29/12/2025
পুনরুত্থান
পর্ব ২
-জান্নাতুল ফেরদৌস রিমু
ঝন ঝন ঝন শব্দে চোখ মেলে তাকাল। সাথে সাথেই যেন মাথায় ধাক্কা খেল তীব্র যন্ত্রণা। চোখ বন্ধ করে খানিক সয়ে নিল ব্যাথাটা। তারপর আবার চোখ মেলল ধীরে ধীরে। চোখের সামনে ভেসে উঠল, গোল পাতার ছাদ। আস্তে আস্তে চোখ ঘুরিয়ে দেখল একটা কুঁড়েঘরে শুয়ে আছে ও। বিছানাটা শক্ত। ঘরে তেমন আসবাব নেই। মাটির ঘরের কোণায় একটা ছোট খাট আলমারি। তাতে দু চারটে কাপড় গুছিয়ে রাখা। এর পাশেই একটা চারপায়া টেবিল। তার উপরে স্টিলের মগ, থালা এসব টুকটাক প্রয়োজনীয় আসবাব রাখা। উঠে বসতে চাইল। কিন্তু মাথা ভীষণ ভারী হয়ে আছে। আস্তে-ধীরে মাথাটা চেপে ধরতে গিয়ে হাতে টান পড়ল। দেখতে পেল ক্যানেলা পরানো। পাশে স্যালাইন রাখা। ক্যানেলা হাত থেকে ছাড়িয়ে মাথা চেপে ধরে উঠে বসল। মাথায় কাপড় বাঁধা। কখন বেঁধেছে কেন বেঁধেছে কিছু মনে পড়ল না। চোখে পড়ল, মাটির মেঝেতে স্টিলের থালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওকে উঠে বসতে দেখে টেবিলের তলা থেকে একটা ছোট বিড়াল ডেকে উঠল, মিঁউ মিঁউ। তারপর বেরিয়ে এসে লেজ দুলাতে দুলাতে ঘরের বাইরে চলে গেল। বোঝা গেল বিড়ালটিই ফেলেছে এসব। থালা পড়ার শব্দে ঘরে একজন ষোড়শী কন্যা ছুটে এলো। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা তোলা। বৌ বৌ মুখ যেন। শালীন গোল জামা। দরজার সামনে এসে এক পলক ওকে বসা দেখতে পেল। মুখ রক্তিম হলো মেয়েটির। পেছন ফিরে দাঁড়াল। সাথেই সাথেই মাথার ঘোমটা সরে গেল। বেরিয়ে এলো লম্বা ঘন কালো কেশ। ইশ! এত লজ্জা! মেয়েটি আর দাঁড়াল না। বাসন না তুলেই ছুটল আবার। মেয়েটিকে দেখে ও কথা বলতে ভুলে গেল। পানির তৃষ্ণা পেয়েছে। কিন্তু ভ্রম কাটিয়ে বলবার আগেই মেয়েটি চলে গেছে। কেন এলো কেন গেল কিছুই বুঝল না।
খানিকক্ষণ সময় পর ঘরে ঢুকলেন একজন বৃদ্ধ। চেহারা নূরে পরিপূর্ণ। কপালে কালো দাগ পড়েছে। শুভ্র পাঞ্জাবি পরনে।মাথায় শুভ্র টুপি। বয়স অনেক বেশি না। পঞ্চাশের আশে পাশে হবে। দেহ এখনও সুঠাম। ঘরে ঢুকে তিনি এক গাল হাসলেন ওকে দেখে। বললেন, বাবা! এখন কেমন লাগছে?
বৃদ্ধের হাসি দেখে ওর মন জুড়িয়ে গেল। বলল, ভালো। ভালো লাগছে। পানি খাব।
এ কথা শুনে বৃদ্ধ গলা উঁচিয়ে হাঁক দিলেন, কই রে মা পানি আন তো।
বলে তিনি পড়ে থাকা থালা বাসনগুলো তুলে রাখলেন টেবিলের ওপর।
একটু পর সেখানে একজন কালো কাপড়ে আবৃত নারী এসে দরজার কাছে একটি পানির জগ রেখে গেল। বৃদ্ধ তা থেকে মগে ঢেলে ওকে পানি দিল।
পানি খেয়ে মগটা বৃদ্ধের হাতে দিল। বৃদ্ধ সেটা তুলে রেখে আবার চকির পাশে রাখা চেয়ারে এসে বসল। বলল, তোমার আর কোথায় কোথায় ব্যাথা আছে বলতে পারো?
ও বলল, আমার মাথায় ব্যাথা করছে খুব। ডান পাশের চোখেও কিছুটা ঝাপসা লাগছে সব। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না? আমি কোথায়?
বৃদ্ধ বললেন সব জানবে ধীরে ধীরে। কেবল জেগে উঠেছ। আমার ধারণার চেয়েও দ্রুত চেতনা ফিরেছে তোমার। তোমার মাথার ক্ষতে ওষুধ লাগানোর সময় হয়ে গেছে।
বলতে বলতেই আবার এলো সেই কালো কাপড়ে আবৃতা নারী। হাতে একটা ট্রে। তাতে সুতি কাপড়, খাবারের বাটি, ওষুধের ছোট ছোট কয়েকটি শিশি রাখা। খাবারের বাটি থেকে ধোঁয়া উঠছে। সেটি টেবিলের উপর রেখে আবারও চলে গেল সে। খাবারের ঘ্রাণে টের পেল বড়ই ক্ষুধা পেয়েছে ওর। মনে হলো কতদিন খাওয়া হয় না।
বৃদ্ধ ট্রে থেকে ওষুধগুলো তুলে আনলেন। পুরোনো বাঁধন খুলে নতুন করে ড্রেসিং করে দিলেন। বেঁধে দিলেন সুতি কাপড় দিয়ে। ওর শরীর খুবই দুর্বল লাগছিল। তাই মাথায় এত প্রশ্ন থাকলেও সে তখন প্রশ্ন করার মন বা শরীরের কোনো টান পেল না। সুস্থতা অনেক বড় সুখ। অসুস্থ না হলে বোঝা যায় না। বৃদ্ধ যাই করতে লাগল ও কিছুতেই বাঁধা দিল না। সব কিছু কেমন ঘোরের মতো লাগল। ড্রেসিং শেষে সুতি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে দিল ওর মাথা। তারপর বাটিতে রাখা খাবার খেতে দিল ওকে। ক্ষুধার জ্বালায় সেই বাটি থেকে গরম তেঁতো পানীয় পেট ভরে খেল ও। হাতে নতুন করে ক্যানেলা পরিয়ে দিল বৃদ্ধ। বললেন, এখন শুয়ে পড়ো। এই ঘুমের পর আশা করি তোমার মাথা ব্যাথাটা আর এত তীব্র থাকবে না। চোখেও ভালো দেখতে পাবে ইন শা আল্লাহ।
বিছানায় পিঠ লাগাতেই ঘুম জড়িয়ে এলো চোখে। যেন তলিয়ে যেতে লাগল নিরুদ্দেশের ঠিকানায়।
জ্যৈষ্ঠ মাস। দোসরা দিন। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ্দুর। গোল পাতার ছাউনিতে অসহ্য গরম। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে চোখেমুখে পড়ছে। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে জানালার অপর দিকে কাত হয়ে শুয়ে রইল খানিকক্ষণ। ঘুমের রেশ কেটে গেলে দেখতে পেল আজকে ঘরের দরজাটা ভেজানো। উঠে বসল। একটা ফ্যান বা পাখা কিছুই নেই। মাথায় চিনচিনে একটা ব্যথা করছে। তবুও ঝরঝরে লাগছে। গোসল করতে পারলে আরো ফ্রেশ লাগত। মুখে হাত দিয়ে দেখল দাড়ি হয়েছে অনেকখানি। টেবিলের উপরে একটি আয়না ঝুলানো। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, লম্বাটে ভরাট মুখ। দাড়িগুলো খানিক লম্বা। কপালে সুতি কাপড়ের বাঁধন। শুকনো মুখ। উজ্জ্বল শ্যামলা বরণ। নিজেকে পরখ করে দেখতে লাগল ও।
মিঁউ মিঁউ! দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে প্রবেশ ঘটল ছোট্ট বিড়ালটির। গায়ের রঙ কালোর উপর কমলা আর সাদার মিশেলে। বিড়ালটি হয়তো পোষা। ঘরে ঢুকেই ওর পায়ে পায়ে ঘুরতে লাগল। ভালো লাগল ওর। কোলে তুলে কথা বলতে লাগল, এই আদুরে! বল তো গোসল করার জায়গাটা কোনদিকে।
বৃদ্ধ ঘরে প্রবেশ করতে করতে বললেন, উঠে পড়েছ? এখন কেমন লাগছে?
ও বলল, ভালো লাগছে। মাথা ব্যথা আগের মতো নেই৷ চোখেও ভালো দেখছি। বলছিলাম, আপনি কে? আমি এখন কোথায়?
বৃদ্ধ বললেন, আমাকে তুমি চিনবে না৷ আমি এই গ্রামের মসজিদের ইমাম ও চিকিৎসক। আমি এখানে আসার পর থেকে গ্রামের লোকেরা সদর হাসপাতালে তেমন গুরুতর না হলে যায় না। ওটা খুব দূরে। আমি বংশ পরম্পরায় একজন চিকিৎসক আলহামদু লিল্লাহ। আর দ্বীনের বিষয়ে পড়াশোনা করা হয়েছিল তাই এখানে মসজিদকে চলমান রাখার চেষ্টা করি। নয়তো আল্লাহর সব বান্দারা আল্লাহর ঘরে হাজিরা দিতে চায় না। তুমি আমার ছেলের মতো তাই তুমি করে বলছি কিছু মনে করো না৷
ও- না কী মনে করব। আপনি মুরব্বি মানুষ। তুমি করেই বলুন। কিন্তু আমি এখানে কী করে এলাম?
বৃদ্ধ- গ্রামের লোকেরা তোমাকে নদীর ধার থেকে তুলে এনে আমার কাছে রেখেছে। এরপর প্রায় এক সপ্তাহ তুমি এই গরীবের ঘরে কোমায় ছিলে। আমার ভাতিজি খুবই লক্ষী মেয়ে। ও এখনও আমার কাছে চিকিৎসা শিখছে। এই কয়দিন মেয়েটাও তোমাকে সুস্থ করতে লেগে ছিল। আল্লাহ তোমাকে ভীষণ সুন্দর স্বাস্থ্য দিয়েছেন মা শা আল্লাহ। আমি তোমার ক্ষতের গভীরতা দেখে ভেবেছিলাম তোমার জ্ঞান ফিরতে অন্তত এক মাস সময় লাগবে। আল্লাহ তোমাকে অতিদ্রুত সুস্থ করবেন ইন শা আল্লাহ।
ও বলল, আপনাকে দেখে ডাক্তার মনে হয় না চাচা। আচ্ছা, আমার কী হয়েছিল? আমি কোমায় ছিলাম কেন?
প্রশ্নটি যেন নিজেই নিজেকে করল ও। বেখাপ্পা শোনাল নিজের কানেই। মনে করতে চাইল কী কারণে ব্যথা লেগেছিল? মনে পড়ল না। আরও ভাবল নিজের সত্তাকে, নিজের নাম কী? একদম বোকা লাগছে। কিছুই মনে পড়ছে না। জোর করে মনে করতে গেলে মাথার যন্ত্রণা বাড়ছে।
বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন। বললেন, থাক এখন আর মস্তিষ্কে বেশি চাপ দিও না। ধীরে ধীরে মনে পড়বে। তোমার মাথার ডান পাশ আর ডান চোখ লৌহ জাতীয় কিছুর সাথে লেগে আঘাত পেয়েছিল। অনেক বড় দুর্ঘটনা হতে পারত। আল্লাহ তোমাকে অনেক অল্পেই বিপদ কাটিয়ে দিয়েছেন। নদীতে কী করে পড়লে সেটাই বুঝতে পারছি না। তোমার তো কিছুই মনে পড়ছে না। জানার উপায় নেই। এখন খাবারের সময় হয়েছে। খেয়ে নাও বাবা।
ও বলল, আমাকে একটু গোসল করার জায়গাটা দেখিয়ে দিন চাচা! শরীর খুব ভার লাগছে।
বৃদ্ধ - এই দেখ, আমার মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছিল বিষয়টা। চলো তাহলে। আমাদের বাড়িতে পুকুর আছে। পুরুষ মানুষ পুকুরে গোসল করি। তোমার শরীর এখনও বেশ দুর্বল। সিঁড়িতে বসে গোসল করে নাও। বেশি নীচে নামতে হবে না।
ও চাচার কথা মেনে নিয়ে তাঁকে অনুসরণ করল।
গোধূলি। চাচার খোঁজে বাইরে এসে দাঁড়াল ও। চাচা হয়তো বাড়িতে নেই। অপরিচিত জায়গায় কী করবে বসে বসে? গ্রামের পরিবেশ সুন্দর। এই বাড়িটাও সুন্দর। সূর্যের পড়ন্ত রোদ তেরছা ভাবে এসে পড়েছে কুঁড়েঘরের সামনের উঠোনে। কমলা রঙে ছেয়ে আছে বিশাল উঠোন। উঠোনের কিনার ধরে সারি সারি ফুল গাছের টব। নয়নতারা, সন্ধ্যামালতি, বেলী, ঘাসফুল, গন্ধরাজ আর উঠোনের ঠিক মাঝখানে একটা বড় শিউলি ফুল গাছ। দেখতে ভীষণ মনোরম। একটা মিহি ঘ্রাণে ভরে আছে উঠোন। ছায়া ঘেরা জায়গাটায় এখানে সেখানে পড়ে আছে শিউলি ফুল। দেখতে দেখতে মন জুড়িয়ে যায়। অপরপাশে একটা পুরোনো আধাপাকা দালান। টিনশেডের ছাদ। রঙহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও আলো ঝলমলে।খোলা জানালা দিয়ে এক ঝলক দেখতে পাওয়া গেল সেদিনের সেই মেয়েটাকে। চুলে বেণী গাঁথছিল বোধ হয়। গোলগাল মুখে হাসি লেগে আছে। যেন দুনিয়ার সব রঙ সব সুখ এই মেয়ের মনেই। হঠাৎ চোখাচোখি। মেয়েটা বিব্রত হলো বোধ হয়। তবুও ও গাঢ় চোখে তাকিয়েই আছে। মেয়েটার কপাল কুঁচকে গেল। ঘন কালো ভ্রুদ্বয় কাছাকাছি এলো। শ্যামলা গোল মুখে নামল রাজ্যের রাগ। এরপর ঢপাস শব্দে বন্ধ হলো জানালার কপাট। মুখের ওপর এভাবে জানালা বন্ধ হওয়াতে ওর একটু অপমানিত লাগল বৈকি!
কখন যে পুরোপুরি সূর্য পালিয়ে গেছে আর অন্ধকার নামতে শুরু করেছে খেয়ালই হয়নি ওর।
"আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার" পাশেই মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আযান। ধ্যান ভাঙল সে শব্দে। অযূ সেরে মসজিদে গেল ও। মসজিদে গিয়ে পাওয়া গেল বৃদ্ধ চাচাকে। ইমাম বলেই হয়তো জলদি আসেন তিনি। ওকে দেখে বলল, তুমি মুসলিম কি না জানতাম না তো আর তোমারও কিছু মনে নেই তাই তোমাকে ডাকিনি বাবা। ভালো লাগল তোমাকে মসজিদে দেখে। ও বলল, আমি নামায- মসজিদের সাথে পরিচিত। বেসিক জিনিসগুলো মনে আছে হয়তো। উত্তরে বৃদ্ধ হাসলেন শুধু।
সালাত শেষে কিছু সময় মাসনূন আমল করালেন সকলকে সেই বৃদ্ধ ইমাম। তারপর ওর দিকে ইশারা করে সবাইকে বললেন এই সেই যুবক যাকে আপনারা নদী থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন এক সপ্তাহ আগে। সবাই মুখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকালে ও একটু বিব্রত বোধ করল এত লোকের সামনে। সামান্য হাসল। একজন বয়স্ক মুসল্লী বললেন, তুমি এখন সুস্থ? ও উত্তরে বলল, হ্যাঁ ভালো। ওর দিকে তাকিয়ে সেই মুসল্লীর পরিচয় দিলেন ইমাম সাহেব। ইনি মোতালেব ভাই। তুমি চাচা ডাকতে পারো। এই ভাইয়ের ছেলেই তোমাকে রক্ত দিয়েছিল।
এ কথা শুনে ও কৃতজ্ঞতা জানাল মোতালেব চাচাকে। মোতালেব চাচা বললেন, তোমার অবস্থা খুব খারাপ আছিল। আমরা তো আশা ছাইড়া দিসিলাম প্রায়। তবে রাখে আল্লাহ মারে কে? আল্লাহ তোমার হায়াত রাখছে। আমার ছেলেটা এসব সামাজিক সেবার কাজ করে বুঝছ। অয় তোমারে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলছিল। ইমাম সাব কইল হাসপাতাল তো দূরে। রক্ত অনেক গেছে। আঘাত খুব গভীর। চেষ্টা করে দেখি। ইমার্জেন্সি রুগী আগে ইমার্জেন্সি চিকিৎসা দিয়ে দেখি। আমি মনে হয় পারব ইন শা আল্লাহ।
ইমাম সাহেবের চিকিৎসার উপর বিশ্বাস আছে আমাগো গ্রামবাসীর। আল্লাহ ভরসা কইরা এইখানেই তোমার জন্য সব ব্যবস্থা করছি সবাই।
আবারও সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাল ও। সবার এই ভালোবাসায় ওর মন ভরে গেল৷ কাউকে চেনে না আবার তারাও ওকে চেনে না। অথচ কতটা করেছে ওর জন্য। এর ঋণ শোধ করা অসম্ভব।
অপর একজন মুসল্লী চাচা জানতে চাইলেন, তা বাবা তোমার নাম কী? কোন জায়গার পোলা তুমি?
এই প্রশ্নে উত্তরহীন হয়ে চেয়ে রইলে ইমাম সাহেব বললেন, ওর কিছু মনে নেই। দুর্ঘটনায় ওর মাথায় বড় ধরণের আঘাত লেগেছিল। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এখন আপাতত এই গ্রামেই থাকতে হবে ওর যতদিন না সবকিছু মনে পড়ে যায়।
গ্রামের মেম্বার সাহেবও নামাযে এসেছিলেন। ছেলেটির ব্যাপারে জানতেন তিনি। মাঝে মাঝে খোঁজও নিয়েছেন। কিন্তু জ্ঞান ফেরার ও স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার খবর তিনি জানতেন না। মসজিদে এখন জানতে পেরে বললেন, তাহলে তো এই ছেলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। এই কয়দিন না হয় হুশ আছিল না তাই ইমাম সাহেবের বাড়িতে ছিল। এখন তো আর তারে ইমাম সাবের বাড়িতে রাখন যায় না। তাঁর বাড়িতে বিয়ের উপযুক্ত কন্যা আছে। পরিবারে আর কেউ নাই। এমন ফাঁকা বাসায় তো বেটা ছেলে রাখা নিরাপদ না।
এতে গ্রামের সকল মুসল্লী একমত হলো। একজন বলল, আসলেই তো। মেম্বার সাব একটা যুক্তির কথা কইছে। নাম ধাম নাই পরিচয় ঠিকানা কিছুই জানা নাই এমন একটা বেটা ছেলে মানুষ তো কারো বাড়িতেই রাখা ঠিক না। মেম্বার সাব! আপনিই একটা সিদ্ধান্ত নেন কই থাকতে দেওয়া যায় এই ছেলেরে।
তখন মেম্বার সাহেব বললেন, আমার বাড়িতে শুধু আমার বিবিই মহিলা মানুষ। সে তো বাহিরেও বের হয় না। বাড়ির বাইরের মেহমান খানায় থাকার ব্যবস্থা করলে ঠিকঠাক লাগে আমার কাছে। ওখানে আরামেও থাকতে পারবে সে আর আমার লোকেরাও ওর খাতির যত্ন করতে পারবে। আর যা চিকিৎসা বাকি আছে নিয়মিত ইমাম সাব আমার বাড়িতে আইসা দেইখা যাবে তারে। আপনারা কী বলেন!
এই সিদ্ধান্ত গ্রামের সবারই মনঃপুত হল। সবাই একযোগে রাজি হয়ে গেল। নতুন একটা নাম দিলেন ইমাম সাহেব ওকে। "ওমর"। এটাও সবাই পছন্দ করল। এসব আলাপ আলোচনায় ইশার ওয়াক্ত হয়ে গেল। তাই একেবারে ইশা পড়েই সকলে যার যার বাড়িতে গেল। আর ওমরকে মসজিদ থেকেই মেম্বারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল।