14/09/2025
একবার চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা কল্পনা করুন,
দক্ষিণেশ্বর মেট্রো স্টেশন।
দুপুর সবে গড়িয়েছে,
সূর্যের আলো কাঁচের ছাদে পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে।
আপনি দাঁড়িয়ে আছেন টিকিট কাউন্টারের লাইনে।
আপনার চারপাশে রোজকার চেনা ছবি,
কেউ ফোনে ব্যস্ত, কেউ বিরক্ত মুখে অপেক্ষা করছে,
আর একদল স্কুলছাত্র নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটিতে মেতে আছে।
সবকিছু কী ভীষণ স্বাভাবিক, তাই না?
আপনার মনে হতেই পারে, এ আর একটি সাধারণ দিন।
কিন্তু আমি যদি বলি,
সেই স্বাভাবিকতার আড়ালেই বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল এক চাপা হিংস্রতায়,
যা আপনি টের পাননি?
যদি বলি,
আপনার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই মানুষগুলোর মধ্যেই কেউ একজন জানত না
যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই দুপুরটি
একটি কিশোরের জীবনের শেষ দুপুর হতে চলেছে?
প্রথমে ছিল শুধু শব্দের স্ফুলিঙ্গ।
তারপর সামান্য ধাক্কাধাক্কি।
আপনি যদি তখন ওই কিশোরদের দিকে তাকাতেন,
তাহলে হয়তো বুঝতেন, ওটা সাধারণ ঝগড়া ছিল না।
ওটা ছিল বারুদে আগুন লাগার আগের মুহূর্ত।
সেই হিংস্র গর্জন,
যা একবার শুরু হলে সবকিছু ছারখার করে দিয়ে তবেই থামে।
আর তারপর...
এক মুহূর্তেই বদলে গেল সব।
ভিড়ের মধ্যে থেকে একটি হাত
তার স্কুলব্যাগ থেকে যা বের করে আনল, তা কোনো বই বা খাতা নয়। এক ঝলক ধারালো ইস্পাত। একটি ছুড়ি!
আপনি কি কল্পনা করতে পারেন,
যে কৈশোরের হাত পেন-পেনসিল ধরার কথা,
সেই হাত কত সহজে মৃ*ত্যু*র অস্ত্র তুলে নিতে পারে?
একটি আর্তনাদ ওঠার আগেই সব শেষ।
আহত ছেলেটা লুটিয়ে পড়ল আপনার চোখের সামনে,
মেট্রোর ঝকঝকে সাদা টাইলস মুহূর্তে ভিজে যেতে লাগল ঘন লাল র*ক্তে।
ওর নাম মনোজিৎ যাদব।
বয়স মাত্র সতেরো।
কাঁধে স্কুলব্যাগ, চোখে হয়তো বাড়ি ফেরার স্বপ্ন।
ছেলেটা একটু আগে সবার মত স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল,
কিন্তু, সে আর বাড়ি ফিরল না।
যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার নাম রানা সিং, তাকে ধরা হয়েছে হাওড়া স্টেশন থেকে!
মনোজিৎকে যখন তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল,
মৃ*ত্যু তখন দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।
কারণ, যেটুকু র*ক্ত ঝরলে জীবন নিভে যায়,
ততক্ষণে তা ঝরে গিয়েছে।
আপনি যদি সেই বাবার হাহাকার শুনতেন, যার ছেলে স্কুল থেকে সরাসরি বাড়ি ফিরল না আর কোনদিন,
তাহলে হয়তো আপনার বুকের ভেতরটাও ভেঙেচুরে যেত।
আপনি যদি দেখতেন, কীভাবে সহপাঠীর র*ক্তে ভেজা আর এক সহপাঠীর হাত কাঁপছে,
তাহলে আপনিও স্থির থাকতে পারতেন না।
এরপর নিয়মমাফিক পুলিশ এল,
সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হল,
অভিযুক্ত ধরাও পড়ল।
এখনো পর্যন্ত সর্বশেষ পাওয়া আপডেট অনুসারে ত্রিকোণ প্রেমের বচসার জেরে এত কান্ড। একবার ভাবুন বয়স ১৭। মাত্র ১৭।
আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, কেন? কেন সামান্য একটা তর্ক এমন নৃশংস পরিণতি ডেকে আনল?
সহজলভ্য আক্রোশ আর হাতের অস্ত্র। যখন কৈশোরের আবেগ আর জেদের সাথে একটি ধারালো ছুরি মিশে যায়, তখন সেখান থেকে কেবল মৃ*ত্যুই জন্মায়।
নতুন জেনারেশন, জেন জি!
তারা এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে যেখানে লাইক, শেয়ার আর স্ট্যাটাসই তাদের আত্মমর্যাদা ঠিক করে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটি ব্যক্তিগত বিষয়কে ঘিরে তৈরি হওয়া রেষারেষি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, মনোজিৎ তার প্রমাণ।
আপনি সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে যে হিংস্র দৃশ্য দেখেন,
তাকে নিছক বিনোদন বলে উড়িয়ে দেন।
কিন্তু গবেষণা বলছে, এই দৃশ্যগুলো কিশোর মন থেকে সহানুভূতিকে মুছে দেয় এবং আগ্রাসনকে উস্কে দেয়। এবং তারা এরকম পদক্ষেপ নিতে এক মুহূর্ত ও দ্বিধাবোধ করে না।
অবশেষে কৈশোর বয়সে ভালোবাসার আবেগ এবং সঠিক শিক্ষা না ও পাওয়ার জন্য দক্ষিণেশ্বরের মেঝেতে একটি সতেরো বছরের কিশোরের গল্প থেমে যেতে হলো।
অপরাধী ধরা পড়েছে, সে শাস্তি পাবে আশা করা যায়।
কিন্তু শুধু অপরাধীকে সাজা দিলেই কি এই সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা যাবে? না। আপনাকে, আমাকে, আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
স্কুলে শুধু অঙ্ক বা ইতিহাস নয়,
রাগ নিয়ন্ত্রণের পাঠও দিতে হবে।
পরিবারকে সন্তানের ডিজিটাল জীবনের উপর আরও বেশি নজর দিতে হবে।
আর মেট্রো স্টেশনগুলোকে এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলতে হবে, যাতে টিকিট কাটার আগেই প্রতিটি ব্যাগ ভালোভাবে স্ক্যান করা হয়।
এই ঘটনাকে শুধু একটি খবর ভেবে ভুলে যাবেন না।
মনোজিৎ ছিল সে-সবার মধ্যে একজন, আপনার ছোট ভাই, আপনার বন্ধু, বা আপনার শিশুর সহপাঠী।
তার জীবন হঠাৎ থেমে গেল, কিন্তু তার গল্প, তার অস্তিত্ব, এখনও এখানে আমাদের চোখের সামনে, আমাদের মনে।
এখন ভাবুন আমরা কি সেই নিঃশব্দে চলা শহরে শুধু পথচারীর মতো হেঁটে যাব? নাকি আমরা সেই গল্পের প্রতিধ্বনি শোনাব, যাতে কোনো মনোজিৎ একাকী আর হারিয়ে না যায়?
শুধু চুপ থাকা নয়, এই শহরের বাতাস, এই রাস্তা, এই মেট্রোর প্রতিটি কণিকা যেন বলে ওঠে, “আমি দেখছি, আমি মনে রাখছি, কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারছি না!”
কথা © RudraX