05/06/2026
📰আজকের উত্তরের সারাদিন ( Uttarer Saradin ) ৩ জুন, ২০২৬ ( বুধবার ), সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতায় আমার লেখা বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। পড়ে দ্যাখা যেতে পারে।
✒️ "বিলুপ্তপ্রায় উত্তরবঙ্গের অসুর সমাজ!"
ইতিহাসের মঞ্চে কোনো কোনো আদিম জনগোষ্ঠীর পথচলা এতটাই নাটকীয় যে, তা মহাকাব্যের ট্র্যাজিক নায়ককেও হার মানায়। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চলের সবুজ চা-বাগানের নিভৃত কোণে আজ যে 'অসুর' আদিবাসীরা বসবাস করেন, নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত যে তাঁরা আসলে প্রাগৈতিহাসিক ও বৈদিক যুগের সেই কিংবদন্তি 'অসুর' বংশের সরাসরি উত্তরসূরি। ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে যদি আমরা একটু পেছনে তাকাই, তবে দেখা যাবে এই প্রোটো-অস্ট্রালয়েড জনগোষ্ঠীর মূল শিকড় লুকিয়ে ছিল সমৃদ্ধ সিন্ধু সভ্যতায়। বৈদিক আর্যদের সঙ্গে ক্ষমতার তীব্র দ্বন্দ্বে পরাজিত হয়ে তাঁরা সিন্ধু উপত্যকা ছাড়তে বাধ্য হন এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত হয়ে ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমির দুর্গম নেতারহাট মালভূমিতে এসে আশ্রয় নেন। এই নেতারহাট অঞ্চলেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁরা নিজেদের আকরিক লোহা গলানোর এক অলৌকিক ও আদিম প্রযুক্তিবিদ্যাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, যার প্রমাণ মিলেছে রাঁচি জেলার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজের অরণ্য সংরক্ষণ নীতি এবং আধুনিক ধাতুবিদ্যার আগ্রাসন তাঁদের সেই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ঠিক এই সময়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, ডুয়ার্স অঞ্চলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বিশাল আকারে চা-বাগান পত্তনের কাজ শুরু করে, তখন ম্যালেরিয়া আর হিংস্র জন্তুতে ভরা ঘন জঙ্গল সাফ করার জন্য এক অনমনীয় ও কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক দলের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। স্থানীয় মেচ বা রাভা উপজাতিরা এই বিপজ্জনক কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে, চতুর ব্রিটিশ সাহেবরা একদল দালালের মাধ্যমে ঘুষের টোপ দিয়ে ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর থেকে এই অসুর মানুষদের উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের জঙ্গলঘেরা বুকে নিয়ে আসে। নিজের পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি আর স্বাধীন অরণ্যের অধিকার হারিয়ে এই যাযাবর ধাতুর কারিগরেরা রাতারাতি রূপান্তরিত হন চা-বাগানের সস্তা ও শোষিত শ্রমিকে। কালনদীর স্রোতে ভেসে আসা এই ঐতিহাসিক অভিবাসন আজ সমকালীন সমাজতত্ত্বের চোখে কেবল এক উপজাতির বেঁচে থাকার লড়াই নয়, বরং তা হলো মূলধন ও সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট এক আদিম কারিগর সভ্যতার নির্মম রূপান্তরের জীবন্ত আখ্যান।
নৃতাত্ত্বিক ক্যানভাসে অসুর সমাজের নিজস্ব জীবনচর্চা, তাঁদের সামাজিক জ্যামিতি এবং আচার-অনুষ্ঠানের রসায়ন অত্যন্ত চমকপ্রদ ও বর্ণিল। ঐতিহাসিকভাবে তাঁরা তিনটি প্রধান উপবিভাগে বিভক্ত—বীর অসুর, বীরজিয়া এবং আগরিয়া। অসুর সমাজ সম্পূর্ণভাবে পিতৃতান্ত্রিক ও পিতৃবংশীয় হলেও, তাঁদের পরিবারে নারীর স্থান অত্যন্ত সম্মানজনক এবং শ্রদ্ধার। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে তাঁদের সমাজ বারোটি সুনির্দিষ্ট 'কিলী' বা বহির্বিবাহ গোত্রে বিভক্ত, যার প্রতিটিই কোনো না কোনো লৌকিক টোটেম বা প্রাকৃতিক উপাদানের (যেমন বাঁশ, ব্যাং, হরিণ, বুনো কুকুর বা বিশেষ পাখি) নামে চিহ্নিত। সমগোত্রে বিবাহ বা যৌন সম্পর্ক সেখানে এক চরম সামাজিক অপরাধ বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য হয়, যার শাস্তি সমাজচ্যুতি। