11/10/2021
|| অপেক্ষা ||
"লাবণ্যটা যে কবে ফিরে আসবে, কে জানে! একদম ভালো লাগছে না। পুজো চলে এলো, আর তার নাকি এখনো ছুটিই দেয় নি! এয়ারপোর্ট অবধি তো কষ্ট করে আসতে পারতো; না হয় আমিই প্লেনের টিকিটটা কেটে দিতাম। কী হতো শুনি পুজোর ওই চারটে দিন আমার জন্য একটু ছুটি নিলে? মা দুর্গা স্বয়ং আসছেন হিমালয় থেকে তাঁর কাজ থেকে ছুটি নিয়ে আর এই মহারানীর নাকি সামান্য হাজার কিলোমিটার দূরের শহর থেকে আসার সময়ই নেই!" কলকাতার কর্পোরেট পাড়ার বহুতলের ফ্ল্যাটটির এক কোণে রাখা গাঢ় লাল কাপড়ে মোড়া সোফাতে বসে বসে নিজের আর লাবণ্যর একসাথে তোলা ছবিতে ভর্তি রঙিন অ্যালবামটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে, এসবই সাত-পাঁচ ভাবছিল অংশু।
অংশুর প্রেমিকা অর্থাৎ মিস্ লাবন্যপ্রভা চৌধুরী ওরফে লাবণ্য ব্যাঙ্গালোরের একজন বড়ো সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার,তিন বছর হলো এক নামকরা কোম্পানিতেই লাবণ্য চাকরি করছে। দুই শহরে দুজন থাকায় অংশু বা লাবণ্য দুজনের কেউই কাউকে তেমন সময় দিতে পারে না। দেওয়ার চেষ্টা থাকে না তেমনটা নয় কিন্তু দুই শহরে দুজনের আলাদা দুনিয়া; ব্যস্ততার দুনিয়া, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই-এর দুনিয়া, স্বপ্নপূরণের চেষ্টাটুকু করার দুনিয়া আর সবশেষে হয়তো বা একটা ক্লান্ত করা দুনিয়া! কাজের চাপ বা দিনশেষের ক্লান্তিতে কতদিন এরম হয়েছে যে ঠিক মতো কথা পর্যন্ত হয়নি সপ্তাহের পর সপ্তাহ দুজনের। এমনকি স্মার্টফোনের ওই চারচৌকো সাড়ে ছয় ইঞ্চি স্ক্রিনটাতেও দুজনের দেখা হয় না ঠিক করে। তাই এই পুজোর ছুটিটুকুর জন্য অধির অপেক্ষায় বসে থাকে দুজনেই। শেষ দু'বছরই লাবণ্য নিজে এসেছিলো কলকাতার পুজো দেখতে। অংশুকে কোনো কিছুই করতে হয়নি সেই দু'বারে লাবণ্যকে কলকাতায় নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু এইবছর লাবণ্যর কাজের চাপ অনেকটা থাকায় কোনোভাবেই সে এবার ছুটি ম্যানেজ করতে পারেনি। এই কথাটা ফোন করে বলতেই অংশু অনেকটা রাগ দেখিয়ে ফেলেছে লাবণ্যর ওপরে আর বেশ কয়েকটা কড়া কড়া কথাও শুনিয়ে ফেলেছে। সেদিন ফোনে লাবণ্যের ফিরতে না পারার কথাটা জানার পরই অংশু কথার মাঝে ফোন কেটে দিয়েই সেটা সুইচ অফ করে দেয়। পরের দিন বিকালবেলা করে লাবণ্য আবার ফোন করে অংশুকে। ফোন ধরে কোনো কথা না শুনেই অংশু বলে 'আমার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। অনেক ভাবো তুমি আমার কথা! আর প্লিজ, ভাবতে যেও না। তোমার কাজটাই তুমি সামলে যাও সারাজীবন। আমার চিন্তা আমি নিজেই করতে পারি,রাখো ফোনটা এবার!" আবারও ফোনটা সেদিন রাগে কেটে দেয় অংশু আর সেই সঙ্গে একদম ফোন সুইচ অফ। রাতে ফোনের সুইচ খুলতেই সে দেখে, লাবণ্যর থেকে এই নিয়ে পঁচিশটা মিসডকল আর গোটা চোদ্দ মেসেজ। অংশু ফোন করতেই লাবণ্য ওপাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে,"দেখো, কিছু করার নেই গো আমার। বড্ড কাজের চাপ এখানে। বস