15/08/2021
“নটুবাবুর স্বাধীনতার গান”
কলমে: বন্যা গাঙ্গুলী
নটুবাবু সেই ছোট্টটি থেকে বাংলা গানের বিশাল ফ্যান।বিশেষ করে দেশাত্মবোধক গান হলে নটু কেমন আলাদা মানুষ হয়ে যায়। দেশমাতৃকার সেবা করতেই যেন সে মাতৃ জঠরে ঠাঁই নিয়েছিলো।এ হেন ব্যক্তি্ত্বের দেশের উন্নতি অবনতির কথা ভেবে মা সরস্বতীর কৃপাধন্য আশীর্বাদ আর পাওয়া হয়ে ওঠে নি।গাছের আমটা,নারকেলটা,পকুরের টাটকা মাছটা এই সমস্ত জীবন্ বস্তু, স্কুলের হেডুকে(হেড মাস্টার) ভেট দিয়ে নটুর আ্যকাডেমিক জীবনটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন তার স্বল্প শিক্ষিতা গর্ভধারিণী। কোনোরকমে ক্লাস এইট অবধি গড়িয়েছিলো ব্যাস তারপর লালবাতি। বাবার ছিলো বংশানুক্রমে পাওয়া মুদিখানার ব্যাবসা।তাও সে তিনপুরুষে পাকা ছাদের ঘর করে তুলতে পারেনি নটুর পূর্বপুরুষেরা।সবই ওই দ্বিপ্রাহরীক নিদ্রায় জলাঞ্জলি।এ পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বংশধরদের যৌবনের মাঝমধ্যিখানে পৌঁছতে না পৌঁছতেই দেহের মধ্যপ্রদেশ বেড়ে যাওয়া। নটুরও এ ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম ঘটেনি। দোকানদারিতে নটুবাবুর তেমন আগ্রহ দেখা গেলো না।সে গান গাইতে ভালোবাসতো। পাড়ার যেকোনো জলসায় সে নাম লিখিয়ে আসতো। তার গান শোনার জন্য হয়তো শেষ অবধি কেউ থাকতো না। তাতে কি? নটু গলা উঁচু করে চোখ বন্ধ করে গান গাইতো। মোটা মোটা আঙ্গুল দিয়ে নটু যখন হারমোনিয়ামের ওপর গায়ের জোরে চাপ দিতো বোধহয় যন্ত্রটিও তখন পঞ্চত্বপ্রাপ্তির ভয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির প্রার্থনা করতো।রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদদের দেশাত্ববোধক গান নটুকে খুব উজ্জীবিত করতো।১৫ই আগষ্ট বা ২৬শে জানুয়ারীতে নটু খুব ব্যাস্ত থাকতো।অনেকসময় এমনও হয়েছে নটু ঘুম চোখে বিছানায় শুয়ে শুনছে, মাইকে ঘোষিত হচ্ছে,“এইবার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানটির সূচনা করবে পাড়ারই ছেলে নটবর দত্ত” নটুর হৃদপিন্ডটা ক্ষণিকের জন্য কেমন জোরে জোরে চলতে শুরু করতো। রক্ত শিড়া উপশিড়ার মধ্যে ছলাৎ ছলাৎ করতো।নটু হয়তো দাঁত মাজতেও ভুলে গিয়ে সর্বসমক্ষে উপস্থিত হলো।গান গাইতে গিয়ে হাঁ করলে বাসি মুখের দুর্গন্ধে আশেপাশে কেউ নেই।তবুও বেসুরো গলায় গান সে গাইবেই।একবার খুব অসুস্থ হয়ে ণটু হাসপাতালে ভর্তি হলো।পাড়ার সকলে বলতে শুরু করলো এ বছরে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে নটুর গান বোধহয় শোনা হবে না।অনেকে বললো যাক একটা অস্বস্থি থেকে বাঁচা গেলো। সাতসকালে ওই বেসুরো গলায় গান শুনে তাকে হজম করা এ যেন যন্ত্রনায়ক।ও বাবা পঁচিশে বৈশাখ ভোরে নটু যথারীতি নিজের ফর্মে।“চির নূতনের দিলো ডাক পঁচিশে বৈশাখ” নটুর গলার সাতটা স্বর নিয়ে ধ্বনিত হলো। নটুর জীবনে নতুন সংযোন তার বুড়ো বয়সের প্রেম।হাসপাতালে থাকাকালিন যুথিকা তার খুব সেবা সুশ্রষা করেছিলো। নটু ফস করে তাকে প্রেম নিবেদন করে বসে।ওই যে কথায় আছে না, বিপদে পড়লে স্বয়ং ঈশ্বর ও মর্তে নেমে আসেন। এমনিতে নটু প্রেমে পরার পাবলিক নয়।প্রায় চল্লিসটা বসন্ত পেরিয়ে বত্রিশটা স্বাধীনতা দিবসে গান গেয়ে নটবর শেষে এসে কোন গড্ডালিকায় পড়লো।এর আগে মা অনেক কাকুতি মিনতি করেছিলো বংশ রক্ষার তাগিদে ছেলেকে বিয়ে করতে।কিন্ত নটুর ওই এক গোঁ।বিয়ে করলে তার মন চলে যাবে অন্য মার্গে। গানবাজনায় বাধা পড়বে।মা অনেক বুঝিয়েও শেষে স্বর্গে বাতি পাবার অদম্য লোভটাকে দমিয়ে ফেলেছিলো। কিন্ত যুথিকা যুঝে নেবার ক্ষমতা রাখে।বিয়ের প্রায় আড়াই বছরের মাথায় মহালয়ার দিন ভোরবেলা নটুর একটা ফুটফুটে কন্যাসন্তান জন্মায়।স্ত্রী সন্তান বৃদ্ধা মা কে নিয়ে নটু এবার খাবি খেতে লাগল।পৈতৃক ব্যাবসার গণেশ উল্টেছে অনেক বছর আগেই।যুথিকার চেষ্টায় নটু এক নাম করা সঙ্গীত শিল্পীর বাড়ীর কেয়ারটেকার এর কাজ পায়।বাড়ীর মালিক নটুর মনের কথা জানতে পেরে তাকে নিজের বাড়ীতে রেওয়াজ করার সুযোগ করে দেন।এবং নটুকে তার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করেন। এখন নটুবাবু পেশাদারী গায়ক।দেহের চর্বি অনেকটা কমে গেছে।চেহারায় বেশ চিকন ভাব এসেছে।বৌ বাচ্ছা নিয়ে নটু এখন খেটে খায়।নটুর এই উন্নতি দেখে আশি ছুঁই ছুঁই বৃ্দ্ধা মায়ের ছানি পরা অস্পষ্ট দৃষ্টি সম্বলিত চোখে জল এসে যায়।তাহলে গানই নটুকে বাঁচতে সাহায্য করলো। কিন্ত পাড়ার ক্লাবে নটু স্বাধীনতার গান গাইবেই ১৫ই আগষ্টের দিন।এখন তার গান শুনতে লোকে ভীড় করে, নাঃ, উপহাস করার জন্য নয়, স্বাধীনদেশের তেরঙ্গা পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান শোনার জন্য।নটববাবু এখন গলা ছেড়ে গায়, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি\সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।
🎨 অলি