04/09/2026
ফেসবুক সূত্রে পাওয়া
জেলা সম্পর্কিত তথ্য
মহানায়ক উত্তমকুমার সম্বন্ধে
[যাচাই করার সুযোগ হয়নি]
♦️৫২ পরিবারকে জমি কিনে দিয়েছিলেন মহানায়ক
♦️নেপালগঞ্জ পরিচিত হোক 'উত্তম নগর' নামে
এ আর এক অন্য উত্তম। যিনি শুধু মহানায়ক নন, মহান মানুষও। উত্তমকুমারকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা, তিনি ছিলেন কারও কাছে পথপ্রদর্শক, কারও কাছে পরামর্শদাতা, আবার কারও কাছে পরিত্রাতাও বটে। এখনও কলকাতার বুকে ৫২টি পরিবার আছে, যাঁরা উত্তমকুমারের কিনে দেওয়া জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু করেছেন, সসম্মানে বেঁচে আছেন। কলকাতা পুরসভার ১৪২ নম্বর ওয়ার্ডের নেপালগঞ্জ এমন একটা জায়গা, যেখানে কোম্পানি পুকুর, কাঠপোল এলাকায় উত্তমকুমার প্রায় সাড়ে পাঁচ বিঘে জমি কিনেছিলেন। না, নিজে থাকার জন্য নয়। তাঁর টিমের টেকনিশিয়ান সহ ছবির সঙ্গে যুক্ত 'দিন আনা দিন খাওয়া' ৫২টি পরিবারের জন্য। তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রতি পরিবারের জন্য তিনি একটি স্বপ্নের নগরী স্থাপন করবেন। যেখানে এই ৫২টি পরিবারকে উনি ফ্ল্যাটবাড়ি করে দেবেন। টালিগঞ্জ পাড়া থেকে জায়গাটা খুব-একটা দূরে নয়। পুঁটিয়ারি পার হয়েই পড়বে কবরডাঙা। সেখান থেকে বাঁ দিক বরাবর এক-দেড় কিলোমিটার গেলেই এই অঞ্চলটি। কথা হচ্ছিল বুদ্ধদেব দাসের সঙ্গে, 'আমার বাবা রতন দাস ও সেই সময় অনেকেই যাঁরা উত্তমবাবুর সঙ্গে
কাজ করতেন, তাঁদের কথা ভেবে
উত্তম বাবু এই জায়গাটি কিনেছিলেন।
© রূপকথা
আমরা গরিব পরিবারে জন্মেছি। 'নো ওয়ার্ক নো পে' পারিশ্রমিকের মধ্যে পড়ি। বাবা সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আমিও সিনেমার সঙ্গে যুক্ত আছি এবং আমার ছেলেও এই একই কাজে যুক্ত। বাবার সময় অর্থনৈতিক অবস্থা আরও অনেক খারাপ ছিল। সেই সময় সিনেমাও কম হত। আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। ফলে শুধু বাবা কেন, বাবার মতো সিনেমার সঙ্গে যুক্ত অনেক টেকনিশিয়ানেরই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা ছিল। খিদে পেলে খাবার কিনে খাবে, না ভাড়া বাড়ির টাকা মেটাবে? সেই সময় তাঁদের পরিত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। বর্তমানে আমরা যেখানে আছি, মানে নেপালগঞ্জে উনি প্রোডাকশনের সঙ্গে যুক্ত ৫২ জন মানুষের জন্য জমি কিনেছিলেন। এই ৫২ জনের দলে আমার বাবাও ছিলেন। বাবার মুখে বার বার শুনেছি, উত্তমবাবু বলতেন, আমার টেকনিশিয়ান ভাইদের জন্য আমাকে এই কাজটা করতেই হবে। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য, এর কিছুদিনের মধ্যেই উত্তমবাবু হঠাৎ মারা যান। ফলে টেকনিশিয়ানদের জন্য ফ্ল্যাট হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আমরা প্রত্যেকে এক কাঠা চোদ্দো ছটাক করে জায়গা পাকা দলিল সহ পেয়েছি। এই জায়গার জন্য আমাদের একটি টাকাও খরচ করতে হয়নি। পরে যে যার মতো বাড়ি তৈরি করেছি। একসময় আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। এখন নিজের বাড়ি আছে। উত্তমবাবুর জন্য এটা সম্ভব হয়েছে। উনি আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে আমরা হয়তো ফ্ল্যাটবাড়িতে বসবাস করতাম। ওঁর মৃত্যুটা আমাদের কাছে দুর্ভাগ্যের। তবে এটা বলতেই হবে উত্তমবাবুর মতো করে সিনেমার সঙ্গে যুক্ত 'নো ওয়ার্ক নো পে' মানুষদের কথা আর কেউ ভাবেননি। উনি ছিলেন বলেই আজ আমরা তিনটে জেনারেশন বেঁচে গেলাম। মাসের শেষে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার চিন্তা অন্তত আমাদের নেই। এরকম মহান মানুষ হয় না। প্রচুর মানুষকে উনি সাহায্য করেছেন। কিন্তু ওঁনার ডান হাতের কথা বাম হাত জানতে পারেনি। এতে দাতার অহংকারবোধও খানিকটা প্রকাশ পায়। কিন্তু উত্তমবাবু ছিলেন অন্য জাতের মানুষ। তাঁর থেকে যাঁরা সাহায্য পেয়েছেন, তিনি নিজে এবং সেই সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া সেই কথা আর কেউ জানতে পারেনি। আমার নিজের ক্ষেত্রেই বলতে পারি, জমি কেনার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিল না।
বুদ্ধদেব দাসের পুত্রও বর্তমানে সিনেমা টেকনিশিয়ান। অর্থাৎ 'দাস' পরিবারের তৃতীয় যাঁরা প্রজন্ম, বংশগতভাবে সিনেমার কাজের সঙ্গে যুক্ত। বছর ৩০-এর তরতাজা যুবক জানালেন, 'আমাদের কাছে উত্তমকুমার ভগবানতুল্য মানুষ। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য যেমন একই ভাবে অভিনেতার প্রয়োজন, টেকনিশিয়ান ছাড়াও এই ইন্ডাস্ট্রি অচল। তাই বলাই যায়, সিনেমা জগতে অভিনেতা ও টেকনিশিয়ান একে অপরের পরিপূরক। অনেক অভিনেতাই দর্শকদের ভালোবাসায় নায়কের মর্যাদা পেয়েছেন, কিন্তু উত্তমকুমারের মতো মহানায়কই একমাত্র মানুষ, যিনি টেকনিশিয়ানদের কথা ভেবেছেন। তাঁদের দুঃখ-দুর্দশায় পাশে থেকেছেন। সিনেমা জগতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে টেকনিশিয়ানদেরও যে সমান উপস্থিতি প্রয়োজন- এই কথাটির সারমর্ম উত্তমকুমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। দাদুর মুখে শুনেছি, টেকনিশিয়ানদের কাছে তিনি নিজেদের 'বড়দাদা'-র মতো ছিলেন। সবাই নিদ্বির্ধায় তাঁর কাছে গিয়ে নিজেদের অভাব-অভিযোগের কথা জানাতে পারতেন। উনিও যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন সমস্যার সমাধান করতে। আমাদের নিয়ে এভাবে ভাবতে আমরা আর কাউকে দেখিনি।
তথ্যসূত্র মহানায়ক শ্রী উত্তমকুমার।
© রূপকথা