09/08/2025
সূর্য তখন কেবল পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে। সোনালী আভায় ছেয়ে গেছে চারদিক। শান্ত নদীর ধারে বসে আছে অনিমেষ। তার হাতে পুরোনো একটি ডায়েরি। ডায়েরির পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, মলাটটিও বেশ জীর্ণ। কিন্তু প্রতিটি পাতায় মিশে আছে অনিমেষ আর মিতুর না বলা কত কথা, কত স্মৃতি।
অনিমেষ আর মিতুর ভালোবাসা শুরু হয়েছিল এক বৃষ্টির দুপুরে। কলেজের করিডোরে বই হাতে দাঁড়িয়ে ছিল মিতু, আর অনিমেষ এক ছুটে তার সামনে চলে এসে ছাতা ধরেছিল। তারপর থেকেই দু'জনের পথচলা শুরু। একে অপরের কাছে তারা যেন এক অন্য পৃথিবী খুঁজে পেয়েছিল। অনিমেষের চোখ ছিল মিতুর হাসিতে, আর মিতু খুঁজে পেত অনিমেষের নীরব চাহনিতে এক গভীর ভালোবাসা। তারা স্বপ্ন দেখেছিল একটা ছোট সংসার, যেখানে থাকবে না কোনো অভাব, থাকবে শুধু ভালোবাসা।
কিন্তু জীবন সব সময় সিনেমার গল্পের মতো হয় না। মিতুর বাবা-মা তাদের সম্পর্ক মেনে নিলেন না। মিতুর জন্য এক ধনী পাত্রের খোঁজ পেলেন তারা। অনিমেষের তখন সবে চাকরি হয়েছে, আর তাই তার কাছে মিতুকে রাখার মতো কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। অনিমেষ বলেছিল, "আর কিছুদিন অপেক্ষা করো, আমি সব ঠিক করে নেবো।" কিন্তু মিতুর পরিবারের চাপ আর অনিমেষের অসহায়তা, দুইয়ের মাঝে মিতু নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত মিতু অনিমেষকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। সেই দিনটিও ছিল এক বৃষ্টির দুপুর। অনিমেষ মিতুর সামনে দাঁড়িয়েছিল, তার চোখে ছিল না কোনো রাগ, ছিল শুধু একরাশ শূন্যতা। মিতু শুধু বলেছিল, "আমাকে ভুলে যেও অনিমেষ। হয়তো এভাবেই ভালো থাকব আমরা।" এই বলে সে অনিমেষের হাত থেকে তার ডায়েরিটা ফেরত নিয়েছিল।
আজ অনেক বছর পর অনিমেষ সেই ডায়েরিটা আবার হাতে নিয়েছে। ডায়েরির প্রথম পাতায় মিতু লিখেছিল, "আমাদের গল্পটা শুরু হোক। শেষ যেন না হয় কোনো দিন।" অথচ সেই গল্পের শেষটা যে এতো করুণ হবে, তা তারা কেউই ভাবেনি। অনিমেষ ডায়েরিটা বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, জীবনের স্রোতও হয়তো এভাবেই চলে যায়, কিছু ভালোবাসা মাঝপথে হারিয়ে যায়।
অনিমেষ ডায়েরিটা বন্ধ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। নদীর শান্ত জলে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। তার মনে হলো, জীবনের স্রোতও হয়তো এভাবেই চলে যায়, কিছু ভালোবাসা মাঝপথে হারিয়ে যায়।
হঠাৎ তার পাশ থেকে এক মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এলো, "আপনার কি কোনো কিছু হারিয়ে গেছে?"
অনিমেষ চমকে তাকালো। একটি মেয়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত মায়া, অনেকটা মিতুর মতোই। অনিমেষ মৃদু হেসে বলল, "হারিয়ে তো অনেক কিছুই গেছে, তবে আজ যেন নতুন করে কিছু খুঁজে পেলাম।"
মেয়েটি হেসে ডায়েরিটির দিকে তাকিয়ে বলল, "যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কি ডায়েরিটা দেখতে পারি?"
অনিমেষ ডায়েরিটি তার হাতে তুলে দিল। মেয়েটি ডায়েরির পাতা উল্টে দেখল। প্রথম পাতায় লেখা 'মিতু ও অনিমেষ', আর তার পাশে একটি হাসিমুখের ছবি। মেয়েটি ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলল, "মিতু... নামটি খুব সুন্দর।"
অনিমেষ তখন তার জীবনের সেই দুঃখের গল্পটি মেয়েটিকে বলতে শুরু করল। আর মেয়েটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সব শুনল। গল্প শেষে মেয়েটি বলল, "প্রেমের গল্পগুলো এমন হয়, কিছু গল্পের শেষ হয় না, কিছু গল্পের শেষ হয়েও নতুন করে শুরু হয়।"
অনিমেষ তাকালো তার দিকে। তার চোখে তখন আর শূন্যতা ছিল না, ছিল নতুন এক আশার আলো। মেয়েটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "আমার নাম তিথি। আপনার গল্পটা তো এখনো শেষ হয়নি, তাই না?"
অনিমেষ তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, "হয়তো না। হয়তো আজ থেকেই আমাদের গল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।"
নদীর ওপারে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। লাল আর হলুদ আলোয় ভরে উঠেছে আকাশ। সেই আলোর নিচে বসে অনিমেষ আর তিথি, নতুন এক গল্পের সূচনায়।