27/06/2026
আমার হাই রিস্ক প্রেগনেন্সিতে ডাক্তার বলেছিল বেবি বাঁচবে না কিন্তু আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। আমাদের মেয়েটা জন্ম হওয়ার সাথে সাথেই nicu তে রাখা হয়েছিল। nicu তে দিনের পর দিন ওর অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। ডাক্তার বলেই দিয়েছিল যেকোনো সময় লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে। ওর বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। এতগুলো দিন আমার মেয়েটা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছে, কি কষ্ট টাই না সে পেয়েছে ডাক্তার নার্স সবাই হতাশ এবং দুঃখ করেছে ওর জন্য। এত লড়াই আর কষ্টের পরে আল্লাহ ওকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আমাদের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন।৪০ দিন পর ওকে নিয়ে আমরা বাসায় ফিরলাম, এত ছোট আর এত সেনসিটিভ বাচ্চা নিয়ে প্রতিমুহূর্তে ভয়ে ভয়ে কাটাতে হয়!বাবুকে নিয়ে রেগুলার ডাক্তারের কাছে ফলোআপে যাচ্ছি। যেসব বাচ্চারা nicu তে থাকে ওদের ব্রেন, হার্ট, নাক কান, চোখ সবকিছু পরীক্ষা করতে হয়! আমরাও আমাদের মেয়েকে নিয়ে একেক সময় একেক হাসপাতালে সবকিছু পরীক্ষা করালাম। সবকিছু ঠিক থাকলেও ওর ব্রেনে একটা প্রবলেম দেখা গেল ওর ডাক্তার ওকে নিউরোলজিতে রেফার করলো! তারপর তাকে নিয়ে আমরা নিউরোসাইন্স এ গেলাম, নিউরোলজিস্ট দেখে বলল এখন ভয়ের কিছু নেই। ওর যে সমস্যাটা হয়েছে সেটা কমে গেলে আলহামদুলিল্লাহ আর যদি বেড়ে যায় তাহলে সার্জারি করতে হবে! ওর বাবা আর আমি নতুন এক চিন্তায় পড়ে গেলাম এবং ভয়ে ভয়ে দিন যাচ্ছে আমাদের! এর মাঝে হঠাৎ করে দেখলাম আমাদের মেয়েটা যেন কেমন করছে জিনিসটা আমাদের কাছে একদমই নতুন। দুইদিন আমরা অবজারভেশন করার পরে তিন দিনের দিন ইমারজেন্সিতে বাসার কাছে একজন চাইল্ড স্পেশালিস্ট দেখালাম। আমরা ভিডিও করে রেখেছিলাম ভিডিওটা দেখাতেই তিনি বললেন এটা হচ্ছে খিচুনি। শোনার পরে ভয়ে আতকে উঠলাম, একটা বাচ্চার জন্য খিচুনি যে কত ভয়ংকর সেটা আমরা জানি! ডাক্তার ওর ফাইল রিপোর্ট সব কিছু দেখে বলল ওর উপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে। ডাক্তার ওষুধ দেওয়ার পরে দৃশ্যমান খিচুনি কমে গেলেও আরও একটা সমস্যা এখনো বিদ্যমান ।ব্রেইনের খিচুড়ি টা বন্ধ হয়েছে কিনা সেটা আমরা জানি না। ঠিক করলাম আমরা আবার নিউরোসায়েন্স এ নিয়ে যাব যেহেতু খিচুনি টা ব্রেন থেকে আসে। আর এই খিঁচুনির পুরা ইফেক্ট টা ব্রেনে পড়ে তাই আমরা ওকে আবার নিউরো সাইন্সে নিয়ে গেলাম সেখানে নিউরোলজিস্ট কে ভিডিওটা দেখানোর পরে আর ওর হিস্ট্রি বলার পরে উনি EEG করতে দিলেন।আর যে ওষুধটা খাওয়ানো হচ্ছে ওইটাই কন্টিনিউ করতে। টেস্টের জন্য আমরা খোঁজ নিয়ে দেখলাম ওখানে সিরিয়াল এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে যায়।এত দেরি করলে ওর ব্রেইনের উপর আরো বেশি ইফেক্ট পরবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা টেস্ট টা বাইরে করাবো!নিউরোসাইন্স থেকে আমরা আবার গেলাম শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে দেখলাম একটি বাচ্চা একেক সমস্যায় ভুগছে কেউ সি পি বাচ্চা, কেউ অটিজম আবার কারো ডেভেলপমেন্ট ডিলে। ম্যাক্সিমাম বাচ্চাদের খিচুনির সমস্যা।