22/11/2025
#গল্প_রঙ্গীলা_মন
#কলমেঃ Rezoyana Afrin Mahi-রেজওয়ানা আফরিন মাহী
#পর্বঃ৯
"কি আশ্চর্য! আজকে সূর্য দক্ষিণ দিকে উঠেছে নাকি! রাত মামুনি আপনারা এই খানে কি ভাবে?? ফাস্ট বেঞ্চ কে লাস্ট ব্রেঞ্চ ভেবে বসে পড়েছেন আপনারা তাই নাহ??
" স্যার,,,, আমরা কি ফার্স্ট বেঞ্চে বসতে পারি না নাকি!!সবার এত আশ্চর্য হওয়ার কি আছে বুঝলাম না।আপনারা টিচার রাই তো সবসময় আমাদেরকে ফাস্ট বেঞ্চে বসতে বলেন, আজকে যেই বসেছি, অমনি আপনারা বুলিং শুরু করেছেন.. এরকম করলে কিন্তু আমরা আর সামনে বসবো না বলে দিলাম।।
শাহ আলম স্যারের কথায় অভিমানী কন্ঠে উত্তর করল রাত। ওরা কখনোই ফার্স্ট বেঞ্চ তো দূরের কথা লাস্ট ব্রেঞ্চ ছাড়া অন্য কোনো বেঞ্চে বসে না। ওদের এই এক বছরে কোন টিচার অন্য ব্রেঞ্চে বসাতে পারেনি, যদিও কোন টিচারের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে বসেছে তবেও ওই ক্লাস করে আবার পেছনে চলে গেছে। আজকে নিজ উদ্যোগে ওদের ফার্স্ট বেঞ্চে বসাটা ঠিকঠাক কেউই হজম করতে পারছে না।
"আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে, বসো, তোমাদের যে ব্রেঞ্চে মন চায় সেই ব্রেঞ্চে বসে ক্লাস করো।
শাহ আলম স্যার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে, নিজের লেকচার শুরু করলেন। ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ রুহি,রাতের কানে ফিসফিস করে বলল
"সত্যি করে বলতো মামা, কাহিনী কি??এনে বইলি কেন??
"হরে,এনে আমার বসতে একটুও ভালো লাগতেছে না। মনে হইতেছে স্যার আমার কপালের উপরে আইসা পড়বো। "আদ্রিতা সরল গলায় রুহির সঙ্গ নিল।
"এইখানে বসলে সিজান স্যারকে একদম সরাসরি দেখা যাবে। কেন রুপ ভেজাল ছাড়া। তাকে একদম চোখের সামনে দেখতে পাব তাই,,, "রাত মহাচ্ছন্ন গলায় প্রতি উত্তর করল ওদের প্রশ্নের।
" কি,,, তুই শুধু মাএ স্যার রে দেখতে সামনে বসছিস । হায় আল্লাহ,মামা,, তুই তো শেষ, এক্কেবারে শেষ স্যারের প্রেমে।
"ধুর কিসের প্রেম?আমি কই প্রেমে পড়লাম?
"প্রেম নয় তো কি? প্রেম না থাকলে দেখার জন্য এত উতলা হয়েছিস কেন??
" জানি না রে,,, তারে শুধু দেখতে মন চায়। কেন মন চায়,কিসের জন্যে মন চায়, আমি কিছুই জানি না, শুধু জানি তারে শুধু দেখতে মন চায়।।
রাতের কন্ঠে কিছু একটা ছিল, যা এতক্ষণ ধরে মজা করতে থাকা রুহি আর আদ্রিতা কে বাক্যহারা করে দিয়েছে।
"দোস্ত আর ইউ ওকে নাহ?? মানে তুই কি কোন ভাবে স্যারের প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছিস??
"আমি কিছু জানি না দোস্ত। কিছু বুঝতে পারছি না কেন এমন হচ্ছে। কালকে স্যারকে দেখার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও আমার মাথা থেকে স্যারের কথা বের হয়নি। বারবার শুধু স্যারের মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
"তার মানে শেষ পর্যন্ত তুই স্যারের প্রেমে পড়লি। ও মাই গড...।"আদ্রিতা আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল।
" আমি জানি না,,,,
"জানি না মানে....