কিছুতেই ছুটি দেবেন না। আমি জানি আমি কলকাতায় থাকি না বলেও তোমার আরও মনখারাপ। আর পাঁচটা প্রেমিক বা প্রেমিকার মতো আমরা হাতে হাত রেখে কফিশপে কফি খেতে যেতে পারি না, গঙ্গার ঘাটে একসাথে সূর্যাস্তের আনন্দটাও উপভোগ করতে পারি না, কলকাতার ভিড় রাস্তায়,বাসে বা ট্রেনে দুজনের হাত আগলে বাড়িও ফিরতে পারিনা একসাথে। পুজোর এই চারটে দিনই একমাত্র আমরা পরস্পরকে একটু সময় দিতে পারি মন খুলে সময়ের বাধা না মেনেই কথা বলতে পারি। কিন্তু, এবছর কোনোভাবেই আমি যেতে পারছিনা, অংশু..." কথাগুলো শোনার পর, কোনো কথার কিছু উত্তর না দিয়েই আবারও ফোন কেটে দেয় অংশু। এবার সোজা লাবণ্যর ফোন নম্বরটাকে অংশু ফেলে ব্লক লিস্টে। রাতে শুয়ে শুয়ে অংশু ভাবতে থাকে,"অন্য সব সম্পর্কে প্রেমিকা হন্যে হয়ে পড়ে থাকে তার প্রেমিক আসবে বলে। আর আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক তার বিপরীত। সবাই কতবার করে একমাসে যায় কফিশপে কফি খেতে নিজের মনের মানুষটার সাথে। আর, এখানে এক আমি!! প্রতিমাস তো দূর, বছরে অন্ততঃ চার বার লাবণ্য আর আমি কফিশপে গিয়ে হাতে হাত রেখে কফি খেতে পারতাম! সেটাও নয়। অন্যবছর তো তাও ঠিক আছে। কিন্তু, এইবছর?? সেইটুকু সুযোগও এবছর পাবো না পুজোতে। পুজোর সময়ে লাবণ্যর কাজের চাপ আসতে পারবে না। আবার, অন্য সময়ে ছুটিও পাবে না। তাহলে কবে একটু দেখতে পাবো ওকে সামনা-সামনি?? ওই চারচৌকো স্ক্রিনে এভাবে দেখতে যে আর ভালো লাগছে না আমার!" --- এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে অংশু ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল করেনি সে।
পর দিন ঘুম থেকে উঠেই লাবণ্যকে আনব্লক করে দেয় অংশু। কিন্তু আনব্লক খুলতেই সে বুঝতে পারে যে খেলা হাতের বাইরে চলে গেছে! ইতিমধ্যে সেও ব্লক খেয়ে গেছে ওপার থেকে।এখন আর অংশুর কিচ্ছু করার নেই। এতক্ষণ না হয় শুধু সামনে দেখাটা হাতের বাইরে ছিল কিন্তু এখন তো গলার স্বরটুকু শোনারও কোনো সুযোগ নেই।অংশুর এবার নিজের ওপরেই চরম রাগ হচ্ছে। মনে মনে বলল, "এতোটা রাগ লাবণ্যকে না দেখালেও হতো। এমনিতেই পরশু অষ্টমী। কলকাতা না আসতে পারার দুঃখ আমার হলে লাবণ্যরও আছে। এতটা না বললেও হতো, এখনও রাগ করে আছে মেয়েটা। ধ্যাৎ,পুজো মনেই হচ্ছে না আমার!" নিজের রুমের জানালাটা খুলতেও তার আর ভালো লাগছে না। জানালার বাইরে দিয়েই দেখা যাচ্ছে মণ্ডপে মণ্ডপে লোকের ভিড়, কচিকাঁচাদের আড্ডা আর ঢাকের আওয়াজ। এক কাপ কফি নিয়ে সোফার ওপরে বসে টেবিলে রাখা আগের দিনের অ্যালবামটা দেখেই আবারও একবার মনখারাপ হয়ে গেলো অংশুর। প্রায় বছর তিনেক আগে তোলা লাবণ্য আর তার একসাথে হাতে হাত রাখা একটা ফটো দেখতে দেখতেই, হঠাৎ অংশু শুনতে পেলো, দরজার বাইরের কলিং বেলের আওয়াজ। অ্যালবামটা রাখলো রেখে বিরক্ত মুখে অংশু দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছে কোন্ অনাহুতের আগমন ঘটেছে! ইতিমধ্যে আবার কলিং বেল বেজে উঠলো। পুজোর এই কয়েকটা দিনে বহু