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক আত্মিক যোগ স্পষ্ট। যেমন, প্রসবের পর মা ও শিশুকে অপশক্তির কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাতে আট দিন পর 'ছাটী' নামক এক বিশেষ শুদ্ধিকরণ উৎসব পালন করা হয়, যেখানে আমন্ত্রিত নারীরা এসে মায়ের পা ধুয়ে দিয়ে নবজাতককে শুভেচ্ছা জানায়। আবার বিবাহের ক্ষেত্রে 'ইদে-মে' নামক এক অপূর্ব প্রথা প্রচলিত, যার অর্থ কন্যাকে সহবাসের উদ্দেশ্যে পিত্রালয় থেকে বরের ঘরে নিয়ে যাওয়া। বিবাহের আগে শুভ ও অশুভ লক্ষণ বা শকুন/শগুণ দেখার এক গভীর লৌকিক বিশ্বাস রয়েছে এই সমাজে। পথ চলার সময় শিয়াল বা খালি কলসি দেখা যেমন চরম অমঙ্গলজনক, তেমনই বাঘ বা সাপের দেখা মেলা পরম সৌভাগ্যের প্রতীক। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে দেখলে, অসুরদের আদিম উৎসব হলো 'সানসি-কুটাসী'—যেখানে কোনো বৈদিক মন্ত্র ছাড়াই খোদ লোহার হাতুড়ি, সাঁড়াসি আর নেহাইকে বেদি বানিয়ে মোরগ বলির মাধ্যমে পুজো করা হয়, যাতে আকরিক লোহা গলানোর সময় নিখুঁত ধাতু পাওয়া যায়। বসন্তের শুরুতে শালগাছে নতুন ফুল ফুটলে তাঁরা মেতে ওঠেন তাঁদের প্রধান উৎসব 'সরহুল'-এ এবং বর্ষায় বীজ বোনার পর উদযাপিত হয় 'হারিয়ারী' ব্রত। এমনকি মৃত্যুর পরেও তাঁরা দেহ দাহ করেন না, বরং মৃতদেহকে দক্ষিণে পা দিয়ে পরম মমতায় সমাহিত করেন এবং আত্মার পরলোকের যাত্রাপথের খাদ্য হিসেবে কবরের ওপর কিছু ধান ও শস্যদানা ছড়িয়ে দেন। প্রকৃতির বুক থেকে উঠে আসা এই সরল অথচ গভীর উপাচারগুলোই প্রমাণ করে যে, লৌকিক ধর্মের মূল শক্তি লুকিয়ে থাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে মানুষের আদিম ও নিবিড় সমর্পণের বন্ধনে।
সময়ের নিয়মে এবং বিশ্বায়নের তীব্র ঘূর্ণাবর্তে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের কালকূট বস্তি, মাঝেরডাবরি, সাতালী কিংবা ক্যারন চা-বাগানের নিভৃত কোণে থাকা অসুর সমাজ আজ এক গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিক্ষা, বাজার অর্থনীতি এবং সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে—খ্রিস্টধর্মের ব্যাপক অনুপ্রবেশ তাঁদের হাজার বছরের পুরনো লৌকিক কাঠামোর ভোল বদলে দিচ্ছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আজ আর নিজেদের সেই পুরনো টোটেম বা প্রথাগত পোশাকের গণ্ডিতে আটকে রাখতে চাইছে না বরং বাজার চলতি জিন্স, কুর্তি আর আধুনিক কসমেটিক্সের প্রতি তাদের আকর্ষণ স্পষ্ট। বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রথাগত আচার ভেঙে আজ ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে বিয়ে এবং আধুনিক জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক প্রীতির অনুষ্ঠান বা ওয়েডিং রিসেপশন দেওয়ার প্রবণতা হু হু করে বাড়ছে, যেখানে মহুয়ার পাশাপাশি আধুনিক পানীয়ের ছড়াছড়ি দেখা যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসে। অসুর সমাজের একটি বড় অংশ আজ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ফলে প্রতি রবিবার গির্জায় প্রার্থনা সভায় সমবেত হচ্ছেন, যার ফলে তাঁদের সনাতন 'সারণা' উৎসবের পাশাপাশি বড়দিন বা ক্রিসমাস আজ মহাধুমধামে পালিত হচ্ছে। এই ধর্মীয় রূপান্তর তাঁদের পারিবারিক ও সামাজিক আচার, এমনকি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও এক ধরণের সংকর বা হাইব্রিড মডেলের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতির আঙিনাতেও এক নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছে; আগে যেখানে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ পঞ্চায়েতে কেবল পুরুষদের একচেটিয়া অধিকার ছিল এবং বংশানুক্রমিক প্রধান 'মাহাতো' সমস্ত সামাজিক বিবাদের মীমাংসা করতেন, আজ সেখানে আধুনিক বিধিবদ্ধ পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। ফলে