"সাইলেন্স,,,
রুহি কথা শেষ করার আগেই থমকে উঠলেন স্যার। স্যারের ধমকে ওরা চুপচাপ ক্লাসে মনোযোগী হলো। পরপর দুটো ক্লাস কমপ্লিট করে,টিফিন টাইমে ওরা বেরিয়ে আসলো ক্লাস রুম থেকে। ক্যান্টিনে যাওয়ার সময় ফাহিম দৌড়ে আসলো ওদের কাছে, এতক্ষণ ও ওর ছেলে ফ্রেন্ডদের সাথে ছিল। এসেই হুলুস্তর কাণ্ড বাজিয়ে বলা শুরু করল,,,
"মামা ওই মাইয়াটারে নিয়ে কিছু ভাবছোস?? কিছু তো কর,,,
" কি করবো হ্যাঁ,দুইজন দুইটার লাইগা পাগল হইছস। কোনটা রে রাইখা কোনটার দিকে ফিরে তাকাবো। কোনটার সেটিং আগে করাবো সেটাই তো বুইঝা পাইতেছি না। "রুহি বিক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল।
"স্যারের সাথে সেটিং করা তো আর চারটে খানি কথা না, বড়ই ঝামেলার আর কষ্টসাধ্য হবে বিষয় টা, সময়ও লাগবে।তাই আগে ফাহিমের সেটিং করা যেতে পাবে।
আদ্রিতা ভাবুক সরে প্রতি উত্তর করল। তার কথায় সকলেই সহমত পোষণ করে।এবং ভাবতে থাকে ওই মেয়েটাকে ঠিক কিভাবে প্রপোজ করা যেতে পারে।ভাবতে ভাবতে ওরা ক্যান্টিনের এক কোনার টেবিলে গিয়ে বসে।ফাহিম আর রুহি যায় সকলের জন্য কফি আর হালকা খাবার আনতে।ভিরের মধ্যে সবার না যাওয়াই ভালো, তাই প্রতিদিন যেকোনো দুইজন গিয়ে সকলের জন্য খাবার নিয়ে আসে।খাবার নিয়ে আসা মাত্রই ওরা চারজন টেবিলে গোল হয়ে বসে খেতে লাগলো, খেতে খেতে ওদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা চলতে লাগলো,,
" আচ্ছা, মেয়েটা সম্পর্কে আর কোন খবরা-খবর পেয়েছিস, কোথায় থাকে,নাম,বা বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা, সামথিং লাইক কিছু?? "রাত ফাহিম কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করল।
"হুম,, নাম হলো মারিয়া, বাসা ঝড়কার কোথায় একটা। আর যতটুকু খোঁজ লাগিয়ে জানতে পারলাম বয়ফ্রেন্ড নেই।
"ও ও ও মারিয়া এ তুনে কেয়া কিয়া,, ফাহিম কা দিল চুরালিয়া,, মারিয়া য়া য়া য়া মারিয়া,, 🎶
ফাহিমের কাছ থেকে নাম জানার পর ওরা তিনজনই ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে টেবিল থাপড়িয়ে থাপড়িয়ে সুর তুলে গেয়ে উঠলো....। ওদের গান শুনে ফাহিম লজ্জা লজ্জা ভাব করে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল, তারপর বিড়বিড় করে বলল,,,
"অমন কইরা বইলো না গো,, মোর সরম করে,,,,।
" আাা হা গো,,"
ওরা সকলেই উচ্চশব্দে হেসে উঠলো ফাহিম আর রাতের অভিনয়ে। হাসাহাসির মাঝখানে হঠাৎ রাতের চোখ গেল ঘড়ির দিকে টিফিন টাইম শেষ হওয়ার আর ২ মিনিট বাকি আছে। এতে তার কিছু যায় আসে না, কারণ সবগুলো ক্লাস করার মত স্টুডেন্ট ওরা না।কিন্তু হঠাৎ করে কিছু একটা মাথায় আসতেই রাত হাসি বন্ধ করে সিরিয়াস ভঙ্গিতে সোজা হয়ে বসলো।তারপর নিজের সন্দেহকে যাচাই করার জন্য রুহি কে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,,
"টিফিন শেষে কি ক্লাস রে??
"কি আর ইকোনমিক্স।"রুহি ঘা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল।
কিন্তু রাত সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো,আর কোন কথা না বলেই দৌড়াতে লাগলো বাইরের দিকে । হঠাৎ করে রাতের এই কান্ডে হক চকিয়ে গেল ওরা। ওদের এক মিনিট সময় লাগলো রাতের হঠাৎ দৌড়ানোর কারণ বুঝতে, কিন্তু যখনই মাথায় আসলো ইকোনমিক্স ক্লাস রাতের ক্রাশ সিজান স্যার নিবেন, তখন ওরাও আর কোন দিক না তাকিয়ে সোজা রাতের পিছু পিছু দৌড়াতে লাগলো।এক দৌড়ে ওরা নিচতলা থেকে তিনতলায় চলে এসেছে।ক্লাসে সামনে আসতে দেখল সিজান স্যার এখনও ক্লাসে আসেন নি, তার জন্য ওরা আস্তে ধীরে ক্লাস প্রবেশ করে নিজ নিজ সিটে বসলো।
"ভাই তুই কি নিজের সাথে সাথে আমাদের কেউ মারতে চাইছিস। দৌড়াতে দৌড়াতে আমার জীবন শেষ। কবে যেন তোদের পাগলামি সহ্য করতে করতে আমি টপকায় যামু রেহ,,,"
রুহি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। ওর কথা শুনে আদ্রিতা রাতের দিকে ঘুরে বসে সিরিয়াস মুখ নিয়ে প্রশ্ন করল।
"এভাবে দৌড়ানোর কোন মানে হয়, রাত। আসলে তুই চাইছিস টা কি বলতো..??
