18/03/2022
একটু আলাদা ছিলো, তাই না?
আমরা তখন অপেক্ষা করতাম শব-ই বরাতের জন্য।
সকাল থেকে চাপা উত্তেজনা-
যোহরের পর থেকে মসজিদে মসজিদে মাইকে শোনা যেতো হামদ্-নাত। কিছুক্ষণ পরপর চাল তুলতে আসতো মসজিদ থেকে,
আমরাও এলাকার মসজিদের হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়েছি।
রুটি বানানোর জন্য চাল কোটা-গরুর গোস্তের বন্দোবস্ত- হালুয়ার জন্য দুধ,
মসলা রেডি করাতে ব্যস্ত থাকতেন বাবা মা।
অন্যান্য দিনের তুলনায় রান্নাঘরে সেদিন পাওয়া যেতো আলাদা ঘ্রাণ।
এর মধ্যেই শুরু হয়ে যেতো প্রতিবেশীদের থেকে রুটি-হালুয়ার আগমণ। স্টিলের ট্রে’তে করে নিয়ে আসা হতো খাবার। মিসকিন’রা ভিড় করতো দরজায়- আমাদের উপর দায়িত্ব ছিলো সবার মধ্যে বন্টন করা। বন্টন শেষেও অনেকে আসতেন-
আমাদের এও দায়িত্ব ছিলো – তাদের বলা- চলে যান, দেওয়া শ্যাষ।
আছরের পর পরেই মহল্লার বন্ধুদের জড়ো হওয়া শুরু। রাত পর্যন্ত একসাথে থাকার সৌভাগ্য শব-ই বরাত ছাড়া অন্য কোনো সময়ে সম্ভব না। আমরা খেলার মাঠে পাঁচিলে পা ঝুলিয়ে পরিকল্পনা করেছি- রাতে কি কি করা যায়?
মাগরিবের নামায শেষে দীর্ঘ খুতবা,
মসজিদে তিল ধারণের স্থান নেই- ছোট বাচ্চা কোটায় আমাদের থাকতে হতো শেষ কাতারে।
তাতে অবশ্য আমাদের সুবিধাই হতো- বন্ধুরা একসাথে বসে জমিয়ে রাখা গল্পগুলো ফিসফাস করে শেষ করতে পারতাম। কতোজন যে কতোবার ‘ফিক’ করে হেসে দিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।
দীর্ঘ আলোচনার পর জিকির।
মসজিদের বাতি বন্ধ করে শুধুমাত্র লো লাইট অন করে রেখে মুসল্লিরা একমনে জিকির করতেন।
গুমগুম শব্দ ছাড়া পৃথিবীতে তখন আর কোনো শব্দ শোনা যেতো না।
আমরাও তালে তালে মাথা দুলিয়েছি।
আল্লাহু আল্লাহু করে উঠেছে আমাদেরও ক্বলব।
জিকিরের মধ্যেই আমরা অপেক্ষা করতাম-
কখন শেষ হবে এবং মসজিদ কর্তৃক বানানো অমৃতসম খিচুড়ি আমাদের ভাগ্যে জুটবে।
চাপা একটা ভয়ও থাকতো- যদি না পাই!
বাড়িতে বানানো নানান পদের খাবারের থেকেও আমাদের লোভ ছিলো মসজিদের এই তবারকের প্রতি। হালকা ভেজা ভেজা এই খিচুড়ি যেকোনো বেহেশতি খাবারের সমতুল্য বলে আমাদের মনে হতো!
জিকির শেষে দোয়া-
আহারে, কি সে দোয়া- একবার হাত উঠলে-
ঘন্টা খানেক খোদার আরশের দিকে তাক করা থাকতো! মুসল্লিদের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতো ধীরে ধীরে। আমরা চুপ করে থাকতাম-
কেনো যেনো আমাদের চোখে পানি আসতো না-
বাচ্চা ছিলাম বলেই হয়তো!
সমস্ত আয়োজন শেষে শুরু হতো
নফল নামাজের হিড়িক।
বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নামায পড়া।
তুই পঞ্চাশ রাকাত,
দাঁড়া আমি এক ঘন্টাতেই এক’শ পড়ে ফেলবো!
সবচেয়ে উত্তেজনার পার্ট ছিলো-
গোরস্থানে যাওয়া।
দল বেঁধে বিভিন্ন মসজিদ থেকে
নিকটস্থ কবরস্থানে যাওয়া হতো মৃতদের
মাগফিরাত কামনার লক্ষ্যে।
আমাদের লক্ষ্য ছিলো শুধু যাওয়া-
মধ্যরাতে কবরস্থানে যাওয়ার লোভ কেউই
সামলাতে পারতাম না।
তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরে আসা।
সারারাত জাগবো নিয়ত করেও ঘুমে আচ্ছন্ন!সারারাতের ইবাদত বৃথা যাবে-
যদি ফজর না পড়ি-
এটা জানার পরেও শরীরের কাছে হার মেনে ঘুমিয়ে পড়া-
পরদিন সকালে উঠে সেই কি আফসোস!
আহারে শৈশব!
আমরা জানতাম-
শব-ই বরাতের দোয়া বৃথা যায় না।
শৈশবে লিস্ট করতাম- দোয়ায় কি কি চাইবো!
সবই চাওয়া হতো নিজের জন্যে।
আজকে নিজের জন্য চাওয়ার কিছু নেই!
শুধু চাই- ফিরে আসুক আগের শীতলতা।
এখনকার শৈশবে থাকা পিচ্চি গুলো ভয়ংকর স্মৃতি না নিয়েই বেড়ে উঠুক।
আমাদের শব-ই বরাত।
একটু আলাদা ছিলো, তাই না?
🖤