পুরুষতান্ত্রিক বেড়াজাল ভেঙে ঘরের অসুর নারীরা, যাঁরা এতদিন রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অন্তরালে ছিলেন, তাঁরা আজ সমান ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সমাজের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সামনের সারিতে উঠে আসছেন। এই সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও অভিযোজন একদিকে যেমন তাঁদের আধুনিক পৃথিবীর আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই তাঁদের নিজস্ব আদিম ঐতিহ্যের শিকড়কে এক অদৃশ্য খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
আজ যখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বমঞ্চে মহাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন উত্তরবঙ্গের এই অসুর সমাজের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার দিকে তাকালে একজন সমাজ সচেতন ব্যাক্তির বুক কেঁপে উঠবেই। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং রাষ্ট্রের এক চরম দ্বিচারিতা যে, ঝাড়খণ্ডের বুকে যে অসুর সমাজকে 'বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উপজাতি গোষ্ঠী' বা PVTG (Particularly Vulnerable Tribal Group) হিসেবে মর্যাদা ও বিশেষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানায় পা রাখতেই তাঁদের সেই আইনি তকমা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা হারিয়ে গিয়েছে। ফলে আজ তাঁরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অন্যান্য উপজাতিদের চেয়েও বহুগুণ পিছিয়ে পড়েছেন। ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলোর রুগ্ন দশা এবং কৃষিজমির তীব্র সংকটের কারণে আজ বেশিরভাগ অসুর মানুষ ভূমিহীন শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন, কেউ কেউ পেটের তাগিদে টোটো রিকশা চালাচ্ছেন বা শহরের বুকে ট্রাক ড্রাইভার ও দিনমজুরের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অসুর সমাজের ড্রপ-আউট বা স্কুলছুটের সংখ্যা এতটাই আশঙ্কাজনক যে, আলিপুরদুয়ার জেলার পাঁচটি গ্রাম মিলিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছে মাত্র হাতে গোনা দশজন ছাত্র, আর কলেজে পা রাখার সৌভাগ্য হয়েছে মাত্র চারজনের। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে যে—টিপু সুলতানের বিশ্বখ্যাত দামাস্কাস তলোয়ার, দিল্লির মরচেহীন কুতুব মিনারের লৌহস্তম্ভ কিংবা কোনারকের সূর্য মন্দিরের সেই ঐতিহাসিক লোহার বিম যাঁর পূর্বপুরুষদের আবিষ্কৃত অ্যান্টি-রাস্ট বা মরচে-প্রতিরোধী প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছিল, তাঁদেরই বংশধরেরা আজ চরম পুষ্টিহীনতা আর নিরক্ষরতার অন্ধকারে ধুঁকছেন! এমনকি বিশ্বায়নের চাপে তাঁদের আদিম ভাষা 'অসুরি' আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে, স্কুলের অ-উপজাতি বাচ্চাদের সামনে লজ্জায় ও হীনমন্যতায় তরুণরা নিজেদের মাতৃভাষা বলা ছেড়ে দিয়েছে। বাংলার মননশীল বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারক মহলের কাছে আজ আমার একটাই জোরালো প্রশ্ন—উন্নয়ন ও প্রগতির এই অন্ধ জাঁকজমকে নিজেদের গৌরবময় আদিম মেধা ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে এভাবে বলি দিয়ে আমরা কি সত্যিই সভ্যতার অগ্রগতি ঘটাচ্ছি, নাকি এক অপূরণীয় বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? এই আদিম ও লিজেন্ডারি অসুর উপজাতির নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও মেধাকে যদি এখনই প্রশাসনিক ও গবেষণার স্তরে পুনরুজ্জীবিত করা না যায়, তবে ইতিহাস আমাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না।
© উৎস চক্রবর্ত্তী (স্বাধীন গবেষক | প্রাবন্ধিক)
ঘোকসাডাঙা, কোচবিহার
জুন ৩, ২০২৬ (বুধবার)
#উত্তরবঙ্গ #কোচবিহার #কুচবিহার #সাঁওতাল #অসুর #ফালাকাটা