উটকো লোকের ভিড় জমে কলকাতার বুকে, এই সাত-পাঁচ ভেবেই দরজাটা আরও যেন খুলতে ইচ্ছে করছে না অংশুর। পুজোগণ্ডার দিনে চুরি,ছিনতাই আর পকেটমারের সংখ্যা যেভাবে মাথা চারা দিয়ে ওঠে তাতে কোথা থেকে কি যে হয় কিচ্ছু বলা যায় না! আবার এদিকে আজ ষষ্ঠী অথচ, লাবণ্য আসবে না ভেবে মনটাও খারাপ। এবার কলিংবেলের সাথে সাথে দরজায় বারখানেক টোকাও পড়লো পরপর। এবার উঠতেই হলো তাকে। দরজাটা খোলার আগে হাতের নাগালেই থাকা ফোনটা ডান হাতে নিয়ে অংশু দেখতে থাকলো অনলাইন শপিং সাইট গুলো। নাঃ তো!! কিছুই তো অর্ডার দেওয়া নেই। তাহলে, বাইরে কে?? "আসছি, আসছি" বলেই, দরজা খুললো অংশু। দরজা খুলতেই দেখে, একটা মাঝবয়সী লোকের হাতে একটা বড়ো বাক্স রঙ্গিন বাদামি কাগজে মোড়া। পার্সেলটা নিয়ে একটা সাইন করে ওই মাঝবয়সী লোকটিকে বিদায় করলো অংশু। দরজা লাগিয়ে ভেতর ঘরে গিয়ে সোফায় বসে পার্সেলটার মোড়ক খুলতে লাগলো সে। ওপরের রঙ্গিন কাগজ খোলার পরেই, অংশু দেখলো একটা হলুদ পাঞ্জাবী,কালো জিন্স আর একটা কাগজের টুকরো। অবাক হয়ে গেলো অংশু। কে পাঠিয়েছে বা না পাঠিয়েছে, কেন পাঠিয়েছে সেটা ভাবতে ভাবতে হাতে তুলে নিলো চিরকুট গোছের কাগজের টুকরোটা,তাতে লেখা----
"প্রিয় অংশু,
তোকে তো বরাবরই জ্বালাতে বড্ড ভালো লাগে আমার। তাই খানিক ইচ্ছে করেই ব্লক করে একটু চিন্তায় ফেলেছি। ভাবিস না সরি বলবো। খুব ইচ্ছা ছিলো বাড়ি গিয়ে নিজের চোখেই তোর পেঁচার মতো মুখটা দেখবো। আমি জানি তুই বড্ড চিন্তা করবি আমার জন্য তাই, তোর পেঁচা মুখ নিজের চোখে দেখার সাধ বাক্সবন্দী করে এই চিঠিটা লিখে পাঠাচ্ছি আর আমার খুব পছন্দের হলুদ রঙের পাঞ্জাবী দিলাম তোকে। আমি কলকাতায় যাচ্ছি আজ সন্ধ্যেতে। তুই চিন্তা করিস না বেশি। আমি এয়ারপোর্টে গিয়েই তোকে ফোন করে দেবো, বুঝলি বুদ্ধু?? আর পৌঁছেই কফিশপ যাবো কিন্তু কলেজ স্ট্রীটে মনে থাকে যেন! সে ভাবেই তৈরি হয়ে থাকবি। আর অষ্টমীতে আমিও হলুদ শাড়ি কিনে নিয়েছি। জানি, তুই কিনে রাখবি তবুও তোর পাঞ্জাবী কিনতে গিয়ে পছন্দ হলো শাড়ীটা ভীষণ, তাই নিয়েই নিলাম। মহারাজ রাগ করে থাকলেও এবার ভেঙে গেছে আশা করি! তাই, যদি আবার আমার জন্য কেনা শাড়িটা আমার ওপর রাগ করে না দিস, তাহলে তোর আর আমার সাথে হাতে হাত রেখে একই রঙের পোশাকে পুরো কলকাতার বুকে আঁচড় কাটাটা আর এবছর হবে না! হিহিহিহি। আর এই যে বুড়ো,তুই বুঝি ভুলে গেছিস গতবছর দোলের রং মাখাতে মাখাতে তোকে কি কথা দিয়েছিলাম? "কথা ছিল, হেঁটে যাবো ছায়াপথ..." তবে, তুই এটা ভাবলি কি করে যে তোর কথাতে আমি পুজোতে আসবো না? পাগল রে আমি বুঝি তোর অভিমানটা! তৈরি থাক। আমি আসছি। তোর ঘাড়ে ভূত হয়ে বসে কয়েকদিন বেশ করে তোকে জ্বালাবো।
ইতি,
যার জন্য এতো মনখারাপ করে বসে আছো সেই বিশেষ নারী "
চিরকুটটা রেখে দিয়ে পাঞ্জাবী আর টেবিলের ওপরে রাখা অ্যালবামটা বুকে আগলে রেখে শুরু হলো এক অন্য অপেক্ষার, নিজের মানুষকে নিজের করে পাওয়ার অপেক্ষার।
কলমে : স্মৃতি(মনা)
সাজিয়েছে : রাত্রি