কয়েকজন মায়েদের সাথে কথা হল অনেকদিন ধরে ট্রিটমেন্ট করছে কিন্তু তেমন কোন উন্নতি হয়নি। এসব দেখার পরে আমাদের মনের অবস্থা কেমন সেটা আমরাই জানি।সময় যত যাচ্ছে আমার আর ওর বাবার টেনশনে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যে এতটুকু বাচ্চা আর কত কিছু সহ্য করবে আর ওর উপর দিয়ে কত কিছু যাবে। ইবনে সিনায় সিরিয়াল দেয়া হল ভোর ছয়টায় আমরা টেস্ট করাতে গেলাম। সাড়ে আটটার দিকে আমাদের ডাকা হল টেস্ট করার জন্য। কি যে টেনশন হাত-পা কাঁপছে কেমন অস্থির লাগছে এত টেনশন এর মধ্যে বাচ্চাটাকে নিয়ে রুমে ঢুকলাম ঘুমের ওষুধ খাইয়েও ওকে ঘুম পাড়ানো হয়েছে আমার কোলের মধ্যে নিয়ে বসলাম, এতগুলো তার ওর মাথার মধ্যে লাগানো হয়েছে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম যে আল্লাহ এই ছোট্ট জান আর কত কষ্ট করবে। ওর রিপোর্ট যেন ভালো আসে। প্রায় ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগলো টেস্ট টা শেষ করতে । তারপর বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আমার হাজবেন্ডের মনটা একটু খারাপ। ওখানে এক ভাইয়ের সাথে তার আলাপ হয়েছে তার বাচ্চার বয়স চার বছর,তাকেও ডাক্তার EEG দিয়েছে। চার বছরের একটা বাচ্চা হাঁটতে পারে না, বসতে পারেনা, কথা বলে না হাসে না নিস্তেজ হয়ে শুধু শুয়ে থাকে। বাচ্চাটাকে নিয়ে তারা অনেক জায়গায় গিয়েছে কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। বাচ্চাটার ব্রেনে খিচুনি আর এই খিচুনি থেকেই বাচ্চাটার এই অবস্থা। এটা শোনার পরে টেনশন ভয় আরো বেড়ে গেল! আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে তাই দেখে আমার হাসবেন্ড আমাকে বোঝালো! আমি মেয়ে মানুষ আমার দুঃখ কষ্ট আমি প্রকাশ করতে পারি কান্না করতে পারি,আমার হাজবেন্ড পুরুষ মানুষ সবকিছু প্রকাশ করতে পারেনা কান্নাও করতে পারে না। তার ভিতরে কি চলছে সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সে আমাকে সব সময় বোঝায় সান্তনা দেয়!বুঝতে পারেন আমাদের মনের অবস্থা কি একটা বাচ্চা পেট থেকে অনবরত কষ্ট করে যাচ্ছে একের পর এক সমস্যা একের পর এক সমস্যা। আমরা তাকে নিয়ে ছুটছি এই হসপিটাল থেকে ওই হসপিটাল।এই ডাক্তার থেকে ওই ডাক্তারের কাছে। কত রকমের পরীক্ষা কত রকমের ওষুধ। আমার মনে ভীষণ ভয় আমার বাচ্চা কি আর অন্য বাচ্চাদের মতো সুস্থ স্বাভাবিক হবে? ও কি হাঁটতে চলতে পারবে হাসবে খেলবে বাবা মা বলে ডাকবে! কি হবে আমাদের মেয়েটার! ব্রেইনের খিচুনি সুস্থ একটা বাচ্চাকে একদম নিঃশেষ করে দেয়! পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় কারা জানেন? অসুস্থ সন্তানের বাবা মা! আমরা জানি না আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ কি! আল্লাহ ওর কপালে কি লিখে রেখেছেন! আমাদের দিন রাত যায় ডাক্তার হাসপাতাল আর ভয়ে ভয়ে!মুহূর্তে কান্নাকাটি করি আবার নিজেকে নিজে সামলিয়ে রাখি! একটা অসুস্থ বাচ্চা যার সাথে আমরা আরো তিনজন মানুষ যুদ্ধ করে যাচ্ছি! এর শেষ কোথায় আমরা এখনো জানিনা! ডাক্তার হাসপাতালে আমাদের জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে!সবাই আমার মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ যেন ওর এই খিচুনিটা সারা জীবনের মতো বন্ধ করে দেয় আর ও যেন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে!