09/02/2025
গল্প : ছায়ার অন্তর্ধান
জনরা : সাসপেন্স (Suspense),থ্রিলার (Thriller),মনস্তাত্ত্বিক রহস্য (Psychological Mystery)
গভীর রাত। রাস্তায় আলো ঝিমিয়ে পড়েছে। শুধু কয়েকটা স্ট্রিটল্যাম্পের হলুদ আভা ছড়িয়ে আছে অন্ধকারে। নীলা একা হেঁটে চলেছে। তার পায়ের শব্দ ছাড়া চারপাশে কোনো আওয়াজ নেই। আজ অফিসে লেট হয়ে গিয়েছিল। ট্রেন ধরতে দৌড়াতে হয়েছিল। এখন বাসায় ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা বাজে।
নীলার মনে হচ্ছিল, আজ রাস্তাটা একটু বেশিই নির্জন। হয়তো শীতের কারণে লোকজন বাড়ি চলে গেছে। সে নিজের কোটটা টেনে গায়ে জড়িয়ে নিল। হঠাৎ পেছনে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সে থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল, কেউ একজন দ্রুত এগিয়ে আসছে। নীলা দ্রুত পা চালাল। কিন্তু পেছনের পায়ের শব্দও যেন তাল মিলিয়ে বাড়ছে।
সে হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। বুকটা ধড়ফড় করছে। রাস্তার শেষ মোড়ে পৌঁছে সে দৌড়াতে শুরু করল। পেছনের লোকটাও দৌড়াচ্ছে। নীলার মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনোভাবেই পেছনের মানুষটাকে ছাড়াতে পারছে না। হঠাৎ সে দেখল, সামনে একটা গলি। নীলা গলিতে ঢুকে পড়ল। গলিটা অন্ধকারে ভরা। সে দৌড়ে গিয়ে একটা বাড়ির গেটের পেছনে লুকাল।
পেছনের লোকটা গলিতে ঢুকল। নীলা দেখল, লোকটা একটা কালো হুডি পরা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। লোকটা গলির মধ্যে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। নীলার শ্বাস আটকে আসছিল। সে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করতে লাগল, যেন লোকটা তাকে না দেখে।
হঠাৎ লোকটা থমকে দাঁড়াল। তারপর আস্তে আস্তে গলি থেকে বেরিয়ে গেল। নীলা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। যখন নিশ্চিত হল যে লোকটা চলে গেছে, তখন সে গেটের পেছন থেকে বেরিয়ে এল।
সে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। বাড়ির সামনে পৌঁছেই সে দেখল, দরজা খোলা। নীলার মনে পড়ল, সে তো দরজা বন্ধ করেই বেরিয়েছিল। তারপরও দরজা খোলা কেন? সে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, লাইট জ্বলছে। লিভিং রুমে কেউ বসে আছে।
নীলা ধীরে ধীরে লিভিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। দেখল, সোফায় বসে আছে তার ছোট ভাই, রাহুল। রাহুলের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি। নীলা অবাক হয়ে বলল, "রাহুল? তুই এখানে কী করছিস? তোর তো আজ হোস্টেলে থাকার কথা!"
রাহুল হাসতে হাসতে বলল, "আপু, তুমি তো সব সময় বলো, আমি বড় হইনি। আজ আমি প্রমাণ করব, আমি বড় হয়ে গেছি।"
নীলার গা শিউরে উঠল। রাহুলের হাতে একটা ছুরি। সে ধীরে ধীরে নীলার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। নীলা পিছিয়ে গেল। রাহুল বলল, "আপু, তুমি তো সব সময় আমাকে অবহেলা করো। আজ আমি তোমাকে শেখাব, আমাকে কেউ অবহেলা করতে পারবে না।"
নীলা চিৎকার করে বলল, "রাহুল! থাম! কী করছিস তুই?"
রাহুলের চোখে পাগলামির চিহ্ন। সে বলল, "আপু, তুমি তো সব সময় আমাকে ছোট ভাবো। আজ আমি তোমাকে দেখাব, আমি কত বড় হতে পারি।"
নীলা দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে দরজার দিকে দৌড়াল। কিন্তু রাহুল তাকে ধরে ফেলল। নীলা চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু কেউ তাকে শুনতে পাচ্ছে না। রাহুলের হাতের ছুরি নীলার দিকে এগিয়ে এল।
হঠাৎ দরজায় কড়া শব্দ হল। কেউ জোরে দরজায় কড়া নাড়ছে। রাহুল থমকে গেল। নীলা দ্রুত দরজা খুলে দিল। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ। একজন অফিসার বলল, "নীলা? তুমি ঠিক আছো তো? আমরা তোমার ফোন কল পেয়েছি। তুমি সাহায্য চেয়েছিলে।"
নীলা অবাক হয়ে বলল, "আমি তো কোনো কল করিনি!"
অফিসার বলল, "না, তোমার ভাই রাহুলের কাছ থেকে কল পেয়েছি। সে বলেছে, তুমি বিপদে আছো।"
নীলা পেছনে ফিরে তাকাল। রাহুল সোফায় বসে আছে। তার হাত থেকে ছুরি মেঝেতে পড়ে গেছে। রাহুলের চোখে জল। সে বলল, "আপু, আমি তোমাকে ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি পারলাম না। আমি তোমাকে ভালোবাসি।"
নীলা রাহুলের দিকে এগিয়ে গেল। সে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "রাহুল, তুই কি পাগল হয়েছিস? আমি তোকে কখনো অবহেলা করিনি। তুই আমার ছোট ভাই, আমি তোকে সব সময় ভালোবাসি।"
পুলিশ অফিসাররা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। নীলা রাহুলকে নিয়ে বসে রইল। সে বুঝতে পারল, রাহুলের মনে কত বড় একটা শূন্যতা ছিল। আজ সে তা পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভুল পথে।
রাত গভীর হতে লাগল। নীলা রাহুলের হাত ধরে বলল, "চল, আজ তুই আমার ঘরেই থাক। কাল আমরা সব কথা ঠিক করে ফেলব।"
রাহুল মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। দুজনে একসাথে বসে রইল। বাইরে আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এল। কিন্তু এবারের নিস্তব্ধতা যেন একটু বেশি আরামদায়ক।
লেখা: Md Yakub Ali