভাবে বাস্তবে কাজ করে তা বুঝতে লাইব্রেরিতে কাটালাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ইংরেজি কবিতার কবির রচনার উঁচু ক্লাসের সমালোচনা পড়লাম, শুধুমাত্র একটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে।
চার বছর ধরে প্রতিদিন ১৪-১৬ ঘণ্টা কেটেছে বই, রেফারেন্স আর খাতার সঙ্গে। এমনকি ছুটির দিনও আমার সময় কেটেছে পড়াশোনার টেবিলে। বাবা-মা বলতেন, "এইবার থাম," আর বন্ধুরা বলত, "তুই মারা যাবি!" কিন্তু আমার লক্ষ্য পরিষ্কার ছিল — অপমানের দাঁতভাঙা জবাব দিতে হবে।
ইন্টারমিডিয়েটের দুই বছরে আমি এইচএসসি সিলেবাস শেষ করেছি সাতবার। বিশ্বাস না হলে আমার কিছু করার নেই।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! আমার এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। ক্লাসের দ্বিতীয় শেষ ছাত্র, অঙ্কে ১২ পাওয়া, সায়েন্স গ্রুপের অযোগ্য বলা সেই ছেলেটি মেধা তালিকায় পুরো বোর্ডে প্রথম! দেড় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম! প্রধানমন্ত্রী ডাকলেন, টিভিতে সাক্ষাৎকার, পত্রিকায় ছবি ছাপা হলো।
এটা ছিল আমার মিষ্টি প্রতিশোধ, এরপর আর পেছন ফিরে তাকাইনি।
এই অভিজ্ঞতায় আমি শিখেছি "ভালো ছাত্র" বা "জিনিয়াস" — এসব কিছুই না। আসল কথা হলো কঠোর পরিশ্রম। আমি যদি সত্যিই কিছু পেতে চাই, তাহলে সেটি পাবই। না পাওয়া মানে আমি মন থেকে চাইনি।
আপনি বিসিএসে প্রথম হতে চাননি বলেই হননি।
ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাননি? কারণ, আপনি হৃদয় থেকে চাননি।
আপনার কোটি কোটি টাকা নেই? সেটাও আসলে আপনি চাননি।
আমরা সাফল্যের ফলটা দেখি, কিন্তু এর পেছনের শ্রম, ত্যাগ, কষ্ট — এসব দেখিনা। যদি কিছু পেতে চান, তবে সেটা পাওয়ার জন্য পাগলের মতো চেষ্টা করুন। দ্বিতীয় কোনো বিকল্প রাখবেন না। ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয়। সফল হোন, নতুবা চেষ্টা করতে করতে হারিয়ে যান।
সৃষ্টিকর্তা আমাদের শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই। আর শ্রেষ্ঠ জীব কখনো হারতে পারে না।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)"