আদ্রিতা কথা শুনে রাত গুন গুন করে গেয়ে উঠলো,,,
🎶এমন নিদানের দিনে বিনীত প্রার্থনা গো
লক্ষ-কোটি ভুল আর ত্রুটি করিও মার্জনা গো
শোনাইবো তাহারে আজ, করেছি বাসনা গো
ঐরাবতের হৃদয় হতে ক্ষুদ্র এ রচনা
আমি কী করিবো, কোথায় যাবো
কোন সাধনে পাবো গো
আর একটি বার তাহারি-ই দর্শন..!
আর একটি বার তাহারি-ই দর্শন..!
কোন বাদনে বাধিঁ আমি.?
কেমনে তারে রাখি গো....."
তারে ছাড়া রিদয় অচেতন...!🎶
রাতের গানের মধ্যেই তার অপেক্ষায় অবসান ঘটিয়ে ক্লাসরুমে প্রবেশ করলো সিজান।তাকে প্রবেশ করতে দেখা মাত্রই সকল স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে এক জোটে সালাম জানালো। সিজান সবাইকে বসতে বলে নিজের সাথে নিয়ে আসা এক্সাম পেপারগুলো ডিক্সের উপর রাখল। তারপর হঠাৎ খেয়াল করলো সবাই বসে গেলেও সামনের একটা মেয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে আর তার দিকে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতেই হঠাৎ মনে আসলো এটা কালকের ওই ক্লাসরুমে ঘুমানো মেয়েটা। এতে যেন আরও বেশি বিরক্ত হলো সিজান।
সিজনের কপাল কুঁচকে যেতে দেখে,তার বিরক্তি টা যেন ঠাওর করতে পারলে রুহি।তাই তাড়াতাড়ি রাতের হাত ধরে টেনে ওকে বসিয়ে দিল নিজের সাথে । রাত এখনো এক ধ্যানে সিজানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ও আর সিজান বাদে আশেপাশে আর কিছুই নেই।
সিজান মনে হয় ওর এই ভাবে তাকানো তে আরো কিছুটা বিরক্ত হলো। কিন্তু তারপরেও ওকে এবং ওর দৃষ্টি কে এভোয়েড করে, ক্লাস শুরু করলো,,
"গুড মর্নিং, এভরিওয়ান।হোপ ইউ আর অবসোলুটলি ফাইন।
আরো কিছু টুকটাক ফর্মাল কথাবার্তা বলে, শিক্ষার্থীদের মাঝে ওদের প্রি টেস্টের এক্সাম পেপার দেতে শুরু করল সিজান। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে উঠে এসে এক্সাম পেপার নিয়ে যাচ্ছে। একে একে রুহি,আদ্রিতা,ফাহিম খাতা পেয়ে গেল, কিন্তু রাত পেল না। এতে অবশ্য ওর মাথা ব্যথা নেই, ও এখনো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সিজানের দিকে। কি এতো দেখছি আল্লাহ জানে। রুহি শেষমেষ বিরক্ত হয়ে না পেরে বলে উঠলো,,,
" ভাই এইবার থাম। বেচারার তো তোর নজর লেগে পেট খারাপ হয়ে যাবে।
রুহির কথায় বিরক্ত হলো রাত। তার নজরে পেট খারাপ হতে যাবে কেন আজব। সে কি খারাপ ভাবে,বা কুনজর দিয়েছে নাকি,যে পেট খারাপ হতে যাবে।রাত প্রতিবাদী কণ্ঠে কিছু বলবে,তার আগে এক গুরু গম্ভীর ভরাট কণ্ঠস্বর শোনা গেল,,
"ইবরাত কে সামনে এসো। কুইক,,
~চলবে
(অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত।আমি ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটু ব্যস্ততার মধ্যেই সময় পার করছি।কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নিয়মিত গল্প দিতে পারবো বলে আশা রাখছি।)