16/01/2022
'ফ্যাচফ্যাচ করে কোর্টের সামনে বসে কাদছিস কেনো?যা বাসায় যা।মানুষ কত অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে চোখে পড়েনা তোর?'
কারোর গলার স্বর শুনে চোখ তুলে তাকালাম।সামনে সাদিফ দাড়ানো।দেখেই রাগে শরীর জ্বলে উঠলো।যার জন্য চোখের পানি সেই এসে বলে কাদছি কেনো!আমি ওর দিকে না তাকিয়ে চারদিকটায় নজর বুলালাম।সত্যিই মানুষ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে।আজ আমার আর সাদিফের ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলতে কোর্টে আসা।উকিল ডেকেছিলেন দুজনকেই।দুজনের মতামত জানলেন উকিল সাহেব।এরপর কোর্টে সব কাগজপত্র পেশ করা হবে।আমার কাদতে ইচ্ছে করেনা।কিন্তু এই মানুষটাকে দেখলে আমার আপনা-আপনি চোখে পানি এসে যায়।উকিল সাহেবে সাথে কথা বলা শেষ করে বাসায় যাবো কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না বলে কোর্টের বাইরে একটা বন্ধ চায়ের দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চে বসে কাদছিলাম আর সাদিফ এসে কথাটা বলে আমাকে।আমি চারদিকে নজর বুলানো বাদ দিয়ে ওর দিকে তাকালাম।একা একা আগ বাড়িয়ে কেনো আসলাম ধুর।ভাইয়া আসলে এতক্ষণে বাসায় নিয়ে চলে যেতো।বদমাইশটা এখনও দাড়িয়ে আছে সামনে।আমি তাকাতেই ভ্রু কুচকে তাকালো।তারপর আবারও বলে উঠলো,
'তোরে জিন্স টপর স্কার্ফ গলায় ঝুলাতে মানা করছিলাম।পড়ছিস কেনো আবার?'
'চুপ করবি তুই?কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা বুঝতে পারছিস না?কাদিয়ে জিগাসা করিস কাদছি কেনো?আর আমার লাইফ আমি যা খুশি পড়বো তোর কি?কে তুই আমার?কিছু হস না তুই আমার? একদম অধিকার দেখাতে আসবিনা তুই।সর চোখের সামনে থেকে।'
কথাটা বলেই আমি ওখান থেকে উঠে হাটা ধরলাম।উদ্দেশ্য সিএনজি ধরে বাসায় যাবো।কিন্তু সাদিফ পিছন পিছন তাশফি তাশফি করে চিল্লাচ্ছে আর আসছে।আমি পিছন ফিরে তাকালাম। কোমড়ে হাত দিয়ে দাড়িয়ে বললাম,
'রাস্তার মধ্যে সীন ক্রিয়েট করার শখ জাগছে তোর?জুতার বারি খাওয়াবো কি তোরে?এমন ষাড়ের মতো চিল্লাচ্ছিস কেনো?মানুষ তাকিয়ে এখন কি দেখছেনা?আমি কাদছিলাম সেটাই দেখছে তোর চিল্লাচিল্লি কি দেখেনা তারা?'
আমার কথার কোনো দাম দিলোনা সাদিফ।হাত ধরে একটা রিকশা থামিয়ে রিকশায় টেনে তুললো।চারদিকে মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে বলে চুপচাপ উঠলাম। নতুন করে তামাশা দেখতে ইচ্ছে করছেনা।রিকশায় উঠে ও রিকশাওয়ালার সাথে বগুড়া শহর ঘুরে দেখাতে কথা মিটমাট করলো।আমি জিগাসা করে বসলাম,
'সম্পর্কটা বিচ্ছেদের পর্যায়ে। এমন মায়ার জন্ম দেওয়ার চেষ্টা কেনো করছিস?'
'প্রথমত আমি তোর আটবছরের বড়, তাই তুই নয় আগের মতো তুমি বলে ডাক।দ্বিতীয়ত আমাদের সম্পর্কটা শুরু বিচ্ছেদ দিয়ে তাই বিচ্ছেদই হয়তো এর পরিণতি।'
'মানে?'
সে আমার দিকে তাকালো এবার।একটু চুপ থেকে উত্তর দিলো,
'বিষয়টা সাধারণ,তুই যদি তোর বেস্টির সাথে আমায় মিলিয়ে দিতি আমি ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা ভোগ করতাম না।ইভেন আমি এখনও ভুলতে পারিনা তারে।সে সাথে নেই অথচ মনের মধ্যে জ্বলে যায় তার কথা ভেবে।এখন বুঝছিস তো কেমন লাগে?'
আমি নিরবে দুফোটা অশ্রু ঝড়ালাম।অন্যদিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
'বেস্টি যারে ভালোবাসছে তার সাথে মিলিয়ে দিয়েছি।তার প্রতিশোধটা এভাবে না নিলেও পারতি।তোরে ভালোবাসলে তোর সাথেও মিলাতাম।কিন্তু আমার জীবনটা নষ্ট করে কি শান্তি পেলি?'
'আবারও তুই বলছিস যে!তোর বেস্টি তোরে কখনও বলছিলো সে যার সাথে বিয়ে দিলি তারে ভালোবাসে।ছেলেটা তো পারিবারিক ভাবে বিয়ে করেছিলো তারে।তোর বেস্টির মা উনি তো রাজী ছিলোনা। তুই রাজী করিয়েছিলি।তুই রাজী না করালে আমি তারে বিয়ে করতে পারতাম পারিবারিক ভাবে।'
'তোরে দেখলে তুই ছাড়া আর কোনো।ডাক আসেনা।আমার বেস্টি আমি জানতাম ওর কার প্রতি অনুভূতি আছে।ওরে পাইলিনা, তুই আমার ভাইয়ের হাত ধরে আমায় চেয়েছিলি।যেদিন কাবিন নামায় সই করেছিলাম এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে করেছিলাম সই।হাত ধরে বলেছিলি আমার পড়া শেষ হলে ঘরে নিয়ে যাবি তোর ঘরে।টোনাটুনির সংসার হবে আমাদের।এরমাঝে এবরোডে জব করতে চলে গেলি রেখে।সেখানে গিয়েও সুন্দরমতো অন্য কাউকে জুটিয়ে নিয়ে আমায় আজ ছুড়ে ফেললি।এই তোর ভালোবাসা!'
ও হাসলো আমার কথায়।আমি কিছু বললাম না আর।চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি।নিরবতা ভেঙে ও বলে উঠলো,
'কিছু চোখে যা দেখা হয় তার সত্যি হয় না রে। আই ইউশ যদি বলতে পারতাম।'
'কি সত্যি বল শুনি!এরপর তোর মুখোমুখি বেচে থাকতে হবোনা।কাগজ পাঠিয়ে দিস সাইন করে দিবো।'
'বলতে পারলে আগেই বলতাম।যাই হোক তুই আর কখনও এসব পড়বিনা।নিষেধ করছিলাম সাহস হয় কি করে পড়ার?'
'কথা কাটাচ্ছিস!আচ্ছা যা না বললি।কিন্তু তোর আর অধিকার নেই আমায় এসব বলার।'
'আইনত এখনও তুই আমার কাবিন করা বউ।'
'বউ! হাসাচ্ছিস।আচ্ছা বিচ্ছেদে এত যন্ত্রণা কেনো রে?'
'বিচ্ছেদে সুখ থাকলে পৃথিবীতে একটা কাপলও খুজে পেতিনা।বিচ্ছেদে যন্ত্রণা বলেই মানুষ ভালোবেসে একে-অপরের পাশে থাকে।'
'আমায় তবে ভালো কেন বাসলি না? আমি এতই খারাপ?দুইটা বছর আগে তুই কাবিন করে এক আকাশ স্বপ্ন দেখালি।আজ দুইবছর পর সেগুলো দুঃস্বপ্নে পরিণত করলি।এক সাইনে বাচার আশা আরেক সাইনে ঝর বয়ে আনলি লাইফে।'
'ঝড়ের পরেও নতুন একটা সূর্য উকি দেয়।সেই সূর্যের আলো তোর জীবনে আসুক। তাই এই বিচ্ছেদ বিরহ। '
আমার আর কথা বলতে ইচ্ছে করলোনা।মানুষটা আমায় পিষে মারার চেষ্টায়।খানিকক্ষণ পর সে রিকশাওয়ালাকে সাতমাথার চত্বরে থামিয়ে ভাড়া মিটালো।সিএনজি স্ট্যান্ডে এনে একটা সিএনজি ধরে বসিয়ে দিয়ে সিএনজি ওয়ালে বললো ঠিকমতো বাসায় পৌছে দিতে।ভাড়াটাও মিটিয়ে দিলো।আমি চেচিয়ে বলে উঠলাম,
'আমার কাছে টাকা আছে।আমি দিতে জানি।এই চাচা আপনি ওর টাকা ফেরত দেন।'
সাদিফ সিএনজির ফাক গলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
'তুই মানুষটা এখনও আমার আর আমারই দায়িত্ব।মাফ করিস না আমায়।ঘৃণা পুষে রাখিস।লাইফে আগাতে পারবি।আমায় মায়ায় আটকে থাকিস না ঝড়ের বেগ বাড়তেই থাকবে।ভালো থাকিস তুই সবসময় দুয়া রইলো।'
কথাগুলো বলায় সময় চোখের কার্ণিসে জল দেখলাম।এ কেমন যন্ত্রণা আল্লাহ।এরমাঝেই শুনতে পেলাম,
'চাচা যা বললাম সেই অনুযায়ী পৌছে দিবেন।আর হ্যা একটা লোকও উঠানোর দরকার নেই।'
সিএনজিওয়ালা তার কথায় সিএনজিতে বসে সিএনজি ছেড়ে দিলো।আমি সিএনজির ফাকা দিয়ে মাথা গলিয়ে বাইরে তাকালাম।সে দাড়িয়ে আছে বুকে হাত ভাজ করে দাড়িয়ে আছে।যতদূর দেখা গেলো দেখলাম।তারপর সিএনজির সিটে গা এলিয়ে দিয়ে হাতে থাকা ফোনটায় তার ছবি বের করে বুকের সাথে চেপে ধরলাম।এত যন্ত্রণা কেনো।আনমনে ভেবে উঠলাম,"এ কেমন তিক্ত অনুভূতি!সহ্যও করা যায়না,দূরেঔ ঠ্যালা যায়না।
সমাপ্ত
অণুগল্প_তিক্ত_অনুভূতি
Hridi